Main Menu

জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে লেনিনবাদ

জাতিয়তাবাদ বা Nationalism হলো মতবাদিক ও রাজনৈতিক নীতি যা অন্যান্য জাতির তুলনায় কোনো এক জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, জাতিয় বিশেষত্ব, জাতিদম্ভ, জাতিয় বিচ্ছিন্নতা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা সম্পর্কিত ভাবধারা ও ধারণাকে একত্রে প্রকাশ করে। আর বুর্জোয়া জাতিয়তাবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদি সমাজের সৃষ্ট, যা অনিবার্যভাবে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিরোধ, বর্ণবৈষম্য, জাতিয় ও উপনিবেশিক নিপীড়নের জন্ম দেয়।[১]

জাতিয়তাবাদ বলতে প্রধানত পুঁজিবাদি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র প্রকাশক আদর্শকে বুঝায়। পুঁজিবাদের বিকাশের মধ্য দিয়ে জাতিয়তাবাদ বিকাশ লাভ করেছে। জাতিয়তবাদের ব্যাপক প্রচারের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে অভাবি দরিদ্র মানুষগুলোকে তাদের অভাব ও যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়া। জাতিয়তাবাদি জুজুর মোহে দরিদ্র সর্বহারা শ্রমিক, কৃষক শোষকদের চিনতে ভুলে যায়, শত্রুদের চেহারা ভুলে যায়। জাতিয় চেতনার ডামাডোলে সর্বহারারা ভুলে যায় কারা তাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিপিড়ন ও শোষণ করছে।

পুঁজিবাদি রাষ্ট্র জাতিয়তাবাদকে তার অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য মনে করে। পুঁজিবাদি রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণি অর্থাৎ পুঁজিপতি এবং তার সহযোগী শ্রেণি জাতিয়তাবাদের আওয়াজ তুলে সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত ও তার সহযোগী কৃষক শ্রেণিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।[২]  লেনিন লিখেছেন,

“সমস্ত সামন্ত অত্যাচার, সমস্ত জাতীয় নিপীড়ন এবং কোনো একটি জাতি বা ভাষার বিশেষ সুযোগসুবিধা দূর করা—একটা গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে এটা প্রলেতারিয়েতের অবশ্য কর্তব্য, নিঃসন্দেহেই তা প্রলেতারিয় শ্রেণিসংগ্রামের স্বার্থ, যা জাতিগত কামড়াকামড়ির ফলে ঝাপসা ও ব্যাহত হয়। কিন্তু এই কঠোরভাবে নির্দিষ্ট, বিশেষ ঐতিহাসিক সীমার বাইরে গিয়ে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের সহায়তা করার অর্থ প্রলেতারিয়েতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং বুর্জোয়ার পক্ষ গ্রহণ।”[৩]

এছাড়া শাসক ও শোষক পুঁজিবাদীরা জাতিয় ঐক্যের বুলি ও বিভ্রান্তি তৈরি করে অপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তি সংহত করার এবং তাকে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। সাম্রাজ্যবাদের আমলে পুঁজিপতিরা আরো যে কাজটি করে তা হচ্ছে অনবরত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের ক্ষুদ্র জাতিগুলোকে শোষণের জন্য বৃহৎ জাতিটির সাথে ঐক্যের কথা বলে সব জাতির সমান বিকাশকে রুখে দেয়। যেমন ভারতে পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তাদের অনুগত মধ্যশ্রেণির সহায়তায় জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করেছিল এবং সেই পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের শোষণের প্রয়োজনে বহু জাতিতে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও সকল ভারতবাসীকে এক জাতি বলে প্রচার করেছে এবং এবং সেই কাজ এখনও অনবরত করে চলেছে।[৪] এই ক্ষেত্রে ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণিটিকে গত সাত দশক ধরে সহায়তা করে চলেছে ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই (এম)। বাংলাদেশে প্রায় পঞ্চাশটির অধিক জাতির বসবাস হলেও এখানে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বাংলাদেশকে এক জাতির বলে প্রচার করেছে এবং পরে তাদের সবাইকে বাংলাদেশী হিসেবে নামকরণ করেছে।

মার্কসবাদ একটি আন্তর্জাতিকতাবাদী মতবাদ যা পুঁজির উৎখাতের লক্ষ্যে নিয়োজিত। পুঁজি যেহেতু একটি জবরদস্ত আন্তর্জাতিক শক্তি তাই এর বিপরীতে মার্কসবাদ বলে আন্তর্জাতিকতার কথা। কমিউনিস্ট ইশতেহারেই বলা হয়েছে, যে বুর্জোয়ারা “কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করে যে তারা চায় স্বদেশ ও জাতিসত্তার বিলোপ।”  এরপর মার্কস এঙ্গেলস উত্তর দিচ্ছেন যে “মেহনতীদের দেশ নেই। তাদের যা নেই তা আমরা কেড়ে নিতে পারি না।”[৫] ফলে মার্কসবাদ শুরু থেকেই জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে হাজির করেছে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির দিশা আন্তর্জাতিকতাবাদ। লেনিন লিখেছেন,

“জাতীয়তাবাদ তা সে সবচেয়ে ন্যায্য, সবচেয়ে বিশুদ্ধ, সবচেয়ে মার্জিত ও সুসভ্য হলেও, তার সংগে মার্কসবাদের কোনো আপোস নেই। সব রকমের জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে মার্কসবাদ উপস্থিত করে আন্তর্জাতিকতাবাদ। … … সমস্ত রকমের জাতীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম — তা অবশ্যই হ্যাঁ। যত রকম জাতীয় বিকাশ এবং সাধারণভাবে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’র জন্যে সংগ্রাম — অবশ্যই না।”[৬]

মেহনতি প্রলেতারিয়েত যেহেতু ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে মুক্ত, ফলে তার কোনো দেশ নেই। তাকে উচ্ছেদ করে নিক্ষেপ করা হয়েছে শ্রমশক্তি বিক্রির কেন্দ্রে। তাই বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে সকল প্রলেতারিয়েতের কর্তব্য। লেনিনের মতে ‘বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া; জাতীয়তা ও দেশের সীমানাগুলো যে ঐতিহাসিক ভাবে ক্ষণস্থায়ী, এই এই সত্য নজর থেকে সরে যাওয়া’ হচ্ছে সুবিধাবাদের মতাদর্শগত ভিত্তি।[৭] লেনিন আরো লিখেছেন,

“যিনিই প্রলেতারিয়েতের সেবা করতে চান তাঁরই কর্তব্য হলো ‘স্বদেশী’ হোক বা বিদেশি হোক, বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অটল লড়াই চালিয়ে সর্বজাতির শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করা। জাতীয় সংস্কৃতির ধ্বনিটিকে যিনি সমর্থন করেন তাঁর স্থান জাতীয়তাবাদী কূপমণ্ডূকদের মধ্যে, মার্কসবাদীদের মধ্যে নয়।”[৮]

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামী সর্বহারা শ্রেণির জন্য জাতিয়তাবাদ কোনো সহায়ক আদর্শ নয়। কারণ জাতিয়তাবাদের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য এবং বৈরি বোধের সৃষ্টি করা। অপরদিকে সর্বহারা এবং সমাজতান্ত্রিক শক্তির জন্য দরকার আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সংহতি। অনেক সময়ে দেখা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদী  রাষ্ট্রের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে জাতিয়তাবোধ সৃষ্টি, মুক্তিলাভের পরে রাষ্ট্রীয় শক্তি দখলকারী পুঁজিবাদি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সর্বহারার নতুনতর সংগ্রামের সাফল্যকে প্রতিরোধ করার জন্য সেই জাতিয়তাবোধকে একটা ভাবগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। সংগ্রামি শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে জাতিয়তাবাদের মোহ সৃষ্টি করে তাকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে পৃথক করে রাখারও সে প্রয়াস পায়।[৯] এর ফলে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদীদের মধ্যে জাতিয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি দেখা যায়। আর এই বিচ্যুতি সম্পর্কে স্তালিন বলেছেন,

“জাতিয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতিটি হলো বুর্জোয়া শ্রেণির জাতিয়তাবাদি নীতির সাথে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতিকে মানানসই করা।”[১০] 

পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদি যুগে পদার্পণ  করে তখন জাতিয়তাবাদেরও দুটি রূপ প্রকাশ পায়। এর একটা রূপ হচ্ছে অপর জাতি ও রাষ্ট্রের আক্রমণকারী ও নিপীড়নকারী আগ্রাসি জাতিয়তাবাদ। জাতিয়তাবাদের অপর প্রকাশ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তিকামি জনগণের ঐক্য সৃষ্টিকারি সংগ্রামি মনোভাবাপন্ন জাতিয়তাবাদ।

এই দুই ধারণার জন্য জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে সাম্যবাদীগণ দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করবেন এবং নিপীড়ক জাতির শাসকদের বিপক্ষে দাঁড়াবেন, নিপীড়িতের পক্ষে লড়াই চালাবেন, এবং সমস্ত লড়াইকে বিপ্লবী লড়াইয়ে, সমস্ত যুদ্ধকে গণযুদ্ধ ও বিপ্লবী যুদ্ধে রূপান্তরের চেষ্টা চালাবেন। কারণ প্রত্যেকটি জাতি বা জাতিগোষ্ঠীর কাছে বিপ্লবই হচ্ছে মূল প্রশ্ন। কোনো জাতি বা জাতিগোষ্ঠীর মুক্তিলাভ এবং ঐ জাতি বা জাতিগোষ্ঠী যখন তার উপর উৎপীড়ক রাষ্ট্র হতে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা হয়ে নিজ রাষ্ট্র গঠন করবে কিনা, অথবা উৎপীড়ক নয় এরূপ কোনো ভ্রাতৃমূলক ও ঐতিহাসিক সম্বন্ধযুক্ত জাতিগোষ্ঠীর সাথে মিলিত হবে কিনা তাহা কেবল বিপ্লবের মধ্য দিয়েই স্থির হতে পারে। কারণ, কোনো উৎপীড়ক রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় কখনও তার অন্তর্ভুক্ত কোনো জাতিকে বিচ্ছিন্ন হবার ও পৃথক রাষ্ট্র গঠনের অধিকার দিবে না।[১১] বিভিন্ন দেশের ইতিহাসই এই সত্যটিই বারবার দেখিয়েছে যে বৈপ্লবিক সংগ্রামের মাধ্যমেই নিপীড়িত জাতি ও জনগণ মুক্তি পেতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ

১. দেখুন, Sofia Kholod, What is What; A concise Dictionary of Social and Political Terms.

২. সরদার ফজলুল করিম, দর্শনকোষ; প্যাপিরাস; ঢাকা; পঞ্চম সংস্করণ; জুলাই, ২০০৬।

৩. লেনিন, ভি আই, জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য, দ্বিতীয় অধ্যায় জাতীয় সংস্কৃতি, অনুচ্ছেদ ১৩, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭১, পৃষ্ঠা ২৩] 

৪. সুপ্রকাশ রায়, জাতি সমস্যায় মার্কসবাদ, র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন কলকাতা, তৃতীয় প্রকাশ নভেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা ১৭

৫. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট ইশতেহার, ১৮৪৮

৬. লেনিন, ভি আই, জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য, দ্বিতীয় অধ্যায় জাতীয় সংস্কৃতি, অনুচ্ছেদ ১৩, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭১, পৃষ্ঠা ২২-২৩

৭. ভি. আই. লেনিন, যে উত্তরাধিকার আমরা বহন করি,

৮. লেনিন, ভি আই, জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য, দ্বিতীয় অধ্যায় জাতীয় সংস্কৃতি, অনুচ্ছেদ ১৩, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭১, পৃষ্ঠা ১২

৯. সরদার ফজলুল করিম, দর্শনকোষ; প্যাপিরাস; ঢাকা; পঞ্চম সংস্করণ; জুলাই, ২০০৬।

১০. জে. ভি. স্তালিন, সিপিএসিউ-এর সপ্তদশ কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় কমিটির রিপোর্ট, জানুয়ারি, ২৬, ১৯৩৪।

১১. সুপ্রকাশ রায়, জাতিসমস্যায় মার্কসবাদ, র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, কলকাতা, তৃতীয় প্রকাশ, নভেম্বর, ২০১৫, পৃষ্ঠা ৩১-৩২

রচনাকাল ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *