আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > দর্শন > মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ

মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ

হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদ থেকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে এসেছে মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। অর্থাৎ হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে মার্কসবাদের অন্যতম একটি উপাদানের উদ্ভব হয়েছে। মার্কস হেগেলের ভাববাদ বর্জন করে তাঁর দ্বন্দ্ববাদকে এবং ফয়েরবাখের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করে তাঁর বস্তুবাদকে গ্রহণ করে যে দর্শন গড়ে তোলেন তাকেই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (ইংরেজি: Dialectical Materialism) বলা হয়।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হচ্ছে বাস্তবতা বুঝবার পথ, এই বাস্তবতা হতে পারে চিন্তাসমূহ, আবেগসমূহ, বা বস্তুগত দুনিয়া। সহজভাবে বলতে গেলে এই প্রণালীবিদ্যা হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদ এবং বস্তুবাদের সংশ্লেষণ। মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে এই বস্তুবাদী দ্বন্দ্বতত্ত্ব আর সাম্যবাদ হচ্ছে মার্কসবাদের অনুশীলন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের একটি প্রায়োগিক উদাহরণ হচ্ছে ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারনা বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ শব্দটি কার্ল কাউতস্কি কর্তৃক প্রথম ব্যবহৃত এবং মার্কস এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মাধ্যমে জনপ্রিয় করা হয়।

বিকাশের এক সাধারণ তত্ত্ব হিসেবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছাড়া পৃথিবীর এক আধুনিক, অখণ্ড ও বৈজ্ঞানিক চিত্র কখনোই উপস্থিত করা যায় না। সেই সঙ্গে তা হলো বৈজ্ঞানিক চিন্তন ও বৈপ্লবিক রূপান্তরের এক অপরিহার্য হাতিয়ার। সেই জন্যই লেনিন দ্বন্দ্ববাদকে মার্কসবাদের ‘সারাংশ’ বা ‘মর্ম’ বলে অভিহিত করেছেন।[১]

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে সামগ্রিকভাবে মার্কসবাদ লেনিনবাদের অন্তরাত্মা বলে গণ্য করবার কারণগুলোর ভেতরে রয়েছে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সারমর্ম ও অন্তর্বস্তুতে বৈপ্লবিক। সবকিছুকে তা দেখে গতি, পরিবর্তন ও বিকাশের মধ্যে। এইভাবে তা পৃথিবীতে সমস্ত ব্যাপারের, বিশেষত সামাজিক সম্পর্কের রূপের ঐতিহাসিকভাবে অচিরস্থায়ী চরিত্র উদঘাটন করে। কার্ল মার্কস লিখেছেন,

“যুক্তিসিদ্ধরূপে এই দ্বন্দ্বতত্ত্ব ছিলো বুর্জোয়াতন্ত্র এবং তার তত্ত্ববাগীশ অধ্যাপকদের কাছেঘৃণ্য ও কলঙ্কবিশেষ, কারণ তাতে বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে উপলব্ধি ও ইতিবাচক স্বীকৃতি যেমন আছে, সেই সংগেই আছে সেই অবস্থার নেতিকরণের, তার অবশ্যম্ভাবীভাঙনেরও স্বীকৃতি; কারণ এই তত্ত্ব অনুসারে, ঐতিহাসিকভাবে বিকাশপ্রাপ্তপ্রতিটি সমাজ-রূপই একটি গতিশীল প্রবাহের মতো, কাজেই এই তত্ত্ব যেমন তারঅচিরস্থায়ী প্রকৃতিকে স্বীকার করে, তেমনই স্বীকার করে তার ক্ষণকালীনঅস্তিত্বকে; কারণ, এই তত্ত্ব কোনো কিছুর দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় না, তাহলো মূলত বিচার-বিশ্লেষণমূলক ও বৈপ্লবিক।”[২]

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সমাজপ্রগতির সামগ্রিক গতিমুখ এবং পুঁজিবাদ কিংবা সমাজবিকাশের প্রাক-পুঁজিবাদী রূপগুলি থেকে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদে উত্তরণের যুক্তি শুধু ব্যাখ্যাই করে না, প্রলেতেরিয়েতের ঐতিহাসিক কর্মব্রত, তার প্রগতিশীল আদর্শগুলি, এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শোষণমূলক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করবার জন্য তার অজেয় প্রয়াসের যথার্থতা প্রতিপাদন করে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ অবধারণার (চিন্তনের) সাধারণ নিয়মগুলো ও শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপ প্রকাশ করে বলেই, তা তাদের মার্কসবাদী লেনিনবাদী মাওবাদী পার্টিগুলোর রণনীতি ও রণকৌশলের তত্ত্বগত ভিত্তি যোগায়। লেনিন লিখেছেন,

“প্রলেতারিয় রণকৌশলের বুনিয়াদি কর্তব্যকর্ম মার্কস কর্তৃক সংজ্ঞায়িত হয়েছিল তার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির (Weltanschauung) সমস্ত মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে কঠোর সামঞ্জস্য রেখে”।[৩]

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার, মানবজাতির সমগ্র বস্তুগত ও আত্মিক জীবনের বিকাশের বিশ্বজনীন নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করে, এটি প্রলেতারিয়েত শ্রেণি ও অন্যান্য সমস্ত শ্রমজীবী জনগণের সামাজিক রাজনৈতিক আদর্শ, লক্ষ্য ও স্বার্থকে বৈজ্ঞানিক ধারায় সূত্রায়িত করে তোলে। জনগণের সৃষ্টিশীল কর্মশক্তির তা অগাধ উৎস, তাঁদের বৈপ্লবিক রূপান্তরসাধক ক্রিয়াকলাপের পরিসর, রূপান্তরের গতির হার ও বিপ্লবের অভিমুখীনতাকে তা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে।
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রাকৃতিক ও সামাজিক ব্যাপারসমূহের অবধারণায় (চিন্তনে), সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য সংগ্রামের নিয়মগুলো, এবং সামাজিক ন্যায়বিচারপূর্ণ এক সমাজ নির্মাণের নিয়মগুলোর অবধারণায় এক জরুরি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিগত ও প্রণালীবিদ্যাগত ভূমিকা পালন করে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্ব এবং মার্কসবাদের মূল প্রতিজ্ঞাগুলো সূত্রায়নে তার ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে লেনিন লিখেছেন,

“একেবারে বুনিয়াদ থেকে শুরু করে সমস্ত অর্থশাস্ত্রকে নতুন করে আকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রয়োগ, ইতিহাস, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, দর্শনে এবং শ্রমিক শ্রেণির কর্মনীতি ও রণকৌশলে তার প্রয়োগ_ এটাই মার্কস ও এঙ্গেলসকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করেছিল, এখানেই তাঁরা যা সবচেয়ে বেশি আবশ্যিক ও নতুন তাই দান করেছিলেন, এবং সেটাই ছিলো বৈপ্লবিক চিন্তার ইতিহাসে তাঁদের পরম পাণ্ডিত্যপূর্ণ অগ্রগতি।[৪]

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল নিয়ম সম্পর্কে আমাদের একটু আলোচনা করা প্রয়োজন। এঙ্গেলস তাঁর প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা গ্রন্থে দ্বন্দ্ববাদের তিনটি প্রধান নিয়মের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেগুলো হচ্ছে,
১. পরিমাণের গুণে রূপান্তর ও এর বিপরীতভাবে গুণের পরিমাণে রূপান্তর। ২. বিপরীতের পরস্পরে ব্যাপ্ত থাকার (Interpenetration) নিয়ম এবং ৩. নেতিকরণের নেতিকরণ-এর নিয়ম।[৫]
পরবর্তীতে স্তালিন তাঁর দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ পুস্তিকায় দ্বন্দ্ববাদের চারটি প্রধান লক্ষণ বা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এগুলো হচ্ছে,
১. বস্তুজগত পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত ও সুসংহত, ২. বিশ্ব প্রকৃতি অনড়, অচল নয়, অবিরাম পরিবর্তনশীল ও গতিশীল, ৩. পরিমাণগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই বস্তুর গুণগত পরিবর্তন হয় এবং ৪. বিপরীতধর্মী গুণের সংগ্রামের অস্তিত্ব।[৬]
কিন্তু মাও সেতুং দ্বন্দ্ববাদের একটিমাত্র মূল বৈশিষ্ট্যের কথাই উল্লেখ করেছেন। মাও দ্বন্দ্ব সম্পর্কে রচনায় দ্বন্দ্ববাদকে ব্যাখ্যা ও বিকশিত করেই তাঁর কাজ শেষ করেননি, বরং দ্বন্দ্ববাদের সারবস্তু দ্বন্দ্বের নিয়মকে তিনি পরবর্তীতে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা অব্যাহত রাখেন। এভাবেই পরবর্তী সময়ে তিনি উপসংহার টানেন যে, দ্বন্দ্বের নিয়মই হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদের মূল নিয়ম, অন্য কোনোটা নয়। মাও বলেছেন,

“এঙ্গেলস তিনটি প্রকারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা হচ্ছে আমি এই প্রকারগুলোর দুটোতে বিশ্বাস করি না।”[৭]

অর্থাৎ মাও সেতুং-এর কাছে গুণ ও পরিমাণের পরস্পরে রূপান্তর এবং নেতিকরণের নেতিকরণ দ্বন্দ্ববাদের মূল নিয়ম নয়। মাওয়ের কাছে পরিমাণ ও গুণের পরস্পরে রূপান্তর হচ্ছে, পরিমাণ ও গুণ এই দুই বিপরীতের একত্ব। তাঁর মতে নেতিকরণের নেতিকরণ নিয়ম বিরাজ করে না। মাও সেতুং বলেছেন,

“বিপরীতের একত্ব হচ্ছে সবচাইতে মৌলিক নিয়ম। গুণ ও পরিমাণের একে অন্যে রূপান্তরটা হচ্ছে পরিমাণ ও গুণ_ এই দুই বিপরীতের একত্ব। নেতিকরণের নেতিকরণের মতো বাস্তবে কিছু নেই। ইতিকরণ, নেতিকরণ, ইতিকরণ, নেতিকরণ … … বস্তুর বিকাশে ঘটনাবলীর শিকলে প্রতিটি সংযোগ হচ্ছে ইতিকরণ ও নেতিকরণ উভয়ই।”[৮]

মাও সেতুং যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তাতে এটি খুব সহজেই চোখে পড়ে যে পরিমাণ ও গুণ কিংবা ইতিকরণ ও নেতিকরণ পরস্পরে রূপান্তরযোগ্য এবং তারা বিপরীতের একত্ব গঠন করে। এটিকে সর্বজনীন ও বিস্তারিতভাবে বললে বলা যায়, যে কোনো দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে অর্থাৎ যে কোনো বিপরীতের একত্ব পরস্পরে রূপান্তরযোগ্য। পার্থিব আরও অন্যান্য বিষয় যেমন, সর্বজনীনতা ও বিশিষ্টতা, সংযোজন ও বিয়োজন, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া, আক্রমণ ও আত্মরক্ষা, জয় ও পরাজয়, অগ্রাভিযান ও পশ্চাদপসরণ ইত্যাদি বিপরীতগুলোও একত্ব গঠন করে এবং নির্দিষ্ট শর্তে এগুলোও পরস্পরে রূপান্তরযোগ্য। ফলে পরিমাণ ও গুণ_ এই দুই বিপরীতের একত্বও এরকমই একটি বিষয়, সেটি দ্বন্দ্ববাদের মূল কোনো নিয়ম নয়। দ্বন্দ্ববাদের মূল নিয়ম দ্বন্দ্বেরই উদাহরণ এটি। মাও সেতুং আরো বলেছেন,

“এটা বলা হতো যে দ্বান্দ্বিকতার তিনটি প্রধান নিয়ম আছে, তারপর স্তালিন বললেন চারটি। আমার মতে একটিমাত্র মূল নিয়ম আছে এবং তা হচ্ছে দ্বন্দ্বের নিয়ম। গুণ ও পরিমাণ, ইতিবাচক ও নেতিবাচক, বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্ম, সারবস্তু ও রূপ, প্রয়োজনীয়তা ও স্বাধীনতা, সম্ভাবনা ও বাস্তবতা প্রভৃতি … … সবই হচ্ছে বিপরীতের একত্বের দৃষ্টান্ত।”[৯]

বিশ্লেষণ, প্রতিবিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ

এঙ্গেলস তাঁর প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা পুস্তকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বেশ কিছু উদাহরণ এনে এই নেতিকরণের নেতিকরণের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। যেমন বার্লির দানার কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে একটি বার্লিদানা উপযুক্ত শর্ত পেলে নেতিকৃত হয় বার্লি গাছের দ্বারা। আসলে বিষয়টি হচ্ছে উদ্ভিদের বীজের ক্ষেত্রে বীজ ও গাছ হচ্ছে একটি দ্বন্দ্বের দুটি দিক। উপযুক্ত শর্তে এই দ্বন্দ্বের বিকাশ ঘটে এবং এই বিকাশ ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে। তাই নেতিকরণের নেতিকরণ নিয়ম নয়, বরং ইতিকরণ ও নেতিকরণ এই দুই বিপরীতের দ্বন্দ্বে বস্তুর বিকাশ হয়। একটি দিক যখন নেতিকৃত হয়ে যায় তখন নতুন বস্তুর উদ্ভব ঘটে, নতুন দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে এবং নতুন করে ইতিকরণ ও নেতিকরণ সজ্জিত হয়। প্রতিটি নেতিকরণই পরবর্তীতে নিজেই নেতিকৃত হবে, অর্থাৎ নিজে নেতিকৃত হওয়ার আগে ইতিকরণে রূপান্তরিত হবে। এটি একটি অব্যাহত অসীম প্রক্রিয়া। এর শেষ নেই।[১০] মাও সেতুং এজন্যই বলেছিলেন, এবং আমরাও পাচ্ছি বিপরীতের একত্ব এবং সংগ্রাম হচ্ছে সবচাইতে মৌলিক নিয়ম। অর্থাৎ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল নিয়ম দ্বন্দ্ব।
দ্বন্দ্বের নিয়ম সম্পর্কে লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি মাও সেতুং থেকে আলাদা ছিলো না। লেনিনও দ্বন্দ্ববাদের ক্ষেত্রে একটি মূল বৈশিষ্ট্যের কথাই উল্লেখ করেছেন। যেমন, লেনিন বলেছেন,

‘প্রকৃত অর্থে দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে বস্তুর একেবারে মর্মে দ্বন্দ্বের পর্যালোচনা’।[১১]

লেনিনের আরো একটি বক্তব্য লেনিনের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। লেনিন বলছেন,

“সংক্ষেপে, দ্বন্দ্ববাদকে বিপরীতসমূহের একত্বের মতবাদ বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। এটা দ্বন্দ্ববাদের শাঁসকে আঁকড়ে ধরে, কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও উন্নতি ঘটানো প্রয়োজন।”[১২]

এই জন্যই মাও সেতুং তাঁর দ্বন্দ্ব সম্পর্কে রচনার শুরু করেছিলেন এই বলে যে,

“বস্তুর মধ্যে দ্বন্দ্বের নিয়ম, অর্থাৎ বিপরীতের একত্বের নিয়ম হলো বস্তুবাদী দ্বন্দ্ববাদের সবচেয়ে মৌলিক নিয়ম। লেনিন বলেছেন ‘প্রকৃত অর্থে দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে বস্তুর একেবারে মর্মে দ্বন্দ্বের পর্যালোচনা।’ লেনিন এই নিয়মকে প্রায়ই দ্বন্দ্ববাদের মর্ম বলতেন; তিনি এটাকে দ্বন্দ্ববাদের শাঁস বলেও অভিহিত করেছেন।”[১৩]

উপরের আলোচনা ও বিশ্লেষণ থেকে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে দ্বন্দ্ববাদের নিয়ম একটি এবং সেটিকে বলা যেতে পারে এভাবে যে, সব বস্তুই হচ্ছে বিপরীতের একত্ব এবং দুই বিপরীতের সংগ্রামই হচ্ছে সেই নির্দিষ্ট বস্তুর বিকাশ। লেনিন বলেছেন,

“দ্বন্দ্ব হচ্ছে সকল গতি ও জীবনীশক্তির উৎস এবং যে কোনো বস্তুতে যতক্ষণ পর্যন্ত দ্বন্দ্ব থাকে শুধুমাত্র ততক্ষণই তা গতিশীল থাকে ও তাতে তাড়না থাকে ও কর্মশীলতা থাকে।”[১৪]

সুতরাং স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, দ্বন্দ্বের কারণেই বস্তুর গতি ও বিকাশ হয়। তাই দ্বন্দ্বই হচ্ছে মৌলিক নিয়ম। এ থেকেই বস্তুর গতি ও অনবরত পরিবর্তনশীলতাকে উপলব্ধি করা সম্ভব। জগতের বস্তুসমূহের বিকাশের ধারা বুঝতে হলে এই মৌলিক নিয়মটি বোঝা দরকার। বস্তুজগতের এই নিয়মটিকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দার্শনিকগণ সূত্রবদ্ধ করেছেন।

তথ্যসূত্র
১. ভাসিলি ক্রাপিভিন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কী, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১৫০
২. কার্ল মার্কস, পুঁজি, দ্বিতীয় জার্মান সংস্করণের উত্তরভাষ, ২৪জানুয়ারি, ১৮৭৩; অনুবাদ, প্রথম খণ্ড, প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩
৩. V I Lenin, Collected Works,Progress Publishers, Moscow, Vol 21, p 75
৪. V I Lenin, Collected Works,Progress Publishers, Moscow, Vol 19, 1977, p 554
৫. ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৩৭
৬. স্তালিন, দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ৩২তম মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর ২০০৬, পৃষ্ঠা ৬-৯
৭. মাও সেতুং, চেয়ারম্যান মাও টকস টু দি পিপল, পৃষ্ঠা ২২৬, উদ্ধৃতি নেয়া হয়েছে গ্রন্থনা নেসার আহমেদ, মাও বিতর্ক, পর্ব ১, ঐতিহ্য, ঢাকা, ডিসেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা ১১১
৮. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১১১
৯. মাও সেতুং, ১৯৬৫, হ্যাংচৌ-এ ভাষণ, সভাপতি মাও সেতুঙের উদ্ধৃতি ও শেষ জীবনের উদ্ধৃতি, ঐশী পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃষ্ঠা ১৬৬
১০. এই বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন, আনোয়ার কবীর, মাওসেতুং চিন্তাধারার সপক্ষে, নবদিগন্ত প্রকাশনী, ঢাকা, জুন ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৪৭-৬০। অথবা নেসার আহমেদ গ্রন্থিত, মাও বিতর্ক, পর্ব ১, ঐতিহ্য, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃষ্ঠা ১০৭-২২।
১১. Lenin, V I, Conspectus of Hegel’s Book: ‘Lectures on the History of Philosophy’, coll. works, vol.38, Progress Publishers, Moscow, Fourth printing, 1976, p. 251-252. ইংরেজি বাক্যটি এরকমঃ ‘Dialectics in the proper sense is the study of contradiction in the very essence of objects’
১২. V I, Philosophical Notebooks, Collected works, vol.38, Progress Publishers, Moscow, Fourth printing, 1976,p. 222. ইংরেজি বাক্যটি এরকমঃ In brief, dialectics can be defined as the doctrine of the unity of opposites. This embodies the essence of dialectics, but it requires explanations and development.
১৩. মাও সেতুং, দ্বন্দ্ব সম্পর্কে, নির্বাচিত রচনাবলী, প্রথম খন্ড, চলন্তিকা বই ঘর, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৩০৫
১৪. Lenin, V I, Philosophical Notebooks, Collected works, vol.38, Progress Publishers, Moscow, Fourth printing, 1976, p. 139 উদ্ধৃতি নেয়া হয়েছে, গ্রন্থনা নেসার আহমেদ, মাও বিতর্ক, পর্ব ১, ঐতিহ্য, ঢাকা, ডিসেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা ১১৯।

১৫. প্রবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] রচিত ভাষাপ্রকাশ থেকে ২০১৬ সালে প্রকাশিত মার্কসবাদ গ্রন্থের ২৬-৩২ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে এবং এখানে প্রকাশিত।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top