Main Menu

মুক্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ

মুক্তি বা স্বাধীনতা (ইংরেজি Freedom বা Liberty) হচ্ছে একটি সমাজে মানুষের সম্ভাবনার পূর্ণ উন্নতির সংস্থান করে মানুষের নিজ কর্মসমূহ নির্ধারণ করার সামর্থ্য ও অধিকার। মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে একজনও উপভোগ করতে পারেন কিন্তু তা সমাজের ভেতরেই করতে হয়। ব্যক্তিগত গুণগুলো সমাজের ভেতরেই বিভিন্ন দিকে কর্ষণ করা যায়, তাই শুধু সমাজের ভেতরেই ব্যক্তিগত মুক্তি সম্ভব। মানুষের উন্নতির জন্য, তার চাহিদা পূরণের জন্য, তার সামর্থ্য ও প্রতিভা প্রয়োগের জন্য সমাজের উপর, সমাজসৃষ্ট পরিস্থিতির উপরই ব্যক্তি স্বাধীনতা নির্ভরশীল।

অতীতে রাষ্ট্রে ও সমাজে কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি তারাই অর্জন করতে পেরেছিলো যারা শাসক শ্রেণির সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলো এবং সেই শ্রেণির ভেতরে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলো। মার্কসবাদে এই ধরনের মুক্তির বিরোধিতা করে সমাজের সকল সদস্যের সামগ্রিক মুক্তির কথা বলা হয়েছে। মার্কস বলছেন মানুষের মুক্তির (Liberation of Man) কাজটি ঐতিহাসিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে অর্থাৎ মানুষের মুক্তির মর্মের বস্তুগত রূপকে ধরতে হবে। আর সেই রূপটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও অর্থশাস্ত্র দিয়ে ধরা সম্ভব।[১]

পুঁজিবাদে যাদের টাকা আছে তারাই স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। যাঁদের শ্রমশক্তি বিক্রি করা ছাড়া বাঁচার কোনো উপকরণ নেই তাঁদেরও স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা খুবই নিয়ন্ত্রিত। বুর্জোয়া সমাজে অন্য সকলের চেয়ে কতিপয় ব্যক্তির স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদী সমাজে সৃষ্ট পুঁজি শ্রমিকেরই শ্রমশক্তির রূপান্তর। সেই পুঁজি তাকেই শ্রমদাসত্বে বন্দি করে রেখেছে। নীতি, নিয়ম, আইন, অর্থ, পণ্য, পুঁজি সবই মানুষেরই সৃষ্টি এবং এই সবই পিঞ্জর হয়ে উঠেছে মানুষেরই কাছে। মানুষকে তাই মানুষের সাথে মনুষ্য সম্পর্কে মিলিত হতে হবে। ফিরে আসতে হবে আত্মবোধে। এটাই হবে বিচ্ছিন্নতার অন্তর্ধান, মার্কসবাদে যাকে বলা হয় মুক্তি।[২]

মার্কসবাদে মুক্তি বলতে বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তিকে বোঝানো হয় এবং এই মুক্তি জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক মুক্তির সাথে। উৎপাদন ব্যবস্থা মানুষকে পণ্যে পরিণত করেছে এবং একটি অমানবিক সত্তায় নিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ তাকে তাঁর উৎপাদিত দ্রব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে অমানবিক করে তুলেছে। কার্ল মার্কস লিখছেন,

“উৎপাদন মানুষকে কেবল একটা পণ্য মানে মানব পণ্য হিসেবেই উৎপন্ন করে না, মানুষ এখানে শুধু পণ্যের ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয় না। উৎপাদন তাকে এমন করে উৎপাদন করে যে সে এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে মানসিক এবং শারীরিকভাবে অমানবিক সত্ত্বায় পরিণত হয়।[৩]

শ্রম বিভাজন এবং বিনিময়ই হলো মানুষের কার্যক্রমের বিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট্যটির রূপ। জেমস মিল বাণিজ্যকে উপস্থাপন করেছিলেন শ্রম বিভাজনের ফলাফল হিসেবে। মিলের কাছে মানব কর্মকাণ্ড ছিলো যান্ত্রিক গতিতে পর্যবসিত। মিলের চোখে শ্রমের বিভাজন ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎপাদনের ধনদৌলতকে এগিয়ে নেয়। মার্কসের কাছে শ্রমের বিভাজন ও বিনিময়ের ব্যাপারটি হয়ে দাঁড়ালো প্রজাতি সত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্নতা। কার্ল মার্কস লিখেছেন,

“শ্রম বিভাজন এবং বিনিময়ের ব্যাপারটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ প্রজাতি কর্মকাণ্ড এবং প্রজাতি ক্ষমতা থেকে সেগুলো হচ্ছে উপলব্ধিজাতভাবে মানব কর্মকাণ্ড ও অপরিহার্য ক্ষমতার বিচ্ছিন্ন [alienated] প্রকাশ।”[৪]

মার্কসবাদে মুক্তির পথ হচ্ছে পৃথিবীর মুখোমুখি হবার পথ। মুক্তির পথ হচ্ছে প্রকৃতির নিয়মকানুনকে, প্রকৃতির শৃঙ্খলাকে, স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতরভাবে চেনবার পথ। যত ভালো করে চিনতে পারা যাবে ততই সেগুলোকে বাঞ্ছিত উদ্দেশ্যের দিকে নিয়োগ করতে পারা যাবে। এই নিয়োগের নামই হলো পৃথিবীকে জয় করা, প্রকৃতির দাসত্ব থেকে মুক্তি। দিনের পর দিন প্রকৃতির শৃঙ্খলা সম্বন্ধে তার চেতনা যত স্পষ্ট হয়েছে ততই সে এগুলোকে কাজে লাগাতে পেরেছে নিজের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। প্রকৃতির স্বাধীনতার অর্থ প্রাকৃতিক নিয়ম থেকে মুক্তি নয়, প্রাকৃতিক নিয়মের পূর্ণ জ্ঞানের অবস্থা। মানুষ প্রকৃতির নিয়মগুলোকে বদলাতে পারে না, তারা শুধু নিয়মগুলোকে জানতে পারে এবং সেগুলোকে কাজে লাগাতে পারে। এঙ্গেলস লিখেছেন,

“প্রকৃতির বিধানসমূহ থেকে কোনো কাল্পনিক বিমুক্তির মধ্যে স্বাধীনতা নিহিত নয়। প্রকৃতির বিধানসমূহের জ্ঞান এবং সেই জ্ঞানের মাধ্যমে এই বিধানসমূহকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সাধনে সুশৃঙ্খলভাবে নিযুক্ত করার যে সম্ভাবনা আমরা লাভ করি তার মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতা নিহিত। … কাজেই তথ্য তথা বাস্তবজগত সম্পর্কে জ্ঞানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা।”[৫]

প্রকৃতির নিয়ম ও শৃঙ্খলাকে মানুষ কাজে লাগিয়েছে প্রয়োজনীয় উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। আর তাই দিনের পর দিন মুক্তির পথে সে এগিয়ে চলতে শিখেছে। কিন্তু একসময় দেখা যাচ্ছে সে তার উৎপাদিত পণ্যের অধীন হয়ে পড়েছে, একসময় সে নিজেই পণ্য হয়ে গেছে। তাই উৎপাদনের ব্যাপার নিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক তাকে ঠিকমতো চিনতে পারা, বুঝতে পারা, আর ওই জ্ঞানের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করা যতদিন সম্ভব না হচ্ছে ততদিন মানুষের পুরোপুরি মুক্তি আসবে না।[৬] মার্কস ও এঙ্গেলস বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির নিয়মসমূহ জানাকে মানবিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। মানুষের এই স্বাধীনতা অর্জনকে তাঁরা একটা ঐতিহাসিক বিকাশের ফলশ্রুতি বলে মনে করেন। তাঁরা মনে করেন, বিজ্ঞান ও সামাজিক অগ্রগতি এমন একটা পর্যায়ে উপনীত হবে যেখানে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হবে। এ থেকেই এঙ্গেলস বলেন যে সমাজে থাকবে না শ্রেণির বৈষম্য কিংবা ব্যক্তির জীবনধারণের জন্য দুশ্চিন্তা, যে সমাজে প্রকৃতির জ্ঞাত বিধানের সঙ্গে সঙ্গতির ভিত্তিতে মানুষের জীবন যাপন সম্ভব হবে, সে সমাজেই মাত্র প্রথমবারের মতো যথার্থ স্বাধীনতার চিন্তা করা সম্ভব হবে।[৭]

মুক্তি বা স্বাধীনতা সমাজতন্ত্রের মতোই আপনা থেকেই আসে না, স্বাধীনতাকে কর্মের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। মানুষকে স্বাধীন হতে হলে তাকে দায়িত্ব পালন করা লাগে। মাও সেতুং বলেছেন যে এঙ্গেলস,

“প্রয়োজনের রাজ্য থেকে স্বাধীনতার রাজ্যে গতির কথা বলেছেন এবং বলেছেন যে, প্রয়োজনের উপলব্ধিই হচ্ছে স্বাধীনতা। এই বাক্যটি সম্পূর্ণ নয়, এতে মাত্র অর্ধেক বলা হয়েছে এবং বাকিটা বলা হয়নি। শুধু উপলব্ধিই কী আপনাকে মুক্ত করে ফেলে? স্বাধীনতা হচ্ছে প্রয়োজনের উপলব্ধি এবং প্রয়োজনের রূপান্তর। একজন ব্যক্তিকে কিছু কাজও করতে হবে।”[৮]

কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে ফরাসি বিপ্লবের পর মুক্তি কথাটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যেত। সেই মুক্তিকে মার্কসবাদীগণ সবসময় অপূর্ণাঙ্গ মুক্তি হিসেবে দেখেছেন। পুঁজিবাদে মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়। মার্কসবাদীগণ প্রমাণ করেছেন মানুষের মুক্তি সম্ভব হবে সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণের পরে, সাম্যবাদ আসবার আগে মুক্তি কেবল বাগাড়ম্বর থেকে যাবে। মালিকদের শোষণের স্বাধীনতাকেই বুর্জোয়াদের তোয়াজকারী বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চালায়। যেমন, ভ. ই. লেনিন লিখেছেন,

“সামন্তবাদের পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, মেহনতি মানুষদের উপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হলো এ মুক্তির অর্থ।”[৯]

মার্কস কেবল প্রকৃতির অন্ধশক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বা স্বাধীনতা অর্জনের দিকটিই দেখেননি। তিনি সামাজিক শক্তির ওপরও মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন। পুঁজির শৃঙ্খল থেকে মানবিক স্বাধীনতা অর্জনের কথা বলেন। মার্কসের মতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের স্বাধীনতা হলো কেবল বাজারে শ্রমশক্তির ক্রেতা বদলের স্বাধীনতা, যা স্বাধীনতার একটা বাহ্য রূপ মাত্র, মর্মগতভাবে তাঁরা অস্বাধীন। পুঁজিবাদী শ্রমিক এক অদৃশ্য সূত্রে পুঁজির শৃঙ্খলে বাঁধা। এ থেকে মার্কস বলেন ‘রোমান ক্রীতদাস লৌহ নিগড়ে বাঁধা থাকতঃ মজুরি-শ্রমিক তার মালিকের কাছে বাঁধা আছে অদৃশ্য সূত্রে। স্বাধীনতার বাহ্যরূপটা বজায় রাখা হয় ক্রমাগত মালিক পরিবর্তনের সাহায্যে এবং মামুলি এক চুক্তির কল্পনা দ্বারা’[১০] এ থেকে বলা যায়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের স্বাধীনতাহীনতা ও জবরদস্তিমূলক শ্রমের কারণে মার্কস পুঁজিবাদের সমালোচনা করেন। মানবিক স্বাধীনতার ধারনার একটি নৈতিক দিক থাকায় মার্কস কর্তৃক পুঁজিবাদের স্বাধীনতাভিত্তিক আলোচনা হয়ে উঠেছে একটা বাস্তব ও নৈতিক সমালোচনা। পুঁজিবাদী স্বাধীনতার বিপরীতে মার্কস মনে করেন, সমাজীকৃত মানুষের মধ্যেই স্বাধীনতা বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে। মার্কস বলেন,

“বস্তুতপক্ষে, স্বাধীনতার এলাকা সত্যি সত্যি শুরু হয় কেবল সেখানেই, যেখানে শ্রম, যা নির্ধারিত হয় প্রয়োজন ও সাংসারিক চিন্তা ভাবনার দ্বারা, তার বিরতি ঘটে; তাই স্বাধীনতার স্বাভাবিক অবস্থানই হচ্ছে সত্যিকারের বস্তুগত উপাদানের পরিধি ছড়িয়ে … এক্ষেত্রে স্বাধীনতা রূপ ধারণ করতে পারে কেবল সমাজীকৃত মানুষের [socialised man] দ্বারা, সংঘবদ্ধ উৎপাদনকারীদের দ্বারা, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের লেনা-দেনাকে যুক্তিসিদ্ধরূপে পরিচালন এবং প্রকৃতি-কর্তৃক, তথা তার অন্ধ শক্তিসমূহ কর্তৃক শাসিত না হয়ে, তাকে তাদের সামূহিক নিয়ন্ত্রণাধীনে আনয়ন করা এবং ন্যূনতম কর্মশক্তি-ব্যয়ে এবং তাদের মানব-প্রকৃতির পক্ষে সর্বাধিক অনুকূল ও উপযুক্ত অবস্থাধীনে এই লক্ষ্য সাধন করার মাধ্যমে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও তা তখনো থেকে যায় প্রয়োজন-পূরণের পরিধির মধ্যে। এই পরিধি ছাড়িয়েই শুরু হয় মানবিক শক্তির সেই বিকাশ, যা নিজেই নিজের উদ্দেশ্য [end in itself], স্বাধীনতার সত্যিকারের জগত [true realm of freedom], কিন্তু যা কুসুমিত হতে পারে কেবল প্রয়োজন-পূরণের জগতের ভিত্তির উপরেই। কাজের দিনের দীর্ঘতা হ্রাস হচ্ছে তার মৌল পূর্বশর্ত।[১১]

স্বাধীনতার সঙ্গে মার্কস মুক্ত সময়কে যুক্ত করে দেখেন। তাঁর মতে প্রযুক্তির অটোমেশন মানুষের জন্য মুক্ত সময় সম্ভব করে তুলবে। তিনি মনে করেন সাম্যবাদে মানুষের এই স্বাধীন বিকাশ সম্ভব হবে। এ থেকে তিনি বলেন কমিউনিজমে ‘শ্রেণি ও শ্রেণিবিরোধ সংবলিত পুরানো বুর্জোয়া সমাজের স্থান নেবে এক সমিতি যার মধ্যে প্রত্যেকটি লোকেরই স্বাধীন বিকাশ হবে সকলের স্বাধীন বিকাশের শর্ত’।[১২] মার্কস মানুষের এই স্বাধীনতা অর্জনকে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যা সম্ভব হবে উৎপাদন-শক্তির উপর মানুষের যৌথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এ কারণেই মার্কস বুর্জোয়া স্বাধীন মানবতার [free humanity] ধারনার বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, বুর্জোয়া স্বাধীনতার ধারনা হলো আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক ব্যক্তির স্বীকৃতি। বুর্জোয়া স্বাধীনতার ধারনা হলো অন্যের সম্পত্তি হরণের স্বাধীনতা, যা মুনাফার নোংরামি থেকে মুক্ত নয়। এটা হলো মুনাফাবৃত্তির স্বাধীনতা।[১৩]

ফলে শোষণ যতদিন থাকছে ততদিন মুক্তির কথা শুধু মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হয়েই প্রায়োগিকভাবে অর্জিত হতে পারে। ব্যক্তিগত মালিকানা ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে কেবলমাত্র সমাজতন্ত্রই মানুষকে বাজারের খেয়ালীপনা, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারী, দারিদ্র ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কায়েম করতে পারে। মানবেতিহাসে প্রথম সমাজতন্ত্রই মানুষকে শোষকদের বদলে নিজের জন্য, সমাজের জন্য কাজ করার এবং শ্রমের মাধ্যমে ও এর ভিত্তিতে নিজস্ব বৈষয়িক ও আত্মিক চাহিদা পূরণের সুযোগ দিয়ে মানুষের শ্রমকে মুক্ত করবার সামর্থ্য রাখে।

বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম বিমূর্ত মানুষের প্রত্যয়টি প্রত্যাখ্যান করে এবং মানবতাবাদের একটি বাস্তব ভিত্তি গড়ে তোলে। মানুষ তৈরিতে সামাজিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত ভূমিকার যথার্থতা উদ্ঘাটনক্রমে বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম ব্যক্তিগত মালিকানা ও শোষণের বৈপ্লবিক উৎখাতসহ নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ, অত:পর সাম্যবাদী সমাজ গঠনের মাধ্যমে মানুষের জন্য কীভাবে সত্যিকার স্বাধীনতা কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় তাও উপস্থাপন করেছে।[১৪]

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. গৌতম দাস অনূদিত, জার্মান ভাবাদর্শ, কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, গৌতম দাসের ১৪ নং ব্যাখ্যা, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯, পৃষ্ঠা ২৩৩

২. সমীরণ মজুমদার, মার্ক্সবাদ বাস্তবে ও মননে, স্বপ্রকাশ কলকাতা, বৈশাখ ১৪০২, পৃষ্ঠা ৮৮

৩. কার্ল মার্কস, অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি ১৮৪৪, জাভেদ হুসেন অনূদিত, বাঙলায়ন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১২, পৃষ্ঠা ৭৩

৪. কার্ল মার্কস, অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি ১৮৪৪, জাভেদ হুসেন অনূদিত, বাঙলায়ন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১২, পৃষ্ঠা ১১৫

৫. সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, এঙ্গেলসের এ্যান্টি ডুরিং, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, অক্টোবর ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১০৪

৬. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, মার্ক্সবাদ, অনুষ্টুপ, কলকাতা, চতুর্থ সংস্করণ আগস্ট ২০১৩, পৃষ্ঠা ৫৩-৫৫

৭. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, এ্যান্টি-ডুরিং, সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম পুনর্মুদ্রণ, অক্টোবর ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫

৮. মাও সেতুং, মাও সেতুঙের শেষ জীবনের উদ্ধৃতি, আন্দোলন প্রকাশনা, মে ২০০৫, পৃষ্ঠা ২৭

৯. ভি আই লেনিন, মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান, মার্চ ১৯১৩, মার্কস এঙ্গেলস মার্কসবাদ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭৫, পৃষ্ঠা ৫৫

১০. মার্কস, পুঁজি প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৯০

১১. কার্ল মার্কস, ক্যাপিটাল, বাংলা সংস্করণ ষষ্ঠ খণ্ড, ইংরেজি তৃতীয় খণ্ড, শেষাংশ, বাণীপ্রকাশ, কলকাতা, সংশোধিত চতুর্থ সংস্করণ, জুন ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩৫১-৩৫২

১২. মার্কস এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, ১৮৪৮, মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন প্রথম খণ্ড প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ৪৬

১৩. এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন, আখতার সোবহান খান, মার্কসবাদ ও ন্যায়পরতার ধারণা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ১৫৬-১৭০

১৪. প্রবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] লিখিত ভাষাপ্রকাশ থেকে ২০১৬ সালে প্রকাশিত মার্কসবাদ গ্রন্থের ৭৬-৮১ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে এবং এখানে পুনরায় প্রকাশ করা হলো। প্রবন্ধটির রচনাকাল ২২ আগস্ট ২০১৪।

রচনাকালঃ ১২ এপ্রিল, ২০১৫

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *