You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > এঙ্গেলস > কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, জার্মান অথবা ‘খাঁটি’ সমাজতন্ত্র

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, জার্মান অথবা ‘খাঁটি’ সমাজতন্ত্র

— কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য

গ। জার্মান অথবা ‘খাঁটি” সমাজতন্ত্র

ফ্রান্সের সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্যের জন্ম হয়েছিলো ক্ষমতাধর বুর্জোয়া শ্রেণীর চাপে এবং এই ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের অভিব্যক্তি হিসাবে। জার্মানিতে সে সাহিত্যের আমদানি হলো যখন সামন্ত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সেখানকার বুর্জোয়ারা সবেমাত্র লড়াই শুরু করেছে।

জার্মান দার্শনিকেরা, হবু দার্শনিকেরা, সৌখিন ভাবুকেরা সাগ্রহে এ সাহিত্য নিয়ে কাড়াকড়ি শুরু করল। তারা শুধু এই কথাটুকু ভুলে গেল যে ফ্রান্স থেকে এ ধরনের লেখা জার্মানিতে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফরাসী সমাজ পরিস্থিতিও চলে আসে নি। জার্মানির সামাজিক অবস্থার সংস্পর্শে এসে এই ফরাসী সাহিত্যের সমস্ত প্ৰত্যক্ষ ব্যবহারিক তাৎপর্য হারিয়ে গেল, তার চেহারা হলো নিছক সাহিত্যিক। তাই আঠারো শতকের জার্মান দার্শনিকদের কাছে প্ৰথম ফরাসী বিপ্লবের দাবিগুলি মনে হলো সাধারণভাবে ব্যবহারিক প্রজ্ঞার দাবি মাত্র, এবং বিপ্লবী ফরাসী বুর্জোয়া শ্রেণির অভিপ্ৰায় ঘোষণার তাৎপর্য দাঁড়াল বিশুদ্ধ অভিপ্রায়, অনিবাৰ্য অভিপ্রায়, সাধারণভাবে যথার্থ মানবিক অভিপ্ৰায়ের আইন।

জার্মান লেখকদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়াল নূতন ফরাসী ধারণাগুলিকে নিজেদের সনাতন দার্শনিক চেতনার সঙ্গে খাপ খাওয়ান, নিজেদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ না করে ফরাসী ধারণাগুলিকে আত্মসাৎ করা।

যেভাবে বিদেশী ভাষাকে আয়ত্ত করা হয়। সেইভাবে, অর্থাৎ অনুবাদের মাধ্যমে এই আত্মসাতের কাজ চলেছিলো।

প্রাচীন পেগান জগতের চিরায়ত সাহিত্যের পুঁথিগুলির উপরেই সন্ন্যাসীরা কী ভাবে ক্যাথলিক সাধুদের নির্বোধ জীবনী লিখে রাখত সে কথা সুবিদিত। অপবিত্র ফরাসী সাহিত্যের ব্যাপারে জার্মান লেখকেরা এ পদ্ধতিটিকে উল্টে দেয়। মূল ফরাসীর তলে তারা লিখল তাদের দার্শনিক ছাইপাঁশ। উদাহরণস্বরূপ, মুদ্রার অর্থনৈতিক ক্রিয়ার ফরাসী সমালোচনার তলে তারা লিখল ‘মানবতার বিচ্ছেদ’; বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ফরাসী সমালোচনার নিচে লিখে রাখল নির্বিশেষ এই প্রত্যয়ের সিংহাসনচ্যুতি’ ইত্যাদি।

ফরাসী ঐতিহাসিক সমালোচনার পিছনে এই সব দার্শনিক বুলি জুড়ে দিয়ে তার নাম তারা দেয় ‘কর্মযোগের দর্শন’, ‘খাঁটি সমাজতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্রের জার্মান বিজ্ঞান’, ‘সমাজতন্ত্রের দার্শনিক  ভিত্তি’ ইত্যাদি।

ফরাসী সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট রচনাগুলিকে এইভাবে পুরোপুরি নিবীৰ্য করে তোলা হয়। জার্মানদের হাতে যখন এ সাহিত্য এক শ্রেণির সঙ্গে অপর শ্রেণির সংগ্রামের অভিব্যক্তি হয়ে আর রইল না, তখন তাদের ধারণা হলো যে ‘ফরাসী একদেশদর্শিতা’ অতিক্রম করা গেছে, সত্যকার প্রয়োজন নয় প্রকাশ করা গেছে সত্যের প্রয়োজনকে, প্রতিনিধিত্ব করা গেছে।প্রলেতারিয়েতের স্বার্থের নয় মানব প্রকৃতির, নির্বিশেষ যে মানুষের শ্রেণি নেই, বাস্তবতা নেই, যার অস্তিত্ব কেবল দার্শনিক জল্পনার কুয়াশাবৃত রাজ্যে তার স্বার্থের।

জার্মান এই যে সমাজতন্ত্র তার স্কুলছাত্রের কর্তব্যটাকেই অমন গুরুগম্ভীর ভারিক্কী চালে গ্ৰহণ করে সামান্য পশরাটা নিয়েই ক্যানভাসারের মতো গলাবাজি শুরু করেছিলো তার পণ্ডিতি সারল্যাটাও কিন্তু ইতোমধ্যে ক্রমে ক্রমে ঘুচে গেছে।

সামন্ত আভিজাত্য ও নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের বিপক্ষে জার্মান, বিশেষ করে প্রাশিয়ার বুর্জোয়া শ্রেণির লড়াইটা, অর্থাৎ উদারনৈতিক আন্দোলন তখন গুরুতর হয়ে ওঠে।

তাতে করে রাজনৈতিক আন্দোলনের সামনে সমাজতন্ত্রের দাবিগুলি তুলে ধরবার বহুবাঞ্ছিত সুযোগ ‘খাঁটি’ সমাজতন্ত্রের কাছে এসে হাজির হয়, হাজির হয় উদারনীতি, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, বুর্জোয়া প্রতিযোগিতা, সংবাদপত্রের বুর্জোয়া স্বাধীনতা, বুর্জোয়া বিধান, বুর্জোয়া মুক্তি ও সাম্যের বিরুদ্ধে চিরাচরিত অভিশাপ হানবার সুযোগ; জনগণের কাছে এই কথা প্রচারের সুযোগ যে এই বুর্জোয়া আন্দোলন থেকে তাদের লাভের কিছু নেই, সবকিছু হারাবারই সম্ভাবনা। ঠিক সময়টিতেই জার্মান সমাজতন্ত্র ভুলে গেল, যে-ফরাসী সমালোচনার সে মূঢ় প্ৰতিধ্বনি মাত্র সেখানে আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের অস্তিত্ব আগেই প্রতিষ্ঠিত, আর তার সঙ্গে ছিলো অস্তিত্বের আনুষঙ্গিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও তদুপযোগী রাজনৈতিক সংবিধান অথচ জার্মানিতে আসন্ন সংগ্রামের লক্ষ্যই ছিলো ঠিক এইগুলিই।

পুরোহিত, পণ্ডিত, গ্ৰাম্য জমিদার, আমলা ইত্যাদি অনুচরসহ জার্মান স্বৈর সরকারগুলির কাছে আক্রমণোদ্যত বুর্জোয়া শ্রেণিকে ভয় দেখাবার চমৎকার জুজু হিসাবে তা কাজে লাগল।

ঠিক একই সময়ে এই সরকারগুলি জার্মান শ্রমিক শ্রেণির বিদ্ৰোহসমূহকে চাবুক ও গুলির যে তিক্ত ওষুধ গেলাচ্ছিল তার মধুরেণ সমাপয়েৎ হলো এতে।

এই ‘খাঁটি’ সমাজতন্ত্র এদিকে এইভাবে সরকারগুলির কাজে লাগছিলো জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়ার হাতিয়ার হিসাবে, আর সেইসঙ্গেই তা ছিলো প্রতিক্রিয়াশীল স্বাৰ্থ, জার্মানির কুপমণ্ডুকদের স্বার্থের প্রতিনিধি। জার্মানিতে প্রচলিত অবস্থার প্রকৃত সামাজিক ভিত্তি ছিলো পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি, ষোলো শতকের এই ভগ্নশেষটি তখন থেকে নানা মূর্তিতে বারবার আবির্ভূত হয়েছে।

এ শ্রেণিকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ হলো জার্মানির বর্তমান অবস্থাটাকেই জিইয়ে রাখা। বুর্জোয়া শ্রেণির শিল্পগত ও রাজনৈতিক আধিপত্যে এ শ্রেণির নির্ঘাত ধ্বংসের আশঙ্কা—একদিকে পুঁজি কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে, অপরদিকে বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের অভ্যুদয়ে। মনে হলো যেন এই দুই পাখিকে এক ঢিলেই মারতে পারবে ‘খাটি’ সমাজতন্ত্র। মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ল তা ।

জল্পনাকল্পনার মাকড়সার জালের পোশাক, তার উপর বাক্যালঙ্কারের নক্সী ফুল, অসুস্থ ভাবালুতার রসে সিক্ত এই যে স্বর্গীয় আচ্ছাদনে জার্মান সমাজতন্ত্রীরা তাদের অস্থিচর্মসার শোচনীয় ‘চিরন্তন সত্য’ দুটোকে সাজিয়ে দিল, তাতে এই ধরনের লোকসমাজে তাদের মালের অসম্ভব কাটতি বাড়ে।

কূপমণ্ডুক পেটি বুর্জোয়ার বাগাড়ম্বরী প্রতিনিধিত্বটাই তার কাজ, জার্মান সমাজতন্ত্র নিজের দিক থেকে তা ক্রমেই বেশি করে উপলব্ধি করতে থাকে।

তারা ঘোষণা করল যে জার্মান জাতি হলো আদর্শ জাতি, কূপমণ্ডুক জার্মান মধ্যবিত্তই হলো আদর্শ মানুষ। এই আদর্শ মানুষের প্রতিটি শয়তানী নীচতার এরা এক একটা গুঢ় মহত্তর সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যা দিলো, যা তার আসল প্রকৃতির ঠিক বিপরীত। এমন কি কমিউনিজমের পাশবিক ধ্বংসাত্মক’ ঝোঁকের প্রত্যক্ষ বিরুদ্ধতা ও সব ধরনের শ্রেণিসংগ্রাম সম্বন্ধে পরম ও নিরপেক্ষ অবজ্ঞা ঘোষণায় তার দ্বিধা হল না। আজকের দিনে (১৮৪৭) যত তথাকথিত সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট রচনা জার্মানিতে প্ৰচলিত, যৎসামান্য কয়েকটিকে বাদ দিলে তার সমস্তটাই এই কলুষিত ক্লান্তিকর সাহিত্যের পর্যায়ে পড়ে।[১]

টীকাঃ

১ ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের বিপ্লবী ঝড় এই সমগ্ৰ নোংরা ঝোঁকটাকে ঝোঁটিয়ে বিদায় দিয়ে, সমাজতন্ত্র নিয়ে আরও কিছু জল্পনার বাসনাটুকুও ঘুচিয়ে দিয়েছে এর প্রবক্তাদের। এই ঝোঁকের প্রধান প্রতিভূ ও ক্লাসিকাল প্রতিচ্ছবি হলেন কার্ল গ্র্যুন মহাশয়। (১৮৯০ খ্রীস্টাব্দের জার্মান সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

পড়ুন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের অংশ সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য এই লিংক থেকে

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের সূচিপত্রে যান এই লিংক থেকে

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top