Main Menu

প্রধান শত্রু নির্ণয়ের সমস্যা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি

যেসব বামপন্থি ও তাদের সমর্থক আওয়ামি লিগকে আক্রমণ না করে বা আওয়ামি লিগকে সহযোগিতা করে দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম এবং সামন্তবাদ দ্বারা উত্থিত, পুঁজিবাদ-পুষ্ট ও সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পালিত জামাতসহ অন্যান্য গোঁড়া ধর্মপন্থি দলগুলোকে উৎখাতের স্বপ্ন দেখছেন তারা আসলে শ্রেণি-সমন্বয়ের লাইনে আছেন এবং সুবিধাবাদকে উৎসাহিত করছেন। তারা দ্বান্দ্বিকঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং শ্রেণিসংগ্রাম থেকেও দূরে আছেন। তারা বিভিন্ন বস্তুর আলাদা আলাদা দ্বন্দ্বগুলো ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝতে চাচ্ছেন না।

দুটো বিষয় বোঝা যে কোনো বাম-সহানুভূতিশীল মানুষের জন্য জরুরি।

১. বাংলাদেশের সমাজে প্রধান শত্রু বুর্জোয়া একনায়কত্ব মানে আওয়ামি-বিএনপি; যদিও তারা সাম্রাজ্যবাদনির্ভর;

২. বিশ্বসমাজে প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদ;

ফলে বাংলাদেশের সমাজে যদি আওয়ামি-বিএনপিকে উৎখাতের কর্মসূচিকে প্রধান না করা হয় তবে তা সংশোধনবাদের খপ্পরে পড়বেই। একটু মাও সে-তুং-এর কাছে যাই, তিনি লিখেছেন

“কোনো প্রক্রিয়াতে যদি অনেকগুলো দ্বন্দ্ব থাকে তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই একটি প্রধান দ্বন্দ্ব থাকবে, যা নেতৃস্থানীয় ও নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ করবে, অন্যগুলো গৌণ ও অধীনস্থ স্থান নেবে। তাই দুই বা দুইয়ের বেশি দ্বন্দ্ববিশিষ্ট জটিল প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা করতে গেলে, আমাদের অবশ্যই তার প্রধান খুঁজে পাবার জন্য সর্ব প্রকারের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই প্রধান দ্বন্দ্বকে আঁকড়ে ধরলে সব সমস্যাকেই সহজে মীমাংসা করা যায়।”[১]

তাহলে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রিরা কাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবেন। অবশ্যই বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে এবং এই বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবেই রাজনীতি করছে আওয়ামি-বিএনপি-জামাত-জাপা। সমাজতন্ত্রিরা যদি জনগণের ভেতরকার দ্বন্দ্বগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন, সফলতা আসবে। ফলে মূল আঘাতটি আওয়ামি-বিএনপি-জামাতকেই করতে হবে।

একসময় বামপন্থিরা শ্লোগান দিত ধর্ম নিয়ে ব্যবসা বন্ধ কর, পরে দেখা গেল এদেশে শুধু ধর্ম নিয়ে ব্যবসা চলে না, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়েও দারুণ ব্যবসা করা যায়। মুক্তিযুদ্ধ শব্দটিও এখন অর্থহীনতায় পর্যবসিত এবং সেটিকে নানা অর্থনৈতিক ব্যাপারের সাথে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের সেই শ্রেণিযুদ্ধটিতে যারা জয়ী হয়েছিলো তারাই আজ দেশের সবচেয়ে সুবিধাভোগি শ্রেণি। এবং সেই যুদ্ধের দুর্বলতা থেকেই নির্মিত হয়েছে আজকের লুটেরা শ্রেণিটি। আর এই শ্রেণিটিকেই সেবা করে যাচ্ছে আওয়ামি-বিএনপি-জামাত-জাপার পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও রাজনীতি।

স্বাধীনতা মানে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক-কৃষকের স্বাধীনতা; তারা স্বাধীন হলে তো তাদের মৌলিক অধিকারসহ অন্য স্বাধীনতাগুলো থাকতো, ১৯৭১-এর আগেও শ্রমিক-কৃষক পরাধীন, এখনো পরাধীন, স্বাধীন হয়েছে আওয়ামি-বিএনপির শিল্পপতি কোটিপতিরা; সেটাও অর্থনৈতিকভাবে; রাজনৈতিকভাবে আওয়ামি-বিএনপি আমেরিকার দাসত্বই করে। এইরূপ পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রিদের আওয়ামি লিগের প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। বাংলাদেশে যেভাবে প্রগতিশীলতার নামে ইতিহাসের উল্টোদিক চলছে; সেই উলটো পথকে সোজা করে দিতে হবে।

২.

সমাজের সবচেয়ে পশ্চাতপদ অংশ হচ্ছে ধর্ম অনুসারী লোকজন আর সেই শ্রেণিটির প্রতিনিধি হয়ে রাজনীতি করছে ধর্মপন্থি দলগুলো; মার্কসবাদিরা সেই পশ্চাতপদ অংশটিকে এগিয়ে নিতে চায়। ফলে মার্কসবাদিদেরকে এসব পশ্চাতপদ অংশের মানুষকে সাথে নিয়ে রাজনীতি করতে হলে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদি দৃষ্টিতে ধর্মকে এবং তার সাথে বাংলাদেশের পরিবেশকে বিবেচনা করে এগোতে হবে। ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্যের নীতি অবলম্বন করে সমাজের সবচেয়ে পশ্চাতপদ অংশটিকে বস্তুবাদি শিক্ষায় শিক্ষিত করে এগোতে হবে; সমাজের সবচেয়ে পশ্চাতপদ দরিদ্র মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে কোনোভাবেই সামান্যতম আঘাত করে তাদের সাথে অনৈক্য সৃষ্টি করা উচিত নয়। লেনিনের নির্দেশমতো সমাজতন্ত্র ও ধর্ম সম্পর্কে ঐতিহাসিক বস্তুবাদি দৃষ্টিভংগি অবলম্বন করে এগোতে হবে।

কারণ শ্রেণিসংগ্রামি-সমাজতন্ত্রিরা যদি বুর্জোয়াদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তারা আর সঠিক লাইনে থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশে সংশোধনবাদী অংশটি বারবার বুর্জোয়াদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। সামরিক শাসকদের সরাতে বামপন্থি ও গণতান্ত্রিকদের ১৫ বছর অতিবাহিত হয়েছিলো। বুর্জোয়াদের সরাতে গিয়েও তাদের ২০ বছর পেরিয়ে গেলো; কিছুই করা সম্ভব হলও না। আওয়ামি-বিএনপির বুর্জোয়া একনায়কত্বকে সরাতে কত বছর লাগে তাই দেখেন?

তাহলে বাসদ-সিপিবির ১৮ ডিসেম্বর, ২০১২’র হরতালে ‘জামাত-শিবিরসহ সকল সাম্প্রদায়িক দল এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ’[২] করার যে দাবিটি প্রধান হয়েছে তা দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ না বোঝার ফলেই হয়েছে। সময় জ্ঞানে তাজরিন গার্মেণ্টসে শ্রমিক পুড়ানোর বিরুদ্ধে হরতাল অবশ্যই হতে পারতো, কিন্তু নেতারা ব্যাখ্যা দেবেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারও জনগণের বিশাল একটা অংশ চায়; যদিও সেই অংশটিকেও অনেকেই মধ্যবিত্ত বলেই অভিহিত করছেন। পরবর্তীতে ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সালে শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি দেখে সে আন্দোলনকে মধ্যবিত্তদের আন্দোলনরূপেই অভিহিত করা হয়েছে।

১৯২১ সাল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি অনেক কটি হরতাল পালন করেছে। হরতাল করাটা বড় কথা নয়। কাজ করাই বড় কথা নয়; কাজের ফল আওয়ামি লিগের ঘরে বা বিএনপির ঘরে যাতে না যায় সে বিষয়ে সচেতন থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লেনিনের একটি প্রবন্ধ আছে “কম করে, কিন্তু ভালো করে।”

তথ্যসূত্রঃ

১. মাও সেতুঙ; দ্বন্দ্ব সম্পর্কে; আগস্ট, ১৯৩৭

২. সিপিবি ও বাসদ প্রকাশিত ৭ ডিসেম্বর, ২০১২-তে প্রকাশিত হ্যান্ডবিল।

রচনাকাল, ২০ ডিসেম্বর, ২০১২

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *