You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > আন্তর্জাতিক > এশিয়া > চীন > চীনের ইতিহাস প্রসঙ্গে

চীনের ইতিহাস প্রসঙ্গে

সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিচারে চীন শুধু প্রাচীন নয়, বড়ও বটে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে চীন ছিল সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। বর্তমান চীনের চাইতেও বেশি এলাকা তখন চীনের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তার কর্তৃত্ব বিস্তৃত ছিল আমুর অঞ্চলের সাইবেরিয়া বনভূমি থেকে উস্থরী পর্যন্ত। তিব্বত, বহির্মঙ্গেলিয়া, অন্তর্মঙ্গোলিয়া তখন চীনের অন্তর্গত। চারপাশের কোরিয়া, অ্যানাম, ব্রহ্মদেশ, নেপাল ও মধ্য এশিয়ার শেখশাসিত অঞল তখন চীনের সম্রাটকে নজরানা পাঠাত। বর্তমান লেখায় এই বিশাল দেশটির সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি প্রাথমিক রূপরেখা দেওয়া হবে।

প্রাচীন চীনের ইতিহাস

চীনের নামকরণ ও জাতিবৈচিত্র্য

‘চীন’ নামটি এসেছে চৌ বংশের (খ্রিস্টপূর্ব ১১২২-২৪৯) একটি করদ রাজ্য ‘চিন’ থেকে। চীনের উত্তর-পশ্চিমে কান-সু এবং শেন-সি জেলা নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই ‘চিন’ রাজ্য। “চিন-কুয়াে’’ নামে পরিচিত এই রাজ্য আশপাশের রাজ্যগুলােকে জয় করে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তােলে। এই সময়ে ‘চিন’ রাজ্যের সঙ্গে বাইরের যে সব দেশের যােগাযােগ ছিল, তারা সকলেই ঐক্যবদ্ধ বড় রাষ্ট্রটিকেও ‘চীন’ বলে ভাবতে শুরু করে। এইভাবে গােটা পৃথিবীতেই ‘চীন’ নামটাই স্বীকৃতি পেয়ে যায়।

চীন সাম্রাজ্য বহু জাতির বাস। আসলে মিশ্র চীনা জাতির উৎপত্তি হয়েছে মােঙ্গলীয়, তাতার, তিব্বতি, বর্মী, সান, মাঞ্চু প্রভৃতি জাতি-উপজাতির সংমিশ্রণে। তাই চীনা জাতির অনেক শাখা। সাধারণভাবে চীনের অধিবাসীদের ছ’টি ‘ৎ সু’ বা জাতি-শ্রেণীতে ভাগ করা যায় : (১) হান- ৎ সু (২) মিয়াও-ৎসু ; (৩) মাৎসু বা মাঞ্চু; (৪) মং-ৎসু অথবা মঙ্গোল ; (৫) হুই-ৎসু অর্থাৎ মুসলমান এবং (৬) ৎসাং-ৎসু বা তিব্বতীয়। এদের মধ্যে জাতি হিসেবে হানরাই প্রাচীনতম এবং প্রধান। চীনের ইতিহাস বা সভ্যতা বলতে এদেরই ইতিহাস বা সভ্যতাকে বােঝায়, এরাই চীনের প্রকৃত প্রতিনিধি। তবে সব জাতি বা শাখাই সাধারণভাবে নিজেদের চীনা বলে ভাবে এবং সেটা তাদের জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। মান্দারিন হলো তাদের সর্বজনীন ভাষা।

চীনের ভাষা নিয়ে সাধারণভাবে একটা ভুল ধারণা চালু আছে। অনেকে মনে করেন, চীনের ভাষা বর্ণভিত্তিক নয়, চিত্রভিত্তিক। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। চীনা ভাষার রচনা ও ব্যবহারের ছয়টা ভাগ আছে। এর একটা মাত্র ভাগ চিত্রধর্মী। বাকি ভাগগুলাে বর্ণধর্মী। তবে সমগ্র চীনেই লেখার ও বলার ভাষা এক। এই একভাষিকতাও চীনের জাতীয় ঐক্যের পক্ষে সহায়ক হয়েছে।

চীনে ঐতিহ্যবাদের প্রভাব

চীন একটি গোঁড়া ঐতিহ্যবাদী দেশ (traditionalist)। তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি বিশেষ ধরন ছিল। মার্কোপােলাের মতাে মধ্যযুগীয় পর্যটক, আর ভেলতেয়ার—দিদেরাে-র মতাে অষ্টাদশ শতকের দার্শনিক সকলেই একথা স্বীকার করেছেন। নিজেদের কৃষ্টি বিষয়ে চীনারা খুবই অভিমানী ছিলেন। স্বদেশকে তারা বলতেন ঝংগুয়াে বা আসল দেশ; নিজেদের সভ্যতাকে বলতেন ঝংঘুরা বা সব সভ্যতার মূল। চীনাদের দাবি, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকেই তারা ছ’প্রকার কলাবিদ্যায় পারদর্শী। এগুলাে হলো: ‘লি’ বা শিষ্টাচার, ‘য়াে’ বা সংগীত, ‘শে’ বা ধুনর্বিদ্যা, ‘য়ু’ বা সারথ্য, ‘শু’ বা রচনা এবং ‘সু’ বা অঙ্কশাস্ত্র।

চীনের স্বাভাবিক জীবনদর্শন সৃষ্টিবাদ (Creationism) বা অদ্বৈতবাদ (Monism) কোনােটিকেই গ্রহণ করেনি। কোনাে অলৌকিক প্রক্রিয়ায় তাদের জগৎ তৈরি হয়েছে, একথা যেমন তারা বিশ্বাস করেনি, তেমনি অতীন্দ্রিয় পরমপিতা আর তাদের জাগতিক জীবন অভিন্ন সূত্রে বাঁধা—একথাও তারা বলতে চায়নি। তাদের ধারণায়, জীবপ্রক্রিয়ার দুটো বিপরীতমুখী শক্তি কাজ করে। একটি হল ‘ইন’ এবং অন্যটি হল ‘ইয়াং’—যেমন সক্রিয়-নিষ্ক্রিয়, সাকার-নিরাকার, গুণ-নির্গুণ, চন্দ্র-সূর্য, রাত্রি-দিন, নারীপুরুষ ইত্যাদি। এই দুই-এর টানাপােড়েনেই সভ্যতা তৈরি হতে থাকে। অনেকে বলেন, টানাপােড়েন বা দ্বন্দ্বের ধারণা চীন সংস্কৃতির স্বাভাবিক সৃষ্টি। তাই মাও-সে-তুং সহজেই তাদের দ্বন্দ্বতত্ত্ব বােঝাতে পেরেছিলেন।

এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে চীনা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, তাকে চীনারা মনে করত পবিত্রতম বা সভ্যতম। তাদের মতে, চীন সভ্যতার প্রধান গুণ চারটি।

আরো পড়ুন:  গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন

(ক) চীন সভ্যতা মৌলিক এবং সৃজনক্ষম। চীনা সভ্যতা কাউকে অনুকরণ করেনি, চীনারা তাই কারো কাছে ঋণী নয়।

(খ) স্থায়িত্ব এই সভ্যতার বড় গুণ। মিশর, ব্যাবিলন ও সিন্ধুর সভ্যতা লুপ্ত হয়েছে, কিন্তু চীনের সভ্যতা শুধুই টিকে যায়নি, প্রসার লাভও করেছে।

(গ) এই সভ্যতা বহুব্যাপ্ত। আয়তনে চীন বিরাট। এই বিশাল দেশে এক ভাষা, এক বর্ণমালা। 

(ঘ) চীন সভ্যতার চতুর্থ গুণটি হলো এর মানবিকতা ও বিশ্বপ্রেমিকতা।

ঐতিহ্যবাদের প্রভাবে চীনারা এই গুণগুলােকে বাইরের স্পর্শদোষ থেকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য সচেষ্ট ছিল। তাই অষ্টাদশ শতকের পশ্চিমী সভ্যতাকে (Herodianism) তারা বর্বর মনে করেছিল এবং জাপানি প্রয়ােগবাদকে দূরে রেখে পশ্চিমের দিকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে ছিল। সমাজ রক্ষা করতে হলে প্রাচীন শিক্ষার ভিত্তি অটুট রাখা দরকার, কনফুসীয় এই শিক্ষা চীনারা কখনাে ভােলেনি। পশ্চিমী পণ্যসভ্যতার স্পর্শে সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে, এই ভয়ে তারা দীর্ঘদিন পশ্চিমকে অস্পৃশ্য করে রেখেছিল। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিয়েন-লুং রাজত্বের সময়ে ব্রিটিশি প্রতিনিধি লর্ড ম্যাকার্টনি ব্রিটেন-রাজের শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে চীনে আসেন। কিন্তু জবাবে চিয়েন-লুং ব্রিটেন-রাজকে একটা চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি লেখেন—

“আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য তদারক করবার জন্য লােক পাঠাবার যে প্রস্তাব আপনি করেছেন তা অনুমােদন করা সম্ভব নয়, কেননা সেটা আমাদের স্বর্গীয় সাম্রাজ্যের আইনবিরুদ্ধ। আমার প্রধান কাজ প্রজাপালন। দুষ্প্রাপ্য এবং মূল্যবান জিনিস আমার কাছে অপ্রয়ােজনীয়।

বস্তুত, আমার এই স্বর্গীয় সাম্রাজ্যে কোনাে জিনিসের অভাব নেই। সবই প্রচুর পরিমাণে এখানে উৎপন্ন হয়। সুতরাং বহির্জগতের বর্বরদের তৈরি কোন জিনিস আমদানি করবার আমার দরকার নেই।”

প্রাচীন চীনের সংস্কৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র

বহুজাতিক চীন ছিল মিশ্র সংস্কৃতির পীঠস্থান। ধরে নেওয়া হয় যে, বহুদিন ধরে আটটি কৌণিক সংস্কৃতির ধারা এসে তৈরি করেছিল চীনা সংস্কৃতি। (১) এদের মধ্যে একটি ছিল হােপেই (বেজিং-এর চারপাশ), শান্টুং এবং দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ার উত্তর-পূবালি সংস্কৃতি। আদি সাইবেরীয় গােষ্ঠীজাত এই সংস্কৃতির ধারকরা ‘শিকারী’ থেকে বুনিয়াদী ‘কৃষকে’ উন্নীত হয়েছিল। (২) এরই পশ্চিমে ছিল শানসি ও অন্তর্মঙ্গোলিয়ার জেহল প্রদেশের উত্তুরে সংস্কৃতি। এখানকার মােঙ্গল জাতির মানুষ ছিল যাযাবর পশুপালক। (৩) আরও পশ্চিমে আদিম তুর্কিরা শেনসি আর কাংসু প্রদেশে গড়ে তুলেছিল উত্তর-পশ্চিম সংস্কৃতি। তারা কৃষিকাজ জানত, ভেড়া ও ছাগল পালন করত, ঘােড়াকেও তারা পােষ মানিয়েছিল। (৪) পশ্চিমের সেঝুয়ান এবং কাংসু-শেনসি-র পার্বত্য অঞ্চলে থাকতে তিব্বতিরা। তারা ছিল প্রধানত মেষপালক। এই চারটি সংস্কৃতি ছাড়া দক্ষিণে ছিল চার ধরনের সংস্কৃতি। সেগুলাে হলো অস্ট্রো-এশিয়াটিক লিয়াও সংস্কৃতি, কোয়াংটুং এবং কোয়াংসির থাইঘেঁষা ইয়াও সংস্কৃতি, আদি থাই সংস্কৃতি এবং ইয়াও ও থাই-এর সম্পূর্ণ মিশ্রণের পর নতুন আর একটি মিশ্র সংস্কৃতি। দক্ষিণের এই সংস্কৃতিগুলাে মূলত ছিল কৃষিমুখী।

ওলফার্ম এবারহার্ড-এর (Wolfram Eberhard) মতে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত এই আটটি ধারাকে পৃথক পৃথকভাবে চেনা যেত। কিন্তু এর এক শতকের মধ্যেই পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই সংস্কৃতিগুলাে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় এবং শেষ পর্যন্ত দুটো প্রধান চৈনিক সংস্কৃতি-চেতনা গড়ে ওঠে। পূর্বে লুং শান (Lung Shan) ও পশ্চিমে ইয়াং-শাও (Yang Shao)। লুং শান সংস্কৃতির মানুষরা কৃষিকাজে উন্নত ছিল, তাদের স্থায়ী কৃষিজমি ছিল, স্তরবিন্যাস্ত সমাজভিত্তিক গ্রামগুলাে মাটির দেওয়াল দিয়ে ঘেরা থাকত এবং তারা চাকা ঘুরিয়ে চমৎকার কালাে মৃৎপাত্র তৈরি করত। ইয়াং-শাও গ্রামগুলাে তুলনায় ছিল অস্থায়ী। তবে তারাও সুন্দর সুন্দর পাথুরে হাতিয়ার (কাস্তে, কোদাল) ব্যবহার করে কৃষির উন্নতি ঘটিয়েছিল। ভেড়া ও ছাগল ছাড়াও তারা শূয়াের ও কুকুর পালন করত। লাল, কালাে ও সাদা—এই তেরঙ্গা মৃৎপাত্র তারা বানাতে জানত। রেশমের ব্যবহারও তারা আবিষ্কার করেছিল বলে জানায়। প্রথম সংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থাও এই ইয়াং-শাও-এর হেনান অঞলেই গড়ে ওঠে বলে মনে করা হয়। সম্ভবত ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে ব্রোঞ্জ ধাতুর ব্যবহার শুরু হয় এবং ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে তা বিস্তৃত অঞ্চলে ২২০৫ অব্দে ই-উ (Yii) এখানে সিয়া (Hsia) রাষ্ট্রের পত্তন করেন। এই বংশের শাসন স্থায়ী হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭২৫ মতান্তরে ১৭৬৬ অব্দ পর্যন্ত। এই পর্বের চীনে সামন্ততন্ত্র ছিল না। গােষ্ঠীকেন্দ্রিক সমাজের ভিত্তি ছিল পিতৃতান্ত্রিক পরিবার।

আরো পড়ুন:  চীনা দর্শন প্রসঙ্গে

চীনের সামন্তবাদ

কৃষিভিত্তিক চীনে খ্রিস্টপূর্ব একাদশ অব্দে সামন্তবাদের একটা গড়ন লক্ষ্য করা যায়। চৌ-বংশের আমলে সেই সামন্তবাদ পরিণত হয়ে উঠেছিল। ব্যাপক, কেন্দ্রীভূত ও দীর্ঘস্থায়ী এই সামন্তবাদী সমাজে পরিবারও এক বিশেষ নীতিকাঠামাের মধ্যে সাংগঠনিক ভিত্তিরূপ পেয়েছিল। ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক দ্বন্দ্ব—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল এই পরিবার। জেন্ট্রি ও কৃষকদের মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও যেমন চীনা সামন্তবাদ ভেঙে যায়নি, তেমনি এই পরিবারও তার পুরােনাে চেহারায় ছিল অটুট।

দীর্ঘকাল ধরে চীনের রাজনীতি-অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষি। মধ্যযুগে কৃষি যেমন সংগঠিত উৎপাদনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তেমনি একে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধেছিল সামন্তবাদ। চীনের সামন্তবাদকে দুটো পর্যায়ে ভাগ করা যায়। খ্রিস্টপূর্ব একাদশ অব্দে শুরু হয় আদি-ব্যবস্থার সামন্তবাদের (early feudalism) পর্যায়। তার প্রায় তিন-চারশাে বছর পর দেখা যায় পরিণত সামন্তবাদ (mature deudalism)।

চীনে মধ্যযুগের অবসান ঠিক কখন হয়, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। পুরাতনপন্থী চৈনিক ঐতিহাসিকরা, যেমন শিয়াও-ই-শান, চিং-তাই-তুং-শি, মনে করেন, মিং যুগের অবসানের পর চিং যুগের শুরুতে মধ্যযুগের শেষ হয়। কেননা পাশ্চাত্যের সঙ্গে যােগাযােগের সূত্রপাত এই সময়েই। কিন্তু ফেয়ারব্যাঙ্ক, ভিষাক, ইম্যানুয়েল সু প্রভৃতি ঐতিহাসিক আফিম যুদ্ধের (১৮৩৯) আগে পর্যন্ত চীনে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়নি বলে মনে করেন। কারণ এই যুদ্ধের পরই (১৮৩৯-৪২) চীনের বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত অবসান ঘটে। জঁ শ্যেনাে, ইস্রায়েল এপস্টেইন, জিয়ান বােজান, মারিয়ানে বাস্তিদ প্রভৃতি ঐতিহাসিকরাও আফিম যুদ্ধকেই মধ্যযুগ-আধুনিক যুগের বিভাজক-রেখা হিসেবে গণ্য করেছেন। কেননা, এর পরেই সামন্তবাদী চীন আধা-সামন্তবাদী আধা-ঔপনিবেশিক চীনে পরিণত হয়।

আধুনিক চীন

চীনের সংস্কার আন্দোলন থেকে অসমাপ্ত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব

চীনের আধুনিক ইতিহাসে আফিং যুদ্ধ কথাটিও ঘটনা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্যের নানা শক্তি ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য তাদের নৌবহর ইত্যাদি নিয়ে চীনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। চীনের আফিং এর চাষ খুব লাভজনক বলে পাশ্চাত্য শক্তিসমূহ বিবেচনা করে। চীনা সরকার চীনের সঙ্গে অবাধে চীন থেকে আফিং সংগ্রহে বাধাদানের চেষ্টা করে। এ নিয়ে চীনের সঙ্গে পাশ্চাত্য শক্তির সংঘর্ষ এক পর্যায়ে যুদ্ধের রূপ গ্রহণ করে। এই সংঘর্ষই আফিং যুদ্ধ বলে অভিহিত হয়। আফিং কেনা বেচার এই যুদ্ধ ১৮৪২ পর্যন্ত চলে।[২]

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে চীনের দুর্বল মাঞ্চু রাজতন্ত্র রাষ্ট্রকে সক্রিয় নেতৃত্বদানে অপারগ হয়ে পড়ে। জরাগ্রস্থ এই রাজতন্ত্র পশ্চিমী আগ্রাসনকে রােধ করতে পারেনি। ইঙ্গো-চীনা আফিম যুদ্ধের পর ১৮৪২ সালে সম্পাদিত নানকিং-এর সন্ধি মাঞ্চু রাজতন্ত্রের জয়প্রিয়তা অনেকটাই হ্রাস করেছিল। এই সময় স্থানে স্থানে বিদ্রোহের মাধ্যমে গণ-অসন্তোষ প্রকাশ পেতে থাকে। এই বিদ্রোহ তরঙ্গের চরম পরিণতি ছিল তাইপিং বিদ্রোহ। চীনা সরকারের এই দুর্দিনে পশ্চিমী রাষ্ট্রশক্তি নিজ সুবিধার্থে অনেক অন্যায় সুবিধা আদায় করে নেয়। চীনা জনগণ নিজ বাসভূমিতে কোনাে প্রকার সুবিধা, সুবিচারের সুযােগ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। চীনা সমাজ-ব্যবস্থার কৃষক শ্রেণি ছিল সর্বাপেক্ষা অবহেলিত শ্রেণি। রাজস্ব ব্যবস্থার অরাজকতা, কৃষিযােগ্য জমির অপ্রতুলতার জন্য কৃষক শ্রেণি প্রায় অর্ধদাসে পরিণত হয়েছিল। সরকারি পক্ষ থেকে কৃষক ও কৃষির উন্নতির জন্য কোন প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। এই সময় যে সংস্কার আন্দোলন শুরু হলো তাতেও জনসমর্থনের বিষয়টি অবহেলিত ছিল। তাই জনসমর্থনে অভাবে সংস্কার আন্দোলন ব্যর্থ হয়।

আরো পড়ুন:  চীন সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী রাষ্ট্র

এরপর চীন বক্সার বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা লাভ করে। এই বিদ্রোহ গুপ্ত সমিতি দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং এর লক্ষ্য ছিল বিদেশিরা। নানা কারণে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়ে যায় এবং বিদেশি নিষ্পেষণ আরও বৃদ্ধি পায়। এই সময় অর্থাৎ ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ও বিংশ শতকের সূচনায় চীনা জনসংখ্যা বিস্ফোরক হারে বৃদ্ধি পায় (১৮৮৫-১৯১০ পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৩০ মিলিয়ন), খাদ্যাভাব দেখা দেয়, জমির উপর চাপ পড়তে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ক্ষতিপূরণদানের সমস্যা। চীন-জাপান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, বস্তার বিদ্রোহের ক্ষতিপূরণ প্রভৃতির অর্থ দিতে গিয়ে মাঞ্চু রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। এই অর্থাভাব মেটাতে গিয়ে সরকার বাড়তি করের বােঝা জনগণের উপর চাপিয়ে দেন ফলে জন-অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। এই সময় বিপ্লবী সংবাদপত্রগুলি, যার মধ্যে উল্লেখযােগ্য মিন-পাও (Min-Pao) সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করে। সান-ইয়াৎ-সেনের নেতৃত্বে টুং-মেং-হুই বা সম্মিলিত দল ছিল বিপ্লবের কর্ণধার। তিনিই জাতীয়তাবাদী সংগঠিত করে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত করেন। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯১১ সালে চীনে স্থাপিত হয় প্রজাতন্ত্র।

বিদ্রোহকে চীনদেশের একটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অধিকার দৈব নির্দেশের তত্ত্বের মধ্যে নিহিত ছিল এবং তা কনফুসিয় দর্শন দ্বারা সমর্থিত ছিল। চীনে পশ্চিমী শক্তির অনুপ্রবেশের ফলে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, মাঞ্চু সরকারের দুর্নীতির এবং সামন্তবাদের বিরুদ্ধে একের পর এক চীন লাভ করেছিল বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা। তাইপিং বিপ্লব, বক্সার বিদ্রোহ এবং সর্বশেষে ১৯১১ সালের প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লব যার ফলে চীন লাভ করে প্রজাতন্ত্র। তবে ১৯১১ সালের বিপ্লব ছিল অসম্পূর্ণ, কারণ চীনের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এই বিপ্লবের ফলে দূরীভূত হয়নি। যদিও মাঞ্চু বংশের পতন হয়ে প্রজাতন্ত্রের পতন হলো কিন্তু তা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে এনে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কারণ চীনে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ দূরীভূত হয়নি, নিশ্চিহ্ন হয়নি সামন্তবাদ, তাই প্রকৃত প্রজাতন্ত্র ১৯১১ সালের বিপ্লবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই কারণে বিপ্লবটি ছিল অসম্পূর্ণ বিপ্লব।

সান-ইয়াৎ-সেন রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার সুবিধার্থে উয়ান-শি-কাই নামক মাঞ্চু রাজবংশের এক প্রভাবশালী সেনাপতির পক্ষে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করেন। কিন্তু চীনের নতুন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি উয়ান-শি-কাই গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিপ্লবীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সান ইয়াৎ-সেনের গণতন্ত্রের আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চীনে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য উয়ান-শি-কাই-এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় একটি বিপ্লবের প্রয়ােজন অনুভূত হয়। দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করার জন্য সান-ইয়াৎ-সেন কুয়াে মিন তাং বা চীনা জনগণের দল নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দল দক্ষিণ চীনে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠন করে। এই সময় সান-ইয়াৎ-সেন পশ্চিমী রাষ্ট্রের শােষণমূলক চুক্তিগুলি নাকচ করার চেষ্টা করেন। ১৯২৫ সালে তাঁর মৃত্য হলে তাঁর কার্য অসমাপ্ত রয়ে যায়।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম

১৯১৯ -এর ৪ঠা মে আন্দোলনের পরবর্তীকালে চীনের শ্রমিক আন্দোলন বিস্তারলাভ করতে থাকে। কমিউনিস্ট মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ চীনা বুদ্ধিজীবীরা সাংহাই, হুনান এবং অন্যান্য এলাকার শ্রমিকদের সঙ্গে যােগাযােগ করেন, বিভিন্ন এলাকায় ট্রেড ইউনিয়ন, ক্লাব, আংশিক সময়ের বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। পিকিং, সাংহাই, কোয়াংচৌ এলাকায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। যার মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে কমিউনিস্ট চিন্তাভাবনা প্রচার করা হয়। এইভাবে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শের যােগসূত্র স্থাপিত হয়। ১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালে সাংহাই শহরে প্রথম মার্ক্সবাদী গােষ্ঠীর জন্ম হয়। একই বছরের আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় চীনের সমাজতান্ত্রিক যুব লিগ। একই সময়ে পিকিং, হ্যাংকোউ, চাংশা এবং অন্যান্য বহু এলাকায় মার্ক্সবাদী গােষ্ঠী ও সমাজতান্ত্রিক যুব লীগ গড়ে ওঠে। এছাড়া দেশের বাইরে প্যারিস ও টোকিওতে একই জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। অবশেষে ১৯২১ সালের জুলাই মাসে সাংহাই শহরে চূড়ান্ত গােপনীয়তার মধ্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়।

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩০০।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top