আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সাহিত্য > প্রবন্ধ > বাংলা ভাষার সহজীকরণ ও বাংলা পরিভাষা সমস্যা

বাংলা ভাষার সহজীকরণ ও বাংলা পরিভাষা সমস্যা

বলা হচ্ছে বাংলা ভাষা পৃথিবীর চতুর্থ জনসংখ্যাবহুল ভাষা। প্রায় ৩০ কোটির বেশি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। সংখ্যাগত দিক দিয়ে এই পরিমাণ মোটেই হেলাফেলার নয়। কিন্তু তদুপরি কী আমরা এই ভাষা নিয়ে শঙ্কা পোষণ করি না? বাংলা ভাষা কী তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে বা বাংলা ভাষা কী একটি মৃত ভাষা হতে চলেছে; এরকম অনেক প্রশ্ন আমাদের জীবনে নানা প্রেক্ষিতে উত্থিত হয়।

বাংলা ভাষায় শব্দ সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দেন অনেকে; নতুন শব্দের অন্তর্ভুক্তি চলে আমাদের অনেকের অলক্ষ্যে। পুরাতন ও অপ্রচলিত অনেক শব্দ তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। উৎপাদনের উপকরণের বিলুপ্তি ও সমাজের পরিবর্তনের সাথে জীবনধারার পরিবর্তন ঘটে এবং তার সাথে ঘটে শব্দের ব্যবহারহীনতা। নতুন প্রযুক্তি ও নতুন সমাজের আবির্ভাবের সাথে আসে নতুন শব্দের অধিক ব্যবহার।

নতুন শব্দ বিভিন্নভাবে সৃষ্টি হয়। জনগণের প্রয়োজনীয়তা ও নতুন উদ্ভাবনি শক্তি থেকে আসে নিত্যনতুন শব্দ। শব্দের সাথে আসে চিন্তা ও তার প্রভাব। বাংলা ভাষায় লেখক-গবেষকেরা চিন্তা ও অনুভূতির গভীরতা, সূক্ষ্মতা এবং ভাষার অর্থ ও সৌন্দর্য নিয়ে ভাবার সময় কম পান। তাঁদেরকে বাংলা বানান, লিপি, উচ্চারণ, বাক্য গঠন ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্যার আলোচনা ও বিতর্ক করে অনেক সময় পার করতে হয়েছে, যা একটি অপচয়ও বটে। ফলশ্রুতিতে তারা স্বল্প আয়াসে জটিল চিন্তাকে সহজবোধ্যরূপে উপস্থাপন করতে প্রায়শ পারেন না। বাংলাভাষী অঞ্চলে দার্শনিক দীনতার এটি একটি অন্যতম কারণ।

প্রায়োগিক ভাষাবিজ্ঞানের (ইংরেজি: Applied Linguistics) বহুবিধ করণীয় থাকে; সেগুলো হচ্ছে মান ভাষা নির্মাণ, সেই ভাষার মানোন্নয়নয়ের জন্য অভিন্ন ও সুবিধাজনক বানানরীতি, পরিভাষা তৈরি ইত্যাদি।[১] বিদেশি শব্দগুলোর জন্য বাংলা ভাষায় অনেক পারিভাষিক শব্দ দরকার। বাংলা ভাষায় সাম্প্রতিক জ্ঞানের প্রচারের জন্য এই কাজটি করা দরকার। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, জ্ঞানের অজস্র শাখা যেমন প্রকৌশল, চিকিৎসাশাস্ত্র, উদ্ভিদ ও প্রাণীবিদ্যায় হাজার হাজার বাংলা শব্দ দরকার। রাষ্ট্রনৈতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রেও নতুন শব্দ দরকার। সেই পারিভাষিক শব্দগুলো তৈরি করা যেতে পারে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে। ভাষাবিদ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩ – ১৯৩১) কঠিন ও সাধারণ মানুষের জন্য দুর্বোধ্য পরিভাষা নির্মাণের বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে পরিভাষা নির্মাণে প্রথমে বাংলা কথার খোঁজ করতে হবে। বাংলা ভাষায় নিতান্তই পাওয়া না গেলে অসমীয়া, উড়িয়া, ও হিন্দি খুঁজে দেখা উচিত; তাতেও না হলে যে ভাষার যে ভাব, সেই দেশের কথাতেই নেয়া উচিত।[২] পরিভাষা নির্মাণের বিষয়টি রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (১৮৬৪ – ১৯১৯) খুব মনোযোগের সাথে খেয়াল করেছেন। ‘স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য বাংলা পরিভাষা তৈরি করে দিয়ে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে কিছুটা পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়োজনে’ তিনি পরিভাষা সংক্রান্ত অনেকগুলো প্রবন্ধ লেখেন এবং অনেক পারিভাষিক শব্দ নির্মাণ করেন। তিনি পরিভাষা নির্মাণকারীদেরকে ‘সুবিধা, সরলতা, শ্রুতিসুখতা, প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি রেখে’, ব্যাকরণ বা ব্যুৎপত্তির খুঁটিনাটি ত্যাগ করে সাহসের সাথে চলার পরামর্শ দেন।[৩] বাংলার ভাষাবিদগণ পরিভাষা নিয়ে ভেবেছেন, পরিভাষা নির্মাণ করেছেন এবং ভিনভাষার বা দেশি, লোকজ শব্দ থেকে পারিভাষিক শব্দ তৈরি করেছেন, অব্যবহৃত শব্দগুলোকে নতুন করে জীবন দান করেছেন, প্রাচীন অর্থটির পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন অর্থ আরোপ করে বাংলা পরিভাষাকে এগিয়ে নিয়েছেন; ফলে বাংলা ভাষা পেয়েছে অজস্র নতুন শব্দ।

পারিভাষিক শব্দের সংকট অনুবাদকেরা খুব অনুভব করেন, কিন্তু চিন্তার অস্থিরতা, সময়ের স্বল্পতা এবং দলগত সংগঠনের অভাবের কারণে এই কাজে ব্যর্থ হয়ে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার শব্দকেই গ্রহণ করতে হয়। একটি উদাহরণ দেয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না, ২০১১-১২ সালে বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ছয়শ প্রজাতির পাখির বাংলা নাম দেয়া হয়েছে, এই পাখিগুলোর পরিবারেরও বাংলা নাম দরকার। একইভাবে গোটা দুনিয়ার প্রায় ১০,০০০ প্রজাতির পাখির বাংলা নাম দেয়া প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। পৃথিবীর প্রায় ৪৩৩ প্রজাতির প্রাইমেটদের (ইংরেজি: Primate) বাংলা নাম দরকার। এরকম প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের লাখ লাখ বিষয়ের বাংলা শব্দ, বাংলা নাম বা পরিভাষা দরকার। কে দেবে, কোথা থেকে কীভাবে এতো শব্দ বাংলায় আসবে তা সাম্প্রতিককালের একটি জীবন্ত প্রশ্ন।   

আমরা যত বেশি জ্ঞান বাংলায় সৃজন করবো তত বেশি বাংলায় নতুন শব্দ সৃষ্টি হবে। আসল কথা হলো বাংলাকে বাঁচাতে হলে প্রচুর বাংলা শব্দ দরকার; শব্দের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া যাতে লেখকেরা সহজে বুঝতে পারেন সেজন্য শব্দগঠন সম্পর্কে বিশ্লেষণ দরকার। সাথে সাথে দরকার বাংলা ভাষা ও বাংলা ভাষাবিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞানের উন্নতি।

নতুন যুগের কবিতায় নতুন শব্দ আসবে এটাই স্বাভাবিক, নতুন শব্দ আসতে পারে লোকজ, প্রাকৃত, সংস্কৃতসহ পার্শ্ববর্তী বা সবশেষে দূরদেশি বিদেশি ভাষা থেকে। রবীন্দ্রনাথ একাই বাংলা ভাষায় তিন হাজার নতুন শব্দ যুক্ত করেছেন। পরাধীন উপনিবেশিত মানুষ বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে না চাইলে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করবেন এবং এটাই এখন বাংলাদেশে হচ্ছে। আমরা যদি বাংলার উন্নতি চাই, বাংলা ভাষায় জ্ঞানের উন্নতি চাই তবে কবিতা, উপন্যাস, নাটক; বিজ্ঞানের সকল শাখাসহ সর্বত্রই জনগণের ভাষা থেকে শব্দকে পরিশোধিত করে ব্যবহার করতে হবে। শুধু বাংলা কবিতায়, বাংলা টিভি নাটকে বা বাংলা উপন্যাসে লোকজ শব্দের ব্যবহার বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে পারবে না। মনে রাখা দরকার শুধু বাংলা ভাষাই নয়, অন্যান্য ছোট ও কম জনসংখ্যাবহুল সব ভাষাই  সাম্প্রতিককালে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।

বাংলাভাষীদের ভাষাচিন্তা মূলত বানান, বর্ণমালা, লিপি ও উচ্চারণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে। কিন্তু এই স্বল্প পরিসর থেকে ভাষাচিন্তাকে বিস্তৃত করতে হবে ভাষার জীবনপ্রবাহ রক্ষার স্বার্থেই। এ প্রসঙ্গে আবুল কাসেম ফজলুল হক লিখেছেন,

আমাদের দেশে ভাষা বিষয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাস যতটা প্রবল, সুচিন্তিত কার্যক্রমের দিকে মনোযোগ সেই তুলনায় কম।… ভাষার সমস্যাকে কল্যাণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে ভাষাগত দিক দিয়ে বিচার করার মানসিকতা এখানে সুলভ নয়।[৪]

বাংলা ভাষার বানান নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। বাংলা বানান নিয়ে বা বাংলা বানানের সংস্কার নিয়ে অনেক লেখক প্রচুর লেখা লিখেছেন। ভুল বানানকে অনেকেই ভাষার কলুষতা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এ বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট কথা হচ্ছে বাংলা ভাষা বাঁচাতে বাংলা বানানে সহজীকরণ দরকার। অযথা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতাকে বর্জন করা দরকার। জনগণ যাতে অতি সহজে বাংলা লিখতে পারে সেজন্য বানানের জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা বাদ দেয়া সমীচীন। একই ধরনের সমস্যা বাংলা বর্ণমালা, লিপি ও উচ্চারণের  ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষা সমস্যাকে অতিক্রম করবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে, বিশ্লেষণাত্মক ও বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করে দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলা ভাষার জীবনকে গতিশীল রাখতে বাংলা বানান, বর্ণমালা, লিপি ও উচ্চারণের সহজীকরণ করতেই হবে। এটি করা না গেলে বাংলা তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই থেকে মুক্ত হবে না।[৫]

তথ্যসূত্র:

১. পবিত্র সরকার, ভাষা মনন: বাঙালি মনীষা; পুনশ্চ, কলকাতা; গ্রন্থমেলা ১৯৯২, পৃষ্ঠা ৭১।

২. দেখুন, হরপ্রসাদ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, ইস্টার্ন ট্রেডিং কোম্পানি, কলকাতা ১৯৫৬, পৃষ্ঠা ২৮৩।

৩. পবিত্র সরকার, ঐ, পৃষ্ঠা ৯২-৯৩।

৪. আবুল কাসেম ফজলুল হক, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে, গ্লোব লাইব্রেরী প্রা. লি. ঢাকা, এপ্রিল ২০০২, পৃষ্ঠা ৩৮৬-৩৮৯।

৫. প্রবন্ধটি কাফি কামাল সম্পাদিত গ্রন্থ শূন্য দশকের নির্বাচিত প্রবন্ধ গ্রন্থে সংকলিত এবং প্রবন্ধটির রচনাকাল ১৯ নভেম্বর, ২০১৫।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top