Main Menu

কবি সমর সেন বাঙালি মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর

সমর সেন (১০ অক্টোবর, ১৯১৬ — ২৩ আগস্ট, ১৯৮৭) বাংলা ভাষার সেই মহান কবি যিনি মধ্যবিত্তের ছ্যাবলামো কামনা বাসনাকে কবিতায় তুলে এনেছিলেন। তাঁর ছোটো ছোটো কবিতাগুলো মধ্যবিত্তের সুশীল পশ্চাৎদেশে একাধিক লাথি মেরে গেছে। সেইসব লাথিতে তীব্র জোর না থাকায় বাঙালির বোধোদয় আজো ঘটেনি। মধ্যবিত্ত বাঙালির পেছনে লাত্থি দেবার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (জুন ২৩, ১৯৪৮ — জুলাই ৩১, ২০১৪) পর্যন্ত যার শব্দের ধার টাকা আর ক্ষমতালোভি মধ্যবিত্তকেও তীব্রভাবে আঘাত করতে পেরেছিলো। সমর সেনের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,

“কবি সমর সেনের প্রধান অবলম্বন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের দুঃখলাঞ্ছনা, আশাহীন আনন্দহীন ধূসর অপরাহ্ণ। তিনি জনতার প্রাণের কথা শুনতে অভিলাষী। প্রায়শই মিথ্যা আদর্শবাদের ফাঁকা বুলিকে ব্যাঙ্গের কশাঘাতে জর্জরিত করতে চেয়েছেন।”[১]

সমর সেন সেই মধ্যবিত্তের আশপাশে টিকে ছিলেন যারা কলকাতা এবং পরবর্তীতে ঢাকায় বসে গোটা বাংলার জনগণের ওপরে মস্তানি ফলাত। সেই মস্তানি শুধু সাম্প্রদায়িক রক্তের হোলিখেলায় মত্তই হয়নি, আরো দৃঢ়ভাবে বাঙালি শ্রমিক কৃষক ও প্রলেতারিয়েতকে বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত করে শোষণের কলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেই নরপিশাচ বিত্তলোভি মস্তানদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে গিয়ে তিনি যে মহান মানুষটিকে সমর্থন করেছিলেন তাঁর নাম চারু মজুমদার এবং যে মহান সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তার নাম নকশাল আন্দোলন। ‘যে মধ্যবিত্ত গণ্ডিটাকে তিনি সারা জীবন উপলব্ধি করেছিলেন কিন্তু ভাঙতে পারেননি— নকশালপন্থিরা খানিকটা জোর করে সে’ গণ্ডিতে নাড়া দিতে পারায় তিনি নকশাল আন্দোলনের পক্ষপাতী হয়েছিলেন। নকশাল আন্দোলনের কমিউনিস্টরা মধবিত্ত ক্ষুদে বুর্জোয়াদের জগত থেকে ‘রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রাঙ্গণকে বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন’ এবং সমর সেন সেই বিস্তৃত জগতে নির্ভয়ে পা রেখেছিলেন; অন্যান্য সব ক্ষেত্রেই তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রতিবাদের কাজটি দৃঢ়ভাবে পালন করেছিলো যার প্রমাণ পাওয়া যাবে জনগণ, গণতন্ত্র ও শ্রমিক-কৃষকের স্বাধীনতার শত্রু, ভারতীয় পুঁজির খুনে প্রতিনিধি প্রতিক্রিয়াশীল নরপিশাচিনী ইন্দিরা গান্ধীর (১৯১৭ — ১৯৮৪) জারীকৃত ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে।[২]  

সমর সেন ছিলেন অগ্নিগর্ভে লড়াকু এক সৈনিক যার ব্যক্তিগত সমস্যায় প্রতিবাদ ছিলো না। তিনি প্রতিবাদ করেছেন শ্রমিক-কৃষকের হয়ে। ১৯৭৩ সালের শেষকালে একবার পুলিস তাঁর বাসায় হানা দিয়ে যথেষ্ট হয়রানি করে। কয়েকজন বন্ধু বললেন, একজন সম্পাদকের বাসায় পুলিসি হানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো উচিত। তিনি লিখেছেন, ‘যখন জেলে, পুলিস ভ্যানে, রাস্তাঘাটে কিশোর ও যুবক হত্যা রেওয়াজ তখন সম্পাদকের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য প্রতিবাদ’[৩] হবে কীভাবে। এই হচ্ছেন সমর সেন।

সমর সেন কবি ছিলেন, ন্যায় যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, প্রলেতারিয়েতের মুক্তি নিয়ে ভাবিত ছিলেন। একুশ শতকের শুরুতে বাঙালির অজস্র কবিদের ভেতরে সমর সেন যেন সেসব লড়াকু দুর্বল শ্রেণিযোদ্ধাদের মতোই বাংলার বিপন্ন আকাশে হারিয়ে গেছেন। তাঁকে আজ তরুণ কবিদের খুব সামান্য অংশই চেনে। আজ যত কবি দেখি, তাদের মেরুদণ্ডের খোঁজ নিতে গেলে দেখতে পাই, কাকও প্রতিবাদ করে; কিন্তু কবিরা মুনাফাপূজারি।

যেই সময়ের কবি তিনি তখনই ‘সমুদ্র শেষ’ হয়ে যেত, ‘চাঁদের আলোয়’ ‘সময়ের শূন্য মরুভূমি জ্বলে’[৪] উঠত। সেই শূন্য মরুভূমিতে বণিকেরা সভ্যতা গড়ে আর ‘একটি বেকার প্রেমিকের’ সকালবেলায় ঘুম ভাঙে ‘কলতলার ক্লান্ত কোলাহলে’। বেকার প্রেমিকের ‘রক্তে জ্বলে’ ‘মৃত্যুহীন প্রেম থেকে মুক্তি’র আকাঙ্খা। এই যে প্রেম, তার চেয়ে মৃত্যুও বড় রমণীয়, সেখানে অন্তত বেকারত্বের গ্লানি নেই।

সমর সেন যেই সমাজের আশা নিয়ে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শুনেছিলেন সেই বসন্ত আজো সুদূরপরাহত। চিংকাং পাহাড়ের অগ্নিশিখা জ্বলতে আজো অনেক দেরি, তবে তা পুনরায় শূন্য দশকে ভারতের আকাশে জ্বলার পূর্ব পর্যন্ত চোখ ক্লান্ত হয়ে গেছে তাকে খুঁজতে। আমাদের দিনগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে ছিলো। তবুও সমর সেন-এর কবিতা কানে বাজে,

“বসন্তের বজ্রধ্বনি অদৃশ্য পাহাড়ে।
আজ বর্ষশেষে
পিঙ্গল মরুভূমি প্রান্ত হতে
ক্লান্ত চোখে ধানের সবুজ অগ্নিরেখা দেখি
সুদূর প্রান্তরে।”[৫]

তিনি সাংবাদিক হয়েছিলেন, শ্রমিক কৃষকের মুক্তির জন্য সম্পাদনা করেছেন ‘ফ্রন্টিয়ার’ নামের ইংরেজি পত্রিকা, এ যুগে যেকথা শুনে হয়ত কৌতুক মনে হতে পারে। কিন্তু গণশত্রু ইন্দিরার জরুরি অবস্থার সময়ে সেন্সরধারী মূর্খ মধ্যবিত্তকে ধাপ্পা দিতে সেটি কাজে লেগেছিল। সমর সেন আলাপের কণ্ঠে আমাদেরকে শুনিয়ে দেন রক্তের আগুনের কথা যা একুশ শতকের রক এন রোল শোনা তরুণদের কাছে মশকরা বৈকি। তিনি ৩০ বছরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই কবিতা ছেড়েছিলেন, কবিতায় আর ফিরে যাননি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত না হলে যিনি গেরিলা হতে পারতেন, তিনি হয়ত কোনো গ্রামে কবিতার কাছে পরাজিত হন, কিন্তু কৃষক তাঁকে মনে রাখে। আমাদের এটিই বড় ট্রাজেডি যে সমর সেন আমাদের স্মৃতিভারাতুর মনে নাড়া দেয় না।

কবি সরোজ দত্তরা অভিযোগ করলে ১৯৪০ পরবর্তীকালের কবিতায় ‘সমান জীবনের চকিত স্বপ্ন’ নাড়া দেবে তাঁর কবিতায়। ‘মৃত্যু’ কবিতায় ‘কলের বাঁশির হাহাকারে’ ধরা পড়বে শ্রমজীবীর উপরে পুঁজিবাদী শোষণের নির্মমতা, ‘নাগরিক’ কবিতায় ‘পাটের কলের উপরে আকাশ তখন / পাথরের মতো কঠিন’। পাটকল শ্রমিকদের প্রতি কবির সহানুভূতি ছড়িয়ে পড়বে। সামাজিক বৈষম্য অবসানের প্রত্যাশা দেখা যাবে ‘নাগরিক’ শিরোনামের কবিতায়,

“কিছুক্ষণ পরে হাওয়ায় জোয়ার আসবে
দুর সমুদ্রের দ্বীপ থেকে—
সেখানে নীল জল, ফেনায় ধূসর-সবুজ জল,
সেখানে সমস্ত দিন সবুজ সমুদ্রের পরে
লাল সূর্যাস্ত
আর বলিষ্ঠ মানুষ, স্পন্দমান স্বপ্ন_”[৬]

লাল সূর্যাস্ত আর বলিষ্ঠ মানুষ নিঃসন্দেহে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের দ্যোতক। সেই বিপ্লবী স্বপ্ন তাঁর কবিতার এক অমূল্য দিক। তিনি বলছেন জোয়ার আসছে, প্লাবন আসছে, কৃষক জাগছে, শ্রমিক জাগছে। তিনি, খাপ ছাড়া ঘুমে দূরে শুনছেন জোয়ারের জল, কীসের কল্লোল! বাঁধ ভেঙে বন্যার জল আসছে; এ পৃথিবীকে মুক্ত করবে অসাম্যের অভিশাপ থেকে। বাংলায় বন্যা এক সাধারণ নিত্য বাৎসরিক অভিশাপ, সেই বন্যাকে বিপ্লবে রূপান্তরের জন্য হিম্মত লাগে, সেই হিম্মত সমর সেন এবং নবারুণ ছাড়া আর কজন কবির ছিলো। সমর সেনের হিম্মত ছিলো, কিন্তু তিনি নিজেকে বাস্তবে কী মনে করতেন? তিনি নিজেকে বিপ্লবী মনে করতেন না, একজন ছাপোষা মধ্যবিত্তই মনে করতেন যার আরেক নাম বাঙালি বাবু। তাঁর সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী বাবু বৃত্তান্তে তিনি লিখেছেন, বাবু বৃত্তান্ত

“পড়ে পাঠকেরা বুঝবেন যে জনগণের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ছিলো না, পরিধি ও পরিবেশ ছিল মধ্যবিত্ত। আমার ছাত্রাবস্থায় বাবা বলতেন আমার বন্ধু বান্ধব সবাই সচ্ছল। কথাটা ঠিক । আমাকে কেউ বিপ্লবী বললে মনে হতো — এবং এখনো হয় — যে বিপ্লবকে হেয় করা হচ্ছে। চিন্তায় ও কর্মে সমন্বয় আনতে না পারলে বড় জোর ‘বিপ্লবী” সাপ্তাহিক চালানো যায়, কিন্তু বিপ্লবী হওয়া যায় না। এমন কি স্তালিনোত্তর ‘মহান বিপ্লবী’ দেশে কয়েক বছর কাটালেও নয়।”[৭]  

এই হচ্ছেন সমর সেন, যিনি নিজেকে বিপ্লবী মনে করেন না, অথচ বিপ্লবের জন্য লিখেন, বিপ্লবীদের জন্য লিখেন। ফলে একুশ শতকে যখন মানুষের চেয়ে মুনাফার শক্তি কয়েক লক্ষ গুণ বেশি হয়ে যায়, তখন সমর সেনকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করে মালিক-পুঁজিপতি শ্রেণি। সাপের মতো মসৃণ, ধূসর অন্ধকারের ভিতরে যখন একটি জাতি সাময়িক বন্দি হয় তখন সমর সেন বিস্মৃত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। জনগণের কবি সমর সেন বেঁচে থাকবেন জনগণের হৃদয়ে। ‘মধ্যবিত্তের সাহসের দৌড়’ সম্পর্কে সুবিদিত এই মহান মানুষটি তাঁর লড়াইয়ের জন্যই আমাদের কাছে স্মরণীয়। কবিতার এই শিল্পী তাঁর জীবনের লড়াইয়েও এগিয়ে ছিলেন কৃষক-শ্রমিকের সংগ্রামের সাথে। মুক্তির সকল লড়াইয়ে সমর সেনরা অমর রহে।

তথ্যসূত্র:

১. ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত, মডার্ন বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, পুনর্মুদ্রিত নতুন সংস্করণ ২০০৭, পৃষ্ঠা ৫৯১

২. আরো দেখুন, খালেদ হোসাইন ও সাজ্জাদ আরেফিন সম্পাদিত, সমর সেন; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা; সেপ্টেম্বর, ২০০২, পৃষ্ঠা- ২৮৬।

৩. সমর সেন, বাবু বৃত্তান্ত, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৩৪

৪. সমর সেন-এর কবিতা ‘স্বর্গ হ’তে বিদায়’ থেকে

৫. সমর সেন-এর কবিতা ‘বসন্ত’

৬. ‘নাগরিক’, কয়েকটি কবিতা কাব্যগ্রন্থ থেকে

৭. সমর সেন, বাবু বৃত্তান্ত, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৪৭।

রচনাকাল আগস্ট, ২০১৪

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *