Main Menu

সোভিয়েত সরকারের আশু কর্তব্য সম্পর্কে ছয়টি থিসিস—ভি আই লেনিন

১. সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অতিমাত্রায় সুকঠিন ও সংকটাকীর্ণ, কেননা আন্তর্জাতিক পুঁজিসাম্রাজ্যবাদের অতি সুগভীর ও মূলগত স্বার্থই তাকে প্রবৃত্ত করছে শুধু রাশিয়ার ওপর সামরিক হানার প্রয়াসে নয়, রাশিয়াকে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে সোভিয়েত শক্তিকে শ্বাসরুদ্ধে করার একটা রফাতেও।

শুধু পশ্চিম ইউরোপে জাতিদের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের তীব্রতা এবং দুরপ্রাচ্যে জাপান ও আমেরিকার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এই প্রয়াসকে অচল অথবা সংযত করছে, তাও কেবল অংশত এবং খুব সম্ভব খানিকটা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য।

সেই কারণে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অত্যাবশ্যক রণকৌশল হওয়া উচিত: একদিকে, দেশের দ্রুততম অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তার প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বৃদ্ধি, পরাক্রান্ত সমাজতান্ত্রিক ফৌজ গঠনের জন্য সমস্ত শক্তির চূড়ান্ত প্রয়োগ এবং অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক কর্মনীতিতে অবশ্য কর্তব্য হিসেবে এদিক-ওদিক করা, পশ্চাদপসরণ, ততদিন পর্যন্ত কালহরণ, যতদিন না আন্তর্জাতিক প্রলেতারীয় বিপ্লব চুড়ান্তরূপে পরিপক্ক হয়ে উঠছে, যা এখন কয়েকটি অগ্রণী দেশে পূর্বা ক্ষা দ্রুত পরিপক্ক হয়ে উঠছে।

২. অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে বর্তমান মুহূর্তে ১৯১৮ সালের ১৫ মার্চের সারা-রাশিয়া সোভিয়েতগুলির কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে সামনের কর্তব্য হিসেবে যা এগিয়ে এসেছে তা হলো সাংগঠনিক কাজ। সামাজিকীকৃত বৃহৎ যান্ত্রিক (শ্রমের) উৎপাদনের ভিত্তিতে উৎপাদন এবং উৎপন্ন বণ্টনের নতুন ও সর্বোচ্চ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই কর্তব্যটিই হলো ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবরে সূচিত রাশিয়ায় সমাজতান্ত্ৰিক বিপ্লবের প্রধান আধেয় এবং তার পূর্ণ বিজয়ের প্রধান শর্ত।

৩. নিছক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৰ্তমান পরিস্থিতির মর্মবস্তু হলো এই যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচির নির্ভুলতায় রাশিয়ার মেহনতীদের প্রত্যয় জাগান এবং শোষকদের কাছ থেকে মেহনতীদের জন্য রাশিয়াকে জিতে নেওয়ার কাজটা প্রধান এবং মূলগত দিক থেকে সম্পূর্ণ হলেও এখন সামনে আসছে প্রধান সমস্যা — রাশিয়াকে কীভাবে শাসন করা যায় — সেই সমস্যা। সঠিক প্রশাসন সংগঠন, সোভিয়েতরাজের নির্দেশগুলির অটল সংসাধন – এই হলো সোভিয়েতগুলির জরুরী কাজ, এই হলো সোভিয়েত ধরনের রাষ্ট্রের পূর্ণ বিজয়ের শর্ত, যে-ধরনের রাষ্ট্রের পক্ষে আনুষ্ঠানিক ডিক্রি জারি করা যথেষ্ট নয়, দেশের সর্বত্র তা প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত করাই যথেষ্ট নয়, প্রশাসনের নিয়মিত ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারিকভাবে তার সুব্যবস্থা এবং যাচাই করে দেখাও প্রয়োজন।

৪. সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক নির্মাণকর্মের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতির মর্মবস্তুটি হলো এই যে উচ্ছেদকারীদের — জমিদার ও পুঁজিপতিদের — সরাসরি উচ্ছেদের তুলনায় উৎপাদন এবং উৎপন্ন বণ্টনের ওপর আমাদের সর্বজনীন ও সর্বাত্মক হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনের প্রলেতারীয় নিয়ামন প্রবর্তনের কাজ খুবই পেছিয়ে আছে। এই মূলগত ঘটনাতেই নির্ধারিত হচ্ছে আমাদের কর্তব্য।

এ থেকে, একদিকে, এই দাঁড়ায় যে বুর্জোয়ার সঙ্গে আমাদের সংগ্রাম প্রবেশ করছে একটা নতুন পর্যায়ে, যথা: ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে হিসাব ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। অক্টোবরে পুঁজির বিরুদ্ধে আমরা যেসব বিজয় অর্জন করেছি, জাতীয় অর্থনীতির এক-একটা শাখায় জাতীয়করণের যে-ব্যবস্থা নিয়েছি শুধু এই পথেই তা সুদৃঢ় হতে পারে, শুধু এই পথেই সম্ভব হতে পারে বুর্জোয়ার সঙ্গে সংগ্রামের সফল সমাপ্তির প্রস্তুতি, অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের পরিপূর্ণ সংহতি।

অন্যদিকে, উল্লিখিত এই মূল ঘটনা থেকে পাওয়া যায় কেন কোন কোন পরিস্থিতিতে সোভিয়েত রাজকে এক পা পিছু হটতে অথবা বুর্জোয়া প্রবণতার সঙ্গে আপাস করতে হয়েছে তার ব্যাখ্যা। এই ধরনের পিছু হটা এবং প্যারিস কমিউনের নীতি থেকে বিচুত হওয়ার দৃষ্টান্ত হল বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের জন্য উচ্চ বেতনের প্রচলন। এই ধরনের আপস হলো সমবায়ে সমগ্র জনসাধারণকে ক্রমশ টেনে আনার জন্য ব্যবস্থাদি গ্রহণে বুর্জোয়া সমবায়ীদের সঙ্গে রফা। প্রলেতারীয় সরকার যতদিন সর্বজনীন নিয়ন্ত্রণ ও হিসাবকে পুরোপুরি চালু করতে না পারছে, ততদিন এই ধরনের আপস আবশ্যকীয়। এবং আমাদের কর্তব্য হলো জনগণের কাছে এগুলির নেতিবাচক দিক সম্পর্কে মোটেই মুখ বুজে না থেকে এরূপে আপস সম্পুর্ণ বিদূরণের একমাত্র পথ ও পদ্ধতি হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ উন্নত করার জন্য সচেষ্ট হওয়া। বর্তমান মুহুর্তে মন্থর কিন্তু নিশ্চিত অগ্রগতির একমাত্র জামিনস্বরুপ এরূপ আপস (হিসাব ও নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমাদের বিলম্বের দরুন) আবশ্যকীয়। উৎপাদন এবং উৎপন্নের বণ্টনের হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চালু হলে এরূপ আপসের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।

৫. শ্রমশৃঙ্খলা ও শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ব্যবস্থাবলীর গুরুত্বই এখন সমধিক। এদিকে ইতিমধ্যে গৃহীত ব্যবস্থা, বিশেষত ট্রেড ইউনিয়নগুলির পক্ষ থেকে গৃহীত ব্যবস্থাকে সর্বশক্তিতে সমৰ্থন করা, মজবুত করা ও বর্ধিত করা প্রয়োজন। এতে থাকবে, যেমন, ঠিকা-মজুরি প্রবর্তন, টেইলর প্রথায় বৈজ্ঞানিক ও প্রগতিশীল যা-কিছু আছে তার অনেকগুলির প্রচলন, কারখানার সাধারণ কাজের মোট ফলাফল অথবা রেলপথ ও জলপথ পরিবহণের ব্যবহারিক পরিমাণ, ইত্যাদি অনুসারে পারিশ্রমিককে সমানুপাতিক করা। এক-একটা উৎপাদনী ও পরিভোগী কমিউনের মধ্যে প্রতিযোগিতা, সংগঠকদের বাছাই, ইত্যাদিও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।

৬. পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব অবশ্য-অবশ্যই আবশ্যক। আমাদের বিপ্লবেও এই সত্যের পূর্ণ ব্যবহারিক সমৰ্থন পাওয়া গেছে। কিন্তু একনায়কত্ব একটি বিপ্লবী সরকারের পূর্বশর্তাধীন, যা যেমন শোষকদের তেমনি গুন্ডাদের দমনে সত্যিই কঠোর ও নির্মম আর আমাদের ক্ষমতা এদিক থেকে বড়ো বেশি নরম। কাজের সময় একনায়কত্বের অধিকার দিয়ে (দৃষ্টান্তস্বরূপ, রেল ডিক্রিতে যা দাবি করা হয়েছে) নির্বাচিত অথবা সোভিয়েত সংস্থাদি দ্বারা নিযুক্ত সোভিয়েত পরিচালক, একনায়কদের এক-ব্যক্তিক নির্দেশ বিনাবাক্যে পালন এখনো মোটেই যথেষ্টরূপে নিশ্চিত হয় নি। এটি হলো পেটি-বুর্জোয়া নৈরাজ্যের, ক্ষুদে মালিকী অভ্যাস, প্রবৃত্তি, মনোবৃত্তির নৈরাজ্যিক প্রভাবের ফলশ্রুতি, যা প্রলেতারীয় শৃঙ্খলা ও সমাজতন্ত্রের আমূল বিরোধী। প্রলেতারিয়েতকে এই পেটি-বুর্জোয়া নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার পুরো শ্রেণিসচেতনাকে সংহত করতে হবে, যা শুধু প্রত্যক্ষেই অভিব্যক্ত নয় (প্রলেতারীয় রাজের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া ও তার লেজুড়দের – মেনশেভিক, দক্ষিণপন্থী সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি, ইত্যাদির নানাবিধ প্রতিরোধ), পরোক্ষেও প্রকটিত (কর্মনীতির মূল প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে যেমন পেটি-বুর্জোয়া বামপন্থী সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারিদের পার্টিতে, তেমনি পেটি-বুর্জোয়া বামপন্থী বিপ্লববাদের পদ্ধতি নিয়ে বামপন্থী সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারিদের অনুকরণে আমাদের পার্টির ‘বামপন্থী কমিউনিস্ট’ ধারাতেও পরিস্ফুট হিস্টিরিয়া-গ্ৰস্ত দোলায়মানতা)।

লৌহদৃঢ় শৃঙখলা এবং পেটি-বুর্জোয়া দোলায়মানতার বিরুদ্ধে পুরোপুরি প্রলেতারীয় একনায়কত্ব প্রয়োগ – এই হলো বর্তমান মুহুর্তের সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত ধ্বনি।

১৯১৮ সালের ২৯ এপ্রিল ও ৩ মে’র মধ্যে লিখিত

৩৬ খন্ড, ২৭৭-২৮ পৃঃ

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *