You are here
Home > সাহিত্য > প্রবন্ধ > কমিউনিস্টদের পার্টি বিষয়ক ধারণায় দুই লাইনের সংগ্রাম নাকি মনোলিথিক পার্টি?

কমিউনিস্টদের পার্টি বিষয়ক ধারণায় দুই লাইনের সংগ্রাম নাকি মনোলিথিক পার্টি?

বাংলাদেশে বামপন্থীদের ভেতরে রাজনৈতিক দল সংক্রান্ত আলোচনায় নানা প্রবণতা কাজ করে। বামপন্থীদের বৃহৎ অংশটি নিজেদেরকে কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদী এবং দলের সদস্য হিসেবে নিজেদেরকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বলে। এছাড়াও সমাজতন্ত্রী এবং সমাজগণতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক দল হিসেবেও বামপন্থীরা নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে চায়। সাধারণত সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী দলগুলোর ভেতরে বাংলাদেশে ও বাংলাভাষী অঞ্চলে পার্টির রূপ হিসেবে মনোলিথিক পার্টি এবং দুই লাইনের সংগ্রামী পার্টি সংক্রান্ত আলোচনা চালু আছে। এক্ষেত্রে মনোলিথিক পার্টি বা মনোলিথিক সিস্টেম বিষয়টি নিয়ে একটু দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন। এখানে কিছু আলোচনা করা সম্ভব হলেও উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টি নিজেদেরকে মনোলিথিক সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত হিসেবে ঘোষণা করে সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো না। 

সাধারণত বলা হয় যে সাম্যবাদী দলের ভেতরে প্রলেতারিয়েতের চিন্তাধারা এবং বুর্জোয়াদের চিন্তাধারা ক্রিয়াশীল থাকে। যখন পার্টির অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রামের কথা বলা হয় তখনো দুই মতাদর্শ, অর্থাৎ বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয় মতাদর্শের কথা বলা হয়। এছাড়াও অনেক সময় সাম্যবাদী দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযানের কথা বলা হয় তখন মূলত অসর্বহারা চিন্তা ও ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে পার্টিকে শুদ্ধ করার কথা বলা হয়। আসলে এসব কথার ভেতরে হয়ত সাধারণভাবে পার্টির অভ্যন্তরে সর্বহারা মনোভাব এবং বুর্জোয়া মনোভাবের সংগ্রামের দিকে ইঙ্গিত করা হয়। এসব সংগ্রামকে স্তালিন ও মাও সে তুং “দুই লাইনের সংগ্রাম” বলে অভিহিত করেছিলেন।

মাও সেতুং দলের জন্য লাইনের সঠিকতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। পার্টিকে বিকশিত হবার প্রক্রিয়া হিসেবে লেনিনবাদী বলশেভিক ধরনের পার্টিগুলোতে সঠিক লাইন খুঁজে বের করার উপর জোর দেয়া হয়। এসব আলোচনার জন্য আমাদেরকে মূলত দুটি চিন্তা ও মতাদর্শের দুটি ধারার দিকে নজর দেবার প্রয়োজন পড়ে। সাম্যবাদী দলে যেহেতু বিভিন্ন শ্রেণি থেকে লোক আসে, ফলে একই পার্টিতে ভুল বা অসর্বহারা ও সঠিক বা সর্বহারার দুটি ধারা ক্রিয়াশীল হয়ে যায়। ফলে পার্টির সংশোধনবাদি সুবিধাবাদী নেতারা ভুল বা অসর্বহারা দৃষ্টিভঙির প্রতিনিধিত্ব করে। সেই ভুল দৃষ্টিভংগির বিরুদ্ধে লড়াই করেই পার্টির লাইন সঠিক রাখতে হয়।

বাংলাদেশে কয়েকটি পার্টির নেতারা সাধারণত প্রচার করে এই ধরনের কথা যে “একটি সঠিক পার্টি বিপ্লব করবে”, অথবা “আমদের পার্টিই সঠিক পার্টি”। এই ধরনের কথা প্রথম কোন দলের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল তা গবেষণা করে খুঁজে বের করতে হবে, তবে সেটির প্রয়োজন নেই বলেই মনে হয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ মূলত বিকাশের ক্ষেত্রে বিপরীতের একত্ব ও সংগ্রামের কথা বলে। ফলে যদি ধরে নেই সংগ্রামের মাধ্যমে বিকাশ হয়, তবে সংগ্রাম কিসের ভেতর হবে, এমন প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক। এক পার্টি সঠিকতার ধারণাটি যথেষ্ট বিশ্লেষণের দাবি রাখে যা নিচে আমরা করার চেষ্টা করব।

সঠিক হওয়ার লড়াইটা আসলে দলের ভেতরের লড়াই, কোনো বস্তু বিকশিত হয় তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। কিন্তু যারা অন্য পার্টিকে আক্রমণের জন্য নিজেরটাকে সহি বলেন তারা বস্তুর বিকাশের নিয়ম মানেন না। বস্তুর অভ্যন্তরটাই প্রধান, বাইরেরটা শর্ত। মাও সেতুং পার্টির ধারণা সংক্রান্ত স্তালিনীয় ‘দুই লাইনের’ চিন্তাকে নিজ পার্টির ভেতরে অনুশীলন করেছেন। যারা পার্টিকে মনোলিথিক বা এক প্রস্তরীভূত বলে মনে করেন তারাও পার্টির অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রাম পর্যন্ত মানেন, এবং মাও সেতুংকে অভিযুক্ত করেন লেনিনবাদকে বিকৃত করার জন্য। তাদের কাছে প্রশ্ন করা যায় পার্টিতে যদি দুই লাইন, দুই মতাদর্শ, দুই নীতি না থাকে, তবে পার্টির কীভাবে বিকাশ হবে, পার্টি কীভাবে গতিপ্রাপ্ত হবে, পার্টি কীভাবে এগিয়ে যাবে? কারণ ভি. আই. লেনিন তো এও বলেছেন ‘বস্তুর মধ্যকার বিপরীতের দ্বন্দ্বই বস্তুকে স্বয়ংক্রিয় গতি প্রদান করে’। এছাড়াও লেনিন আরো বলেছেন, “দ্বন্দ্ব হচ্ছে সকল গতি ও জীবনীশক্তির উৎস” [১]। এসব কথার মাধ্যমে লেনিন বস্তুর অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের কথা বলছেন।[২] পার্টি যদি বস্তু হয়, তাহলে এ প্রশ্ন করা যায় পার্টি নামক বস্তুটির মধ্যকার বিপরীতের দ্বন্দ্ব দুটি কি? নাকি অভিযোগকারীরা কী পার্টিকে বস্তু বলে স্বীকার করেন না?

জে. ভি. স্তালিন এপ্রিল, ১৯২৯ সালে সিপিএস ইউ(বি)তে দক্ষিণ বিচ্যুতি সম্পর্কে যে রিপোর্ট প্রদান করেন তাতে সুনির্দিষ্টভাবে দুই লাইনের কথা উল্লেখ করেন। সেই রিপোর্টের প্রথম পয়েন্টটিই শুরু হয়েছে এই প্রশ্ন দিয়ে ‘এক লাইন, না দুই লাইন’। এরপর দীর্ঘ ৬ পৃষ্ঠাব্যাপী আলোচনা প্রশ্ন ও ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন পার্টিতে একটি লাইন থাকে না দুটি লাইন থাকে এবং সিদ্ধান্তে দেখিয়েছেন কীভাবে দলে দুটি লাইনের অস্তিত্ব ক্রিয়াশীল। শুরুর বাক্যটি একটু দেখুন। প্রথম বাক্যটিতে স্তালিন বলছেন,   

“আমাদের লাইন কয়টি — একটি একক, অভিন্ন ও সাধারণ লাইন, না দুটি লাইন? কমরেডগণ, এটাই হলো মূল প্রশ্ন।”[৩]

ছয় পৃষ্ঠার আলোচনার শেষে স্তালিন যা লিখেছেন তা আমরা একটু দেখি,  

“বর্তমান ক্ষেত্রে সত্যটি হলো এই যে, বাস্তবতই আমাদের কোনো একক, অভিন্ন লাইন নেই। একটি লাইন আছে যা হলো পার্টি লাইন, বিপ্লবী লেনিনবাদি লাইন। কিন্তু তার পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি লাইন লাইন, বুখারিন গ্রুপের লাইন, যা পার্টিবিরোধী ঘোষণা দ্বারা, পদত্যাগের দ্বারা, পার্টির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও ছদ্মাবরণকৃত বিশ্বস্ততাভংগকারি কার্যকলাপ দ্বারা, পার্টিবিরোধী জোট গঠনের উদ্দেশ্যে বিগত সময়ের ট্রটস্কিবাদিদের সাথে নেপথ্যে বোঝাপড়া স্থাপনের দ্বারা পার্টি লাইনকে বিরোধিতা করছে। দ্বিতীয় লাইনটি হলো সুবিধাবাদি লাইন। 

এটাই হলো বাস্তব ঘটনা, যেটাকে কোনো ধরনেরই কূটনীতিসুলভ বাগাড়ম্বরতা কিংবা একটি একক লাইনের অস্তিত্ব সম্পর্কিত অলংকারপূর্ণ বিবৃতি দ্বারা আড়াল করা যাবে না।”[৪]      

কিন্তু বাংলাদেশের ও বাংলাভাষী অঞ্চলে পার্টি সংক্রান্ত ধারণা কী? এই অঞ্চলে দুই লাইনের সংগ্রামকে স্বীকার করেন কতিপয় মাওবাদি ধারার রাজনৈতিক দলগুলো। এছাড়া অন্যান্য দলগুলো পার্টিকে মনোলিথিক বলেন এবং সেভাবেই চর্চা করেন। যেমন, শিবদাস ঘোষ (১৯২৩ – ৫ অগস্ট, ১৯৭৬) ‘চিনের কমিউনিস্ট পার্টির নবম কংগ্রেস’-এর আলোচনায় স্পষ্টভাবেই পার্টির অভ্যন্তরের দুই লাইনের সংগ্রামটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন।[৫] আবার ‘চিনের কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেস’-এর আলোচনায় তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন,

“দলের অভ্যন্তরে দুই লাইনের সংগ্রাম মানুষের ইচ্ছা-নিরপেক্ষ একটা সত্ত্বা—বিষয়টা এরকম নয়।”[৬]

শিবদাস ঘোষের সংগঠন এসইউসিআই’র পরবর্তীকালের সাধারণ সম্পাদক প্রভাস ঘোষ লিখেছেন, 

এঁরা [জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, ট্রটস্কি, বুখারিন] সকলেই দলের মধ্যে আলাদা আলাদা গ্রুপ ও ফ্যাকশান তৈরি করেন এবং একটি সর্বহারা শ্রেণির দল যে ডেমোক্র্যাটিক্যালি সেন্ট্রালাইজড ও মনোলিথিক পার্টি হবে, এই লেনিনিয় তত্ত্বের বিরোধিতা করেন।[৭]  

শিবদাস ঘোষের পার্টি এসইউসিআই (সি)-এর প্রক্রিয়াসমূহকে অবলম্বন করে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ। এই সংগঠনটিও পার্টিকে মনোলিথিক বলে বিবেচনা করে। বাসদের শুরুর দিকের একটি পুস্তকে পার্টিকে “একটি monolithic organism (এককেন্দ্রীক জীবন্ত অখণ্ড সত্ত্বা)” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই কথা বলেছেন শিবদাস ঘোষ অন্য আরেক লেখায়।[৮] তবে বাসদ ছাড়াও অন্য কিছু দলেও এরকম চিন্তা আছে যেমন জ্ঞানাকাশ নামে প্রচারিত একটি পুস্তিকায় ড. দেবব্রত চৌধুরী নামের একজন লেখক লিখেছেন,

কমিউনিস্ট বিপ্লবিদের করণীয় হচ্ছে সকল রূপের সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ — লেনিনবাদের ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণির বলশেভিক ধরনের মনোলিথিক পার্টি গড়ে তুলে বিপ্লবী করণীয় কার্যকরী করে সাম্রাজ্যবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ববিপ্লবকে ত্বরান্বিত করা।[৯] 

এছাড়া কমরেড আবদুল হক (২৩ ডিসেম্বর, ১৯২০ — ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৫) আলী হোসেন ছদ্মনামে লিখেছেন,

পার্টি গঠন সম্পর্কে মাও সেতুং লেনিনিয় পার্টি গঠনের নীতিকে স্বীকার করে নেননি। সর্বহারা শ্রেণির পার্টি — কমিউনিস্ট পার্টি হবে মহান লেনিনের ভাষায় ছিদ্রবিহীন পাথরের মত এককাট্টা (Monolithic party).[১০]   

কিন্তু অনেক আগে থেকেই এই মনোলিথিক পার্টির ধারনাটির বিরোধিতা করে এসেছেন কিছু নেতা ও লেখক। অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে ভি. আই. লেনিন কোথাও মনোলিথিক পার্টির কথা বলেননি। যেমন, কমরেড অজয় দত্ত লিখেছেন,  

কমরেড লেনিন কোথায় ‘ছিদ্রবিহীন পাথরের মত এককাট্টা (Monolithic) পার্টির কথা বলেছেন তা জনাব আলী হোসেন উদ্ধৃত করেননি।[১১]  

আমরা মনে করি, আমরা চাই বা না চাই, আমরা ইচ্ছা করি বা না করি; বস্তুর নিয়ম মানলে, বস্তুর মধ্যকার বিপরীতের দ্বন্দ্ব মানলে, পার্টিকে একটি বস্তু মানলে; দুই লাইনের মতাদর্শিক সংগ্রামকে মেনেই পার্টির অভ্যন্তরীণ অসর্বহারা মতাদর্শকে পরাজিত করতে হবে। এসব আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যারা মনোলিথিক পার্টির কথা বলছেন এবং উল্লেখ করছেন, লেনিন এই ধরনের পার্টির কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তবে লেনিন রচনাবলীর কোথায় এই কথা বলা হয়েছে তা তারা বলতে পারছেন না।

আমরা এই আলোচনায় দেখছি দুই ধরনের অর্থাৎ ‘সর্বহারা ও অসর্বহারা মতাদর্শের সংগ্রাম’/‘দুই লাইনের সংগ্রাম’ চলতেই থাকে এবং একই পার্টিতে তা দুইজন নেতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। এক্ষেত্রে একাংশকে বের করে দিলে সমস্যাটির সমাধান তো হবেই না, পার্টি বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।  

এক্ষেত্রে যা করণীয় তা হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণিকে তার বিপরীত মতাদর্শের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনা করা। সর্বহারা বিপ্লবি লাইন ও মতাদর্শের প্রাধান্য পার্টিতে সব সময় বজায় রাখার জন্য অবিরত চেষ্টা চালানো। এটি কেবলমাত্র বিপ্লবি লাইনকে বিকশিত করে এবং সংশোধনবাদকে পরাস্ত করেই সম্ভব হতে পারে। তবে অসর্বহারা মতাদর্শকে পার্টিতে পূর্ণভাবে শেষ করা সম্ভব নয়, কেননা যতদিন শ্রেণি থাকবে ততদিন পার্টিতে অসর্বহারা মতাদর্শ থাকবেই। এ-বিষয়ে মাও সেতুং বলেছেন,

“পার্টির ভেতরে বিভিন্ন চিন্তাধারার বিরোধ ও সংগ্রাম নিরন্তর ঘটতে থাকে। এ হচ্ছে পার্টির ভেতরে সমাজের শ্রেণির দ্বন্দ্বের এবং নতুন ও পুরাতনের দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। পার্টির ভেতরে যদি কোনো দ্বন্দ্ব না থাকে এবং তা সমাধান করার জন্য মতাদর্শগত সংগ্রাম না থাকে, তাহলে পার্টির জীবন শেষ হয়ে যাবে।”[১২]  

পার্টির ভেতরের সুবিধাবাদি ও সংশোধনবাদি ধারার সমালোচনা এবং এই ধারার বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে মতাদর্শিক সংগ্রাম যা মূলত তত্ত্ব ও অনুশীলনের সংগ্রাম। মতাদর্শ প্রচার ও প্রলেতারিয় দার্শনিকতাকে আঁকড়ে থেকে বিপ্লবের পথ বের করতে হয়। পার্টিকে সঠিক লাইনে রাখার সংগ্রামটিকে বলা যায় মার্কসবাদকে বিকৃত করার বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং যারা মার্কসবাদের বিকৃতি ঘটিয়ে সংশোধনবাদের ধ্বজাকে উপরে তুলে ধরছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই।

পার্টি একটি আলাদা বস্তু এবং এই বস্তুরও দ্বন্দ্ব থাকতে বাধ্য। পার্টির অভ্যন্তরে সর্বহারা ধারার নেতাকর্মীদের সাথে অসর্বহারা ধারার নেতাকর্মীদের লড়াইটা প্রধান। আমরা মনে করি পার্টি আর রাষ্ট্র দুটো আলাদা বস্তু; ফলে তাদের প্রধান দ্বন্দ্ব দুটিও আলাদা হওয়ারই কথা;  এবং দ্বন্দ্বের প্রধান দিকে দুটি আলাদা শক্তিরই থাকার কথা এবং তাদের ভেতরেও দ্বন্দ্ব থাকার কথা। যদিও পার্টির অভ্যন্তরের দ্বন্দ্বটি অবৈরী দ্বন্দ্ব, তবে তা সবসময় অবৈরী থাকে না, তখন পার্টিকে দুটুকরা না করে উপায় থাকে না।

পার্টির কাজের ভেতরে গণলাইন অবলম্বনের কথা লেনিন ও মাও সেতুং বারবার বলেছেন। এই গণলাইন সম্পর্কে বাংলাদেশ ভারতে খুব কমই আলোচনা হয়েছে। ভারত-বাংলার পার্টিগুলো গণলাইন সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। গণলাইন অবলম্বন করে এগোলে ভুল লাইনের পার্টিগুলোর হয়ত কোনোটি ঐক্য বা সংগ্রাম বা উভয় প্রকারে সঠিকভাবে বিকশিত হবে। আমরা আশা করি, পার্টির ভেতরের ভুল ধারাকে সরাতে হবে। ফলে পার্টি থেকে দূরে সরে গিয়ে বা পার্টিকে দ্বিধাবিভক্ত করে কিছু করা যাবে না। আলোচনা-সমালোচনা-ঐক্যের মাধ্যমেই এগোতে হবে।

আমরা শুধু এটুকুই বলে আপাতত ক্ষান্ত দেই। এক প্রস্তরীভূত বা Monolithic বলে কিছু থাকতে পারে না; তাই Monolithic পার্টি বলেও কিছু হতে পারে না। এই সংক্রান্ত মাও সেতুং-এর একটি উদ্ধৃতিঃ

“আমরা ঐক্যবদ্ধ হই এবং তারপর কিছু সময় ধরে আমাদের কাজ করার পর ধারনাসমূহ পৃথক হয়ে যায় এবং ঐক্যটা সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়; পার্থক্যসমূহের উদ্ভব ঘটে এবং আবারো বিভক্তি ঘটে। আমরা দিনের পর দিন এবং বছরের পর বছর ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি না।

যখনই আমরা ঐক্যের কথা বলি সেখানেই অনৈক্য থাকে; অনৈক্য হচ্ছে শর্তবিহীন। যে মুহূর্তে আমরা ঐক্যের কথা বলি, তখনও অনৈক্য থাকে — এজন্যই আমাদের করার কিছু থাকে। অবশ্যই এক প্রস্তরীভূত (Monolithic) ঐক্যের কথা বলা এবং সংগ্রামের কথা না বলাটা মার্কসবাদী-লেনিনবাদি নয়। ঐক্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আগায় এবং শুধুমাত্র এভাবেই ঐক্য অর্জিত হতে পারে।

সর্বদাই ঐক্যের কথা বলাটা হচ্ছে ‘বদ্ধ জলাশয়’; এটা শীতলতায় পরিচালিত হতে পারে।

আমাদের অবশ্যই ঐক্যের পুরোনো ভিত্তিকে ধ্বংস করতে হবে, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং নতুন ভিত্তির উপর ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কোনটা ভাল_বদ্ধ জলাশয় নাকি ‘গর্জনকারী অক্লান্ত চলমান ইয়াংসী’?”[১৩] 

সবশেষে একটি কথা বলেই লেখাটি শেষ করতে চাই। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদের যেসব নীতি থাকে সেগুলোর ভেতরে একটি হচ্ছে পার্টি লাইন। পার্টি লাইন থেকেই এসেছে পার্টির ভেতরের দুই লাইনের সংগ্রাম।[১৪]

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ  

১. ভি. আই. লেনিন; দর্শন সংক্রান্ত নোটবুক থেকে।

২. এই বিষয়ে পড়ুন অনুপ সাদির প্রবন্ধ ‘মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ এবং তার আরেকটি প্রবন্ধ ‘কমিউনিস্ট পার্টি কি এবং কেন’।  

৩. জে. ভি. স্তালিন; সিপিএস ইউ(বি)তে দক্ষিণ বিচ্যুতি; এপ্রিল, ১৯২৯। স্তালিনের এই পুস্তকটি অক্টোবর ১৯৮৮-তে বাংলায় অনুবাদ হলেও দুই লাইনের সংগ্রামের আলোচনায় আমি কোনো বইয়ে এর পূর্বে আলোচনা হতে দেখিনি। আমি নিজে স্তালিনের এই আলোচনা দেখে বিস্মিত হয়ে যাই।  

৪. পূর্বোক্ত।

৫. দেখুন, শিবদাস ঘোষ; নির্বাচিত রচনাবলী; প্রথম খণ্ড; পৃষ্ঠা ৩৬৬।

৬. শিবদাস ঘোষ; নির্বাচিত রচনাবলী; প্রথম খণ্ড; পৃষ্ঠা ৪৩৬।

৭. প্রভাস ঘোষ; মহান স্তালিন; এসইউসিআইসি; দ্বিতীয় প্রকাশ_ জুলাই, ২০১১; কলকাতা; পৃষ্ঠা- ২৬। এখানে একটি সমস্যা আছে। যারা পার্টিকে মনোলিথিক বলেন তারা সেটিকে লেনিনিয় মডেল বললেও লেনিন কোন পরিপ্রেক্ষিতে পার্টিকে মনোলিথিক বলেছেন এবং সেটি লেনিন রচনাবলীর কোথায় রয়েছে তা কিন্তু তারা কখনোই বলেন না।

৮. সর্বহারা শ্রেণীর দল গঠনের সমস্যা প্রসঙ্গে, বাসদ, পৃষ্ঠা ১৫-১৬; এছাড়াও শিবদাস ঘোষ, নির্বাচিত রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১২-১৩। দুটি সূত্রের জন্য দেখতে পারেন, বাসদের মতবাদিক বিতর্ক, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা : প্রাসঙ্গিক বিতর্ক , ২৮ জুলাই, ২০১৩, debatesofspb, তথ্যসূত্রের ১২ নং সূত্র, অনলাইন লিংক, https://debatesofspb.wordpress.com/2013/07/28/spbhaider_5/।

৯. ড. দেবব্রত চৌধুরী; জ্ঞানাকাশ পুস্তিকা; মুক্ত প্রকাশনী; প্রকাশকাল ও প্রকাশ স্থান উল্লেখহীন; পৃষ্ঠা-৩৪।

১০. আবদুল হক, উদ্ধৃতি অজয় দত্ত; বিপ্লবের বিজ্ঞান, মার্কসবাদ লেনিনবাদ মাওবাদ; নবদিগন্ত প্রকাশনী; প্রকাশকাল-জানুয়ারি, ১৯৯৬ পৃষ্ঠা- ৩০।  এছাড়াও আবদুল হক সম্পর্কে নূরুল হাসান লেখেন, ‘কমরেড আবদুল হক মার্কসবাদী লেনিনবাদী ধারার মনোলিথিক ধরণের পার্টি গড়ে তোলার নীতি কৌশল ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে’ ধরেন। দেখুন, নুরুল হাসান, সংশোধনবাদীদের স্বরূপ উন্মোচন করতে কমরেড আবদুল হক-এর শিক্ষাকে উর্ধ্বে তুলে ধরুন, ২৪ মার্চ ২০১৩, সাপ্তাহিক সেবা, ৩২ বর্ষ, ৮ম সংখ্যা।

১১. অজয় দত্ত; বিপ্লবের বিজ্ঞান, মার্কসবাদ লেনিনবাদ মাওবাদ, পূর্বোক্ত।

১২. মাও সেতুং; দ্বন্দ্ব সম্পর্কে, আগস্ট, ১৯৩৭।

১৩. মাও সেতুং; টকস টু দি পিপল, Pantheon Books; 1st edition (1975)

১৪.  গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ সম্পর্কে পড়ুন অনুপ সাদির প্রবন্ধ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ প্রসঙ্গে, সমাজতন্ত্র, ভাষাপ্রকাশ, ২০১৫, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৭৬-৮১।

রচনাকাল অক্টোবর ৮, ২০১২

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top