Main Menu

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির স্বরূপ বিশ্লেষণ

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি (ইংরেজিতে: Socialist economics) বলতে সূত্রায়িত করা হয় প্রস্তাবিত এবং অস্তিত্বশীল সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার অর্থনীতিবিদ্যাগত তত্ত্ব, অনুশীলন এবং নিয়মসমূহকে। এটি শুরু হয় এই প্রত্যয় থেকে যে,

“ব্যক্তি একা বিচ্ছিন্নভাবে বাস বা কাজ করতে পারে না কিন্তু একে অপরের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে বাস করে। অধিকন্তু, যা জনগণ উৎপাদন করে তার সবকিছুই, কিছুটা জ্ঞানে হলেও, সামাজিক উৎপাদন এবং প্রত্যেকেরই, যারা একটি পণ্য উৎপাদনে অবদান রাখে, সেই পণ্যের একটি অংশে অধিকার থাকে। অতএব, মোটের উপর, সমাজের উচিত তার সদস্যদের উপকারের জন্য সম্পদের ওপর মালিকানা অথবা অন্ততপক্ষে নিয়ন্ত্রণ”।[১]

সমাজতন্ত্রের বুৎপত্তিগত ধারণা ছিলো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদন ছিলো এমন এক উপায়ে সংগঠিত যেখানে প্রত্যক্ষভাবে দ্রব্য এবং সেবা তাদের ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত হয়; এটিকে ধ্রুপদী এবং মার্কসবাদী অর্থনীতিতে ব্যবহার-মূল্য হিসেবে বলা হয়েছে। ফিন্যান্স হিসাব এবং পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক নিয়মের বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি সম্পদের প্রত্যক্ষ বণ্টনের একটি একক প্রতিষ্ঠা করে যা পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রণালীসমূহ যেমন ভাড়া, সুদ, মুনাফা, এবং টাকা উৎখাত করে।[২] একটি পূর্ণাঙ্গ বিকশিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে, উৎপাদন এবং ভারসাম্যের উপাদানগুলোকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলও উৎপাদনের উপায়ে সামাজিক মালিকানা।[৩]

বাজার সমাজতন্ত্র (Market socialism) হচ্ছে কয়েক ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতর একটি সাধারণ নাম। একদিকে, এতে বাজার কৌশলকে ব্যবহার করা হয় অর্থনৈতিক উৎপাদিত দ্রব্য বিতরণে, উৎপাদন বিন্যস্ত করতে এবং সরবরাহের বণ্টনে। অন্যদিকে, পুঁজির যৌথ, সর্বজনীন বা সামাজিক মালিকানার মাধ্যমে মুনাফা (economic surplus) পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত মালিকানার তুলনায় সমাজে স্বাভাবিক মুক্তভাবে বাড়ে।[৪]

বাজার সমাজতন্ত্রের বৈচিত্র্য অন্তর্ভুক্ত করে স্বাধীনতাবাদী (Libertarian) প্রস্তাবসমূহ যেমন ধ্রুপদী অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে পারস্পরিকবাদ (mutualism), এবং নয়া-অর্থনৈতিক মডেল যেমন লাং মডেল (Lange Model)।

অন্যদিকে সমাজতন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদী সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণের উপায়। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রে উৎপাদনের উপায়ের বা উপকরণের উপর মালিকানা হতে পারে উৎপাদিত সম্পদের ব্যবহারকারীদের প্রত্যক্ষ মালিকানার ভিত্তিতে এবং এটির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ থাকে শ্রমিক সমবায় বা সাধারণ মালিকানায় বা সর্বজনীন মালিকানায় (Public) অর্থাৎ সমাজের সাথে যুক্ত সেসব মানুষের উপর যারা উৎপাদনের উপকরণগুলি চালায় বা ব্যবহার করে। সর্বজনীন মালিকানা বলতে বোঝানো হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানার শিল্পোদ্যোগ, জাতীয়করণ, পৌরীকরণ অথবা স্বায়ত্বশাসিত যৌথ প্রতিষ্ঠানসমূহ। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সর্বজনীন মালিকানা ও শ্রমিক-চালিত প্রতিষ্ঠানসমূহ যেখানে দ্রব্য ও সেবা উৎপাদিত হয় অন্ততপক্ষে অর্থনীতির মাত্রাকে নির্দেশাবলীর মাধ্যমে।

কাজের স্থানে সর্বোচ্চ পেশাগত স্বায়ত্বশাসনের জন্য শক্তি-সম্পর্কের সাম্যের সাথে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যাবলীর উপর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ হয় স্ব-ব্যবস্থাপনা ও স্ব-পরিচালনার ভিত্তিতে। সংগঠনের একটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামো দূর করে নিয়ন্ত্রণের স্তরবিন্যাস, যদিও কাজের স্থানে কারিগরি জ্ঞানের ক্ষেত্রে স্তরবিন্যাস সাময়িকভাবে থাকে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রতিটি ব্যক্তির সিদ্ধান্ত তৈরির ক্ষমতা থাকে এবং তারা সেখানে মোটামুটি নীতি-নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সামর্থ্য রাখে। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কমিউনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে।[৫]

উৎপাদনের উপকরণের উপর সর্বজনীন মালিকানা প্রতিষ্ঠা মানসিক ও কায়িক শ্রমের পার্থক্য দূর করে। উৎপাদনের উপকরণসমূহ শ্রমজীবী জনগণের দক্ষতার মান নির্বিশেষে একত্রে সমস্ত শ্রমজীবী জনগণের সম্পত্তি, এই বিষয়টির নিহিতার্থ হলও শ্রমজীবী জনগণের সাম্য, কায়িক ও মানসিক শ্রম বা হাতের কাজ করা ও মস্তিষ্কের কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে বৈরি দ্বন্দ্বের বিলুপ্তি। পুঁজিবাদী সমাজে মস্তিষ্কের কাজ করা ব্যক্তিদের পুঁজিপতিরা ব্যবহার করে হাতের কাজ করা শ্রমিকদের শোষণ করার জন্য। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজের শ্রমজীবী ও মনীষীরা দুই মিত্র শ্রেণি যারা কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী স্তর নয়, তারা হলও একই রকমের সমাজতান্ত্রিক মেহনতি মানুষ এবং তারা ঐক্যবদ্ধ সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও মৌলিক স্বার্থসমূহের ঐক্যের দ্বারা। এছাড়া অন্যান্য সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভেদগুলো অবৈরি এবং এই অর্থনৈতিক প্রভেদগুলো বিলীন হতে থাকার সংগে সংগে সমগ্র সমাজতন্ত্রের সর্বজনীন মালিকানা পরিপক্ক হতে থাকে।[৬]

উৎপাদনের উপকরণের উপর সর্বজনীন মালিকানার ঐতিহাসিক সুফল এই যে, শ্রমজীবী জনগণ আর পুঁজিপতিদের জন্য কাজ করে না, একান্তভাবেই নিজেদের জন্য ও তাদের সমাজের জন্য কাজ করে। ফলে কাজের প্রতি তাদের মনোভাব পরিবর্তিত হয়, এবং কাজ এক নতুন অর্থপূর্ণ তাৎপর্যে প্রতিভাত হয়।[৭]

ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক সমাজের অর্থনীতিতে টাকার ব্যবহার ও ভূমিকা একটি বিতর্কিত প্রসঙ্গ। কার্ল মার্কস, রবার্ট ওয়েন, পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ এবং জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখ সমাজতন্ত্রীরা চিন্তা করেছেন নানা রকমের শ্রম-রসিদ, শ্রম-সম্মানী বিষয়ে, যেগুলো টাকার মতোই ভোগ্যদ্রব্য পেতে ব্যবহৃত হবে কিন্তু টাকার মতো পুঁজি হতে পারবে না বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভেতরে ভোগ্যদ্রব্য বণ্টনে ব্যবহৃত হবে না। এই শ্রম-রসিদ বা ভাউচারগুলো সম্পর্কে কার্ল মার্কস লিখেছেন,

“সামাজিকৃত উৎপাদনের বেলায় অর্থ-পুঁজি দূরীভূত হয়। উৎপাদনের বিভিন্ন শাখাকে সমাজ বণ্টন করে দেয় শ্রমশক্তি ও উৎপাদনের উপায়। উৎপাদকরা পেতে পারে বড় জোর কাগজী ভাউচার বা প্রমাণক, যেগুলি ভোগ্যপণ্যের সামাজিক যোগান থেকে তাদের শ্রম-সময়ের সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাণে সামগ্রী তুলে নেওয়ার অধিকার করবে। এই ভাউচারগুলো অর্থ নয়। সেগুলো সঞ্চালিত হয় না।”[৮]

লিওঁ ত্রতস্কিও যুক্তি করেছেন যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরপরই টাকাকে স্বেচ্ছাচারিভাবে বিলুপ্ত করা যেতে পারে না। তিনি বলেন, ‘টাকা সুখ আনতে অক্ষম হয়ে বা মানুষকে ধূলায় দলিত করেই, এটি রূপান্তরিত হতে পারে শুধুমাত্র পরিসংখ্যানবিদের সুবিধাজনক মোটা বইয়ের রসিদের জন্য এবং পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে। দূর ভবিষ্যতে, এই রসিদসমূহও প্রয়োজন হবে না’।[৯]

এই প্রসঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের মতামতটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন,

“আমার মতে, বর্তমান কালের সংকটের মূলে রয়েছে পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক নৈরাজ্য। … … আমি নিশ্চিত, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এই মন্দ দিকগুলো দূর করা যেতে পারে; সেইসংগে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার যার উদ্দেশ্য হবে একটি সামাজিক লক্ষ্য স্থির করা। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণের মালিকানায় থাকবে সমাজ এবং উৎপাদনের ফল পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার হবে। একটি পরিকল্পিত অর্থনীতি, যেটি সমাজের প্রয়োজনের জন্য উৎপাদনের সমন্বয় করবে, প্রত্যেক সমর্থ ব্যক্তির কর্মকে সমভাবে বিতরণ করবে এবং পুরুষ-নারী ও শিশু নির্বিশেষে জীবনধারণের উপায় সুনিশ্চিত করবে। সহজাত উৎকর্ষতা এবং সামর্থ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যক্তির শিক্ষা তার সামাজিক দায়বোধের চিন্তাভাবনা জাগাবে। বর্তমানে যে ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও সাফল্যের সোপান হিসেবে শিক্ষাকে তুলে ধরা হয়, উল্লেখিত ব্যবস্থা হবে তার বিপরীত।[১০]

অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাস্তব সমাজতন্ত্র আবির্ভূত হয় উৎপাদনের সমাজতান্ত্রিক প্রণালী হিসেবে। তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলও উৎপাদনের উপায় গোটা সমাজের সম্পত্তি। উৎপাদনী উপায়ের সামাজিকীকরণের ভিত্তিতে বিলুপ্ত হয় তাদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা, বিলুপ্ত হয় মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণ। শ্রমশক্তি আর পণ্য হয়ে থাকে না। উৎপাদনের উপায়ের সংগে সমাজের প্রতিটি সদস্যের সম্পর্ক একইরকম। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে উৎপাদনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিমালিকের মুনাফা লোটা নয়, সমাজের সকল সদস্যের বৈষয়িক ও আত্মিক চাহিদার পূরণ। এই বৈষয়িক চাহিদার পূরণ হবে স্বভাবতই উৎপাদনী শক্তির অর্জিত মানের পরিসীমায় এবং সকল সদস্যকে তা মেনে সাময়িকভাবে নিতে হবে। ব্যক্তিগত মালিকানা না থাকার ফলে সকল প্রকারের ঘুষ দুর্নীতিসহ সামাজিক অনাচার দূরীভূত হয়। উৎপাদন চলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা অনুসারে। সমাজতন্ত্রে চালু হয় সকলের পক্ষে শ্রমের সমান বাধ্যতা অর্থাৎ সমস্ত মেহনতির কাছে শ্রম হবে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। সমাজতন্ত্রে উৎপাদনের পণ্যরূপ চরিত্র বজায় থাকলেও এ সমাজে পণ্য উৎপাদন মুনাফার জন্যে করা হবে না এবং পণ্যের কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা থাকবে না। পণ্যের উৎপাদক হচ্ছে যৌথভাবে শ্রমিকগণ, ফলে এখানে শ্রমশক্তি আর পণ্য থাকবে না এবং থাকবে না কোনো মজুরি-শ্রম প্রথা। মজুরি-শ্রম প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার ফলে উৎপাদনের ফল বণ্টিত হবে শ্রম অনুসারে। কার্ল মার্কস সমাজতান্ত্রিক রূপের বণ্টন নীতি প্রসঙ্গে লিখেছেন,

“প্রথমে, শ্রমোৎপন্ন এই অর্থে ‘শ্রমফল’ কথাটি ধরা যাক, তাহলে সমবায়িক শ্রমফল হলো সামগ্রিক সামাজিক উপন্ন

তার থেকে এখন বাদ দিতে হবে:

প্রথমত, উৎপাদন-উপায়ের যেটুকু ব্যবহারে ক্ষয় পেল তার পূর্তির জন্য একটা অংশ।

দ্বিতীয়ত, উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য আরো একটা অংশ।

তৃতীয়ত, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত ব্যাঘাত ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে মজুত বা বীমা তহবিল।

‘অটুট পরিমাণ শ্রমফল’ থেকে এগুলো বাদ দেয়া অর্থনৈতিক দিক থেকে আবশ্যিক, এবং লভ্য উপায় ও বল অনুযায়ী এবং কিছুটা সম্ভাব্যতার হিসাব কষে এগুলোর পরিমাণ নির্ধারিত হবে; কিন্তু ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি দিয়ে কোনোক্রমেই এর হিসাব করা যায় না।

বাকি থাকে সামগ্রিক উৎপন্নের অপর অংশ, ভোগের উপকরণে যা ব্যবহার্য।

এই অংশটিকে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে দেবার আগে এর থেকে ফের বাদ দিতে হবে:

প্রথমত, উৎপাদনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন সব সাধারণ প্রশাসনিক খরচ।

বর্তমান সমাজের তুলনায় এই ভাগটি গোড়া থেকেই বেশ খানিকটা সংকুচিত হবে এবং নতুন সমাজের বিকাশের সংগে সংগে আরও কমতে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রয়োজন সর্বজনীনভাবে মেটাবার জন্য নির্দিষ্ট অংশ।

বর্তমান সমাজের তুলনায় এই অংশ গোড়া থেকেই বেশ খানিকটা বেড়ে যাবে এবং নতুন সমাজের বিকাশের সংগে সংগে আরও বাড়তে থাকবে।

তৃতীয়ত, অকর্মণ্য (unable to work) প্রভৃতিদের জন্য, এককথায় আজকালকার তথাকথিত সরকারি দরিদ্র-ত্রাণের মধ্যে যা পড়ে তার জন্য তহবিল। … …

ইতিমধ্যে, ‘অটুট পরিমাণে শ্রমফল’ অলক্ষ্যে ‘হ্রাসপ্রাপ্ত’ ফলে পরিণত হয়ে গেছে। অবশ্য, স্বতন্ত্র ব্যক্তিরূপে উৎপাদক যে অংশ থেকে বঞ্চিত হয়, সমাজের একজন সদস্য হিসেবে সে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে তারই থেকে উপকার পায়।

‘অটুট পরিমাণে শ্রমফল’ কথাটি যেভাবে অদৃশ্য হয়েছে এবার ‘শ্রমফল’ কথাটিও তেমনি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।”[১১]

উপরের কথাগুলোর সাধারণ অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী যা উৎপাদন করে তা থেকে সে কিছু কম পাবে। এই কম পাবার কারণ কিন্তু তাকে শোষণ করা নয় বা সে এর ফলে শোষিত হচ্ছে না, বরং এর চেয়ে কম পাবার কারণ সমাজের সদস্য হিসেবে সে যেসব উপকার ও সেবা পাচ্ছে তা তার পূর্বে কৃত শ্রমফল থেকে বাদ দেয়া বা কেটে নেয়া অংশ। কার্ল মার্কস আরও দেখিয়েছেন,

“উৎপাদন-উপায়ের উপর সাধারণ মালিকানার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমবায়ী সমাজের মধ্যে উৎপাদকেরা তাদের উৎপন্নের বিনিময় করে না; ঠিক তেমনি, উৎপন্নে নিয়োজিত শ্রমও এখানে সেই উৎপন্নের মূল্যরূপে, তার এক বৈষয়িক গুণরূপে দেখা দেয় না, কেননা পুঁজিবাদী সমাজের বিপরীতে এখানে ব্যক্তিগত শ্রম আর পরোক্ষ নয়, থাকছে প্রত্যক্ষভাবে সমগ্র শ্রমের অঙ্গাঙ্গী অংশরূপে।”[১১]

কাজ অনুযায়ী বণ্টন হলো সমাজতন্ত্রের এক আত্মগত প্রয়োজনীয়তা, এক অর্থনৈতিক নিয়ম। এর অর্থ হচ্ছে এই যে শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে বৈষয়িক মূল্য বণ্টনের সময়ে সমাজকে কাজের পরিমাণ, মেয়াদ ও নিবিড়তা, তার গুণগত উৎকর্ষ, মেহনতি মানুষটির দক্ষতা ও উৎপাদন বিষয়ক অভিজ্ঞতা, এবং সমাজের জন্য বিভিন্ন মূর্ত-নির্দিষ্ট ধরনের কাজের গুরুত্ব গণ্য করতে হবে। সমাজতন্ত্রে বণ্টন জাতি, বর্ণ, বয়স, নারী-পুরুষ প্রভৃতির সম্ভাবনাকে বাতিল করে। সমাজতন্ত্রে বণ্টনে পার্থক্যকরণের প্রয়োজন পড়ে যাতে প্রতিটি মেহনতি মানুষ সামাজিক উৎপাদনে তার শ্রম অবদান অনুযায়ী উৎপাদিত দ্রব্যের একটা ভাগ পায়। প্রতিটি মেহনতি মানুষের কাজের পরিমাপ ও ভোগের পরিমাপের উপরে সমাজের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাও এই জন্যই দেখা দেয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে বণ্টন প্রসঙ্গে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস লিখেছেন,

“প্রত্যেক শ্রমিক ব্যক্তিগতভাবে ‘তার শ্রমের পুরো ফলের’ অধিকারী হবে_ এরকম অর্থ নয়, কথাটার তাৎপর্য একমাত্র এই হতে পারে যে সকলেই, শ্রমিক নিয়ে গঠিত সমাজই সমগ্রভাবে মালিক হবে তাদের সকলের শ্রমের সামগ্রিক উৎপন্নের। এই মোট উৎপন্নের একাংশ সমাজ বণ্টন করবে সদস্যদের ভোগের জন্য ও আরেক অংশ ব্যবহৃত করবে উৎপাদনের উপায়ের ক্ষয়ক্ষতিপূরণ ও সম্প্রসারণের কাজে; অবশিষ্ট অংশটা থাকবে উৎপাদন ও ভোগের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ভাণ্ডার হিসাবে।”[১২]

কাজ অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হলও শ্রমজীবী জনগণ ও সমাজের মধ্যকার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক যেটি সামাজিক কাজে ও ভোগ তহবিলে প্রত্যেক ব্যক্তির অংশের মূল্যায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট। উৎপাদিত দ্রব্যের বণ্টনে ব্যক্তির ভাগটা নির্ভর করে, প্রথমত তার শ্রম প্রদানের পরিমাণ ও গুণের উপরে, দ্বিতীয়ত, সমাজের মোট সহায় সম্পদের আয়তনের উপরে। কাজ অনুযায়ী বণ্টন অনর্জিত আয় ও পরজীবীসুলভ ভোগের সম্ভাবনা বাতিল করে। কাজ অনুযায়ী বণ্টন ব্যক্তিগত ভোগের মাত্রাগুলো নির্ধারণ করে এবং সক্রিয় প্রতিদানের বৃদ্ধি ঘটায়। বণ্টনের সেই দিকটির কথা উল্লেখ করে লেনিন লিখেছেন যে ‘বণ্টন হলও উৎপাদন বাড়ানোর একটা পদ্ধতি, একটা হাতিয়ার ও একটা উপায়’।[১৩] কাজ অনুযায়ী বণ্টন সমস্ত সক্ষমদেহ নাগরিককে সামাজিক উৎপাদনের মধ্যে টেনে আনে এবং কাজ করার সর্বজনীন কর্তব্যকে সুদৃঢ় করে, প্রয়োজন অনুযায়ী কমিউনিস্ট বণ্টনে উত্তরণের পূর্বশর্ত সৃষ্টিতে সাহায্য করে।[১৪]

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থ:

১. Socialism at Encyclopedia Britannica.

২. Bockman, Johanna (2011). Markets in the name of Socialism: The Left-Wing origins of Neoliberalism. Stanford University Press. p. 20. ISBN 978-0-8047-7566-3.

৩. খারিস সাবিরভ, কমিউনিজম কী, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-২৭১।

৪. O’Hara, Phillip (September 2003). Encyclopedia of Political Economy, Volume 2. Routledge. p. 70. ISBN 0-415-24187-1.

৫. The Political Economy of Socialism, by Horvat, Branko. 1982. (p. 197)

৬. আরো দেখুন, খারিস সাবিরভ, কমিউনিজম কী, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-২৫১-৫৩।

৭. এম আর চৌধুরী, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন প্রক্রিয়া, উত্তর কমলাপুর, ঢাকা; পৃষ্ঠা- ৯৯।

৮. কার্ল মার্কস, পুঁজি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৬২।

৯. Leon Trotsky – The Revolution Betrayed. 1936 Full Text. Chapter 4.

১০. Albert Einstein, Why Socialism?, 1949.

১১. কার্ল মার্কস, গোথা কর্মসূচির সমালোচনা

১২. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, বাসস্থান সমস্যা

১৩. V.I. Lenin, Speech Delivered at the third all Russia Food Conference, June 16, 1921, Collected works, Vol. 32 Moscow, 1977, p 448

১৪. আরও দেখুন, ম সুভরভা ও ব. রমানভ, সম্পত্তি মালিকানা কি, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১০০-১০৯। প্রবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] রচিত ভাষাপ্রকাশ ঢাকা থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত সমাজতন্ত্র বইয়ের ৪৮-৫৬ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে এবং রোদ্দুরেতে প্রকাশ করা হলো।

রচনাকালঃ আগস্ট ২০১৪।

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *