Main Menu

সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পার্থক্যরেখাগুলো কোথায় ও কীভাবে?

সাম্যবাদী সমাজের গঠনের ধারনা গড়ে উঠেছে তার দুটি পর্ব বা স্তর বা ধাপ সমাজতন্ত্র (Socialism) ও সাম্যবাদের (Communism) বৈশিষ্ট্যকে নিয়ে। এই দুই পর্বের মধ্যে অনেক মিল আছে যেহেতু সেগুলো হলও একই ব্যবস্থার দুটি পর্ব। এই দুই পর্বের ভেতরে বেশ কিছু পার্থক্যও বিরাজমান, এবং এই পার্থক্যগুলো সাম্যবাদী সমাজের বিকাশের নিম্নতম ও উচ্চতম পর্বের প্রকাশ। পুঁজিবাদের পতনের পর সামাজিক সম্পর্কের নতুন সাম্যবাদী পর্যায়ে পৌঁছতে হলে প্রথম পর্যায় সমাজতন্ত্রকে অতিক্রম করতে হবে। সাম্যবাদী সমাজে পৌঁছতে হলে সমাজতান্ত্রিক সম্পর্ক সম্পূর্ণকরণের এক জটিল দীর্ঘ, এবং নানাভাবে বৈর এক প্রক্রিয়া পাড়ি দিতে হয়। অন্যভাবে বললে সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণকরণই হলও সাম্যবাদের দিকে ক্রমান্বয়িক অগ্রগতি।

মার্কসবাদী মতানুসারে উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানার মাধ্যমে পুঁজিবাদি পদ্ধতিতে যে শোষণ প্রক্রিয়া চলে তা থেকে শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজে উত্তরনের অর্ন্তবতীকালিন সময়কে সমাজতান্ত্রিক স্তর বা উত্তরণ পর্ব বলা হয়ে থাকে। অন্যদিকে সাম্যবাদ হলও সাম্যবাদী সমাজ গঠনরূপের সর্বোচ্চ পর্যায়, উৎপাদনের উপায়ের একক সর্বজনীন মালিকানার ভিত্তিতে গঠিত শ্রেণিহীন সামাজিক অবস্থা। এ সমাজে সকল সদস্যের সম্পূর্ণ সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও সাম্যবাদী সমাজের মধ্যে বৈজ্ঞানিক পার্থক্য শুধু এই যে, প্রথম কথাটিতে বোঝায় পুঁজিবাদী সমাজ থেকে বেড়ে ওঠা নতুন সমাজের প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় কথাটিতে বোঝায় তার আরো উচ্চতর পর্ব। অর্থাৎ ‘প্রত্যেকের কাছ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী, প্রত্যেককে শ্রম অনুযায়ী’ সমাজতন্ত্রের এই মূলনীতির জায়গায় প্রতিস্থাপিত হবে সাম্যবাদের ‘প্রত্যেকের কাছ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী, প্রত্যেককে চাহিদা অনুযায়ী’ নীতি। স্মরণে রাখতে হবে যে, প্রতিটি নতুন সামাজিক গঠন ব্যবস্থা হলও তার আগেকার তুলনায় সমাজবিকাশের আরো উন্নত স্তর।  

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে সমাজ ও সব পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কতিপয় ধনী ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচলিত হয়। পুঁজিবাদে মালিকশ্রেণি শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও অন্যান্য খাতের শ্রমিকশ্রেণিকে প্রতিনিয়ত শোষণ করে সীমাহীন মুনাফা দখল করছে। তারা রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী, আইন, আদালত, কারাগার, সশস্ত্র এলিট গ্রুপ ও পুলিশ তৈরি করেছে নিজেদের সুযোগ সুবিধা, পদ ও কাড়ি কাড়ি  মুনাফা লুটের প্রক্রিয়া ঠিক রাখার জন্য। সাম্যবাদের অধীনে সমাজ হবে সমগ্র সমাজের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রকৃত মালিক, সকলের প্রয়োজনে সবকিছুই উৎপাদন করা হবে সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে। তবে এই দুইটির মধ্যে অর্ন্তবর্তীকালিন দুটি স্তর মানবসমাজকে উন্নয়নের স্বার্থে সাম্যবাদে পৌঁছার জন্য অতিক্রম করতেই হবে। ভ. ই. লেনিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে লিখেছেন,

“মার্কসের রাষ্ট্র-বিষয়ক মতবাদের মর্মার্থ কেবল সে-ই আয়ত্ত করেছে যে বোঝে যে, একটি শ্রেণির একনায়কত্ব কেবল সাধারণভাবে সমস্ত শ্রেণি-সমাজের জন্য, কেবল বুর্জোয়া উৎখাতকারী প্রলেতারিয়েতের জন্য দরকার, তাই নয়, পুঁজিবাদ এবং ‘শ্রেণিহীন সমাজ’ কমিউনিজমের অন্তর্বর্তী সমগ্র ঐতিহাসিক পর্বটার জন্য তা দরকার। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রূপ অসাধারণ বিচিত্র, কিন্তু তাদের মূলকথাটা এক: এ সমস্ত রাষ্ট্রই কোনো না কোনো ভাবে, এবং শেষ বিচারে অবধারিতভাবেই বুর্জোয়া একনায়কত্ব। পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উৎক্রমণে অবশ্যই রাজনৈতিক রূপের বিপুল প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য না দেখা দিয়ে পারে না, কিন্তু তাদের মূলকথাটা থাকবে অনিবার্যভাবেই একটা: প্রলেতারীয় একনায়কত্ব।”[১]

সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্র বিদ্যমান থাকে যদিও শোষণ থাকে না। সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্র শোষণের হাতিয়ার নয়, বরং রাষ্ট্র এখানে প্রলেতারিয় একনায়কত্ব কায়েমের মাধ্যমে শোষক শ্রেণিকে দমনের হাতিয়ার। সাম্যবাদী সমাজে রাষ্ট্র প্রচলিত অর্থে থাকবে না, কার্যক্রমে ভয়-ভীতি ও জাতীয় সীমারেখার অস্তিত্ব থাকবে না। যদিও নৈরাজ্যবাদী অতি উৎসাহী ব্যক্তিগণ মনে করেন আমরা রাতারাতি যাদুমন্ত্রের মত পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করে ফেলব। কিন্তু বাস্তবসম্মত এটিই যে সাম্রাজ্যবাদকে টিকিয়ে রেখে দুএকটি দেশে বিপ্লব করে রাষ্ট্র শেষ হবে না। পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজনে অন্তর্বর্তীকালিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিতর দিয়ে বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করতে পারলেই কেবল রাষ্ট্র মারা যেতে পারে। ভ. ই. লেনিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে লিখেছেন,

“মার্কসবাদী ও নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে তফাৎ এই যে: (১) প্রথমোক্তরা রাষ্ট্রের পূর্ণ বিলুপ্তির লক্ষ্য নিলেও স্বীকার করে যে, সে লক্ষ্য কার্যকরী হওয়া সম্ভব কেবল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কর্তৃক শ্রেণি-বিলোপের পরে, রাষ্ট্র শুকিয়ে মরার দিকে আগুয়ান সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ফল হিসেবে; শেষোক্তরা রাতারাতি রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ বিলোপ চায়, সেরূপ বিলুপ্তি কার্যকরী করার শর্ত বোঝে না। (২) প্রথমোক্তরা স্বীকার করে যে, প্রলেতারিয়েতের পক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় করার পর সাবেকী রাষ্ট্রযন্ত্রটা পুরোপুরি ভেঙে তার স্থলে প্যারিস কমিউন ধরণে সশস্ত্র শ্রমিকদের সংগঠন বসানো দরকার; দ্বিতীয়োক্তরা রাষ্ট্র যন্ত্র ধ্বংস সমর্থন করলেও তার স্থলে প্রলেতারিয়েত কী বসাবে এবং কীভাবে বিপ্লবী ক্ষমতা সে কাজে লাগাবে সে ধারণা তাদের একেবারেই অস্পষ্ট; নৈরাজ্যবাদীরা এমনকি বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারে, তার বিপ্লবী একনায়কত্বেও আপত্তি করে। (৩) প্রথমোক্তরা আধুনিক রাষ্ট্র কাজে লাগিয়ে প্রলেতারিয়েতকে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করার দাবি করে; নৈরাজ্যবাদীরা তার বিরোধী।”[২]

সমাজতান্ত্রিক পর্বে বা উৎক্রমণ পর্বে রাষ্ট্র থাকবে, তবে সেই রাষ্ট্রে বুর্জোয়াসহ অন্যান্য শোষক শ্রেণি থাকছে না। সারা দুনিয়ায় প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের মাধ্যমে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ উৎখাত করা গেলে রাষ্ট্র আপনা থেকেই শুকিয়ে মারা যাবে। ভ. ই. লেনিন  তাঁর “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইয়ে দেখিয়েছেন,

“… কমিউনিজমের দিকে বিকাশ এগোয় প্রলেতারীয় একনায়কত্বের মধ্য দিয়ে, অন্যভাবে এগুনো যায় না, কেননা, শোষক পুঁজিবাদীদের প্রতিরোধ চুর্ণ করার মতো আর কেউ নেই এবং অন্য পথ অসম্ভব।

এবং প্রলেতারীয় একনায়কত্ব, অর্থাৎ উৎপীড়কদের দমনের জন্য শাসক শ্রেণি রূপে উৎপীড়িতদের অগ্রবাহিনীর সংগঠন স্রেফ কেবল গণতন্ত্রের প্রসার ঘটাবে, তা হতে পারে না। গণতান্ত্রিকতার বিপুল প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে, এই সর্বপ্রথম যে গণতান্ত্রিকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধনীদের জন্য নয়, গরিবদের জন্য, জনগণের জন্য গণতান্ত্রিকতা, তার সঙ্গে সঙ্গে প্রলেতারীয় একনায়কত্ব নিপীড়ক, শোষক ও পুঁজিপতিদের স্বাধীনতার উপর একগুচ্ছ বাধানিষেধ চাপায়। মজুরি-দাসত্ব থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য তাদের দমন করতেই হবে, তাদের প্রতিরোধ চূর্ণ করতে হবে বল প্রয়োগে_ একথা পরিষ্কার যে, যেখানে দমন রয়েছে, বলপ্রয়োগ রয়েছে সেখানে স্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র নেই।…

জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য গণতন্ত্র এবং জনগণের শোষক ও গণতন্ত্রের এই_ নিপীড়কদের বলপ্রয়োগে দমন অর্থাৎ গণতন্ত্র থেকে বহিষ্কার_ এই রূপান্তরই ঘটে পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উৎক্রমণের সময়।”[৩]

প্রাচুর্য্য ও স্বাধীনতার জন্য এবং সুখশান্তির সাম্যবাদী সমাজে প্রবেশের জন্য আমাদেরকে সাম্যবাদের বস্তুগত বিষয়াবলী সকলের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছে দিতে হবে। যত সময় পর্যন্ত আমরা প্রযুক্তি ও প্রকৌশলগত উন্নতি সাধন করতে না পারব, তত দিন পর্যন্ত দ্রুত দারিদ্র বিমোচন ও অভাব থেকে উল্লম্ফনের মাধ্যমে মুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ ভাবে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে উত্তরণ ঘটাতে পারা যাবে না। মার্কসবাদীদেরে জন্য এই সময়টাকেই বলা হয় সমাজতন্ত্র। গোথা কর্মসূচির সমালোচনায় মার্কস এভাবেই তা ব্যাখ্যা করেছেন। লেনিন লিখেছেন,

“সমাজতন্ত্র হলো শ্রেণির বিলোপ। শ্রেণির বিলোপ করতে হলে সর্বাগ্রে দরকার জমিদার ও পুঁজিপতিদের উচ্ছেদ। … শ্রেণির বিলোপের জন্য, দ্বিতীয়ত, দরকার শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে পার্থক্যের বিলোপ, সবাইকেই মেহনতি করে তোলা। সেটা সংগে সংগেই করা চলে না। এ হলো অতুলনীয় রকমের বেশি দুরূহ ও অনিবার্যরূপেই দীর্ঘকালীন একটা কর্তব্য। কোনো রকম একটি শ্রেণির উচ্ছেদ করে এ কর্তব্যের সমাধান সম্ভব নয়। তার সমাধান সম্ভব কেবল সমস্ত সামাজিক অর্থনীতির সাংগঠনিক পুনর্নির্মাণ মারফত, একক, বিচ্ছিন্ন, ক্ষুদে পণ্য অর্থনীতি থেকে সামাজিক বৃহদায়তন অর্থনীতিতে উত্তরণ মারফত।”[৪]

গোটা পৃথিবী হতে শোষণ, কর্তৃত্ব, নিপীড়ন ও আগ্রাসন উৎখাত করতে হলে প্রাথমিক কাজ হিসাবে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক শ্রেণির মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখল করতে হবে যাকে মার্কসীয় পরিভাষায় বলা হয় প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব এবং সেটি ‘মালিকশ্রেণির একনায়কত্বের’ বিপরীত। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখলের পরে যখনই শ্রমিক শ্রেণি উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ করবে  এবং অংশগ্রহণমূলক পন্থায় কতিপয় ধনিক শ্রেণির মানুষের স্বার্থের পরিবর্তে সকলের স্বার্থে তা পরিচালনা করবে; তখনই সমাজ অতি দ্রুত সকল মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করে আরো বেশি কিছু দিতে পারবে। সমাজ উৎখাত করবে সকল রকমের বেকারত্ব, দিতে পারব বিনামূল্যে  প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, গৃহসহ দরকারি সব কিছু। লোকজনের কল্যাণ, জনগণের সর্বমুখী বিকাশ, মানবের সকল সুপ্ত প্রতিভার স্ফুরণ, মানুষের সৃজনশীলতার বাস্তবায়ন, উৎপাদন শক্তির অনবরত উৎকর্ষ হবে খোদ সাম্যবাদী সমাজের অস্তিত্ব ও বিকাশের লক্ষ্যে। সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্র থাকবে কিন্তু সেই রাষ্ট্র হবে শোষণমুক্ত ও শ্রমিকগণ হবেন সকল নিপীড়ন থেকে মুক্ত। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস সমাজতান্ত্রিক ‘রাষ্ট্রের’ ব্যাখ্যায় বলেছেন,

“ইহা সত্যিকার অর্থে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্বশীল একটি সমাজ হবে, এই শব্দটি তার প্রচলিত অর্থের তাৎপর্যই হারিয়ে ফেলবে, রাষ্ট্র বিলীন হবে সমাজের মাঝে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সমাজের খুবই স্বল্প মানুষের প্রতিনিধিত্বই করে থাকে। আর সে জন্যেই তারা বেশির ভাগ মানুষের উপর প্রভূত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নির্মম পন্থার আশ্রয় নিয়ে থাকে। তবে যদি একবার সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন সকলের স্বার্থে শুরু হয়ে যায় তবে দ্রুত পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিলোপ হতে থাকবে এবং এর সাথে সাথে পুঁজিবাদি সমাজে চলমান শোষণ, নিপীড়নও বৈষম্য ক্রমান্নয়ে তিরোহিত হয়ে যাবে। এ ছাড়া পুঁজিবাদি সমাজের প্রচলিত ভয়ভীতি প্রদর্শন, শক্তি প্রয়োগ থাকবে না, সমগ্র সমাজব্যবস্থাটাই পরিচালিত হবে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে সকলের স্বার্থে সকলের প্রয়োজনে।”[৫] 

প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বাধীন সমাজে জনগণ পাবে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র। এছাড়া সমাজতন্ত্রের আবির্ভাবের পূর্বের সকল সমাজে ছিলো শোষকদের জন্য স্বাধীনতা এবং তাদের জন্যই ছিলো গণতন্ত্র। সমাজতন্ত্রের অধীনে যে গণতন্ত্র হবে তাই একমাত্র গণতন্ত্র যা শোষণকে যাদুঘরে নিক্ষেপ করবে। ভ. ই. লেনিন যথার্থই লিখেছেন,

“পুঁজিবাদী সমাজে আমরা পাই কাটাছেঁড়া, হতচ্ছাড়া, জাল করা একটা গণতন্ত্র, যা কেবল ধনীদের জন্য, অল্পাংশের জন্য। প্রলেতারীয় একনায়কত্ব, কমিউনিজমে উৎক্রমণের পর্বটাই প্রথম দেবে শোষকদের উপর সংখ্যাল্পদের আবশ্যকীয় দমনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের জন্য, অধিকাংশের জন্য গণতন্ত্র। কেবল কমিউনিজমই দিতে পারে সত্যসত্যই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র, এবং সে গণতন্ত্র যতই পরিপূর্ণ হবে, ততই দ্রুত তা নিষ্প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াবে, আপনা থেকেই শুকিয়ে মরবে।

অন্য কথায়: পুঁজিবাদে আমরা পাই সঠিক অর্থে একটি রাষ্ট্র, এক শ্রেণি কর্তৃক অপর শ্রেণিকে, তদুপরি সংখ্যাল্প কর্তৃক সংখ্যাগুরুদের দমনের একটা বিশেষ যন্ত্র। বোঝাই যায় যে, সংখ্যাল্প শোষক কর্তৃক সংখ্যাগুরু শোষিতদের নিয়মিত দমনের মতো একটা ব্যাপার সফল হতে হলে দরকার দমনের চূড়ান্ত হিংস্রতা ও পাশবিকতা, দরকার রক্তের একটা সমুদ্র, মানবজাতিকে যেখানে খুঁড়িয়ে চলতে হয় দাসত্বে, ভূমিদাসত্বে, মজুরি দাসত্বে।

তারপর, পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উৎক্রমণের সময় দমন তখনো দরকার, তবে সেটা অধিকাংশ শোষিত কর্তৃক অল্পাংশ শোষকদের দমন। বিশেষ হাতিয়ার, দমনের বিশেষ যন্ত্র হিসেবে ‘রাষ্ট্র’ তখনো দরকার, কিন্তু সেটা তখন উতক্রমায়মান রাষ্ট্র, সঠিক অর্থে সেটা আর তখন রাষ্ট্র নয়, কেননা দাস, ভূমিদাস, মজুরি দাসদের বিদ্রোহ দমনের তুলনায় গতকালের মজুরি-দাসদের অধিকাংশ কর্তৃক শোষকদের অল্পাংশকে দমন করার কাজটা এতই সহজ, সাধারণ ও স্বাভাবিক যে, মানবজাতিকে তার জন্য অনেক কম মূল্য দিতে হবে। এবং তাতে জনসংখ্যার এতই বিপুল একটা সংখ্যাগরিষ্ঠের নিকট গণতন্ত্রের সম্প্রসারণ চলে যে দমনের বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন লোপ পেতে শুরু করে। খুবই স্বাভাবিক যে, শোষকেরা এরূপ কাজের জন্য জটিলতম যন্ত্র ছাড়া জনগণকে দমন করতে অক্ষম, কিন্তু জনগণ শোষকদের দমন করতে পারে অত্যন্ত সরল ‘যন্ত্রের’ সাহায্যেই, প্রায় ‘যন্ত্র’ ছাড়াই, বিশেষ হাতিয়ার ছাড়াই_ নিতান্তই সশস্ত্র জনগণের সংগঠন দিয়েই (একটু এগিয়ে বলি, যেমন শ্রমিক-সৈনিক প্রতিনিধি সোভিয়েত)।

শেষত, রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ নিষ্প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় কেবল কমিউনিজমে, কেননা, তখন দমন করার মতো কেউ থাকছে না_ ‘কেউ’ এটা অবশ্য শ্রেণির অর্থে, জনগণের নির্দিষ্ট একটা অংশের সঙ্গে প্রণালীবদ্ধ সংগ্রামের অর্থে। আমরা মোটেই ইউটোপীয় নই এবং ব্যক্তি বিশেষের অনাচার তথা সেরূপ অনাচার দমনের আবশ্যিকতা যে আছে এ সম্ভাবনা এবং অনিবার্যতা আমরা এতটুকু অস্বীকার করি না। কিন্তু প্রথমত, তার জন্য দমনের বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন নেই, সশস্ত্র জনগণ নিজেরাই সে কাজটা তেমনি সহজে ও অনায়াসে করবে যেভাবে এমনকি বর্তমান সমাজেই সুসভ্য জনতা মারপিট ছাড়িয়ে দেয় কিংবা নারীর ওপর বলাৎকার হতে দেয় না। দ্বিতীয়ত, আমরা জানি যে, সমাজ জীবনের নিয়ম লঙ্ঘন করা অনাচারের মূল কারণ হল জনগণের উপর শোষণ, তাদের অভাব-অনটন। অনাচারের এই প্রধান কারণটা দূর হলেই অনাচারও অনিবার্যভাবেই ‘শুকিয়ে মরতে’ শুরু করবে। সেটা কত তাড়াতাড়ি ও কী ক্রমিকতায় হবে সেটা আমরা জানি না, কিন্তু এটা আমরা জানি যে, ওগুলো শুকিয়ে মরবে। তারা শুকিয়ে মরার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রও শুকিয়ে মরবে।” [৬]

সমাজতান্ত্রিক সমাজ কায়েমের জন্য সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পার্থক্যরেখাগুলো লেনিনবাদী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেই এগোতে হবে। মার্কসবাদ লেনিনবাদের পথে মানবজাতিকে মুক্ত করতে হলে অতীতের সমস্ত সংগ্রামের সারসংক্ষেপ করেই কেবল এগোনো যেতে পারে।[৭]

তথ্যসূত্র সহায়ক গ্রন্থ ও টিকা:

১. ভ. ই. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ৩৬

২. ভ. ই. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ১১২

৩. ভ. ই. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ৮৮

৪. ভ. ই. লেনিন, প্রলেতারিয় একনায়কত্বের যুগে অর্থনীতি ও রাজনীতি, রচনা সংকলন, তৃতীয় ভাগ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ২১২

৫. Friedrich Engels, Anti-Duhring, Progress Publishers, Moscow 1975, p. 321-322.

৬. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ৮৯-৯০]

৭. প্রবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] রচিত ভাষাপ্রকাশ ঢাকা থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত সমাজতন্ত্র গ্রন্থের ২৯-৩৬ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে এবং রোদ্দুরেতে প্রকাশ করা হলো। প্রবন্ধটির রচনাকাল ৩০ অক্টোবর, ২০১৪। 

আরো পড়ুন






2 Comments to সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পার্থক্যরেখাগুলো কোথায় ও কীভাবে?

  1. paresh chattopadhyay says:

    Lenin stood Marx on his head.

  2. Paresh Chattopadhyay says:

    There is NO text in Marx’s Writings showing a distinction between Socialism

    and Communism’ They are equivalent and alternative terms for the same

    society which Marx also calls ‘Republic of Labour’ ‘Union of Free and Equal

    Individuals’ , ‘Cooperative Society’, or, simply ‘Association’.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *