You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > আন্তর্জাতিক > এশিয়া > ভারত > বিস্তারবাদের প্রকৃতি ও ভারত প্রসঙ্গ

বিস্তারবাদের প্রকৃতি ও ভারত প্রসঙ্গ

বিস্তারবাদ বা সম্প্রসারণবাদ (ইংরেজি: Expansionism) সাধারণভাবে গঠিত হয় রাষ্ট্রের ও সরকারের সম্প্রসারণবাদী নীতিগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। কেউ কেউ এটিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সাথে যুক্ত শব্দ হিসেবেও ব্যবহার করেন। আরো সচরাচরভাবে সাধারণত বিস্তারবাদ নির্দেশ করে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত ভিত্তি বা অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির মতবাদ, যদিও সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে এটি করা প্রয়োজনীয় নয়। এটি সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও আবাসভূমিবৃদ্ধিবাদের (Lebensraum) সাথে তুলনীয়। প্রতিরক্ষা, সম্পদ বা বাজারে প্রবেশাধিকার, জাতীয় গর্ব, বা অনুভূত জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব বিস্তারবাদের কারণ হতে পারে।

কিন্তু যখন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে আগের ভূমি দখল বা হারানো ভূমি পুনর্দখল করা তখন শাসনবাদ (Irredentism), প্রতিশোধবাদ (Revanchism), অথবা প্যান-জাতীয়তাবাদ মাঝে মাঝে সম্প্রসারণবাদকে ন্যায্য এবং বৈধ করতে ব্যবহৃত হয়। একটি সরল ভূখণ্ডগত বিরোধ, যেমন সীমান্ত বিরোধ সচরাচর সম্প্রসারণবাদকে নির্দেশ করে না।

১৭৬০ ও ১৮৭০ এর দশকের মাঝের সময়গুলোতে পশ্চিম ইউরোপের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ পূর্ববর্তী শতাব্দীর সম্প্রসারণবাদ ও উপনিবেশবাদ থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে পৃথক ছিল। শিল্প বিপ্লবের উত্থানের সাথে সাথে, অর্থনৈতিক ঐতিহাসিকরা সাধারণত ১৭৬০-এর দশকেই সন্ধান করে বুঝতে পারে যে, এবং সাম্রাজ্য-সৃষ্টিকারী দেশগুলিতে শিল্পায়ন অব্যাহতভাবে ছড়িয়ে পড়ে; ফলে ঔপনিবেশিত দেশগুলোতে বাণিজ্য কৌশল পরিবর্তিত হয়। অতীতের মতো ঔপনিবেশিত দেশসমূহের পণ্যের প্রাথমিকভাবে ক্রেতা ছিলো যে ইংল্যান্ড ও ইউরোপ, তারাই বিনিময়ের ভারসাম্য বদলে দেয় এবং শিল্প বিপ্লবের ফলে পর্যাপ্ত বিক্রয়যোগ্য দ্রব্য সরবরাহের চাপে, শিল্পায়নশীল দেশগুলি তাদের মেশিনে উৎপাদিত পণ্যগুলির ক্রমবর্ধমান পরিমাণের জন্য নতুন বাজারগুলির অনুসন্ধানে সক্রিয় হয়ে উঠে। পরিণতিতে পশ্চিম ইউরোপের উপনিবেশ স্থাপন প্রয়োজন হয়ে পড়ে, লাখ লাখ গণহত্যায় নেমে পড়ে ইস্ট ইন্ডিয়া ও তার সহযোগী-প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো। উপরন্তু, ঔপনিবেশিত এলাকায় উত্পাদিত পণ্যগুলির চাহিদায় আমূল পরিবর্তন আসে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঔপনিবেশিত এলাকার উৎপাদিত পণ্যগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়। শিল্প এলাকার বৃদ্ধির কারণে শিল্পের জন্য কাঁচামালের চাহিদা (যেমন, তুলা, উলের, উদ্ভিজ্জ তেল, পাট, রঙিন কাপড়) অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং খাদ্যশস্য (গম, গচা, কফি, কোকো, মাংস, মাখন, ডাল ইত্যাদি) শিল্প বিপ্লবের আগের বাণিজ্যিক পণ্য মশলা, চিনি, এবং ক্রীতদাস অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

বাণিজ্যের ধরনগুলোতে এই দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন ঔপনিবেশিক নীতি এবং অনুশীলনের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক অধিগ্রহণের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনে। বাজার তৈরির তাত্পর্য এবং নতুন উপকরণ এবং খাদ্যের অবিচ্ছিন্ন চাপ অবশেষে ঔপনিবেশিক প্রয়োগে প্রতিফলিত হয়, যা ঔপনিবেশিত অঞ্চলগুলোকে শিল্পায়নকৃত রাষ্ট্রগুলির অধীন করে, পশ্চাৎপদ এলাকাগুলো ইউরোপের করতলগত হয়। এই ধরনের পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত অঞ্চলে বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থাগুলির ভাঙনে প্রধান ভূমিকা রাখে, পশ্চিম ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ গোটা দুনিয়ায় বিস্তৃত হয় যা বিস্তারবাদ হিসেবে নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে পড়ে।

১৭৬৩ সাল থেকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত চলে পশ্চিম ইউরোপের উপনিবেশবাদী কার্যকলাপ যা গোটা দুনিয়ায় লুটপাট চালায় এবং ইউরোপে সমস্ত সম্পদকে কেন্দ্রীভূত করে।  তবুও, ১৭৬০-এর প্রথম দিকের ঘটনাগুলির একটি সংহতি ছিল, যা অনেক যোগ্যতা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় সম্প্রসারণবাদে একটি নতুন পর্যায় আনে, এবং বিশেষ করে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সাম্রাজ্য, গ্রেট ব্রিটেন গড়ে উঠে। এটি শুধু গ্রেট ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবই নয়, এটি এই সময়ের সাথে যুক্ত করিয়ে দেয় সাত বছরের যুদ্ধে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের সিদ্ধান্তমূলক বিজয় এবং দ্বিতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে উপনিবেশবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার শুরু ১৭৬৩ সালকে ধরা যায়।

১৭৬৩ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত সময় হচ্ছে পশ্চিম ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী দেশসমূহের স্থিতির কাল। ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত তারা গোটা দুনিয়ার ৬৮ শতাংশ এলাকা নিজেদের কব্জায় নেয়। উনিশ শতকের শেষভাগে এবং ২০ শতকের শুরুতে কমপক্ষে দুটি পরিবর্তন নতুন যুগের সূচনা করে,  প্রথমত: (১) উপনিবেশিত এলাকাসমূহের উল্লেখযোগ্য গতিপথ; এবং (২) ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি। কিছু নতুন শিল্পায়িত শক্তি, কিছু নতুন উপনিবেশবাদী শক্তি পশ্চিম ইউরোপের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, তারা পুনরায় গোটা দুনিয়াকে ভাগ করার আহবান জানায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯১৪ সালে সাম্রাজ্যবাদী মহাযুদ্ধ শুরু করে। ফলে সাম্রাজ্যবাদের বিস্তৃতির আরম্ভকাল হিসেবে ১৮৭০-এর দশককে ঐতিহাসিকগণ বিবেচনা করে থাকেন।

বাংলাদেশ ও নেপালে বিস্তারবাদ বা সম্প্রসারণবাদ শব্দটি সাধারণত ভারতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভারত বিস্তারবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী উভয় বৈশিষ্ট্যই অর্জন করেছে। ভারত এখন পুঁজিবাদ, বিস্তারবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সমন্বয় যদিও এটি অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নামছে না। ভারত তার বিস্তারবাদী চরিত্র থেকে যেমন আশপাশের দেশগুলোতে পণ্যের বাজার দখল করছে তেমনি তার সাম্রাজ্যবাদী বৈশিষ্ট্য থেকে কাশ্মীর, সাত বোন ও সিকিম দখল করেছে।

সমাজ-গণতন্ত্রী বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল ও ভারতের এসইউসিআই গোত্রের তত্ত্ববিহীন অনুশীলনপন্থী কমরেডরা একটি সহজ হিসাব মিলিয়ে দেন যে টাটা-বিড়লা-আম্বানিরা যেহেতু গোটা দুনিয়াতে ব্যবসার জন্য নেমে পড়েছে, বিদেশে পুঁজি খাটাচ্ছে; তাই ভারত এখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। এইভাবে তারা ভারতের বিস্তারবাদী বৈশিষ্ট্যকে আড়াল করে। এই সংগঠন দুটি যারা ভারতকে সম্প্রসারণবাদী বলে তাদের যুক্তিগুলো বিবেচনায় নিতে চান না। ভারত কেন সাম্রাজ্যবাদী নয় সেজন্য প্রধান প্রশ্নটি এটি যে, ভারত কেন অন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সাথে বিরোধে জড়ায় না, ভারত কেন ভারী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে যায় না, এমনকি ভারত কেন রেল-শিল্পেরও সর্বোচ্চ উন্নতি করে না? ভারতের শিল্পপতিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা মুৎসুদ্দি চরিত্রের এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিরোধহীন।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের অন্যতম শত্রু হলো ভারতের শোষক শাসকশ্রেণী, সাম্প্রদায়িক হিঁদু জাতিদম্ভবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও দেশটির বৃহৎ পুঁজি। দেশটি অবৈধভাবে সিকিম, সেভেন সিস্টার্স, কাশ্মীরকে দখল করে সেখানে গত ৫০ বছর জরুরী অবস্থা জারি করে রেখেছে। আর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে চলছে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার বহনকারী কেন্দ্রীভূত ভারত রাষ্ট্র তার পড়শি দেশগুলো ও নিজ দেশের বিভিন্ন জাতি ও জনগণকে তার শাসন-শোষণের জোয়ালের নিচে আনতে বলপ্রয়োগ করছে। বৃহত হিঁদু জাতিদম্ভবাদের লক্ষ্য হচ্ছে জাতিগত ও ধর্মীয়  সংখ্যালঘুদের ওপর অভ্যন্তরীণ নির্যাতন বৃদ্ধি করা। বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অনুগত থেকে এইভাবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ দক্ষিণ এশিয়ার সকল জাতি ও জনগণের ওপর নির্যাতনকারী সবচেয়ে আধিপত্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অতীতে কয়েক দশক ধরে ভারত সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় এই অপকর্মটি করছিলো এবং এখন বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ, প্রধানত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনে এটি চালিয়ে যাচ্ছে।

ভারত মহাসাগরে নজরদারি বৃদ্ধির ভারতীয় উদ্যোগের খবর গত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৩ টাইমস অফ ইন্ডিয়া প্রচার করে যাতে এই ভারত মহাসাগর সহ এখানে প্রদর্শিত মানচিত্রের এলাকাগুলোতে প্রভাব বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১.  Magdoff, Harry. “European expansion since 1763.” Www.britannica.com, Encyclopædia Britannica, Inc. , 20 July 1998, www.britannica.com/topic/colonialism/European-expansion-since-1763.

২. Bagchi, Indrani. “India looks to expand strategic footprint in Indian Ocean.” The Times of India, Bennett, Coleman & Co. Ltd., 16 Dec. 2013, timesofindia.indiatimes.com/india/India-looks-to-expand-strategic-footprint-in-Indian-Ocean/articleshow/27446456.cms.

আরো পড়ুন:  আসামে সংকট, দায়ী কে?
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top