You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > লেনিনবাদ > নারীর মর্যাদা, নারীর লড়াই এবং নারীমুক্তি প্রসঙ্গে

নারীর মর্যাদা, নারীর লড়াই এবং নারীমুক্তি প্রসঙ্গে

বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত নারীরা কথা বলতে শিখেছে, তারা আর অবলা নয়। তারা টিশার্ট পরে লোকাল বাসে উঠে চোখে সানগ্লাস পরে পোজ দেয়। যদি বলা হয়, একটু মিছিলে চলেন তবে এসব নারীর ভড়ং কোথায় উবে যাবে। নারী মুক্তির লড়াইটি নিশ্চয় টিশার্ট আর চোখে সানগ্লাস পরে পোজ দেয়ার লড়াই ছিলো না আমাদের পূর্বসুরীদের কাছে।

যেই নারীরা একত্রিত, যুদ্ধক্ষেত্রে আছে। কাঁধে রাইফেল, শত্রুর মোকাবেলা করছে দৃঢ়ভাবে। মানবজাতির গত পাঁচ হাজার বছরের সংগ্রামের রূপ নিয়ে আলোচনা করছে যে নারীরা, সেই নারীদের কি টিশার্ট পরতে হবে; “গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না”? কোনো পুরুষের সাহস হবে সেই নারীদের কাছে ঘঁষার? মাংসপিন্ড এবং মর্যাদাবান মানুষের ভেতরে অনেক ফারাক আছে, সেটি ভুলে নারী যদি হয় প্রচারণা আর পপুলিজমের শিকার?

নারীর মুক্তির লক্ষ্য ছিলো পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি, নারী সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ থেকে মুক্ত না হয়ে নিজেদের মুক্ত করতে পারে না, যেমন প্রলেতারিয়েত নিজেদের মুক্ত না করে মানবজাতিকে মুক্ত করতে পারে না। ফলে নারীমুক্তির অগ্রনেত্রীবৃন্দ যেমন ক্লারা জেটকিন, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, আলেকজান্দ্রা কল্লোনতাই, চিয়াং চিং নিজেদেরকে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত করেছিলেন।

নারীমুক্তি [Women’s freedom] এবং নারীবাদ [Feminism] এক জিনিস নয়। ইউরোপে আর আমেরিকায় নারীবাদী আন্দোলনের যত ফটো আপনি দেখবেন তার অন্তত অর্ধেক ফটো হচ্ছে পোশাক খুলে ফেলার ফটো। ফেমিনি, ফেমিনিজম, ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট মানেই হচ্ছে পোশাক ছেড়ে দুই একটি মিছিল, পুলিশের সামনে বা রাস্তায় ২০-৫০ জন মহিলার সামান্য বক্তিমা। এই নারীবাদীরা সেসব নারীদের শত্রু যারা ফিলিপাইনে, সিরিয়ায়, লাতিন আমেরিকায় গণযুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অস্ত্র হাতে।

নারীমুক্তির দীর্ঘ ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট নারীবাদী আন্দোলন দেশে দেশে বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে ১৯৬০-এর দশকের পর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গত অর্ধ শতকে দেখা গেছে যারা নিজেদের নারীবাদী হিসেবে পরিচয় দেয় তারা নারীমুক্তির বিরোধী। নারীবাদীরা নারীর শরীর নিয়ে ব্যবসা করার বিরোধী নয়, এরা মুনাফার বিরোধী নয়, নারীবাদীরা এখন পুঁজিবাদেরও বিরোধী নয়। ফলে নারীবাদীরা এখন সাম্রাজ্যবাদের ও পুঁজিবাদের একনিষ্ঠ সহযোগী।

বাংলাদেশে নারী নিপীড়নের জন্য সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র এবং পুরুষতন্ত্র দায়ী। এই সমস্যাগুলো থেকে বের হবার জন্য গৃহযুদ্ধ ছাড়া তাত্ত্বিক দিক থেকে কি অন্য কোনো পথ খোলা আছে?

রাজনীতি ব্যর্থ হচ্ছে সামন্তবাদের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্বটিকে মিটিয়ে ফেলতে, পুঁজি চাচ্ছে মেয়েরা বাইরে কাজে আসুক, সামন্তবাদ ও পুরুষতন্ত্র এটার বিরোধিতা করছে। যখন রাজনীতি সমাধান দেয় না, তখন যুদ্ধের মাধ্যমেই সমাধান করতে হয়। হাজার হাজার ধর্ষণ আর হত্যার পরেও কি যুক্তি থাকতে পারে, এখনো ন্যায়বিচার বা গ্রেপ্তার বা বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার আদায়ের কথা বলার।

যৌন ব্যবসা পৃথিবীর এখন তৃতীয় বৃহত্তম ব্যবসার খাত। একাডেমিক ক্ষেত্রে LGBTQ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের আরেক পৃষ্ঠপোষক জনপ্রিয় খাত যেটাও আমার কাছে ব্যবসা মনে হয়েছে। ফলে সাম্রাজ্যবাদের সাথে সংযুক্ত এখন পুরুষতন্ত্র। এই পুরুষতন্ত্রকে শক্তিশালী করে যে নারীরা তারা বায়োলজিকালী নারী হতে পারে কিন্তু তারাও পুরুষতন্ত্রের লাঠিয়াল। আমরা যদি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র মাধ্যম দেখি তবে দেখব, মূলধারার চলচ্চিত্রগুলো মানুষকে সেই যন্ত্র বানাতে চায় শুধু শ্রম দেবে আর যৌনাঙ্গের ব্যবহার করবে। যার মূল বিষয়টাই হচ্ছে সন্তান উৎপাদন। জনসংখ্যা বাড়লেই সস্তায় শ্রম পাওয়া যাবে, এই শ্রমিক উৎপাদন বাড়াবে, উতপাদিত মুনাফার মালিক হবে সেই কর্পোরেট কোম্পানি।

বাংলাদেশে নিরাজনীতিকরণের রাজনীতিই এখন সবচেয়ে বড় রাজনীতি। ফলে ‘নারীদের বাদ দিয়ে জনগণকে রাজনীতিতে টেনে আনা অসম্ভব’[১]। অরাজনৈতিক নামধারী বাঙালি নারীর পেটগুলো এখন ইউরো-আমেরিকা-মধ্যপ্রাচ্যের দাস তৈরির যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। বাঙালি নারীরা শুধু সস্তায় বাঙলাদেশের শ্রমিক উৎপাদন করে দেশের পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে অবদান রাখছে তাই নয়; তারা ইউরোপ-আমেরিকা-মধ্যপ্রাচ্যের কর্পোরেট অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। কিন্তু আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো বাঙালি নারীদের সন্তানেরা যা বিদেশে করছে তা দাসযুগে দাসেরা যা করতো তাই।

আমদের নারীমুক্তি বিষয়ে কাজ করা দরকার। কিন্তু এটা ভোলা উচিত হবে না যে পুরুষতন্ত্রের একটা অর্থনীতিও আছে। বাংলাদেশের নারী-পুরুষেরা ইউরোপ-আমেরিকায় যত সহজে শ্রমদাস সরবরাহ করতে পারে তত সহজে কিন্তু নারীর যথার্থ মুক্তির রাস্তাগুলো খুঁজে বের করতে পারে না। কারণ নারীমুক্তির চিন্তাটি এই কথা বলে যে নারীমুক্তি নারী-পুরুষ উভয়ের মুক্তির অধীন।

ভ্লাদিমির লেনিন নারীমুক্তির ক্ষেত্রে মূল সূত্রসমূহ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন “দুনিয়ার সমস্ত পুঁজিবাদি, বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রেই শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, স্বাধীনতা_এইসব জাঁকালো কথার সংগে সংগে থাকে মেয়েদের অসমান অবস্থার অত্যন্ত ঘৃণিত, বিরক্তিকর, নোংরা এবং পাশবিক রকমের আইন।”[২]

তথ্যসূত্র:

১. লেনিন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস; ৪ মার্চ, ১৯২১

২. লেনিন, সোভিয়েত রাজ ও মেয়েদের অবস্থা।

আরো পড়ুন:  পুরুষ নারীর শত্রু নয় --- সাক্ষাতকারে হাসনা বেগম
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top