Main Menu

আমরা যে অবস্থা দেখছি তা দীর্ঘকাল থাকবে না, স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে — আবুল কাসেম ফজলুল হক

প্রথমদ্বিতীয় পর্বের পর

৩.

অনুপ সাদি: এখানে গরীবরা শাসন ক্ষমতায় গেলেই যে ধনী হয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: না, বাস্তবে দেখা যায় গরীবরা শাসন ক্ষমতায় গেলে ধনী হয়ে যায়। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ব্যতিক্রম দুর্লভ। রাশিয়া, চীন_ এসব দেশ তো একটা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছে। তাদের সামনে আদর্শ ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে, একটা সময়ের ব্যবধানে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাচ্ছে তারা আনুষঙ্গিক অন্য ক্ষমতা, যেমন_ শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ নিচ্ছে, অর্থনৈতিক ক্ষমতা-সম্পদ অর্জন করছে, রাষ্ট্রে চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা থাকলে সেইখানে তাদের ছেলেমেয়েরা বেশি সুযোগ নিচ্ছে। কাজেই এখানে মানবস্বভাব বিচার করে সমস্যার সমাধান চিন্তা করতে হবে। রাতারাতি কিংবা অল্প সময়ে কোনো উন্নতি হবে না। Nature of Man, Concept of Man বলে দর্শনের একটা সমস্যা আছে। সেই সমস্যার ভেতরে প্রবেশ করলে গণতন্ত্রের সমস্যাগুলো গভীরভাবে বোঝা যাবে। মানুষের কামনা-বাসনা ও আশা আকাঙ্ক্ষার জগতটাকে জানতে পারলে গণতন্ত্রের সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে। মানুষের কামনা-বাসনা তো শূন্যে থাকে না। মানুষের দেহের সংগে যেমন তেমনি পরিবেশের সংগেও কামনা-বাসনার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। ওই জায়গায় গেলে, মানুষের স্বরূপের সমস্যায় গেলে গণতন্ত্রের আসল সমস্যাগুলো বোঝা যাবে এবং তার সমাধান যে জটিল কঠিন তা স্পষ্ট বোঝা যাবে। তুমি যেসব সমস্যার সমাধান আশা করছো সেগুলোর সমাধান যে হাজার হাজার বছরের সংগ্রাম ও সাধনার ব্যাপার সেটা বোঝা যাবে। তবে অনেক সমস্যা আছে যেগুলোর সমাধান অল্প সময়ের মধ্যে করা যাবে।

অনুপ সাদি: পুঁজিবাদী উদার গণতন্ত্রের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে অন্তত ২০টি দেশের ওপর যুদ্ধ চালিয়েছে, বোমাবর্ষণ করেছে। এ দেশটা তো আসলে কোনো দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চায় না।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: এতে কোনো সন্দেহ নেই, খুবই সত্য কথা এটা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের … …  যে আধিপত্যবাদী নীতি, সাম্রাজ্যবাদী নীতি, কর্তৃত্ববাদী নীতি, শোষণনীতি আমরা লক্ষ্য করি, তাতে লক্ষ্য করি_ গণতন্ত্র স্বাধীনতা ও মানবতাবাদের বিকাশে তাদের ভূমিকা অত্যান্ত ক্ষতিকর। একক সুপার পাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে এই রাষ্ট্রটি অত্যন্ত জঘন্যভাবে অন্য অনেক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে চলেছে_ সন্ত্রাসী ও যুদ্ধবাজের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তাদের ভূমিকা জঘন্য থেকে জঘন্যতর হয়ে চলেছে।

অনুপ সাদি: পুঁজিবাদী উদার গণতন্ত্র নারীকে পণ্য করে রেখেছে। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র নারীকে মুক্ত করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই তো সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পতন আমাদের চোখের সামনেই ঘটে গেল। নারী পুরুষের সমান অংশ। নারীর মুক্তির একটা ব্যাপার আছে, পুরুষের মুক্তিরও একটা ব্যাপার আছে। নারী-পুরুষ উভয়ের মুক্তির ক্ষেত্রে উদার গণতন্ত্র ব্যর্থ। কিভাবে মুক্তি ঘটবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: সেটা বলা যাবে না। পুঁজিবাদী উদার গণতন্ত্রের ধারণায় একজনের সংগে অন্যজনের পার্থক্য আছে, এক রাষ্ট্রের সংগে অন্য রাষ্টের পার্থক্য আছে। ব্রিটেনের লিবারাল পার্টি থেকে উদার গণতন্ত্রের কথাটা বাইরের জগতে ছড়িয়েছে। সেই লিবারাল পার্টির তো এখন অস্তিত্ব প্রায় নেই, লিবারাল পার্টির ওপরে দাঁড়িয়ে গেছে লেবার পার্টি। নারীমুক্তির বেলায়ও বুঝতে হবে যে, মুক্তি মানে সমস্যা থেকে মুক্তি_ অর্থাৎ সমস্যার সমাধান। বিশেষ সমাজব্যবস্থায়, রাষ্ট্রব্যবস্থায়, পরিবারব্যবস্থায় নারীর যে সমস্যা দেখা দেয়, সেই সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে তা থেকে মুক্তির জন্যে চেষ্টা করতে হবে। চুড়ান্ত মুক্তির কথা বলা যায়, কিন্তু চুড়ান্ত মুক্তির রাতারাতি বাস্তবায়ন সম্ভব কোনো ছবি তো অঙ্কন করা যায় না। …….. নারীতে এবং পুরুষে পার্থক্য আছে, বায়োলজিকাল পার্থক্য আছে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষায় চিন্তা-ভাবনায় পার্থক্য আছে এবং এই পার্থক্য আমাদের জানা ইতিহাসের সবটাতেই দেখতে পাই। কাজেই ১০, ৫০, ১০০ বা ২০০ বছরের মধ্যে সমস্যার পরম সমাধান হবে_ এটা আশা করা তো বাতুলতা মাত্র। তবে এটা আমরা দেখি, যে-কথাটা গণতন্ত্র বা অন্যান্য প্রশ্ন সম্পর্কেও বলেছি যে, আমরা যদি ফরাসি বিপ্লবের পূর্ববর্তী ২০০ বছরের ইউরোপের সমাজের অবস্থা দেখি, তাহলে সেখানে নারীর অবস্থা যতটা বঞ্চনার, নির্যাতনের মধ্যে দেখতে পাই, তা থেকে পরবর্তী ২০০ বছরের অবস্থার অনেকখানি উন্নতি দেখি। আজকে আমরা যে অবস্থা দেখছি সে অবস্থা দীর্ঘকাল থাকবে না, স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাতে মুক্তি বা অগ্রগতি বা সমস্যার সমাধান হবে। এক সমস্যার সমাধান হলে নতুন আরেক সমস্যা দেখা দেবে। তারপর সেই সমস্যারও সমাধান করতে হবে। এই ভাবেই এগুতে হবে। নারী এবং পুরুষ যতদিন থাকবে ততদিনই তাদের সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা থাকবে।

অনুপ সাদি: তাহলে নারীমুক্তির ব্যাপারটা নিয়ে কি আলাদাভাবে চিন্তা করার দরকার নেই?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: আছে দরকার, কারণ নারীরা যেহেতু পুরুষ থেকে কোনো কোনো দিক দেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, সুতরাং তাদের স্বতন্ত্র সমস্যা আছে। এমনকি পুরুষের কিছু আলাদা অসুখ আছে, নারীরও কিছু আলাদা অসুখ আছে, সেগুলোতে আলাদা চিকিৎসার কথা ভাবতে হয়। সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের সমস্যার কথা আলাদাভাবে চিন্তা করতে হবে। আবার অনেক সমস্যা আছে যেগুলোতে নারী-পুরুষ উভয়কে মিলিয়েই সমাধান খুঁজতে হবে। মেয়েদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও পুরুষের সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। পুরুষের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির জন্যও মেয়েদের সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। নারী-পুরুষ মিলেই তো মানুষ। মানুষ বললে শুধু পুরুষকে বোঝায় না, মানুষ বললে শুধু নারীকেও বোঝায় না, নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়। কাজেই সমস্যাগুলোকে নির্দিষ্ট পরিবেশের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়কে মিলিয়েই দেখতে হবে। তারপরে মেয়েদের সমস্যা আলাদা করে আইডেন্টিফাই করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। পুরুষকে নারীর কিংবা নারীকে পুরুষের শত্রুরূপে দেখলে ভুল করা হয়। নারীর সমস্যার মূল জায়গা পরিবার। নারীর মুক্তির ও উন্নতির জন্য পরিবার ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।

অনুপ সাদি: নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা ছাড়া কি ধনী-দরিদ্র্যের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর সম্ভব? নারী-পুরুষের বৈষম্যের  ক্ষেত্রে কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্যটাই মূল ফ্যাক্টর।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: নারী-পুরুষ যদি একসংগে সংসার করে, যদি তাদের পরিবার সন্তানাদি ও সম্পত্তি থাকে, তাহলে নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক সাম্যের প্রশ্নটা এভাবে আসবে যে, সম্পত্তির মালিকানা_ পরিবারের সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকার কী হওয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাঙলাদেশের বাস্তবতায় আইন-কানুনের পরিবর্তনের দরকার আছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনগুলো যারা ‘নারীবাদী আন্দোলন’ করছেন, সেই নারী-পুরুষেরাও ভালো করে, স্পষ্ট করে, বলছেন না। কারণ পরিবর্তন সাধনে সমস্যা আছে। মেয়েদের কাগুজে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পরিবর্তন ঘটানো হলেই যে মেয়েরা অধিকার ভোগ করতে পারবে, এ নিয়েও সংশয় আছে। সে কারণেই হয়তো তারা বিবাহ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন-কানুন পরিবর্তনের কথা জোরেশোরে বলেন না। কিন্তু আমি মনে করি সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার ও হস্তান্তর সম্পর্কিত আইনগুলোতে বড়ো রকমের পরিবর্তন সাধনের দরকার আছে_ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও দরকার আছে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যও দরকার আছে, নারী-পুরুষের মানবসৃষ্ট অসাম্য দূর করার জন্যও দরকার আছে। নারীর উন্নতি, পুরুষের উন্নতি, সন্তানাদির উন্নতি, সকলের উন্নতির জন্যেই এবং সমাজে অথবা ধনী-দরিদ্রের মধ্যে মানবসৃষ্ট বৈষম্য দূর করে উন্নত সুন্দর সমাজব্যবস্থা ও জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি অর্জনের উপায় ইত্যাদি বিষয়ক আইন-কানুনের বড়ো রকমের পরিবর্তন দরকার। শুধু বাঙলাদেশের নয়, পৃথিবীর সকল দেশেই দরকার। বিয়েতে দেনমোহর ও খোরপোষ সংক্রান্ত যেসব কথা মুসলমানদের ক্ষেত্রে দলিলে লেখা হয়, তাতে তো আসলে মেয়েদের বেলায় বিয়ে মেয়ের পিতার দিক থেকে কন্যা বিক্রয়ের তুল্য। অন্য ধর্মসমূহের বেলায় যে বিশেষ উন্নত আইন ও নীতি কার্যকর আছে তা তো নয়। আমি যে গণতন্ত্রের কথা বলি তাতে বিবাহ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন-কানুনের মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য। তবে সেই পরিবর্তন সাধন করতে হবে জনমতের ভিত্তিতে; শক্তি প্রয়োগ করে কিংবা জবরদস্তি দ্বারা নয়। সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের সমস্যা আর নারী পুরুষের বৈষম্যের সমস্যাকে এক করে ফেললে ভুল করা হয়। দুই সমস্যার প্রকৃতি ভিন্ন।

অনুপ সাদি: স্যার, অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছি। বাঙালিরা কেমন জাতি? বাঙালিরা বড় জাতি কি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: বড় জাতি বলতে তুমি কি বোঝাতে চাও তার ওপর নির্ভর করছে উত্তর। জনসংখ্যার দিক দিয়ে আমরা বাঙলাদেশের বাঙালিরা পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম কি সপ্তম বৃহত্তম জনসমষ্টি। পৃথিবীতে বর্তমানে বোধ হয় ১৮৮টি রাষ্ট্র জাতিংঘের সদস্য আছে। তার মধ্যে যদি আমাদের স্থান সপ্তম কিংবা অষ্টম হয়, তাহলে তো আমরা সংখ্যার দিক দিয়ে অবশ্যই বড় জাতি।

দ্বিতীয়ত, তুমি যদি বাঙালি বলতে বাঙলা ভাষায় যারা কথা বলে তাদের সকলকে ধরো, তাহলে পৃথিবীতে বর্তমানে বাঙালির সংখ্যা অন্তত ২৩-২৪ কোটি, তার চাইতে বেশিও হতে পারে। আগরতলা, আসামের ও মেঘালয়ের কয়েকটি জেলা, পশ্চিম বাঙলার সীমান্তবর্তী বিহারের কিছু বাঙলাভাষী অঞ্চলে ধরলে বাঙলাভাষী জনসংখ্যা এর চেয়েও বেশি হবে। আসাম, মেঘালয় ও উড়িষ্যার মানুষেরা তো বাঙালির মতোই। সুবে বাংলায় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ছিল। যাক সে কথা। আমি রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় দিক বিবেচনা করে একথা বলিনি। কোনো জাতি জনসংখ্যায় বড়ো হলেই সভ্যতায়, সংস্কৃতিতে, সমৃদ্ধিতে বড় হয় না। এ দিক দিয়ে বলতে পারো বাঙালিরা দরিদ্র, দুর্বল, সংস্কৃতির দিক দিয়েও গত তিন দশক ধরে ক্ষয়িঞ্চু_ বাঙলাদেশের বাঙালিরা, ভারতের বাঙালিরা উভয়ই।

অনুপ সাদি: এদেশের মানুষ প্রথমে ভারতীয়, পরে পাকিস্থানি, তার পরে বাঙালি, এখন আবার বাঙলাদেশী। এই যে আমাদের জাতি না হয়ে ওঠা, এ দেশে জাতীয়তাবোধের সুস্পষ্ট বিকাশ না হওয়া_ বড়ো বা মহান জাতি হওয়া তো দূরের কথা_ আপনি বললেন যে দরিদ্র, দুর্বল, ক্ষয়িঞ্চু জাতি_ আসলে প্রশ্নটা হচ্ছে আমরা জাতি হয়ে উঠতে পারলাম না কেন? 

আবুল কাসেম ফজলুল হক: জাতি, জাতিয়তাবোধ, জাতীয়তাবাদ, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতিরাষ্ট্র_ এইসব কয়টি ধারনাই রাজনৈতিক ধারনা। Race অর্থে যদি জাতি বলো, তাহলে সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু Nation বা নেশনের সংগে সম্পর্কিত যতোগুলো ধারনা তার প্রত্যেকটাই রাজনৈতিক ধারনা। আমাদের জাতির রাজনৈতিক চরিত্র বা রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যই এজাতির দুর্বলতার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টিতে, রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে আমাদের জাতির গোটা ইতিহাসে দুর্বলতার পরিচয় দেখতে পাই। মধ্যযুগে, প্রাচীন যুগে, আধুনিক যুগে দেখবে এ-জাতি বিদেশিদের দ্বারা, বিভাষীদের দ্বারা, বিজাতিয় লোকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। তুর্কি, আফগান, মোগল, ইংরেজের দ্বারা শাসিত হয়েছে। বাইরের নানা শক্তি দ্বারা শাসিত হয়েছে। বাইরের নানা শক্তি দ্বারা শাসিত হয়েছে। রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির দুর্বলতার পরিচয় ইতিহাসে আছে। বাঙালির জাতীয় চরিত্রের দুর্বলতার দিক রাজনীতির দিক। আজকের দিনেও রাজনৈতিক যে সচেতনতা, চিন্তা-ভাবনা এবং জাতি হিসেবে উন্নত ও শক্তিশালী হওয়ার জন্য রাজনৈতিক অনুশীলন দরকার, সেটা এ সমাজে খুব পশ্চাদবর্তী অবস্থায়, বিকৃত অবস্থায় আছে। পরাধীনতার অনেক কুফল এ-জাতির জীবনে শিকড় গেড়ে আছে। এসব কারণে জাতীয় চেতনা, জাতীয় ঐক্যবোধ, জাতিয়তাবাদি চিন্তাভাবনা ইত্যাদির স্বাভাবিক বিকাশ এ জাতিতে হয়নি বলতে পারো। অধিকন্তু আধুনিক জাতি সম্পর্কিত ধারনাগুলো এদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে বিকশিত হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের ডিভাইড এণ্ড রুল ছিল। ভারতবর্ষে, গোটা ভারতবর্ষেই, জাতি সমস্যার সমাধান হয়নি। এই যে টু নেশন থিওরি জিন্নাহ প্রচার করেছিলেন, এটার জন্য শুধু জিন্নাহকে বা মুসলিম লিগকে দায়ি করলে ঠিক হবে না_এর পেছনে দায়িত্ব অনেকখানি কংগ্রেসেরও ছিল। গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেলকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার উপায় নেই। কংগ্রেসের যে চিন্তা ও কাজ, তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিয়েছে টু নেশন থিওরি। কংগ্রেস জাতি সম্পর্কে যে ধারনা দিয়েছে সেই ধারনা ঠিক ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টি জাতি সম্পর্কে চিন্তাই করতে চায়নি, তারা কেবল Proletarian Internationalism-এর কথা বলেছে। ভারতবর্ষে, পাকিস্তানে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিচারে কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোর কাজে প্রশংসাযোগ্য কি আছে? জাতি সম্পর্কিত বিবেচনা অনেক বেশি মনোযোগ দাবি করে ভারতীয় উপমহাদেশের সকল রাষ্ট্রে। এ জায়গায় একটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে। আমাদের জাতির ভেতরে যে অপূর্ণতা তা বাঙালি জাতির গোটা ইতিহাসের দুর্বলতারই অংশ। উন্নতি করতে হলে একেবারে মূলে গিয়ে ইতিহাস-ভূগোলের সবটা হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উপমহাদেশের সকল জাতিকে যুক্ত করতে হবে সমস্যা সমাধানের আন্দোলনে।   

অনুপ সাদি: তাহলে আমাদের জাতি হতে হবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: জাতি হতে হবে। জাতি না হয়ে ওঠার যন্ত্রণা আমাদেরকে জাতি হয়ে উঠতে সাহায্য করবে হয়তো।

অনুপ সাদি: বাঙালির দুইটা অংশ, একটা অংশ বাংলাদেশে, আরেকটা অংশ ভারতে। এই ভারতের অংশটা যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ না গ্রহণ করে ভারতীয় জাতিয়তাবাদে গেল_ এটাও তো জাতি না হওয়ারই একটা প্রক্রিয়া।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: হ্যাঁ, সেটাও জাতি হয়ে না ওঠার একটা কারণ। তারা ভারতীয় জাতি হতে গিয়ে কী আসলে ভারতীয় জাতি হতে পেরেছে? সেখানেও অনেক সমস্যা আছে, জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন আছে। কাশ্মীরে আছে, পাঞ্জাবে আছে, পূর্ব ভারতের জাতিগুলোর মধ্যে আছে, দক্ষিণ ভারতেও অসন্তোষ আছে। ভারত কি এক জাতির রাষ্ট্র? জাতি রাষ্ট্র? ভারতের জনগণ এক জাতি হয়ে উঠেনি। ভারত এক জাতির রাষ্ট্র হতে পারে না। অনেক জাতি ভারতে আছে। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় আলাদা আলাদাভাবে ভারতের প্রত্যেকটা জাতি বিকশিত হতে পারছে না_ সকলে এক জাতিও হতে পারছে না। অনেক সমস্যা আছে ভারতে। জাতি সমস্যার সমাধান ভারতে হয়নি। পাকিস্তানেও জাতি সমস্যার সমাধান হয়নি। পাকিস্তানও এক জাতির দেশ নয়। বর্তমান পাকিস্তানে অন্তত চারটা জাতি আছে। দুই দেশেই অনেক উপজাতি আছে। উপজাতিগুলোকে বাস্তব কারণে পার্শ্ববর্তী জাতিগুলোর সংগে মিলে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা আছে। জাতি সমস্যা আর জাতিভেদ প্রথা ভারতের উন্নতির পথে বিরাট বাধা। বাংলাদেশের জনগণ এক জাতি হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকে তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের অভাব দেখা যাচ্ছে।

অনুপ সাদি: বাঙলা ভাগ বাঙালিকে কতটুকু দুর্বল করেছে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: বাঙলা ভাগ অনেক কার্যকারণের মধ্যে দিয়ে ঐতিহাসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছে। দুর্বলতার ধারাগুলো আগে থেকে বিকশিত হয়ে আসছিল, ১৯৪৭ সালের বিভক্তির মধ্য দিয়ে একটা পরিণতিতে গিয়েছে। এর দ্বারা বাঙালিরা সাধারণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এই খতিটা আকস্মিকভাবে হয়নি, অনেক দুর্বলতা একত্রে ঘনীভূত হয়ে বাঙলাকে ভেঙেছে, বাঙালি আত্মকলহের সমাধান করে এক থাকতে পারেনি। তবে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে এখন বাংলাদেশই জাতি রাষ্ট্র, আর কোনোটি নয়। বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারলে বাংলাদেশের বাঙালিরা ভারতীয় উপমহাদেশের সকল জাতির পথপ্রদর্শক হতে পারত। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭২ সাল থেকেই জাতি না হওয়ার প্রক্রিয়ায় পড়ে গেছে_ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ভেঙে খান খান হয়ে গেছে।  

অনুপ সাদি: দুই বাঙলা কী এক হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: দুই বাঙলা এক হতে পারে এরকম চিন্তা কেউ কেউ করেন, স্পষ্টভাবে ঘোষণা না করলেও, পশ্চিমবাংলায় এমন লোক আছেন, বাংলাদেশেও আছেন। শক্তিশালী বৃহত বাঙালি জাতি আর বাঙালির শক্তিশালী বৃহত রাষ্ট্র হয়তো তারা কামনা করেন। আমার কাছে যেটা মনে হয় সেটা হলো, সেই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে অনেকগুলো কারণ মিলে বিভেদ বেড়েছে, বেড়েছে, কেবলই বেড়েছে। এমনকি গত ২০ বছরের মধ্যে নতুন করে ব্যবধান বেড়েছে। তাতে দুই বাঙলা এক হবে এই চিন্তাকে এখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা মনে হয় না আমার কাছে। পশ্চিম বাঙলার বাঙালিরাও বাঙালি হিসেবে বিকশিত হোক, বাংলাদেশের বাঙালিরাও বাঙালি হিসেবে বিকশিত হোক। নিজ নিজ ধারনা ও অভিপ্রায় মতো এইভাবে যদি দুই জনগোষ্ঠীর বিকাশের উপায় হয়_ ওখানের বাঙালিরা একটা জাতি হয়, এখানের বাঙালিরা একটা জাতি হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে দুই জাতির সম্পর্ক ভালো হতে পারে, তখন দুই জাতির সভ্যতা সংস্কৃতি উন্নত হলে কোনো কল্যাণকর পরিবর্তন হতে পারে।   

আরো পড়ুন সাক্ষাতকারের বাকি অংশঃ  

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাতকার, প্রথম পর্ব

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাতকার, দ্বিতীয় পর্ব

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাতকার, চতুর্থ পর্ব  

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *