Main Menu

অসমে বাঙালি মৃগয়া কি গণহত্যায় পরিণত?

এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নবায়নের নামে বাঙালি বিদ্বেষী শাসক যেভাবে জাতিবিদ্বেষ ও হিংস্রতায় প্ররােচনা দিয়েছে, তাতে তিনসুকিয়ার গণহত্যা অনিবার্যই ছিল। পাঁচজন বাঙালি দিনমজুর যে অকালে আততায়ীর নৃশংসতায় প্রাণ হারালেন, একে যত বিশেষণ দিয়েই নিন্দা করি না কেন তাতে এই মূল বিষয় ঝাপসা হবে না যে, এঁদের মাতৃভাষাই মৃত্যুর কারণ। এরকম তাে হওয়ারই কথা। দুর্গাপুজোর ঠিক আগে গুয়াহাটির পানবাজারে যে বােমা বিস্ফোরিত হয়েছিল, তাতে বীরপুঙ্গব পরেশ বড়ুয়া বিদেশে ঘাপটি মেরে থেকে হুংকার দিয়েছিল: বাঙালিরা সাবধান। কেন এই দাম্ভিক শাসানি? কারণ অসমে তাদের ঠাঁই নেই। এই ঘৃণা ও হত্যার আগাম সংকেত দিয়েছিল আলফা নামক রাষ্ট্রবিরােধী অপশক্তির অন্য আরও মুখপাত্রেরা, মৃণাল হাজারিকা, জিতেন দত্ত। মৃণাল ২৪ অক্টোবর ভিডিয়াে বার্তায় জানিয়েছেন, অনেকটা যেন হিন্দি ছায়াছবির বিখাত সেই সংলাপের ধরনে—একজন একজন করে বাঙালিকে ‘চুন চুনকে মারুঙ্গা’ যদি ওরা এনআরসি সম্পর্কে ট্যাঁ-ফোঁ করে। ভালাে কথা, ইনি শাসক দলের ঘনিষ্ঠজন।

আর, জিতেন দত্ত তাে মধ্যযুগের নাইট। তিনি নৈহাটিতে প্রকাশ্য জনসভায় হুঙ্কার দিয়েছিলেন। এক হাজার বাইক-আরােহী নিয়ে বরাক উপত্যকায় অভিযান করবেন। এবং বেয়াদপ বাঙালিদের উপর অসমিয়া আধিপত্য কায়েম করবেন। হ্যাঁ এইসবই ঘটেছে এই ২0১৮ সালে, যখন বেছে বেছে বাঙালিদের নাম নানা অজুহাতে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। অথচ এত বড় ‘গণতান্ত্রিক কাজে বাধা দিচ্ছে বাঙালিরা এমন স্পর্ধা তাে মেনে নেওয়া যায় না। সবই চলছিল নিয়মমাফিক। ডিটেনশন ক্যাম্পে ‘ডি ভােটার’ সাজিয়ে অসহায় বাঙালিদের মুরগির মতাে পুরে দেওয়া হচ্ছিল। অখণ্ড ভারতের সন্ততি মাত্রেই ভারতীয় এবং খণ্ডিত দেশের কোনও অংশেই তাদের ‘বিদেশি’ বলা চলে না। কিন্তু কে কার কথা শােনে। একে একে ভয়ে অপমানে লাঞ্ছনায় ৩১ জন বাঙালি আত্মহত্যা করেছেন।

কিন্তু এইসব আত্মহত্যা কি রাষ্ট্রীয় হত্যালীলা নয়? যে পাঁচজন। দিনমজুর গণহত্যার শিকার, রাষ্ট্রই তাে তাদের প্রকৃত আততায়ী। যে বন্দুকের নল তাদের মৃত্যু দিয়েছে, তা তাে ধরা আছে ঘৃণা-বিদ্বেষসর্বস্ব উগ্র আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদের হাতে। আর সেই প্রভুত্বের পেছনে আছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান নীতির প্রবক্তা মধ্যযুগীয় ধর্মোন্মাদনায় বিশ্বাসী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তি। কীভাবে ভুলব, এই অপশক্তির সবচেয়ে বড়াে চক্ষুশূল বাঙালি জাতি। নইলে শাসক দলের সর্বাধিনায়ক এতখানি তাচ্ছিল্যে বাঙালিদের ‘উইপােকা’ বলতে পারে? এইসব ঘােষণায় কি প্ররােচিত হয়নি আততায়ীরা? তাহলে এনআরসির আতঙ্কে যাঁরা আত্মঘাতী হয়েছেন এবং যাঁরা অসমের তিনসুকিয়ার কাছে বেঘােরে প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?

আরও একটি বিষয় লক্ষ করুন। গতকালই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অসমের বাঙালিরা একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন: পনেরােটি মূল নথি বহাল আছে। প্রতীক হাজেলা তার অদৃশ্য প্রভুদের নির্দেশে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়েছিল, তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বাঙালি কিন্তু পায়নি কিছুই, যা ছিল তাই বহাল থেকেছে শুধু। কিন্তু এটা যাদের আঁতে ঘা দিয়েছে তারাই চূড়ান্ত কাপুরুষের মতাে ঘাতকের বেশে দেখা দিয়েছে ওই দিনমজুরদের কাছে। এটি তবে আরও দুর্যোগের আগাম সংকেত অসমের বাঙালির জন্যে? না, এ আসলে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের সর্বত্র বসবাসকারী বাঙালির অশনি সংকেত। কেননা, উইপােকা নিকেশের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গণহত্যার সূচনা হয়েছে, আমরা কি আততায়ীর দুঃসহ স্পর্ধা প্রতিহত করব না?

লেখক: প্রাবন্ধিক ও প্রাক্তন উপাচার্য, অসম বিশ্ববিদ্যালয়, উৎস: একদিন, ৩ নভেম্বর, ২০১৮

আরো পড়ুন

তপোধীর ভট্টাচার্য একজন লেখক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৯।  অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে আছে প্রতীচ্যের সাহিত্যতত্ত্ব, পশ্চিমের জানালা, রোলাঁ বার্ত তাঁর পাঠকৃতি, টেরি ঈগলটন তাঁর তত্ত্বজিজ্ঞাসা, মিশেল ফুকো তারঁ তত্ত্ববিশ্ব, জাঁ বদ্রিলার সময়ের চিহ্নায়ন, জাক দেরিদা তাঁর বিনির্মাণ প্রভৃতি।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *