Main Menu

মার্কসবাদ ও অভ্যুত্থান — ভি. আই. লেনিন

রাশিয়া সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক শ্রমিক পার্টি (বলশেভিক) কেন্দ্রিয় কমিটির নিকট চিঠি

প্রভাবশালী ‘সমাজতান্ত্রিক’ পার্টিগুলি মার্কসবাদের যেসব বিদ্বেষপূর্ণ ও প্রায় বহু-প্রচারিত বিকৃতি ঘটিয়েছে তার মধ্যে এই সুবিধাবাদী মিথ্যাটি অন্তর্গত, যথা: অভ্যুত্থানের প্রস্তুতিকে, সাধারণভাবে অভ্যুত্থানকেই একটা শিল্পকলা হিসেবে দেখা নাকি ‘ব্লাঙ্কিবাদ’।  

সুবিধাবাদের নেতা বার্নস্টাইন মার্কসবাদকে ব্লাঙ্কিবাদে অভিযুক্ত করে আগেই এক শোচনীয় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, বর্তমানের সুবিধাবাদীরা ব্লাঙ্কিবাদের সোরগোল তুলে বার্নস্টাইনের রিক্ত ‘ভাবনাকে’ একবিন্দু নবায়িতও করে নি, ‘সমৃদ্ধ’ও করে নি।

অভ্যুত্থানকে একটা শিল্পকলা হিসেবে দেখার জন্য মার্কসবাদীদের কিনা ব্লাঙ্কিবাদে অভিযুক্ত করা! সত্যের এর চেয়ে ঘোরতর বিকৃতি আর কী হতে পারে যখন কোনো এক মার্কসবাদীও একথা অস্বীকার করতে পারে না যে স্বয়ং মার্কসই একান্ত সুনির্দিষ্ট, যথাযথ ও তর্কাতীত রূপে এই ব্যাপারে মত দিয়েছেন, অভ্যুত্থানকে স্পষ্টতই শিল্পকলা বলেছেন, বলেছেন যে অভ্যুত্থানকে গ্রহণ করতে হবে শিল্পকলার মতো, বলেছেন দরকার প্রাথমিক সাফল্য জয় করা এবং শত্রুর ওপর আক্রমণ বন্ধ না করে, তার বিহবলতার সুযোগ নিয়ে সাফল্য থেকে সাফল্যে এগিয়ে যাওয়া, ইত্যাদি।

অভ্যুত্থান সার্থক হতে হলে নির্ভর করা উচিত চক্রান্তের ওপর নয়, পার্টির ওপর নয়, অগ্রণী শ্রেণিটির ওপর। এই হলো প্রথম কথা। অভ্যুত্থানকে নির্ভর করতে হবে জনগণের বৈপ্লবিক জোয়ারের ওপর। এই হলো দ্বিতীয় কথা। ক্রমবর্ধমান বিপ্লবের ইতিহাসের এমন সন্ধিক্ষণে অভ্যুত্থানকে নির্ভর করতে হবে যখন জনগণের অগ্রণী পঙক্তিগুলির সক্রিয়তা সর্বোচ্চে উঠেছে, যখন শত্রুদের মধ্যে এবং বিপ্লবের দূর্বল, দোমনা, অস্থিরচিত্ত বন্ধুদের মধ্যে দোলায়মানতা সবচেয়ে বেশি। এই হলো তৃতীয় কথা। অভ্যুত্থানের প্রশ্ন উপস্থাপনে ব্লাঙ্কিবাদ থেকে মার্কসবাদের তফাৎ এই তিনটি শর্তে।

কিন্তু এই শর্তগুলি যদি বর্তমান থাকে, তাহলে অভ্যুত্থানকে শিল্পকলা হিসেবে দেখতে অস্বীকার করার অর্থ মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ও বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।

বর্তমানে আমরা যে-মুহূর্তের মধ্য দিয়ে চলেছি সেটাকে কেন এমন মুহূর্ত বলে ধরা উচিত, যখন পার্টির পক্ষে একথা স্বীকার করা বাধ্যতামূলক যে বাস্তব ঘটনাবলির ধারায় অভ্যুত্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচি এবং অভ্যুত্থানকে দেখা উচিত শিল্পকলা হিসেবে, তা প্রমাণের জন্য বোধ হয়। সবচেয়ে ভাল হবে তুলনার পদ্ধতি নিয়ে ৩-৪ জুলাইয়ের সঙ্গে সেপ্টেম্বর দিনগুলিকে যাচাই করা।

সত্য লঙ্ঘন না করে ৩-৪ জুলাইয়ে প্রশ্নটা হাজির করা যেত এভাবে: ক্ষমতা দখল করাই সঠিক, কেননা অন্যথায়ও শত্রু আমাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ আনবে ও অভ্যুত্থানকারী হিসেবে আমাদের দমন করবে। কিন্তু এ-থেকে ক্ষমতা দখলের অনুকূলে সিদ্ধান্ত টানা যেত না, কেননা অভ্যুত্থানের বিজয়ের বাস্তব পরিস্থিতি তখন ছিলো না।

১) তখন বিপ্লবের অগ্রবাহিনী হতে সক্ষম শ্রেণীটি আমাদের পক্ষে ছিলো না।

রাজধানী দুটির  শ্রমিক ও সৈনিকদের মধ্যে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তখনো ছিলো না। এখন উভয় সোভিয়েতেই তা বর্তমান। সেটা গড়ে উঠেছে কেবল জুলাই ও আগস্টের ইতিহাসে, বলশেভিক ‘দলনের’ অভিজ্ঞতা ও কর্নিলভ হাঙ্গামার অভিজ্ঞতায় ।

২) একটা সর্বজনীন বিপ্লবী জোয়ার তখন ছিলো না। কর্নিলভ হাঙ্গামার পরে এখন সেটা আছে। প্রদেশগুলির অবস্থা এবং নানা স্থানে সোভিয়েতগুলি কর্তৃক ক্ষমতাগ্রহণে তা প্রমাণিত হচ্ছে।

৩) সেই সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ রাজনৈতিক আয়তনে আমাদের শত্রুদের মধ্যে ও দোমনা পেটি বুর্জোয়াদের মধ্যে দোলায়মানতা ছিলো না। এখন দোলায়মানতা রয়েছে বিরাটাকারে। আমাদের প্রধান শত্রু, মিত্রশক্তি ও বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদ (কেননা ‘মিত্রশক্তি’ রয়েছে বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের পুরোভাগে) বিজয়াবধি যুদ্ধ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে পৃথক সন্ধি – এই দুয়ের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের পেটি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা স্পষ্টতই জনগণের মধ্যে সংখ্যাধিক্য হারিয়ে ভয়ানক দোদুল্যচিত্ত হয়ে পড়েছে, কাদেতদের সঙ্গে সঙ্ঘ, অর্থাৎ জোট অস্বীকার করেছে।

৪) তাই ৩-৪ জুলাইয়ে অভ্যুত্থান হতো ভুল: আমরা আঙ্গিক বা রাজনৈতিক কোনো দিক থেকেই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারতাম না। আঙ্গিকভাবে, যদিও পেত্রগ্রাদ কোনো কোনো মুহূর্তে এসে গিয়েছিল আমাদের হাতে। কেননা পেত্রগ্রাদ দখলের জন্য আমাদের শ্রমিক ও সৈন্যরা তখন লড়তে ও মরতে যেত না: এমন ‘হিংস্রতা’, কেরেনস্কি তথা সেরেতোলি-চের্নোভদের প্রতি এমন ফুসন্ত বিদ্বেষ ছিলো না, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি ও মেনশেভিকদের অংশগ্রহণে বলশেভিকদের ওপর যে-দলন চলে, তার অভিজ্ঞতায় আমাদের লোকেরা তখনো পোক্ত হয় নি।

রাজনৈতিকভাবে আমরা ৩-৪ জুলাইয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারতাম না, কেননা কর্নিলভ হাঙ্গামার আগে ফৌজ ও প্রদেশগুলি পেত্রগ্রাদের বিরুদ্ধে অভিযান করতে পারত ও করত।

এখনকার ছবিটা অন্যরকম।

শ্রেণিটির, বিপ্লবের অগ্রবাহিনীর, জনগণকে সঙ্গে টানতে সমর্থ জাতির অগ্রবাহিনীর অধিকাংশ আমাদের পক্ষে। জনগণের অধিকাংশ আমাদের পক্ষে, কেননা কৃষকেরা যে সোশ্যালিস্ট — রেভলিউশনারি ব্লক (এবং খোদ সোশ্যালিস্ট — রেভলিউশনারিদের) কাছ থেকে জমি পাবে না তার অতি প্রকট, জাজ্বল্যমান লক্ষণ হলো চের্নোভের পদত্যাগ, এবং মোটেই এটা একমাত্র লক্ষণ নয়। বিপ্লবের লোকায়ত চরিত্রের মূল কারণটা এখানেই।

সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ এবং সোশ্যালিস্ট — রেভলিউশনারি ও মেনশেভিকদের গোটা ব্লকটির অশ্রুতপূর্ব দোলায়মানতার পরিস্থিতিতে যে-পার্টি তার পথ সম্পকে দৃঢ়চিত্তে সজ্ঞান, এমন এক পার্টির সুবিধাজনক অবস্থা রয়েছে আমাদের ৷

আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত, কেননা জনগণ একেবারে হতাশার মুখে এসে পৌছেছে আর ‘কর্নিলভ হাঙ্গামার দিনগুলোয়’ গোটা জনগণের কাছে আমাদের নেতৃত্বের তাৎপর্য দেখিয়ে, তারপর ব্লক-ওয়ালাদের কাছে আপসের প্রস্তাব পেশ করে এবং তাদের অব্যাহত দোলায়মানতা সত্ত্বেও তাদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবার পর পরিত্রাণের সঠিক পথ আমরাই জনগণকে দেখাচ্ছি।

আমাদের আপসের প্রস্তাব বুঝি-বা এখনো প্রত্যাখ্যাত হয় নি, গণতান্ত্রিক সম্মেলন তা এখনো গ্রহণ করতে পারে একথা ভাবলে প্রকাণ্ড ভুল হবে।

আপস প্রস্তাবিত হয়েছিল পার্টি থেকে পার্টির কাছে; অন্যভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করা যায় না। পার্টিগুলি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। গণতান্ত্রিক সম্মেলন মাত্র একটা সম্মেলন, তার বেশি কিছু নয়। একটা কথা ভোলা চলে না: তার ভেতর বিপ্লবী জনগণের অধিকাংশের, গরিব ও ক্রুদ্ধ কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব নেই। এটা হলো জনগণের সংখ্যালঘুর সম্মেলন — এই চাক্ষুষ সত্যটা ভোলা চলে না। গণতান্ত্রিক সম্মেলনকে একটা পার্লামেণ্ট হিসেবে দেখলে আমাদের পক্ষ থেকে হবে একটা মহাভুল, প্রকাণ্ড একটা পার্লামেণ্টি আহাম্মকি (১), কেননা এই সম্মেলন যদি নিজেকে এমন কি বিপ্লবের কায়েমী সার্বভৌম পার্লামেণ্ট বলেও ঘোষণা করে, তাহলেও সেই সম্মেলন কিছুই ফয়সালা করবে না। ফয়সালা রয়েছে তার বাইরে, পেত্রগ্রাদ ও মস্কোর শ্রমিক পাড়াগুলোয়।

সার্থক অভ্যুত্থানের সব ক’টি বাস্তব পূর্বশত আমাদের সামনে। আমাদের রয়েছে পরিস্থিতিগত এক অসাধারণ সুবিধা, যখন লোককে যা জ্বালিয়ে মারে দুনিয়ায় এই সবচেয়ে যন্ত্রণাকর জিনিস — দ্বিধার অবসান ঘটাবে কেবল অভ্যুত্থানে আমাদের বিজয়; যখন অভ্যুত্থানে কেবল আমাদের বিজয়েই অবিলম্বে জমি পাবে কৃষক; যখন অভ্যুত্থানে কেবল আমাদের বিজয়েই বিপ্লবের বিরুদ্ধে পৃথক শান্তির খেলা চুকবে, খেলা চুকবে বিপ্লবের হিতার্থে অনেক পরিপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত ও শীঘ্র একটা শান্তির প্রস্তাব দিয়ে।

পরিশেষে, কেবল আমাদের পার্টিই অভ্যুত্থানে জয়লাভ করে পেত্রগ্রাদকে বাঁচাতে পারে, কেননা আমাদের শান্তি প্রস্তাব যদি প্রত্যাখ্যাত হয়, এমন কি সাময়িক যুদ্ধ বিরতিও যদি আমরা না পাই, তাহলে তখন আমরা হয়ে দাঁড়াব ‘প্রতিরক্ষাবাদী’, আমরা গিয়ে দাঁড়াব সমর পার্টিগুলোর নেতৃত্বে, হয়ে দাঁড়াব সবচেয়ে ‘সামরিক’ পার্টি, লড়াই চালাব সত্যি করেই বিপ্লবী উপায়ে। পুঁজিপতিদের সমস্ত রুটি ও সমস্ত বুট আমরা কেড়ে নেব। তাদের জন্য রাখব রুটির ছাল, পায়ে পরাব গাছের বাকলের জুতা। সমস্ত রুটি ও সমস্ত বুট আমরা ফ্রণ্টকে দেব।

আর তাহলে আমরা রক্ষা করতে পারব পেত্রগ্রাদকে।

রাশিয়ায় সত্যিকারের বিপ্লবী যুদ্ধের পক্ষে আত্মিক ও বৈষয়িক সম্পদ এখনো অপরিমিত; জার্মানরা আমাদের অন্তত সাময়িক যুদ্ধ বিরতি দেবে এই সম্ভাবনা শতকরা ৯৯ ভাগ। আর এখন যুদ্ধ বিরতি পাওয়া তো গোটা দুনিয়া জয় করারই নামান্তর।

***

বিপ্লবকে বাঁচাতে ও সাম্রাজ্যবাদীদের উভয় দলের দ্বারা রাশিয়াকে ‘পৃথক’ বিভাজন থেকে বাঁচাতে পেত্রগ্রাদ ও মস্কোর শ্রমিকদের অভ্যুত্থান যে একান্ত আবশ্যক একথা স্বীকার করার পর আমাদের উচিত, প্রথমত, সম্মেলনে ক্রমবর্ধমান অভ্যুত্থানের পরিস্থিতির উপযোগী করে নিজেদের রাজনৈতিক রণকৌশল খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, আমাদের দেখানো উচিত যে অভ্যুত্থানকে শিল্পকলা হিসেবে নেওয়ার আবশ্যিকতার বিষয়ে মার্কসের কথাটাকে আমরা কেবল মুখেই স্বীকার করছি না।

সম্মেলনে আমাদের উচিত সংখ্যাবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে, দ্বিধাগ্রস্তদের দোলায়মানদের শিবিরেই ছেড়ে দিতে ভয় না পেয়ে অবিলম্বে বলশেভিক দলকে সংহত করে তোলা। এই দোদুল্যমানেরা দৃঢ়চিত্ত, নিঃস্বার্থ যোদ্ধাদের শিবিরের চেয়ে সেখানেই থাকলে বিপ্লবের বেশি উপকার হবে।

আমাদের উচিত বলশেভিকদের একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা রচনা করা, তাতে স্পষ্টত লম্বা-চওড়া বক্তৃতা এবং সাধারণ বক্তৃতার অপ্রাসঙ্গিকতায় জোর দিয়ে বলা দরকার: বিপ্লবরক্ষার জন্য চাই অবিলম্বে সংগ্রাম, বুর্জোয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণে সম্পর্কচ্ছেদ, বর্তমান সরকারের সম্পূর্ণ অপসারণ, রাশিয়ার ‘পৃথক’ বিভাজনের উদ্যোক্তা ইঙ্গ-ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ, বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী গণতন্ত্রের কাছে অবিলম্বে সমস্ত ক্ষমতার হস্তান্তর।

জনগণের জন্য শান্তি, কৃষকদের জন্য জমি, কলঙ্ককর মুনাফার বাজেয়াপ্তি এবং পুঁজিপতিদের কতৃক উৎপাদনের কলঙ্কজনক ক্ষতিরোধ — এই কর্মসূচিগত প্রস্তাব প্রসঙ্গে উক্ত সিদ্ধান্তের একান্ত সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণ বর্ণনা থাকা চাই আমাদের ঘোষণায়।

ঘোষণাটা যত সংক্ষিপ্ত ও যত তীক্ষ্ণ হয়, ততই ভাল। কেবল আরও দুটি জরুরি কথা তাতে বলা দরকার: জনসাধারণ দোলায়মানতার ফলে উত্ত্যক্ত হয়ে উঠেছে, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি ও মেনশেভিকদের সংকল্পহীনতায় তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছে; আমরা এই দুটি পার্টির সঙ্গে চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদ করছি, কেননা তারা বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

দ্বিতীয় কথা: অবিলম্বে, বিনা রাজ্যগ্রাসে শান্তির প্রস্তাব দিলে, অবিলম্বে মিত্রশক্তি-সাম্রাজ্যবাদী ও সর্ববিধ সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করলে অবিলম্বে হয় একটা যুদ্ধবিরতি ঘটবে, নয় সমগ্র বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত চলে আসবে প্রতিরক্ষার পক্ষে এবং তার নেতৃত্বে বিপ্লবী গণতন্ত্র চালাবে সত্যি করেই ন্যায্য, সত্যি করেই বিপ্লবী একটা যুদ্ধ।

 এই ঘোষণাটা পড়ার পর কথা নয় সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রস্তাব-লেখা নয় কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের সমস্ত দলটাকে কলকারখানায় ও সৈন্য ব্যারাকে পাঠাতে হবে। ওখানেই তাদের জায়গা, ওখানেই জীবনের নাড়ী, ওখানেই বিপ্লবকে বাঁচাবার উৎস, ওখানেই গণতান্ত্রিক সম্মেলনের চালিকাশক্তি।

সেখানে উদ্দীপ্ত আবেগময় বক্তৃতায় আমাদের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করতে হবে ও প্রশ্নটা রাখতে হবে এইভাবে: হয় সম্মেলন সেটা পুরোপুরি গ্রহণ করুক নয় অভ্যুত্থান। মধ্যপন্থা নেই। বিলম্ব অসম্ভব। বিপ্লব মরছে।

প্রশ্নটা এইভাবে রেখে, সমস্ত দলটাকে কারখানা ও সৈন্য-ব্যারাকে কেন্দ্রীভূত করে আমরা সঠিকভাবে অভ্যুত্থান শুরুর মুহূর্ত বাছব।

আর অভ্যুত্থানকে মার্কসবাদী কায়দায়, অর্থাৎ শিল্পকলা হিসেবে নিতে হলে আমাদের এক মুহূর্ত নষ্ট না করে অভ্যুত্থানকারী বাহিনীগুলির কেন্দ্রদপ্তর গঠন করতে হবে, শক্তিবিন্যাস ঘটাতে হবে, বিশ্বস্ত রেজিমেন্টগুলিকে পাঠাতে হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে, ঘেরাও করতে হবে আলেক্সান্দ্রিনসিক থিয়েটার, দখল করতে হবে পিটার ও পোল দুর্গ (২) সেনাপতিমণ্ডলী ও সরকারকে গ্রেপ্তার করতে হবে, য়ুঙ্কার ও বন্য ডিভিসনের বিরুদ্ধে (৩) এমন সব বাহিনী পাঠাতে হবে যারা বরং মরবে তবু নগরকেন্দ্রের দিকে শত্রু সৈন্যকে এগুতে দেবে না; সশস্ত্র শ্রমিকদের জমায়েৎ করতে হবে আমাদের, ডাক দিতে হবে শেষ মরিয়া সংগ্রামে, তৎক্ষণাৎ দখল করতে হবে টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন কেন্দ্র, আমাদের কেন্দ্র দপ্তরকে বসাতে হবে কেন্দ্রিয় টেলিফোন অফিসে সমস্ত কলকারখানা, সমস্ত রেজিমেণ্টগুলি, সশস্ত্র সংগ্রামের সমস্ত এলাকা, ইত্যাদির সঙ্গে তার টেলিফোন যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে।

বলাই বাহুল্য, এসবই দৃষ্টান্তস্বরপ, শুধু এটা দেখাবার জন্য যে অভ্যুত্থানকে শিল্পকলা হিসেবে না নিলে বর্তমান মুহূর্তে মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বস্ত, বিপ্লবের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা যায় না।

টিকা

১. ভ. ই. লেনিনের লেখায় প্রায়শ বিদ্যমান ‘পার্লামেন্টী আহাম্মকি’ অভিব্যক্তিটি আসলে মার্কস ও এঙ্গেলসেরই ব্যবহৃত। এঙ্গেলসের ভাষায় ‘পার্লামেন্টী আহাম্মকি’ হলো এক দুরারোগ্য ব্যাধি, এক ধরনের ‘বিকৃতি, যা তার দুর্ভাগা শিকারের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল করে যে, সারা দুনিয়া, তার ইতিহাস, ভবিষ্যৎ ওই বিশিষ্ট প্রতিনিধি সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট দ্বারাই শাসিত ও নির্ধারিত, যে-সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হয় ওই সভার সদস্যদের ভোটে’ (‘জামানিতে বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব’, ১৫ অধ্যায়)।

ভ. ই. লেনিন এই অভিব্যক্তিটি সুবিধাবাদীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন, যারা বিশ্বাস করে যে যে-কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে পালামেন্টারী কার্যকলাপ হলো একক ও প্রধান ধরন।

২. আলেক্সান্দ্রিনকা — গণতান্ত্রিক সম্মেলনের অধিবেশন বসিয়েছিল পেত্রগ্রাদের আলেক্সান্দ্রিনস্কি থিয়েটারে। পিটার ও পোল দুর্গ – শীতপ্রাসাদের (১১৩ নং টীকা দ্রষ্টব্য) উলেটাদিকে অবস্থিত। পিটার ও পোল দুর্গ ছিলো এক বিরাট অস্ত্রভান্ডার এবং সামরিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

৩. বন্য ডিভিসন — প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ককেশাসের পাহাড়ী জনগণের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাব্রতীদের নিয়ে গড়া ডিভিসনের নাম।

৩৪ খন্ড, ২৪২-২৪৭ পৃঃ ১৯১৭ সালের ১৩-১৪ (২৬-২৭) সেপ্টেম্বরে লিখিত

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *