Main Menu

স্পেনের গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গ এবং প্রাসঙ্গিক ইতিহাস

স্পেনে ১৯৩১ সালে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়। ১৯৩১ এবং ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে ডানপন্থী ও মধ্যপন্থিরা জয়লাভ করে। নতুন সরকার অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি খর্ব করে বিভিন্ন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করে। স্পেনে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি না থাকায় এই নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী কোনো গোষ্ঠীই এই সরকারকে সমর্থন করে না। বামপন্থীদের দৃষ্টিতে এই সরকার ছিলো রক্ষণশীল আর দক্ষিণপন্থীরা এই সরকারকে অতিবৈপ্লবিক বলে মনে করে। এই অবস্থায় সরকারের মধ্যপন্থা নীতি জনসাধারণের বিশেষ সমর্থন লাভ করতে পারে না।

১৯৩৬ সালের স্পেনের সাধারণ নির্বাচনে বামপন্থী পপুলার ফ্রন্ট জয়ী হয়। স্পেনে দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীর মধ্যে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে একজন বামপন্হী পুলিশ অফিসার নিহত হন এবং তারপরেই দক্ষিণপহী একজন নেতাকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্পেনে পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মরোক্কোতে নিযুক্ত স্পেনীয় সেনানায়ক জেনারেল ফ্রাঙ্কো দক্ষিণপহীদের নেতা হিসেবে নিযুক্ত হলেন। স্পেনের সরকার এই গৃহযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং বাধ্য হয়ে সম্পূর্ণরূপে বামপন্থীদের সাহায্যেই সরকার গৃহযুদ্ধের মোকাবিলার চেষ্টা করে। ১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বরে কেব্যালেরো (Caballero) স্পেনের প্রধান মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়। কেব্যালেরো সমাজতন্ত্রে বিশবাসী ছিলেন এবং স্পেনে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েতপহী সরকার স্থাপিত হয়। বিদ্রোহী নেতা জেনারেল ফ্রাঙ্কো স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং ফ্যাসিবাদেরও সমর্থক ছিলেন। আন্তর্জাতিক পটভূমির জন্য স্পেনের গৃহযুদ্ধ ইউরোপীয় কূটনীতির ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে স্পেনে যে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয় তাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের (ইংরেজি: (League of Nations) ভূমিকা ছিল নগণ্য। সেই গৃহযুদ্ধ আইনত না হলেও কার্যত ইউরোপের সংগ্রামে পরিণত হয়। জার্মানী ও ইতালী বিদ্রোহী নেতা জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের বিভিন্ন উপকরণ প্রেরণ করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পেনের সরকারকে যথাসম্ভব সাহায্য প্রদানের চেষ্টা করে। গণশত্রু সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সরকার কোনো পক্ষই যোগদান না করে নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছিল। স্পেনের গৃহযুদ্ধে কোনো বিদেশী শক্তি যাতে হস্তক্ষেপ না করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই ধরনের নীতি (Policy of Non-Intervention) গ্রহণ করে এবং জাতিপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে লণ্ডনে একটি Non-Intervention Committee স্থাপন করে। ইউরোপের সমস্ত বৃহৎ রাষ্ট্রসহ ২৭টি দেশ এই নীতি সমর্থন করে। স্পেনের কোনো পক্ষই যাতে বিদেশ থেকে কোনো সাহায্য না পায় তার ব্যবস্থা করা হয় ইউরোপের সমস্ত সরকার মিলে। বিদেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবীরা যাতে স্পেনে প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য বর্বর ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালী ও জার্মানীর জাহাজ স্পেনের উপকূলে পাহারা দিতে থাকে এবং স্থলপথে ফ্রান্স ও পর্তুগালের সাথে স্পেনের সীমান্তরেখাতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এই ব্যবস্থা গ্রহণ করার পূর্বেই জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোকে সাহায্য করার জন্য স্পেনে প্রায় ১ লক্ষ ইতালীয় ফ্যাসিবাদী গণহত্যাকারী সৈন্যরা পৌঁছে গিয়েছিল। তা ছাড়া ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই নীতি মেনে চললেও জার্মানি, ইতালি ও পর্তুগাল কার্যত এই নীতি মেনে চলে না। তার ফলে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর দল বিদেশের সাহায্য লাভ করে, কিন্তু মাদ্রিদ্র সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সামান্য নৈতিক সমর্থন ও অল্প গোপন সাহায্য ছাড়া সমস্ত বৈদেশিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের এই নীতি Non-Intervention Policy স্পেনের আইনসম্মত সরকার এবং বিদ্রোহীদের একই পর্যায়ভুক্ত করে দেখার চেষ্টা করে—কেউ কোনো বৈদেশিক সাহায্য পাবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে স্পেনীয় সরকারের বিদেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করার পূর্ণ অধিকার ছিল।[১]

স্পেনের সরকার সাম্রাজ্যবাদী-ফ্যাসিবাদী এই Non-Intervention নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে আবেদন করে কোনো ফল হয় না—তখন মাদ্রিদ সরকার জাতিপুঞ্জের কাউন্সিলের কাছে আবেদন জানায়। জাতিপুঞ্জ এই বিষয়ে কার্যত কিছুই করতে সক্ষম হয় না। ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিপুঞ্জ Non-Intervention নীতিকেই স্বীকার করে নেয় এবং স্পেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ না করার জন্য প্রত্যেক রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়ে তার কর্তব্য শেষ করে। ১৯৩৬ সালের নভেম্বর মাসেই ইতালি ও জার্মানি জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর সরকারকে স্বীকৃতি জানায়। স্পেন থেকে বিদেশি সৈন্য অপসারণের জন্য Non-Intervention Committee চেষ্টা আরম্ভ করে এবং জাতিসংঘের সভাও সেই বিষয়ে ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। ইতালি ও জার্মানি সৈন্য অপসারণ করতে মোটেই রাজী ছিল না। আংশিক ভাবে সৈন্য অপসারণ করলেও স্পেনে জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর কর্তৃত্ব পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত জামান ও ইতালীর সৈন্য স্পেন পরিত্যাগ করে না। ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ফ্র্যাঙ্কোর সরকারকে স্বীকার করে নেয়।[১]

স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্বন্ধে জাতিপুঞ্জেরর মনোভাব ছিল যে এই সমস্যা স্পেনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং তাই জাতিসংঘের কর্তৃত্বাধীনের বাইরে। কিন্তু জার্মানী ও ইতালি জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোকে প্রত্যক্ষ ভাবে সাহায্য করার ফলে স্পেনের এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি স্পেনীয় সরকারের আইনসঙ্গত অধিকারকে খর্ব করে এবং জাতিপুঞ্জ সেই নীতিকেই সমর্থন জানায়। আসলে তখন আর জাতিপুঞ্জের পক্ষে কোনো কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী ডাকাত শক্তিসমূহের মধ্যে সেই সময়ে গোটা দুনিয়াকে ভাগবাটোয়ারা করার চেষ্টা বিরাজমান। ফলে সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই জাতিপুঞ্জকে দখল করার চেষ্টা করবার ফলে জাতিপুঞ্জ তখন রাজনীতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে অসহায় ও পঙ্গু।

১৯৩৮ সালের মার্চে ফ্যাসিবাদী জার্মান সৈন্য যখন অস্ট্রিয়াতে প্রবেশ করে তখন জাতিপুঞ্জের কাছে আবেদন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা কেউ মনে করে নি। ইতালি তখন কমিন্টার্ন বিরোধী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে জার্মানির সাথে বন্ধুত্বের সূত্রে আবদ্ধ। ১৯৩৪ সালে অস্ট্রিয়াতে জার্মান প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা যখন দেখা দেয় তখন মুসোলিনী তার বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন, কিন্তু ১৯৩৮ সালে ইতালি জার্মানির অভিযানকে সমর্থন করে। ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির সেই অবস্থায় জাতিপুঞ্জের পক্ষে কার্যকরী কোনো ভূমিকা পালন করা আর সম্ভব ছিলো না। চেকোস্লোভাকিয়ার সমস্যাও জাতিপুঞ্জে উত্থাপিত হলো না। ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানি মিউনিক চুক্তি দ্বারা এই সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করে। চেকোস্লোভাকিয়ার যে অংশ মিউনিক চুক্তির পরেও স্বাধীন ছিলো জার্মানী ছয় মাসের মধ্যে তা অধিকার করে বসে। জাতিপুঞ্জের উপর কোনো রাষ্ট্রের বিন্দুমাত্র বিশ্বাসও তখন নেই। সমবেত ভাবে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিপুঞ্জের বাইরে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সম্মেলন আহ্বান করার প্রস্তাব করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি পশ্চিমী বর্বর রাষ্ট্রগুলির গভীর অমূলক সন্দেহ থাকায় সেই সম্মেলন কার্যকরী হয় না। পোল্যাণ্ডের সমস্যা নিয়ে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, কিন্তু সেই সমস্যা জাতিপুঞ্জে উত্থাপন করার মতো উৎসাহ কোনো দেশের ছিল না। হিটলার, মুসোলিনী, জেনারেল ফ্রাঙ্কো এবং জাপানের বিরুদ্ধে জাতিপুঞ্জ কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাতে থাকে। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ তারিখে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়। এর পর থেকে জাতিপুঞ্জের অস্তিত্ব আর অনুভব করা যায় না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মহাপ্রলয়ে জাতিপুঞ্জ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। যুদ্ধের পরে জাতিপুঞ্জের স্থানে জাতিসংঘ (United Nations) নামে এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলো। এক কথায় স্পেনের গৃহযুদ্ধ ছিলো সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা বর্বরদের ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া’[২]।

তথ্যসূত্র:

১. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৫২৯-৫৩২।

২. মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, স্পেনের গৃহযুদ্ধ: পঞ্চাশ বছর পরে, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৮ জুলাই, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-৭।

আরো পড়ুন






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *