আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনশৈলি > পাতলা পায়খানা, অতিসার, পেটের সমস্যা নিরাময়ের পনেরটি ভেষজ ঘরোয়া সহজ চিকিৎসা

পাতলা পায়খানা, অতিসার, পেটের সমস্যা নিরাময়ের পনেরটি ভেষজ ঘরোয়া সহজ চিকিৎসা

পাতলা পায়খানার ভাইরাস

পাতলা পায়খানা বা অতিসার বা পাতলা দাস্ত (ইংরেজি: Diarrhea) প্রাথমিক পর্যায়ে একটি সাধারণ অসুখ। খাদ্যাভ্যাস, হজমে সমস্যা, অম্ল বা গ্যাস্ট্রিক, অপরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি কারণে পাতলা পায়খানা হতে পারে। আবার খাবার থেকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রয়া বা বদহজমের কারণেও এই সমস্যা হতে পারে। পাতলা পায়খানার নিরাময় করতে কিছু ভেষজ উপায় উল্লেখ করা হলো।

১. আমলকী: খুব পাতলা দাস্ত হচ্ছে, থামানো যাচ্ছে না, তখন নাভির চারিদিকে একটু শক্ত করে আমলকী বেটে আল দিয়ে তার মাঝে আদার রসে ভেজানো ন্যাকড়া দেওয়া, আর একটু একটু করে আদার রস ওতে ঢেলে দিতে হয় এবং খেতেও দেওয়া হয়। এর দ্বারা ওটা থেমে যাবে। এ মুষ্টিযোগ আজকালের নয়, ৮ থেকে ৯ শত বৎসর পূর্বেকার (চক্রদত্ত সংগ্রহ)।

২. আমগাছের ছাল ও আমপাতা: আমগাছের ছালের উপরের স্তরটা চেছে ফেলে দিয়ে সেই ছাল গাভীর দুধের সাথে বেঁটে খেলে পেট গুড় গুড় শব্দ ও পাতলা দাস্ত বন্ধ হবে এবং সেজন্য দাহ ও বেদন নষ্ট হয়। আমের কচি পাতা ও কাঁচা কদবেলের শাঁস সমভাবে বেঁটে চাল ধোঁয়া পানি দিয়ে খেলে পক্কাতিসারের উপশম হবে।

৩. ডালিমের খোসা ও বেল শুঁঠ: নতুন বা পুরাতন অতিসারে ডালিমের খোসা চূর্ণ ১ থেকে ৩ গ্রাম মাত্রায় মধু সহ সেবন করতে হবে। এছাড়া ডালিমের খোসা ২০ থেকে ২৫ গ্রাম আধ সের জলে সিদ্ধ করে ১ কাপের মতো থাকতে নামিয়ে ছেঁকে খেলে অতিসার সেরে যায়।
ডালিমের খোসা ও বেল শুঁঠের চূর্ণ সমভাগে মিশিয়ে ২ থেকে ৩ গ্রাম মাত্রায় মধু সহ সেবনেও চমৎকার ফল পাওয়া যায়।

৪. পদ্মের লতি: যাঁদের পাতলা ও সবুজাভ দাস্ত হতে থাকে সেক্ষেত্রে পদ্মের ফেকড়ি বা নতির (যাকে মৃণাল বলা হয়) ২ থেকে ৩ চা চামচ রস চাল ধোয়া জলের সঙ্গে ১০-১২ ফোঁটা মধু মিশিয়ে খেতে দিলে ওটার নিবৃত্তি হয়।

আরো পড়ুন:  অরুচি কমাতে ভেষজ ঔষধের ব্যবহার

৫. বাবলার কচিপাতা: পাতলা দাস্ত হয় তার সঙ্গে আম সংযুক্ত আছে, সেক্ষেত্রে বাবলার কচিপাতা ৩ থেকে ৪ গ্রাম আধ পোয়া জল সিদ্ধ করে এক ছটাক থাকতে নামিয়ে ছেঁকে, অল্প চিনি মিশিয়ে সেটা একবার বা দুইবারে খেতে হয়। এর দ্বারা ওটা সেরে যায়; তবে ঐ পাতা সিদ্ধ করার সময় কুড়চির ছাল ৩ থেকে ৪ গ্রাম দিয়ে থাকেন অনেক বৈদ্য, অবশ্য এটা চক্রদত্তের ব্যবস্থা।

৬. বথুয়া শাক: অতিসারে বা পাতলা দাস্তে বেগ খুব, অথচ অল্প অল্প মল নির্গত হয় এবং তাতে কুন্থও হয় প্রবল, তখন বেতে বা বতুয়া শাকের রস দই ও ডালিমের রসের সঙ্গে তিল তৈল যোগে পাক করে সেবন করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায়।

৭. শুকনো কুল ও ডালিম: অতিসার বা পাতলা পায়খানা বর্ণচোরা আমের মতো ভিতরে রং ধরে আছে অথচ বাহ্যিক প্রকাশ পাচ্ছে না এই রকম যে ক্ষেত্রে অর্থাৎ কাদা কাদা দাস্ত হয়, পেটে দুর্গন্ধও থাকে, সঙ্গে আমও যে নেই তা নয়, এই রকম অতিসারে ১০ থেকে ১৫ গ্রাম শুকানো কুল তিন কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেঁকে খেতে দিলে উপকার যে হবে না তা নয়, তবে এর সঙ্গে একটু সাদা দই মিশিয়ে খেলে ভাল ফল হয়, আর যদি সে সময়ে ডালিম (Punica granatum) পাওয়া যায়, তা হলে তার সঙ্গে ২ থেকে ১ চা চামচ রস মিশিয়ে খেলে আর কথা নেই; এটাতে উপকার হবেই; তবে একটা কথা, সব সময়ে তো ডালিম পাওয়া যায় না, তাই কুল সিদ্ধ করার সময় ডলিমের খোসা ৫ গ্রাম আন্দাজ মিলিয়ে সিদ্ধ করলেও উপকার হবে।
এছাড়া শুকনো কুলের গুড়া ৩ থেকে ৪ গ্রাম একটু সাদা দই মিশিয়ে খেলেও উপকার হয়। এই অতিসারের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ শতকের আচার্য বাগভট তাঁর সংগ্রহ গ্রন্থে লিখেছেন যে, কুলের বীজের গুড়া কাজ করে।

আরো পড়ুন:  আমাশয় রোগের ভেষজ তেরটি চিকিৎসা

৮. ধনে ও গাওয়া ঘি: যে অতিসার পিত্তবিকারজনিত কারণে হয়, এর লক্ষণ হলও অল্প প্রস্রাব ও মলটা খুবই তরল হবে, মলত্যাগ করার সময় মলদ্বার জ্বালা করবে, আর এই মলের রং প্রতিবারেই যেন বদলে যায় কখনও ঘাসের রং, কখনও হলুদ, কখনও বা পচা পাতার রং; এক্ষেত্রে ২৫ গ্রাম ধনে বেটে নিয়ে ২৫ গ্রাম গাওয়া ঘি, জল প্রায় আধ পোয়া একসঙ্গে একটি পাত্রে পাক করে, জলটা মরে গেলে কিন্তু ভাঁজা যাবে না। ওটা নামিয়ে, ছেঁকে, সকালে ও বিকালে দুবারে অর্ধেকটা আর বাকী অর্ধেকটা পরের দিন দুবারে খেতে হবে, এর দ্বারা ঐ পিত্তবিকারের অতিসার সেরে যাবে।

৯. বহেড়া এবং মুথা: পাতলা পায়খানা বা দাস্তের সঙ্গে আম বা অম্ল থাকে, সশব্দে মল নির্গত হয়, বায়ু-নিঃসরণে আতঙ্ক এই বুঝি একটু, গলে যাবে, এক্ষেত্রে বহেড়া চূর্ণ আধ গ্রাম (৩ থেকে ৪ রতি) ও মুথো (cyperus rotundus) ২৫০ মিলিগ্রাম একসঙ্গে সকালে ও বিকালে দুইবার জলসহ খেতে হয়, এর দ্বারা দু’দিনের মধ্যেই এই অতিসার প্রশমিত হবে।[১]

১০. সরিষা বীজ: ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হওয়া পাতলা পায়খানা উপশমে সরিষা বেশ উপযোগী। সরিষার ব্যাকটেরিয়া-প্রতিরোধী উপাদান পেটের সংক্রমণ সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। আধা চা-চামচ সরিষা দুই টেবিল-চামচ পানিতে এক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। ওই পানি পান করুন। দিনে দুতিনবার সরিষা ভেজানো পানি পানে আরাম পাওয়া যাবে।

১১. লাউ: শরীরে পানির চাহিদা পূরণ করে পানি শূণ্যতা রোধে সহায়তা করে লাউ বা এর রস। তাছাড়া পাতলা পায়খানা সমস্যা কমিয়ে আনতেও এই সবজি উপকারী। লাউ টুকরা করে কেটে টাটকা থাকা অবস্থায় রস বের করে নিতে হবে। দিনে দুবার ওই রস পান করতে হবে।

১২. কাঁচা পেঁপে: হালকা ও তীব্র পেট ব্যথা উপশমে কাঁচাপেঁপে বেশ উপকারী। পেঁপে কুঁচি করে কেটে পানিতে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। পানি ছেঁকে কুসুম গরম অবস্থায় পান করতে হবে। দিনে দুতিন বার পান করলে উপকার পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন:  ব্রণ ও মেছতা সারানোর ভেষজ চিকিৎসা

১৩. কলা: পাকা ও কাঁচাকলা ডায়রিয়া উপশমে সহায়ক। পাতলা পায়খানা স্বাভাবিক করে তুলতে এই ফল বেশ কার্যকর। পাকাকলা ও টক দই এক সঙ্গে ব্লেন্ড করে স্মুদি তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। এই মিশ্রণ দিনে তিন বার পান করা যায়। কাঁচাকলা সিদ্ধ করে চটকে এর সঙ্গে খানিকটা লেবুর রস ও লবণ মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

১৪. আদা: খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি হজম সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে আদা বেশ কার্যকারী। ১ টেবিল-চামচ মধুর সঙ্গে কয়েক ফোঁটা আদার রস মিশিয়ে খেলে খাদ্য বিষক্রিয়া জনিত প্রদাহ ও ব্যথা কমে যায়।

১৫. লেবু: লেবুর টক খাদ্যে বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে লেবুর রসের সঙ্গে এক চিমটি চিনি মিশিয়ে বা লাল চায়ের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১ ও ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page