Main Menu

সংগ্রামের পথ ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ নেই — আবুল কাসেম ফজলুল হক

প্রথম, দ্বিতীয়তৃতীয় পর্বের পর

৪.

অনুপ সাদি: বাঙলা ভাগ হয়ে যে সমস্যাটা হলো, অনেক লোকের মাইগ্রেশন ঘটলো, লাখ লাখ লোক শরণার্থী হলো, দুর্বিষহ জীবনযাত্রা ………….।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: বহু লোকের প্রাণ গেছে, বহু লোক পথের ভিখারি হয়েছে, সে এক মর্মান্তিক ইতিহাস। আবার কিছু লোক নানা সুযোগ সুবিধা নিয়ে ধনী হয়েছে, ক্ষমতাবান হয়েছে। পশ্চিম বাঙলায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা কর্তৃত্ব করছে, সন্ধান করলে দেখবে তাদের অনেকগুলো পরিবারই এখান থেকে রিফিউজি হিসেবে, বাস্তুত্যাগী হয়ে, ওখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। আমাদের ঢাকার সংস্কৃতিতে বাঙলাদেশে যারা কর্তৃত্ব করছে রাজনীতিবিদদের, বুদ্ধিজীবিদের ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে, তাদের অনেককেই দেখবে পশ্চিমবাঙলা থেকে আগত। যারা রিফিউজি হয়ে যায় তারা সাধারণত বেশি উদ্যেগি ও পরিশ্রমি হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে একটা ভিন্ন রকমের আত্মসচেতনতা থাকে, ভিন্ন রকমের ঐক্যবোধও থাকে। ফলে তারা উন্নতি করে। তবে সকলে পারে না; বিপুল অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তারা ভিখারি হয়ে গেছে, পথে দাঁড়িয়েছে। তুমি চিন্তা করো এই মোহাম্মদপুরে মিরপুরে যারা বিহারি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে, তারা অনেকে পশ্চিমবাঙলা থেকে এসেছে, বিহার থেকে এসেছে_ তাদের কী দুর্দশা; একবার ভেবে দেখো। অনেকে একেবারে ভিক্ষুক হয়ে গেছে, অনেকে খুব কম পারিশ্রমিকে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করে যে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করে। হয়ত তারা বিহারি, পশ্চিমবঙ্গে বিহারে থাকাকালে ভালো অবস্থায় ছিলো। কাজেই মানুষের এই দুর্দশা, দুঃখ, লোমহর্ষক দুরবস্থা দেশভাগের ফলে হয়েছে। জাতি সম্পর্কে বিকৃত ধারণার ও কার্যধারার ফলে হয়েছে। ভারতবর্ষে প্রতিটি জাতির আলাদা আলাদা স্বধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়া উচিত ছিল।

অনুপ সাদি: বিহারিদের কথা পৃথিবীর মানুষ একেবারে ভুলে গেছে, ৫০ বছরেরও আগের ঘটনা, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভুলে যাওয়া রিফিউজি হচ্ছে বাঙলাদেশের বিহারিরা। এদের মানবিক দিকটা দেখা খুবই জরুরি।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: দেখা খুব জরুরি ছিলো, এখনও জরুরি আছে। এখন জনসংখ্যার দিক দিয়ে এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দারিদ্র এবং নির্দয়তায় সাফার করতে করতে। ১৯৭১ সনের যুদ্ধের সময়ে এরা পাকিস্থান রক্ষা করতে চেয়েছিল, বাঙালিদের জন্য এদের ভূমিকা ক্ষতিকর ছিল, এদের তখনকার ভূমিকা নিজেদের জন্যও আত্মঘাতি হয়েছে।

অনুপ সাদি: বাঙালির জাতি না হয়ে ওঠার কথা হচ্ছিলো, স্বকীয় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া কি জাতিয়তাবোধ গড়ে ওঠে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: কোনো ভূভাগের জনসমষ্টির দৃষ্টিভংগি এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রবোধ জাতি গঠনের একটি অপরিহার্য শর্ত_ মর্মগত বিষয়। জাতীয় সংস্কৃতির চেতনা জাতি গঠনের মর্মে কাজ করে। যখন এই চেতনা রাজনৈতিক চেতনায় রূপ নেয় তখন তা হয় জাতীয়তাবাদ। কোনো জনসমষ্টি তখনই জাতিতে রূপ নেয়। জাতীয়তাবাদ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পরিণতি খোঁজে। জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা, জাতীয় সংস্কৃতির বোধ, জাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে উচ্চাশা-স্বপ্ন-কল্পনা না থাকলে কোনো ভূভাগের জনসমষ্টি জাতি হয় না, আমাদের কিছুটা জাতীয়তাবোধ আমরা দেখেছি পাকিস্থান আমলে, সে সময় পূর্ব বাঙলার বা পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির কথা বলা হয়েছে এবং এই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র ও শ্রেষ্ঠত্বকে ভাষাগত, সাহিত্যগত, চিন্তাগত, ভাবনাগত, আচরণগত দিক দিয়ে হাজারো উপায়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাঙলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে সেই জাতীয়তাবোধের যৌক্তিক বিকাশ আর হলো না, অনৈক্য দেখা দিলো এবং সবকিছু খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেল। এখন রাজনীতিবিদেরা ও তাদের সহযোগি বুদ্ধিজীবিরা নানাভাবে বিভক্ত করেছে জনসাধারণকে_ মৌলবাদি ও অমৌলবাদি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও বিপক্ষের শক্তি ইত্যাদিতে বিভক্ত করছে; নারীবাদিরা নারী-পুরুষে বিভক্ত করে চেতনাকে খন্ড করছে; তারপরে কোনো গবেষক বিদেশি টাকায় গবেষণা করে উপজাতিসমুহের মধ্যে বাঙালিবিরোধি মনোভাব সৃষ্টির জন্য নানাভাবে উস্কানি দিচ্ছে, বাঙালিদের সাথে তাদের ব্যবধান বাড়াবার চেষ্টা করছে। এটা ঠিক কথা যে, ছোট ছোট জাতিগুলো এদেশে ক্ষতিগ্রস্ত, এখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, এই ক্ষতিগ্রস্ত জাতিগুলোর সাথে বৃহৎ জাতির ঐক্য সৃষ্টি করা, এবং বাঙলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে সকলের সমস্যার সমাধান করা দরকার। অতীতের অন্যায়সমূহ দূর করা দরকার। কিন্তু বিভেদ বাড়ানো ও বিভক্ত করার প্রক্রিয়া দ্বারা তা হবে না, উস্কানিমূলক কাজের দ্বারা তা হবে না। অতীতের তিক্ততা ও রক্তপাতের স্মৃতি থেকে সকলের মনকে মুক্ত করা দরকার, ক্ষুদ্র জাতিসমূহের উপর চাপিয়ে দেয়ার ও শোষণের প্রক্রিয়া বন্ধ করা দরকার। সকলের উন্নতির কর্মসূচি, কর্মনীতি ও কর্মপ্রক্রিয়া দরকার।

অনুপ সাদি: বিভিন্ন জাতির মধ্যে নিজেদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যেও তো আলাদা সৃজনশীল সংস্কৃতি প্রয়োজন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: ক্ষুদ্র জাতিসমূহের সংস্কৃতির বিকাশ বাঙলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে, তাদের নিজের ইচ্ছানুযায়ি হবে_ এই নীতি বাঙলাদেশে দরকার।

অনুপ সাদি: একটা দেশে অনেকগুলো জাতি আছে; যেমন ভারতেও অনেকগুলো জাতি আছে। এখন তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্টার জন্যেও তো আলাদা আলাদা সংস্কৃতির বিকাশ দরকার।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: আলাদা আলাদা সংস্কৃতির বিকাশ দরকার সত্য; তবে যেগুলো একেবারে ছোট জাতি_ উপজাতি বলা হয়_ তারা পার্শ্ববর্তি বড় জাতির সংগে মিলে রাষ্ট্র গঠন করবে। কিন্তু ভারতের যে অবস্থা, তাতে আমি তো মনে করি যে, ভারতের প্রত্যেকটা জাতির জন্য আলাদা আলাদা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়া উচিত এবং প্রত্যেক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাতন্ত্র নিয়ে সকল রাষ্ট্র মিলে একটি কনফেডারেশন গঠন করতে পারে। কনফেডারেশনটা সাময়িক ব্যাপারও হতে পারে, স্থায়ী ব্যাপারও হতে পারে। কিন্তু কনফেডারেশন থেকে যে কোনো সময়ে যে কোনো রাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার পরিপূর্ণ অধিকার থাকে। যেমন- সার্ক, সার্ক এক ধরনের কনফেডারেশন, তবে অত্যন্ত দুর্বল_ এর কার্যকারিতা প্রায় নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রই সার্ক থেকে বের হয়ে আসার অধিকার রাখে। সার্কের সভা সময়মতো হয় না আবার প্রয়োজনে হয়ও। এরকম কার্যকারিতাহীন কনফেডারেশন নয়, নিজেদের সমস্যা সমাধানের এবং উন্নতির সহায়ক কার্যকর কনফেডারেশন চাই।

কনফেডারেশনের ধারণাকে আমি ভালো মনে করি। কিন্তু কনফেডারেশনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো ভারতীয় উপমহাদেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাতিরাষ্ট্র গঠন। ভারতে গোটা বিশেক রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানে চারটা রাষ্ট্র হওয়া উচিত, প্রত্যেকটা জাতির জন্য আলাদা আলাদা রাষ্ট্র। …………. আর কনফেডারেশনের সুবিধা হলো, কোনো কোনো নীতি সব রাষ্ট্র মিলে নিতে পারে, সেটা মেনে চলতে পারে। যেমন, প্রতিরক্ষার জন্য কনফেডারেশনের রাষ্ট্রগুলো বেশি খরচ করতে না চাইলে তারা সৈন্যবাহিনী কতটা রাখবে তার সিদ্দান্ত একত্রে নিতে পারে, তারা নিজেরা যুদ্ধবিগ্রহে যাবে না, পরস্পর সহযোগিতা করবে। এটা তাদের সকলের নীতি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কনফেডারেশনের রাষ্ট্রগুলো বাইরের জগতের সাথে কীভাবে পররাষ্ট্রনীতি রাখবে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে তা নির্ধারণ করতে পারে এবং বাস্তবায়ন করতে পারে। এ জাতীয় কনফেডারেশন মঙ্গলকর; যেমন ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র এ ধরনের কনফেডারেশন ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন করেছে। তারা ইউরো নামে অর্ন্তভুক্ত দেশসমূহের জন্য এক মুদ্রার প্রচলন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কনফেডারেশন নয়, ফেডারেশন; সেখানে প্রত্যেক প্রদেশের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন আছে। ভারতে প্রদেশগুলোর পর্যাপ্ত স্বায়ত্তশাসন নেই। ভারতের শাসনতন্ত্রে প্রথমে তা ছিলো, পরে দৃঢ়তা ও বাধ্যবাধকতা দিয়ে অন্য রকম করে ফেলা হয়েছে।

অনুপ সাদি: অন্য একটি ব্যাপারও আছে, ফেডারেশনের ক্ষেত্রে; যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে ফেডারেশন, তারা কিন্তু চাইলে ৫০টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে না। ……… অনেকগুলো জাতির রাষ্ট্র এক হলে আমলাতন্ত্রের হাতে চলে যায় ক্ষমতা, তারা সিদ্ধান্ত নেয় যুদ্ধবিগ্রহের, অস্ত্র বাড়ানোর, অস্ত্র ব্যবসার। আপনি কিছুদিন আগে আমাকে … আলাপের সময়ে বলেছিলেন যে চীন এবং সোভিয়েত রাশিয়াও শোষণের উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো, যদিও শোষণমুক্তির প্রতিশ্রুতি ও চেষ্টাও তাদের ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে রাষ্ট্রের আকারটা বড় হয়ে গেলে সে রাষ্ট্রটি সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালি হয়, অন্য রাষ্ট্রের অন্য জাতির স্বাতন্ত্র স্বীকার করে না; অভিজ্ঞতাতেই এসব দেখা গেছে এবং যাচ্ছে। বহজাতির রাষ্ট্রগুলো ভেঙে আসলে বহু রাষ্ট্র হওয়া দরকার; যতগুলো রাষ্ট্র এখন বৃহত আছে, আমেরিকা চিন ভারত, আরো অনেকগুলো রাষ্ট্রই ভাঙা দরকার।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কনফেডারেশন নয়, ফেডারেশন-অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর আলাদা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার অধিকার নেই সত্য। আর চিন বড় আকার নিলেও অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। সর্বত্রই জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়া দরকার, সুপার পাওয়ার অবাঞ্ছনীয়_ গোটা মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই ইউরোপীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানি ও রাষ্ট্রদার্শনিকেরা একথা বলে আসছেন এবং আমি মনে করি যে, তাদের চিন্তা সার্বিক ধারায় বিকশিত হয়েছে। এখনো পৃথিবীতে জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র যেগুলো হয়নি সেগুলোকে ভেঙে জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা দরকার। কিন্ত সেইসংগে এইটাও মনে রাখতে হবে যে, এই উন্নত প্রযুক্তির যুগে নানারকম আর্ন্তজাতিক আইনও দরকার। জাতিসংঘ বর্তমানে যে রূপে আছে তার মধ্যে তো আমরা সে রকম আর্ন্তজাতিক আইন প্রণয়নের এবং আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক নির্ধারণের দায়িত্ব পালন দেখছি না। এটা বন্দি হয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও তাদের সহযোগি রাষ্ট্রের হাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নীতিই জাতিসংঘ চাপিয়ে দিচ্ছে মানবজাতির উপর। কনফেডারেশনের কথা যে বলছি তা কিন্তু সুপার পাওয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং তার বিপরীত উদ্দেশ্যে। উন্নত প্রযুক্তির যুগে এটা অনিবার্য। আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে, কনফেডারেশন গঠন করতে হবে। আমরা শুভবুদ্ধির দ্বারা স্থির করতে পারি যে, কোনো রাষ্ট্র আধিপত্যবাদি কিংবা আগ্রাসি হয়ে উঠবে না। কিন্তু মানুষের যে স্বভাব তাতে সে প্রবণতা দেখা দেবেই। এই প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে ভারতীয় উপমহাদেশেও কনফেডারেশনের বাস্তব উপযোগিতা আছে। কিন্তু তার আগে দরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাতিরাষ্ট্র গঠন; বর্তমানে বাঙলাদেশকেই বলা যায়, সমগ্র উপমহাদেশে একমাত্র জাতিরাষ্ট্র_ তার যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক; কিন্তু আমরা বাস্তবে দেখছি যে জাতীয় ঐক্যবোধ, জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা বাঙলাদেশের ভেতরে নেই_ জনগণ বিচ্ছিন্নতায়, অনৈক্যে, এলিয়েনেশনে, বিযুক্তিতে দুর্বল; রাষ্ট্র পরাধীন হয়ে যাচ্ছে। এ আমাদের জাতির রাজনৈতিক দুর্বলতা।

অনুপ সাদি: ১৯৪৭ সনে ভারত পাকিস্তান_ দুটি আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে। তাতে জাতিগুলো সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। হায়দারাবাদে গত ৬-৭ মাস ধরে দুর্ভিক্ষ চলছে অথচ ভারত আবার পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে। এই যে ভয়াবহ অবস্থা; এ থেকে মুক্তি কীভাবে সম্ভব হবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক:  এই মুক্তির জন্য তো যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের চেষ্টা করতে হবে, তাদের সংগ্রাম করতে হবে, অন্যেরা মুক্তি দিয়ে দেবে এটাতো আশা করা যায় না। তবে এটা ঠিক যে, যেসব রাষ্ট্র বৃহত শক্তি হয়, তাদের জনগণও ন্যায়বিচারবোধ থেকে হোক, সহানুভূতিবশত হোক, মুক্তিকামি জাতিসমূহের মুক্তির সংগ্রামে সহানুভূতি দেখায়; সে রকম ব্যাপারও আছে। কিন্তু মুক্তি অর্জন করতে হলে নিজেদেরকে সাধনা ও সংগ্রাম করতে হবে। পাকিস্থান ভেঙে বাঙলাদেশ হয়েছে, তার জন্য আমাদেরকে সাধনা ও সংগ্রাম করতে হয়েছে। বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, দেশভাগ ইত্যাদি যা কিছু হোক, স্বাধীনতার জন্য তো রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে যেতে হয়েছে। কাজেই তুমি যে হায়দারাবাদের দুর্ভিক্ষের কথা বলছো, এসব কাটানোর জন্য ওই অঞ্চলের জনগণের, ওখানে জাতির যে বাস্তব অবস্থা তাতে সেই জাতির সংগ্রাম করতে হবে। জাতি যদি শক্তিতে ছোট হয়, সংখ্যায় বেশি ছোট হয়, তাহলে শক্তি বাড়ানোর জন্য পার্শ্ববর্তি অন্যান্য জাতির, অন্য রাষ্ট্রের সহায়তা নিতে হবে; প্রয়োজনে ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে হলেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দুর্বল থাকা অপরাধ; যদি একা দুর্বল হই, তাহলে বহুজনের সাথে মিলে, ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে হলেও শক্তিশালি হয়ে বাঁচতে হবে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। মাৎস্যন্যায়েও মানুষ বাঁচার ও উন্নতির উপায় করতে পারে, অবস্থা পরিবর্তন করে উন্নত অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।

অনুপ সাদি: স্বধীনতা বা মুক্তির জন্য চিন্তার স্বাধীনতাও তো দরকার। উন্নত আধুনিক চিন্তাকে ব্যাপক জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া, তাদের মধ্যে বৌদ্ধিক-নৈতিক মিতালি গড়া ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়। চিন্তার বিকাশে দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীগণ ঢাকার বর্তমান চিন্তাবিধ্বংসী পরিবেশে কীভাবে কী করবেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: এটা ঠিক কথা যে চিন্তার স্বাধীনতা দরকার, চিন্তার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ সমস্যার আলোচনায় গেলেই আমরা দেখতে পাই যে, চিন্তা ব্যাপারটা পরিবেশের সাথেও সর্ম্পকিত; কোনো ব্যক্তির চিন্তা একান্তভাবে তার মস্তিষ্ক বা স্নায়ুমন্ডলির ব্যাপার নয়, বাইরের পরিবেশ চিন্তকের ইন্দ্রিয়ের উপরে কাজ করে, প্রভাব বিস্তার করে, সেই প্রভাবে মস্তিষ্কে অনুভূতি ও চিন্তা জাগে এবং সেই চিন্তার ধারায় চিন্তক সজ্ঞান চেষ্টার দ্বারা নানা সিদ্ধান্তে পৌঁছেন, কাজেই চিন্তার স্বাধীনতার কথা যে বলছো, যারা চিন্তার স্বাধীনতা চান, উন্নত অবস্থা চান, তাদেরকে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করে কর্মনীতি তৈরি করতে হবে, তত্ত্ব আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তব অবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠানব্যবস্থা, পদ্ধতি, পরিবেশ পরিবর্তন করতে হবে। ওই সংগ্রামে গেলেই চিন্তার স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি হবে। ভিত্তি তৈরি ও মানসিকতা তৈরি দুটোই একসাথে দরকার, দ্বিমুখি সঙগ্রাম দরকার_ মনোজীবনের পরিবর্তনের এবং বস্তুগত পরিবেষ্টন-পরিবেশ পরিবর্তনের সংগ্রাম। বস্তুগত মৌলিক ভিত্তিতে পরিবর্তন সাধন করতে হবে, উপরের স্তরে ভাসাভাসা কাজ করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। অন্তত স্থায়ি কিছু করা যাবে না, মুক্তবুদ্ধির সাথে শুভবুদ্ধি যুক্ত হলেই কল্যাণ হবে। শুভবুদ্ধিহীন মুক্তবুদ্ধি বিপদজনক হতে পারে।

অনুপ সাদি: বাঙলাদেশে সব কিছুরই মূল্য আছে, শুধু মানুষেরই মূল্য নেই। যেমন একটা বাস হঠাত করে নেমে গেল নদীতে, একসাথে ৫০ জনের মৃত্যু, এ রাষ্ট্রটাকে আমার কাছে অপরাষ্ট্র ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না_ একটা বর্বর অমানবিক রাষ্ট্র। একটা মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করেও ঠিকমতো খেতে পাচ্ছে না। এই যে বর্বরতা আর অমানবিকতা_ বুর্জোয়া জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র থেকে এটা অনেক দূরে অবস্থান করছে না কি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: তোমার কথায় সত্য আছে। এটা অমানবিক রাষ্ট্র। এতে বিরাজ করছে অমানবিক মানবীয় সম্পর্ক, তবে কোনো কথাকেই Absolute অর্থে ধরলে ঠিক হবে না। বাস্তবের সাথে মিলিয়ে অর্থ করতে হবে। মানবিক মানবীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে যারা সাফার করছে, যারা বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, তাদের সংগ্রাম করতে হবে। নিজেদের জন্য মানবীয় পরিবেশ তাদের তৈরি করতে হবে। দয়া-দাক্ষিণ্য দিয়ে কতটা হবে? কর্তব্যবোধের তাড়নায় কে কার জন্য কি করে দেয়? একবারেই যারা গরিব হয়ে গেছে, জীবনের ধারা থেকে খসে পড়েছে, তারা জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছে, তারা সংগ্রাম করতে পারবে না, তারা করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছে, তাদের জন্য করুণা দরকার-অবশ্যই দরকার। কিন্তু এদেশের মধ্যস্তরের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ, তারাও গরিব মানুষ, তাদের সংগ্রাম করার শক্তি আছে এবং সেই সংগ্রামের স্পৃহা জাগিয়ে দিতে হবে। ……. মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, মানবিক পৃথিবীর দিকে যাওয়ার জন্যে সাধারণ মানুষের ভিতরে সংগ্রাম সৃষ্টি করতে হবে, সংগ্রামের পথ ছাড়া মুক্তির আর তো কোনো পথ নেই। মুক্তি ও উন্নতির পথে সাধনা ও সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই, ছিল না, কোনোদিন হবে কী না কে বলতে পারবে? যারা পথ প্রদর্শন করবেন, নেতৃত্ব দেবেন, তাদেরকে জনসাধারণের সাথে চলতে হবে, কাজ করতে হবে।

এরপরেও আমাদের আলোচনা বিভিন্ন বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। সে প্রসঙ্গ এখানে দেয়ার দরকার নেই।

প্রকাশকাল: ১৯, ২০, ২১ ও ২২ আগস্ট, ২০০২;  দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা।

আরো পড়ুনঃ

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাতকার, প্রথম পর্ব

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাতকার, দ্বিতীয় পর্ব

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাতকার, তৃতীয় পর্ব  

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *