আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > সমাজতন্ত্র > কল্পলৌকিক ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র

কল্পলৌকিক ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র

১. একদিকে আজকের সমাজের ভেতরে মালিক ও অ-মালিক, পুঁজিপতি ও মজুরি শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণি-বৈর, এবং অন্যদিকে উৎপাদনের মধ্যকার নৈরাজ্য — মূলত এরই স্বীকৃতির প্রত্যক্ষ পরিণতি হলো আধুনিক সমাজতন্ত্র। কিন্তু তত্ত্বগত আকারে আধুনিক সমাজতন্ত্রের প্রকাশ্য উদয় অষ্টাদশ শতকের মহান ফরাসি দার্শনিকদের বর্ণিত নীতির অধিকতর যুক্তিনিষ্ঠ সম্প্রসারণরূপে। বাস্তব অর্থনৈতিক ঘটনার যতই গভীরে তার মূল নিহিত থাক না কেন, প্রতিটি নতুন তত্ত্বের মতো আধুনিক সমাজতন্ত্রকেও মত হাতে পাওয়া পূর্ব প্রস্তুত বুদ্ধিমার্গীয় মালমসলার সঙ্গে সংযুক্ত হতে হয়েছিল।

ফরাসি দেশে যে মহামানবেরা আসন্ন বিপ্লবের জন্যে মানুষের মন তৈরি করে গেছেন তাঁরা নিজেরাও ছিলেন চরম বিপ্লবী। বাইরেকার কোন প্রামাণিকতা তাঁরা স্বীকার করেননি। ধর্ম, প্রকৃতিবিজ্ঞান, সমাজ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কঠোরতম সমালোচনার লক্ষ্য হয় সবকিছু; যুক্তির বিচারবেদীর সম্মুখে সবকিছুকেই তার অস্তিত্বের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে হবে নতুবা অন্তর্হিত হতে হবে। সবকিছুর একমাত্র মাপকাঠি হলো যুক্তি। হেগেল বলেন, সে সময় বিশ্ব দাঁড়িয়েছিল তার মাথার ওপর প্রথমত এই অর্থে যে, মনুষ্য মস্তিষ্ক, মস্তিষ্কের চিন্তাপ্রসূত ধারণাগুলিই সর্ববিধ মানবিক কর্ম ও সামাজিক সর্ম্পকের ভিত্তি বলে নিজেদের দাবি করে; কিন্তু ক্রমশ এই ব্যাপকতর অর্থেও যে, যে বাস্তবের সঙ্গে এই নীতি মিলত না সে বাস্তবকে প্রকৃতপক্ষে উল্টে দেওয়া হয়। তদানীন্তন সব ধরনের সমাজ ও সরকারকে, প্রতিটি প্রাচীন ঐতিহ্যগত ধারণাকে অযৌক্তিক বলে নিক্ষেপ করা হয় আস্তাকুঁড়ে। বিশ্ব এযাবৎ কেবল কুসংস্কারের দ্বারা চালিত হয়ে এসেছে; যা কিছু অতীত তা সবকিছু কেবল অনুকম্পা ও ঘৃণার যোগ্য। এখন এই প্রথম দেখা দিল দিনের আলো, যুক্তির রাজদণ্ড; এখন থেকে কুসংস্কার, অবিচার, বিশেষাধিকার, নিপীড়নের জায়গা থেকে শাশ্বত সত্য, শাশ্বত অধিকার, স্বয়ং প্রকৃতির নিয়মজাত সাম্য এবং মানবের অলঙ্ঘনীয় অধিকার।
এখন আমরা জানি, যুক্তির এই রাজত্বটা বুর্জোয়ার আদর্শায়িত রাজ্য ছাড়া বেশি কিছু নয়; জানি যে এই শাশ্বত অধিকার রূপায়ন লাভ করেছে বুর্জোয়া ন্যায়ে; সাম্য পরিণত হয়েছে আইনের চোখে বুর্জোয়া সমানাধিকার; বুর্জোয়া সম্পত্তি ঘোষিত হয়েছে মানুষের একটি মৌলিক অধিকার হিসাবে; এবং যুক্তির শাসন ‘রুশোর’ সামাজিক চুক্তি বাস্তব হয়েছে এবং বাস্তব হওয়াই সম্ভব কেবল একটা গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র রূপে। অষ্টাদশ শতকের মহামনীষীদের পক্ষে তাদের পূর্বতনদের মতোই স্বীয় যুগের সীমা অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

কিন্তু সামন্ত অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গে যে বার্গাররা (বুর্জোয়া) অবশিষ্ট সমাজের প্রতিনিধিত্ব দাবি করছিল তাদের বৈরিতার পাশাপাশি ছিল শোষক ও শোষিত, নিষ্কর্মা ধনী ও গরিব মজুরদের সাধারণ বৈরিতা। এই পরিস্থিতি ছিল বলেই বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিরা শুধু একটা বিশেষ শ্রেণি নয়, সমগ্র নিপীড়িত মানবের প্রতিনিধিরূপে নিজেদের জাহির করতে সমর্থ হয়। অপিচ জন্ম থেকেই বুর্জোয়ারা তার বিপরীত দ্বারা ভারাক্রান্ত: মজুরি খাটা শ্রমিক ছাড়া পুঁজিপতিদের অস্তিত্ব অসম্ভব, এবং গিল্ডের মধ্যযুগীয় বার্গার যে পরিমাণ আধুনিক বুর্জোয়ারূপে বিকশিত হয় সেই পরিমাণেই গিল্ডের কর্মী এবং গিল্ডের বাইরেকার দিনমজুররা পরিণত হয় প্রলেতারিয়েতে। এবং অভিজাতদের সঙ্গে সংগ্রামে বুর্জোয়ারা যুগপৎ সে-কালের বিভিন্ন মেহনতি শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব মোটের ওপর দাবি করতে পারলেও বড়ো বড়ো প্রত্যেকটা বুর্জোয়া আন্দোলনেই স্বাধীন বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই শ্রেণিটির যারা বর্তমান প্রলেতারিয়েতের কমবেশি পরিণত পুরোধা। দৃষ্টান্তস্বরূপ, জার্মান রিফর্মেশন ও কৃষক যুদ্ধের কালে আনাব্যাপটিস্টরা ও টমাস ম্যুনৎসার, মহান ইংরেজ বিপ্লবে লেভেলাররা, মহান ফরাসি বিপ্লবে বাবোফে।

তখনো অপরিণত একটা শ্রেণির এই সব বিপ্লবী অভ্যুত্থানের প্রতিসঙ্গী তাত্ত্বিক প্রতিজ্ঞাও ছিল; ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে আদর্শ সামাজিক ব্যবস্থার ইউটোপীয় ছবি; অষ্টাদশ শতকে সত্যিকারের কমিউনিস্ট সুলভ তত্ত্ব (মরেলি ও মাব্লি)। সাম্যের দাবিটা আর শুধু রাজনৈতিক অধিকারে সীমাবদ্ধ রইল না, তা প্রসারিত হয়ে গেল ব্যক্তির সামাজিক অবস্থার ক্ষেত্রেও। শুধু শ্রেণিগত বিশেষাধিকারের উচ্ছেদের কথা নয়, শ্রেণিভেদেরই অবসান। জীবনের সবকিছু উপভোগ বর্জন করে যোগীসূলভ একধরনের স্পার্টান কমিউনিজম হল এই নতুন মতবাদের প্রথম রূপ। এরপর এলেন তিনজন মহান ইউটোপীয় : সাঁ-সিমোঁ, তাঁর কাছে প্রলেতারীয় আন্দোলনের পাশাপাশি মধ্যশ্রেণির আন্দোলনেরও একটা তাৎপর্য ছিল; ফুরিয়ে এবং ওয়েন- ইনি সেই দেশের লোক যেখানে পুঁজিবাদী উৎপাদন সবচেয়ে বিকশিত, তদুদ্ভূত বৈরিতার প্রভাবে ইনি ফরাসি বস্তুবাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রেখে ধারাবাহিকভাবে শ্রেণিভেদ দূর করার জন্যে তাঁর প্রস্তাব প্রণয়ন করেন।

একটা ব্যাপারে তিনেতেই সমান। ঐতিহাসিক বিকাশ ইতিমধ্যে যে প্রলেতারিয়েতের সৃষ্টি করেছে সেই প্রলেতারিয়েতের স্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে এঁরা কেউ দেখা দেননি। একটা বিশেষ শ্রেণির মুক্তি দিয়ে শুরু না করে ফরাসি দার্শনিকদের মতো তাঁরা সমগ্র মানবেরই মুক্তি দাবি করেন। তাঁদের মতোই এঁদেরও অভিলাষ যুক্তি ও শাশ্বত ন্যায়ের রাজত্ব স্থাপন, কিন্তু তাঁদের রাজত্ব ফরাসি দার্শনিকদের থেকে ততটা দূরে যতটা সুদূর মর্ত্য থেকে স্বর্গ।

কেননা আমাদের এই তিন সংস্কারবাদের কাছে, ফরাসি দার্শনিকদের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত বুর্জোয়া জগতটাও সমান অযৌক্তিক ও অন্যায্য এবং সেই কারণে সামন্ততন্ত্র তথা সমাজের পূর্বতন স্তরগুলির মতোই সত্তর আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপণীয়। বিশুদ্ধ যুক্তি এবং ন্যায় যদি এযাবৎ দুনিয়াকে শাসন না করে থাকে, তবে তার একমাত্র কারণ, মানুষ তা সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। দরকার ছিল শুধু এক প্রতিভাধর ব্যক্তির — এবার তার অভ্যুদয় ঘটেছে, সত্য তার করায়ত্ত। এখন যে তার অভ্যুদয় ঘটলো, সত্য যে এখনই পরিষ্কার করে বোঝা গেল, সেটা ঐতিহাসিক বিকাশের গ্রন্থি বেয়ে আসা এক অনিবার্য ব্যাপার নয়, নিতান্তই এক শুভ দৈবঘটনা। পাঁচশ বছর আগেও তার এ অভ্যুদয় ঘটতে পারতো এবং সে ক্ষেত্রে মানব সমাজকে পাঁচশ বছরের ভ্রান্তি, সংঘর্ষ ও ক্লেসে ভুগতে হতো না।

আমরা দেখেছি বিপ্লবের পুরোগামী, অষ্টাদশ শতকের ফরাসি দার্শনিকেরা বিদ্যমান সবকিছুরই বিচারক বলে হাজির করে যুক্তিকে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে এমন একটা যুক্তিসিদ্ধ সরকার, যুক্তিসিদ্ধ সমাজ; শাশ্বত যুক্তির যা কিছু পরিপন্থী তা সবকিছুকেই নির্মমভাবে বিলোপ করতে হবে। এও দেখেছি যে, আসলে যে অষ্টাদশ শতকের বার্গাররা ঠিক সেই সময়টায় বুর্জোয়া হয়ে উঠেছিল তারই আদর্শায়িত বোধ ছাড়া এ শাশ্বত যুক্তি আর কিছুই নয়। ফরাসি বিপ্লবে এই যুক্তিসিদ্ধ সমাজ ও সরকার বাস্তব হয়।

কিন্তু নতুন ব্যবস্থা আগেকার অবস্থার তুলনায় যথেষ্ট যুক্তিনিষ্ঠ হলেও মোটেই পুরোপুরি যুক্তিসিদ্ধ হয়ে উঠলো না। যুক্তিভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ পতন হলো। রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ বাস্তব রূপ পেল সন্ত্রাসের শাসনে। নিজস্ব রাজনৈতিক সামর্থ্যে বুর্জোয়ারা বিশ্বাস হারিয়ে বসেছিল, তারা এ থেকে নিস্তার খুঁজলো প্রথমে ডিরেক্টরেটের দুর্নীতিপরায়ণাতায় এবং শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নীয় স্বৈরাচারের পক্ষপুটে। প্রতিশ্রুত শাশ্বত শান্তি পরিণত হলো এক দিগ্বিজয়ের অবিরাম যুদ্ধে। যুক্তিভিত্তিক সমাজের হালও এ থেকে ভাল হলো না। এক সাধারণ সম্পন্নতা সৃষ্টি হয়ে ধনী দরিদ্রের বিরোধ মিটে যাওয়ার বদলে তা তীব্রতর হয়ে উঠলো গিল্ড প্রভৃতি সুবিধার অপসারণে- এগুলির ফলে এ বিরোধ খানিকটা চাপা ছিল,- এবং গির্জার দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলির বিলোপে। সামন্ততান্ত্রিক বন্ধন থেকে সম্পত্তির স্বাধীনতা অধুনা সত্যই অর্জিত হল এবং ক্ষুদে পুঁজিপতি ও ক্ষুদে কৃষক মালিকদের পক্ষে তা হয়ে দাঁড়াল বৃহৎ পুঁজিপতি ও জমিদারদের বিপুল প্রতিযোগিতায় নিষ্পিষ্ট হয়ে এইসব মহাপ্রভুদের নিকট নিজ নিজ ক্ষুদে সম্পত্তি বিক্রয়ের স্বাধীনতা এবং এইভাবে ক্ষুদে পুঁজিপতি ও কৃষক মালিকদের দিক থেকে, তা হলো সম্পত্তি থেকে স্বাধীনতা। পুঁজিবাদী ভিত্তিতে শিল্পের বিকাশের ফলে মেহনতি জনগণের দারিদ্র্য ও ক্লেসই হলো সমাজের অস্তিত্বের শর্ত। নগদ টাকা ক্রমশই হয়ে দাঁড়ালো, কার্লাইলের বক্তব্য অনুসারে, মানুষে মানুষে একমাত্র সম্পর্ক। বছরে বছরে বেড়ে উঠলো অপরাধের সংখ্যা। আগে সামন্ত পাপকর্মগুলো প্রকাশ্য দিবালোকে খোলাখুলিই হেঁটে বেড়াতো, এখন তারা উৎপাটিত না হলেও অন্তত পক্ষে পেছনে সরে গিয়েছিল। তার জায়গায় এযাবৎ গোপনে অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে সেই বুর্জোয়া পাপ আরও সতেজে পল্লবিত হয়ে উঠতে লাগলো। ব্যবসা ক্রমশ হয়ে দাঁড়ালো প্রবঞ্চনা। বিপ্লবী সূত্রবাণীর সৌভ্রাত্র্য বাস্তবে রূপায়িত হলো প্রতিযোগিতা সংগ্রামের বুজরুকি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। জবরদস্তি করে নিপীড়নের যায়গায় এলো দুর্নীতি, সমাজ চালাবার প্রথম কারিকা হিসাবে তরবারির জায়গা নিল সোনা। প্রথম রাত্রির অধিকার সামন্ত ভূস্বামীদের হাত থেকে বুর্জোয়া কলওয়ালাদের হাতে। গণিকাবৃত্তির বৃদ্ধি ঘটলো অভূতপূর্ব রকমের। বিবাহ ব্যাপারটাও আগের মতোই গণিকাচারের আইনসঙ্গত একটা রূপ; সরকারি একটা আবরণ হয়েই রইল এবং তদুপরি, তার সঙ্গে যুক্ত হলো একটা অঢেল ব্যভিচারের স্রোতে।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্রের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ধারনার উদ্ভব,

সংক্ষেপে দার্শনিকদের চমৎকার সব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মেলালে যুক্তির বিজয় থেকে উদ্ভূত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি হলো তীব্র নৈরাশ্যকর ব্যঙ্গস্বরূপ। অভাব ছিল শুধুমাত্র সেই নৈরাশ্যকে সূত্রবদ্ধ করার মতো মানুষের এবং তারা দেখা দিল শতাব্দীর পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। ১৮০২ সালে দেখা দিল সাঁ-সিমোঁর ‘জেনেভা পত্রাবলি’, ১৮০৮ সালে প্রকাশিত হলো ফুরিয়ের প্রথম রচনা যদিও তাঁর তত্ত্বের বনিয়াদ গড়ে ওঠে ১৭৯৯ সালেই; ১৮০০ সালের ১লা জানুয়ারি রবার্ট ওয়েন নিউ ল্যানার্কের পরিচালনা গ্রহণ করেন।

এই সময়ে কিন্তু উৎপাদনের পুঁজিবাদী ধরন এবং সেই সঙ্গে বুর্জোয়া প্রলেতারিয়েত বৈরিতা তখনও বেশ অপরিণত। আধুনিক শিল্প সদ্য ইংল্যান্ডে শুরু হয়েছে, ফ্রান্সে তা তখনও অজানা। কিন্তু আধুনিক শিল্প একদিকে বাড়িয়ে তোলে এমনসব সংঘাত যাতে উৎপাদনের ধরনে একটা বিপ্লব তার পুঁজিবাদী চরিত্রের বিলোপ অনিবার্য হয়ে পড়ে- আর এ সংঘাত কেবল তৎসৃষ্ট শ্রেণিগুলির মধ্যেই নয়, তৎসৃষ্ট উৎপাদন শক্তি ও বিনিময় রূপের মধ্যেও- এবং অন্যদিকে, এই অতিকায় উৎপাদন শক্তির অভ্যন্তরেই তা বিকশিত করে তোলে এ সংঘাতগুলির অবসানের উপায়। সুতরাং ১৮০০ সাল নাগাদ নতুন সমাজব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত সংঘাতগুলি যদি সদ্য আকার নিতে শুরু করে থাকে, তাহলে সে সংঘাত অবসানের উপায়ের ক্ষেত্রে একথা আরও বেশি প্রযোজ্য। সন্ত্রাসের শাসনকালে প্যারিসের সর্বহারা জনগণ মুহূর্তের জন্য প্রভুত্ব পেয়েছিল এবং তার ফলে বুর্জোয়ার বিরুদ্ধেই বুর্জোয়া বিপ্লবকে তারা বিজয়ী করে দেয়। কিন্তু তাই করতে গিয়ে তারা শুধু এই প্রমাণ করে যে, তদানীন্তন অবস্থায় তাদের আধিপত্য টিকে থাকা ছিল কী অসম্ভব। এই সর্বহারা জনগণ থেকে নতুন একটি শ্রেণির কোষ-কেন্দ্র রূপে তখন সেই প্রথম যারা বিবর্তিত হয়ে উঠেছে সেই প্রলেতারিয়েত তখনও স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মে অক্ষম, তারা দেখা দিয়েছে একটা নিপীড়িত দুঃখী সম্প্রদায় হিসাবে, আত্ম সাহায্যে অক্ষম এই সম্প্রদায়কে যদি সাহায্য পেতে হয় তবে সে সাহায্য আসতে পারে বড়ো জোর বাইরে থেকে, নতুবা উপর থেকে।

এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির অধীনস্থ হন সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতারাও। পুঁজিবাদী উৎপাদনের অপরিণত অবস্থা ও অপরিণত শ্রেণি পরিস্থিতির প্রতিসঙ্গী হল অপরিণত তত্ত্ব। অবিকশিত অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে যা তখনও সুপ্ত তেমন সব সামাজিক সমস্যার সমাধান ইউটোপীয়রা বার করতে চাইল মাথা থেকে। সমাজ ছেয়ে গেছে কেবল অন্যায়ে, তা দূরীকরণের দায় যুক্তির। সুতরাং দরকার হলো একটা নতুন আরও নিখুঁত সমাজব্যবস্থা আবিষ্কার করে তা বাইরে থেকে প্রচারের জোরে এবং যে ক্ষেত্রে সম্ভব সে ক্ষেত্রে আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেও সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এই নতুন সমাজব্যবস্থাগুলি ইউটোপীয় হতে বাধ্য; যতই সবিস্তারে তাদের পরিপূর্ণ করে রচনা হতে লাগলো ততই বিশুদ্ধ উৎকল্পনায় ভেসে না গিয়ে তাদের উপায় রইল না।

এই কথাগুলো একবার প্রতিষ্ঠার পর প্রশ্নটার এই দিকটা নিয়ে আর কালক্ষেপণের প্রয়োজন নেই- এ এখন সবই অতীতের বিষয়। সে কাজ আমরা ছেড়ে দিতে পারি ক্ষুদে সাহিত্যিকদের জন্যে- এই যে সব উৎকল্পনায় আজ আমাদের মাত্র হাসি পায়, তার ওপর স্বগাম্ভীর্যে ঠোকর মেরে এরূপ পাগলামির তুলনায় নিজেদের পাকাবুদ্ধির উৎসর্গ নিয়ে এঁরা কাকলি করুন। আমাদের আনন্দ বরং সেই সব মহামহীয়ান ভাবনা ও ভাবনার বীজ নিয়ে যা তাদের উৎকল্পী খোলস থেকে সর্বত্রই ফেটে বেরিয়েছে এবং যার প্রতি এই কূপমণ্ডূকেরা অন্ধ।

সাঁ-সিমোঁ মহান ফরাসি বিপ্লবের সন্তান, এ বিপ্লব যখন শুরু হয় তখন তার বয়স ত্রিশও নয়। এ বিপ্লবে জয় হয় তৃতীয় সম্প্রদায়ের, অর্থাৎ সুবিধাভোগী অলস শ্রেণিগুলির ওপর উৎপাদন ও ব্যবসায় যারা খাটছে জাতির সেই বিপুল জনগণের জয়। কিন্তু তৃতীয় সম্প্রদায়ের বিজয় অচিরেই আত্মপ্রকাশ করলো এই সম্প্রদায়ের একটি ক্ষুদ্র অংশের স্বীয় বিজয়রূপে, এ সম্প্রদায়ের সামাজিকভাবে সুবিধাভোগী অংশের অর্থাৎ সম্পত্তি মালিক বুর্জোয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতালাভরূপে। বিপ্লবের ভিতর বুর্জোয়া নিশ্চিতই দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠেছিল- অভিজাত ও গির্জার যে জমি বাজেয়াপ্ত করে পরে বিক্রির জন্য হাজির করা হয় তার ওপর ফাটকাবাজি করে খানিকটা, এবং খানিকটা যুদ্ধ ঠিকার মারফত জাতিকে ঠকিয়ে। এই জুয়াচোরদের আধিপত্যের ফলেই ডিরেক্টরেটের আমলে ফ্রান্স ধ্বংসের সীমায় এসে দাঁড়িয়েছিল এবং নেপোলিয়ন অজুহাত পান কুদেতার।

সুতরাং সাঁ-সিমোঁর কাছে তৃতীয় সম্প্রদায় ও সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যেকার বৈরিতা কর্মী ও নিষ্কর্মাদের মধ্যস্থ একটা বৈরিতারূপে দেখা দেয়। শুধু সাবেকি সুবিধাভোগী শ্রেণি নয়, উৎপাদন ও বিতরণে অংশ না নিয়ে যারা তাদের আয়ের উপর বসে খায় তারা সকলেই নিষ্কর্মা। কর্মীও শুধু মজুরি-খাটা শ্রমিক নয়, কলওয়ালা বণিক ব্যাঙ্কার- সকলেই। নিষ্কর্মারা যে মনীষাগত নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রাধান্যের ক্ষমতা হারিয়েছে তা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল এবং পাকাপাকি স্থির হয়ে যায় বিপ্লবে। সর্বহারা শ্রেণিগুলিরও যে সে ক্ষমতা নেই সেটা সাঁ-সিমোঁর মনে হয়েছিল সন্ত্রাসের শাসনের অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত। তাহলে পরিচালনা করবে, নায়কত্ব করবে কে? সাঁ-সিমোঁর মতে তা করবে নতুন একটা ধর্মীয় বন্ধনে মিলিত বিজ্ঞান ও শিল্প, এ ধর্মবন্ধনের নির্বন্ধ হল ধর্মীয় ভাবনার সেই ঐক্য পুনরুদ্ধার করা, যা রিফর্মেশনের সময় থেকে নষ্ট হয়ে গেছে,- অবশ্যই অতীন্দ্রিয়বাদী এবং কড়া ধরনের যাজকতন্ত্রী নবখৃষ্টবাদ। বিজ্ঞান অর্থে হলো পণ্ডিতবর্গ, এবং শিল্প, সে হল সর্বাগ্রে সক্রিয় বুর্জোয়া, কলওয়ালা, কলওয়ালা বণিক ও ব্যাঙ্কার। সাঁ-সিমোঁর অভিপ্রায় ছিল, এ বুর্জোয়াদের অবশ্যই রূপান্তরিত হতে হবে এক ধরনের জনকর্মচারী, সামাজিক অছিদাররূপে; কিন্তু মজুরদের তুলনায় নেতৃত্বকারী ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত একটা অবস্থান তখনও তাদের থাকবে। ব্যাঙ্কারদের বিশেষ করে ডাক দেওয়া হবে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে সমগ্র সামাজিক উৎপাদন পরিচালিত করতে। এ ধারণাটা ঠিক তেমন একটা সময়ের সঙ্গে খাপ খায় যখন ফ্রান্সে আধুনিক শিল্প এবং সেই সঙ্গে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের মধ্যেকার গহ্বরটা সবে দেখা দিচ্ছে। কিন্তু সাঁ-সিমোঁ বিশেষ জোর যেখানে দেন সেটা এই: সর্বাগ্রে এবং সর্বোপরি তাঁর ভাবনা ছিল সেই শ্রেণির ভাগ্য নিয়ে যারা সবচেয়ে সংখ্যাধিক ও সবচেয়ে গরিব।

জেনেভা পত্রাবলিতেই সাঁ-সিমোঁ প্রস্তাব তুলেছিলেন ‘সমস্ত লোককেই কাজ করতে হবে।’ ঐ রচনায় তিনি এ কথাও বলেন যে, সন্ত্রাসের শাসন ছিল সর্বহারা জনগণের শাসন। সর্বহারাদের তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের সাথীরা যখন ফ্রান্সে আধিপত্য করে তখন কী দাঁড়ায়; তারা একটা দুর্ভিক্ষ ঘটায়।’ কিন্তু ফরাসি বিপ্লবকে শ্রেণিযুদ্ধ হিসাবে, শুধু অভিজাত ও বুর্জোয়াদের মধ্যেকার যুদ্ধ নয়, অভিজাত, বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের মধ্যেকার একটা যুদ্ধ হিসাবে দেখা ১৮০২ সালের পক্ষে একটা অতি অর্থগর্ভ আবিষ্কার। ১৮১৬ সালে তিনি ঘোষণা করেন, ‘রাজনীতি হলো উৎপাদনের বিজ্ঞান, এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন রাজনীতিকে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করবে অর্থনীতি। অর্থনৈতিক অবস্থা যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বনিয়াদ, এ জ্ঞান এখানে মাত্র ভ্রূণাকারে দেখা দিয়েছে। তবুও তখনই যা বেশ পরিষ্কার করে ফুটে উঠেছে সে হল এই ধারণা যে, ভবিষ্যতে মানুষের ওপরকার রাজনৈতিক শাসন পরিবর্তিত হবে বস্তুর ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিচালনায়, অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিলোপে, যা নিয়ে ইদানীং এত সোরগোল চলছে।

আরো পড়ুন:  দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বা সমাজতন্ত্রী আন্তর্জাতিকের কার্যক্রম ও ভূমিকা

সমকালীনদের তুলনায় একই প্রকার শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় সাঁ-সিমোঁ দেন ১৮১৪ সালে, মিত্রশক্তিদের প্যারিস প্রবেশের ঠিক পরেই, এবং ফের ১৮১৫ সালে একশ দিনের যুদ্ধের সময় যখন তিনি ঘোষণা করেন, ফ্রান্সের সঙ্গে ইংল্যান্ডের এবং পরে এই দুই দেশের সঙ্গে জার্মানির মৈত্রীই হলো ইউরোপের সমৃদ্ধ বিকাশ ও শান্তির একমাত্র গ্যারান্টি। ওয়াটারলু যুদ্ধের বিজয়ীদের সঙ্গে মৈত্রীর কথা ১৮১৫ সালে ফরাসিদের কাছে প্রচার করতে হলে যেমন সাহস, তেমনি ঐতিহাসিক দূরদৃষ্টির প্রয়োজন হতো।

সাঁ-সিমোঁর মধ্যে যদি পাই একটা এমন পরিপূর্ণ ব্যাপক দৃষ্টি যাতে পরবর্তী সমাজতন্ত্রীদের যে সব ধারণা একান্তভাবে অর্থনৈতিক নয় তার প্রায় সবগুলি তাঁর মধ্যে ভ্রূণাকারে বর্তমান, তাহলে ফুরিয়ের মধ্যে পাব তদানীন্তন সমাজব্যবস্থার একটা খাঁটি ফরাসি চালের ক্ষুরধার সরস সমালোচনা, কিন্তু তাই বলে মোটেই তা কম গভীর নয়। ফুরিয়ে বুর্জোয়াকে ধরেছেন, ধরেছেন তাদের বিপ্লব পূর্বের অনুপ্রেরিত পয়গম্বর আর বিপ্লবোত্তর স্বার্থান্বেষী চাটুকারদের স্বমুখনিসৃত উক্তিগুলিকেই। বুর্জোয়া জগতের বৈষয়িক ও নৈতিক দৈন্য তিনি উদ্ঘাটিত করেছেন নির্মমভাবে। একমাত্র যুক্তি-শাসিত একটা সমাজ, সর্বজনীন সুখের একটা সভ্যতা, মানুষের অসীম একটা পরিপূর্ণতার যে ঝলকিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পূর্বতন দার্শনিকেরা এবং তাঁর কালের বুর্জোয়া প্রবক্তারা যে সব রঙীন বুলি আওড়াতেন তার মুখোমুখি তিনি দাঁড় করিয়ে দেন বুর্জোয়া জগতটাকে। দেখিয়ে দেন কীভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে অতি উচ্চ বাগাড়ম্বরের তলে আছে অতি শোচনীয় বাস্তব এবং বাক্যের এই অপদার্থ প্রহসনকে তিনি দীর্ণ করেছেন জ্বালাময় ব্যঙ্গে।

ফুরিয়ে শুধু সমালোচক নন; তাঁর অনুত্তেজিত ধীর স্বভাব তাঁকে করে তুলেছে ব্যঙ্গবিদ, এবং নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা ব্যঙ্গবিদদের অন্যতম। যেমন বলিষ্ঠ তেমনি সুন্দর করে তিনি বর্ণনা করেছেন বিপ্লবের পতনের পর যে জুয়াচুরি ফাটকাবাজির মহোৎসব শুরু হয়, সে সময়কার ফরাসি বাণিজ্যের মধ্যে এবং তারই বৈশিষ্ট্যসূচক যে দোকানদারি মনোবৃত্তি তখন প্রচলিত, তার কথা। এর চেয়েও তার ওস্তাদি নরনারী সম্পর্কের বুর্জোয়া রূপ এবং বুর্জোয়া সমাজে নারীর যে স্থান তার সমালোচনায়। তিনি প্রথম ঘোষণা করেন যে, কোন একটা সাধারণ মুক্তির স্বাভাবিক মাপকাঠির হল সে সমাজে নারীমুক্তির মান।

কিন্তু সমাজের ঐতিহাসিক ধারণার ক্ষেত্রেই ফুরিয়ে মহত্তম। সমাজের সমগ্র ধারাকে তিনি ভাগ করেছেন ক্রমবিকাশের চারটি পর্যায়ে- বন্যতা, বর্বরতা, পিতৃতন্ত্র, সভ্যতা। শেষেরটি হল আজকের তথাকথিত সভ্য বা বুর্জোয়া সমাজ অর্থাৎ ষোড়শ শতাব্দী থেকে যে সমাজ ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেন, ‘বর্বরতার যুগে যে পাপের অনুষ্ঠান হতো সরলভাবে তাদের সবকটিকে একটা জটিল দ্ব্যর্থক উভচারী শাঠ্যের অস্তিত্বে উন্নীত করা হয়েছে সভ্য যুগে; সভ্যতার গতি একটা পাপ চক্রের মধ্য দিয়ে, বিরোধের মধ্য দিয়ে, যা সে ক্রমাগত সৃষ্টি করে চলেছে অথচ তার সমাধানে অক্ষম; সুতরাং যা তার অভিপ্রেত অথবা অভিপ্রেত বলে ভান করে ঠিক তার বিপরীতেই সে ক্রমাগত উপনীত হচ্ছে, ফলে দৃষ্টান্তস্বরূপ, সভ্যতার আমলে দারিদ্র্যের সৃষ্টি হচ্ছে অতি প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেই।’

দেখা যাচ্ছে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে ফুরিয়ে ঠিক তাঁর সমকালীন হেগেলের মতোই নিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন। একই দ্বান্দ্বিকতার ব্যবহার করে তিনি সীমাহীন মানবিক পরিপূর্ণতার বিরুদ্ধে তর্ক তুলেছেন, বলেছেন প্রত্যেকটা ঐতিহাসিক পর্যায়েরই যেমন উত্থান তেমনি অবতরণের যুগ বর্তমান এবং এই সত্যকে প্রয়োগ করেছেন সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে। পৃথিবীর শেষ পরিণাম ধ্বংস, এই ধারণাটিকে কান্ট যেমন আমদানি করেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, ফুরিয়েও তেমনি ইতিহাস বিজ্ঞান চালু করেন মনুষ্য জাতির শেষ ধ্বংসের ধারণা।

ফ্রান্সের মাটির ওপর দিয়ে যখন বিপ্লবের ঝড় বয়ে গিয়েছিল তখন ইংল্যান্ডে চলছিল একটা শান্ততর বিপ্লব যদিও তাই বলে সেটা কম প্রচণ্ড নয়। বাস্প এবং নতুন নতুন যন্ত্র তৈরির সরঞ্জামে কারখানা পরিবর্তিত হচ্ছিল আধুনিক শিল্পে এবং এইভাবে বিপ্লব ঘটাচ্ছিল বুর্জোয়া সমাজের সমগ্র ভিত্তিমূলেই। কারখানা যুগের বিকাশের মন্থর গতি বদলে গেল উৎপাদনের একটা ঝটিকাবর্তের যুগ রূপে। নিয়ত বর্তমান ক্ষিপ্রতায় চললো বৃহৎ পুঁজিপতি ও নির্বৃত্ত প্রলেতারিয়েতে সমাজের ভাঙন। তাদের মাঝখানে আগেকার স্থায়ী মধ্য শ্রেণির বদলে কারুশিল্পী ও ক্ষুদে দোকানদারদের একটা অস্থায়ী জনসংঘ, জনসংখ্যার সবচেয়ে অস্থির একটা অংশ, কষ্টে অস্তিত্ব বজায় রেখে চললো।

উৎপাদনের নয়া পদ্ধতি তখন সবে তার উত্থান যুগের শুরুতে ; তখনও পর্যন্ত সেটা উৎপাদনের স্বাভাবিক নিয়মিত একটা পদ্ধতিই বটে, তদানীন্তন অবস্থায় সম্ভবপর একমাত্র পদ্ধতি। তাহলেও, তখনই তা থেকে বিপুল সামাজিক অবিচারের সৃষ্টি হয়ে চলেছে- বড়ো বড়ো শহরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সব মহল্লায় গৃহহীন জনতার ভিড়, চিরাচরিত সবকিছু নৈতিক বাঁধন, পিতৃতান্ত্রিক বাধ্যতা, পারিবারিক সম্পর্কের শৈথিল্য; একটা ভয়ঙ্কর মাত্রার অতি মেহনত, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বেলায়; গ্রাম থেকে শহর, কৃষি থেকে আধুনিক শিল্প, জীবন ধারণের স্থির অবস্থা থেকে দিন দিন পরিবর্তমান একটা অস্থির অবস্থা- একেবারে এই নতুন পরিস্থিতির মধ্যে সহসা নিক্ষিপ্ত হয় শ্রমিক শ্রেণির ব্যাপক নীতিভ্রংশ।

এই সন্ধিক্ষণে এগিয়ে এলেন একজন সংস্কারক, ২৯ বছর বয়সের এক কারখানা মালিক, প্রায় অনির্বচনীয় শিশুসুলভ একটা সারল্য তাঁর চরিত্রে, অথচ সেই সঙ্গেই যে মুষ্টিমেয়রা জননায়ক হয়েই জন্মায় তাদের একজন। রবার্ট ওয়েন বস্তুবাদী দার্শনিকদের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, অর্থাৎ, মানুষের চরিত্র হল একদিকে বংশগতি এবং অন্যদিকে মানুষের জীবন-কালের, বিশেষ করে তার বিকাশ কালের পরিবেশের ফল। তাঁর শ্রেণির অধিকাংশ লোকেই শিল্পবিপ্লবের মধ্যে দেখেছিল কেবল গোলমাল বিশৃঙ্খলা, আর দাও মেরে দ্রুত প্রভূত অর্থ আয়ের সুবিধা। রবার্ট ওয়েন দেখলেন তাঁর প্রিয় তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে বিশৃঙ্খলার মধ্যে থেকে শৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ।

ম্যানচেস্টারের একটা কারখানায় পাঁচ শতাধিক লোকের সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসাবে এটা তিনি আগেই সাফল্যের সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। ১৮০০ থেকে ১৮২৯ সাল পর্যন্ত তিনি স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্কে পরিচালক অংশীদার হিসাবে একটা বৃহৎ সুতাকলের কাজ চালান সেই একই পদ্ধতিতে, কিন্তু, অধিকতর স্বাধীনতা নিয়ে এবং এতটা সাফল্যের সঙ্গে যে ইউরোপে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। প্রথমে যারা ছিল অতি হরেক রকমের একটা দঙ্গল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতি নীতিভ্রষ্ট সব লোক, এবং ধীরে ধীরে যাদের সংখ্যা বেড়ে ওঠে ২,৫০০-এ, এমন একটা জনতাকে তিনি রূপান্তরিত করেন এক আদর্শ উপনিবেশে, যেখানে মাতলামি, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, মোকদ্দমা, দ্বীন আইন, ভিক্ষাদান প্রভৃতি ছিল অজানা। এবং তা করেন মাত্র লোকগুলোর জন্যে একটা মানুষের যোগ্য পরিস্থিতি রচনা করে এবং বিশেষ করে, উঠতি ছেলেমেয়েদের সযত্নে লালন করে। কিন্ডারগার্টেনের তিনিই প্রবর্তক, নিউ ল্যানার্কে তা তিনি চালু করেন। দু-বছর বয়স থেকে ছেলেরা আসতো কিন্ডারগার্টেনে, যেখানে তাঁরা এতই আনন্দে থাকতো যে, বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া দায় হতো। ওয়েনের প্রতিযোগীরা যে ক্ষেত্রে মজুর খাটাতো দিনে তের-চৌদ্দ ঘণ্টা করে, সেই ক্ষেত্রে নিউ ল্যানার্কে কাজের দিন ছিল মাত্র সাড়ে দশ ঘণ্টা। তুলার একটা সঙ্কটে যখন চার মাসের জন্যে কাজ বন্ধ হয়ে থাকে, তখনো তাঁর মজুরেরা পুরো মজুরি পেয়ে এসেছে। এবং এসব সত্ত্বেও তাঁর কারবারের মূল্য দ্বিগুণ বাড়ে, শেষ পর্যন্ত তা মোটা মুনাফা যুগিয়েছে মালিকদের।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পার্থক্যরেখাগুলো কোথায় ও কীভাবে?

তা সত্ত্বেও ওয়েনের তৃপ্তি ছিল না, তাঁর মজুরদের জন্য তিনি জীবন ধারণের যে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সেটা তাঁর চোখে তখনও মানুষের যোগ্য নয়। লোকগুলো আমার করুণানির্ভর ক্রীতদাস। অপেক্ষাকৃত অনুকূল যে পরিস্থিতিতে তাদের তিনি বসিয়েছেন তাতে চরিত্রের এবং বুদ্ধিবৃত্তির সর্বাঙ্গীন ও সঙ্গত বিকাশ তখনও হচ্ছিল না, তাদের যোগ্যতার অবাধ ব্যবহার হচ্ছিল তো আরও কম। অথচ এই আড়াই হাজার অধিবাসীর মেহনতি অংশটা সমাজের জন্য যে পরিমাণ বাস্তব সম্পদ সৃষ্টি করেছে তা করতে প্রায় অর্ধশতক আগে দরকার হতো ছয় লক্ষ অধিবাসীর মেহনতি অংশের। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ছয় লক্ষ লোক যে সম্পদ ভোগ করতো, সে থেকে এই আড়াই হাজার লোক যা ভোগ করছে তা বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকা উচিত সেটা গেল কোথায়?

জবাবটা পরিষ্কার। তা গেছে তিন লক্ষ পাউন্ডের ছাঁকা মুনাফা ছাড়াও কারখানার স্বত্বাধিকারীদের লগ্নি মূলধনের ওপর ৫% পরিশোধ করতে। আর নিউ ল্যানার্কের পক্ষে সেটা খাটে, তা আরও বেশি খাটে ইংল্যান্ডের সমস্ত ফ্যাক্টরি সম্পর্কেই। অযথার্থরূপে প্রযুক্ত হলেও যন্ত্র কর্তৃক এই নতুন সম্পদ যদি না সৃষ্টি হতো, তাহলে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে এবং সমাজের অভিজাত প্রথাকে সমর্থনের জন্য ইউরোপীয় যুদ্ধগুলি চালানো যেত না। অথচ এই নতুন শক্তি হল শ্রমিক শ্রেণিরই সৃষ্টি। এ নতুন শক্তির ফল ভোগের অধিকার সুতরাং তাদেরই। নবসৃষ্ট অতিকায় উৎপাদন শক্তি এযাবৎ যা ব্যক্তিবিশেষকে ধনী করা ও জনগণকে গোলাম করার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে তা থেকে ওয়েন পেলেন সমাজ পুনর্নির্মাণের ভিত্তি; সকলের সাধারণ সম্পত্তি হিসাবে এগুলির নির্বন্ধ হল সকলের সাধারণ মঙ্গলের জন্য চালিত হওয়া।

বলা যেতে পারে ব্যবসায়িক হিসাবের পরিণতিস্বরূপ এই বিশুদ্ধ ব্যবহারিক বনিয়াদের ওপরেই ওয়েনের কমিউনিজমের ভিত্তি। আগাগোড়া তাঁর এই ব্যবহারিক চরিত্র বজায় থেকেছে। এইভাবে ১৮২৩ সালে ওয়েন কমিউনিস্ট উপনিবেশ স্থাপন করে আয়ারল্যান্ডের দুর্দশা ত্রাণের প্রস্তাব তোলেন এবং তা প্রতিষ্ঠার খরচা, বাৎসরিক ব্যয় ও সম্ভাব্য আয়ের পুরো হিসাব তৈরি করে দেন। ভবিষ্যতের জন্য স্থির নির্দিষ্ট তাঁর ছক খুঁটিনাটি সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এমন ব্যবহারিক জ্ঞানের সঙ্গে যে ভিতের নকশা, সামনে থেকে দেখা, পাশ থেকে দেখা, উপর থেকে দেখা, সব সমেত- সমাজ সংস্কারের ওয়েন পদ্ধতি একবার গ্রহণ করলে তার প্রত্যক্ষ খুঁটিনাটি ব্যবস্থার ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপত্তি করার প্রায় জো নেই।

কমিউনিজমের অভিমুখে পদক্ষেপ করায় জীবনের মোড় ফিরে গেল ওয়েনের। যতদিন তিনি মাত্র মানবহিতৈষী, ততদিন কেবল ধনসম্পদ, সাধুবাদ, সম্মান এবং গৌরবের পুরস্কার মিলেছে তাঁর। তিনি ছিলেন ইউরোপের সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তি। শুধু স্বশ্রেণির লোকেরাই নয়, রাষ্ট্রনেতারা, এমনকি প্রিন্সরাও তাঁর কথা শুনতো সপ্রশংসায়। কিন্তু যখন তিনি তার কমিউনিস্ট তত্ত্ব নিয়ে এগিয়ে এলেন তখন সে তো আলাদা কথা। ওয়েনের মনে হয়েছিল সমাজ সংস্কারের পথ রোধ করে আছে তিনটি বৃহৎ প্রতিবন্ধক; ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ধর্ম ও বর্তমানের বিবাহ প্রথা। জানতেন, এদের আক্রমণ করলে কী তার ভাগ্যে আছে- অবৈধীকরণ, সরকারি সমাজ থেকে বহিষ্কার, সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অবসান। কিন্তু ফলাফলের তোয়াক্কা না করে সে আক্রমণ করতে কিছুতেই তিনি পিছপা হলেন না; এবং যা ভেবেছিলেন তাই ঘটলো। সরকারি সমাজ থেকে নির্বাসন, সংবাদপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে নীরবতার চক্রান্ত। আমেরিকায় তার অসফল কমিউনিস্ট পরীক্ষায় নিজের সমস্ত সম্পদ ঢেলেছিলেন। সে সব খুইয়ে তিনি সরাসরি ফিরলেন শ্রমিকদের দিকে, তাদের মধ্যেই কাজ করে যান ত্রিশ বছর। ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থে প্রত্যেকটা সামাজিক আন্দোলন, প্রত্যেকটা সত্যকার অগ্রগতির সঙ্গে রবার্ট ওয়েনের নাম জড়িত। পাঁচ বছর সংগ্রামের পর, ১৮১৯ সালে তিনি ফ্যাক্টরিতে নারী ও শিশুদের কাজের ঘণ্টা সীমাবদ্ধ করার আইন জোর করিয়ে পাস করিয়ে নেন। ইংল্যান্ডের সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন যখন একটা বৃহৎ একক সমিতিতে ঐক্যবদ্ধ হয় তারই প্রথম কংগ্রেসে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সমাজের পরিপূর্ণ কমিউনিস্ট সংগঠনের আগে উৎক্রমণ ব্যবস্থা হিসাবে তিনি একদিকে প্রবর্তন করেন খুচরা ব্যবসা ও উৎপাদনের জন্য সমবায় সমিতি। সেদিন থেকে অন্তত এই ব্যবহারিক প্রমাণ এগুলি দিয়ে এসেছে যে, সমাজের দিক থেকে বণিক ও কলওয়ালারা নিতান্ত অনাবশ্যক। অন্যদিকে তিনি প্রবর্তন করেন মেহনত-নোট মারফত মেহনতের ফল বিনিময়ের জন্য মেহনতি বাজার; এই মেহনত নোটের একক ধরা হয় এক ঘণ্টার কাজ; প্রতিষ্ঠানগুলি নিষ্ফল হতে বাধ্য ছিল, কিন্তু অনেক পরবর্তীকালের প্রুধোঁর বিনিময় ব্যাঙ্কের প্রকল্পটা আগে থেকেই পুরোপুরি আচরিত হয়েছে এখানেই- শুধু এই তফাৎ যে একেই সমাজের সর্ব অকল্যাণের মহৌষধ বলে জাহির না করে বলা হয়েছে সমাজের অধিকতর একটা আমূল বিপ্লবের দিকে তা এক প্রথম পদক্ষেপ মাত্র।

ইউটোপীয় চিন্তাধারা ঊনিশ শতকের সমাজতন্ত্রী ভাবনাকে দীর্ঘকাল প্রভাবিত করে এসেছে এবং এখনও কিছু কিছু ভাবনাকে করছে। কিন্তু, এইগুলি আগেই ফরাসি ও ইংরেজ সমাজতন্ত্রীরা সকলেই তার প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেছে। ভাইংলিং-এর কমিউনিজম সমেত আগেকার জার্মান কমিউনিজমও ওই একই পন্থার পথিক। এদের সকলের কাছে সমাজতন্ত্র হল পরম সত্য, যুক্তি ও ন্যায়ের প্রকাশ; আবিষ্কৃত হওয়া মাত্র তার শক্তিতেই তা বিশ্ব জয় করবে। এবং পরম সত্য যেহেতু দেশ কাল ও মানুষের ঐতিহাসিক বিকাশ নিরপেক্ষ, তাই কখন কোথায় সেটা আবিষ্কৃত হবে সেটা দৈবের ঘটনা। তা সত্ত্বেও এক একটা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতার কাছে পরম সত্য, যুক্তি ও ন্যায় একরকম। এবং প্রত্যেকের এ বিশেষ প্রকাশের পরম সত্য যুক্তি ও ন্যায় যেহেতু তার স্বীয় বোধ, জীবন ধারণের অবস্থা, জ্ঞানের বহর ও বুদ্ধিমার্গীয় অনুশীলনের দ্বারা নির্ধারিত সেইহেতু পরম সত্যগুলির সংঘাতের শুরু এইটে ছাড়া অন্য পরিণাম অসম্ভব যে, সেগুলি হবে একান্তরূপে পরস্পর পৃথক। এ থেকে শুধু এক ধরনের পাঁচমিশালী গড়পড়তা সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই বেরোবে না এবং বস্তুতপক্ষে তাই আজও পর্যন্ত ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের অধিকাংশ সমাজতন্ত্রী-শ্রমিকদের মন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। অতএব সে হচ্ছে অতি বহুবিধ মতান্তরের জগাখিচুড়ি অনুমোদন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতাদের এমন সব সমালোচনী রচনা, অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও ভবিষ্যৎ সমাজ চিত্রের জগাখিচুড়ি, যার বিরোধিতা হবে সবচেয়ে কম; বিতর্কের স্রোতে বিভিন্ন উপাদানের সুনির্দিষ্ট তীক্ষ্ম ধারগুলো যতই নদীর গোল গোল নুড়ির মতো মসৃণ হয়ে উঠবে, সে জগাখিচুড়িও তৈরি হয়ে উঠবে ততই সহজে।

সমাজতন্ত্রকে বিজ্ঞানে পরিণত করতে হলে আগে তাকে স্থাপন করা দরকার বাস্তব ভিত্তির ওপর।

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২৮ নভেম্বর, ১৮২০ - ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ছিলেন জার্মান বিপ্লবী, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে “পবিত্র পরিবার” (১৮৪৪), “ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা” (১৮৪৫) “এ্যান্টি-ডুরিং” (১৮৭৮) “প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা (১৮৮৩), “পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” (১৮৮৪) প্রভৃতি। ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page