Main Menu

শ্রমিক ও যন্ত্রের বিরোধ এবং লুডবাদী আন্দোলন

ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের ফলে একদিকে পুরোনো হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় আর অন্যদিকে শহরে শহরে যন্ত্রভিত্তিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।  শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে পুঁজিবাদের নানা ক্ষতিকর অনুষঙ্গের আবির্ভাবের কারণে নতুনতর যন্ত্রপাতির নিয়োগ, অবাধ প্রতিযোগিতা, অতি উৎপাদন, মন্দা, ছাঁটাই ইত্যাদি ঘটতে থাকে এবং কর্মহীন বেকার মানুষ বাড়তে থাকে। সচেতন, রাজনৈতিক জ্ঞানসমৃদ্ধ শ্রমিকশ্রেণি পরিচালিত শ্রেণিসংগ্রাম সংগঠিত হবার পূর্বে এসব বেকার ও কর্মচ্যুত মানুষের মধ্যে এরূপ মনোভাবের উদয় হয়েছিল যে তারা বুঝেছিল তাদের এই দুরবস্থার জন্য যন্ত্র এবং কারখানাই দোষী। অষ্টাদশ শতকে একদল শ্রমিক এরূপ চিন্তা থেকে কারখানার যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করে। পুঁজির সঞ্চয়নের যুগে কৃষিজীবি মানুষের জীবন ও পরিবেশ ধ্বংসকারী নতুন পুঁজিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত মহান এ-আন্দোলন নির্যাতিত শ্রমিকদের অসহায় ক্ষোভের প্রকাশস্বরূপ ছিল। পুঁজিবাদী সমাজের রাষ্ট্রব্যবস্থা অসহায় শ্রমিকদের এই মহান আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। ধারনা করা হয় ক্যাপ্টেন লুডের এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন। ১৮১২ সালের ভেতরে, তাঁত-কাঠামো ভাঙচুরকারিগণ সংগঠিত হয়েছিলেন, নিজেরা লুড্ডাইট (Luddites) নামে নিজেদের পরিচিতি ঘটিয়েছিলেন এবং রাজা লুড বা ক্যাপ্টেন লুডকে তাদের পৌরাণিক নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এই আন্দোলনের নানা চিঠি এবং ঘোষণাসমূহ “নেড লুড” নামে স্বাক্ষর করা শুরু হয়েছিল।

ক্যাপ্টেন নেড লুড, (ইংরেজি: Ned Ludd বা Ned Lud) সম্ভবত জন্মনাম, নেড লুডলাম বা এডোয়ার্ড লুডলাম (ইংরেজি: Edward Ludlam), সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। বলতে গেলে, লুড ছিলেন লেইসেস্টারের নিকটের আন্সটে, লেইসেস্টারশারের একজন তাঁতি। ১৭৭৯ সালে, অলসতার জন্য চাবুকের আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে, অথবা স্থানীয় যুবকদের দ্বারা বিদ্রুপ-আক্রান্ত হয়ে, তিনি দুটি বয়নের কাঠামোকে ভেঙে ফেলেন। আর এই গল্পটি ২০ ডিসেম্বর, ১৮১১তে ছাপা হয় “দ্য নটিংহ্যাম রিভিউ” পত্রিকার এক নিবন্ধে, কিন্তু সেখানে এটির সত্যতার কোনো স্বাধীন প্রমাণ ছিল না। ১৮১১ সালে প্রকাশিত জন ব্ল্যাকনারের (John Blackner) বই “নটিংহ্যামের ইতিহাস” (History of Nottingham), একটি ভিন্ন গল্প পাওয়া যায়। সেই গল্পটি হচ্ছে পিতার কথা অনুসারে “লুডনাম” নামের এক কাঠামো-তাঁত কর্মী ছিল যে তাঁর ক্রুশিকাঁটাকে বর্গ করত (“square his needles”)। একদিন লুডনাম একটি হাতুড়ি নিয়েছিল এবং “সেগুলিকে ভেঙে স্তুপ করেছিল”। খবরটি এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেখা যায় যখনই অন্তর্ঘাতে বা আন্দোলনের কারণে তাঁতের কাঠামো ভাঙা হতো, জনগণ রসিকতা করে বলতো যে “নেড লুড এটা ভেঙেছে”।

কার্ল মার্কস তাঁর পুঁজি গ্রন্থে ‘শ্রমিক ও যন্ত্রের বিরোধ’ শিরোনামের পরিচ্ছেদে লুডবাদী আন্দোলন এবং সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের আরো কিছু আন্দোলন সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি এই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন,

“পুঁজিপতি আর মজুরি-শ্রমিকের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা হয় পুঁজির উদ্ভব থেকেই। গোটা ম্যানুফ্যাকচারের যুগ ধরে তা চলেছিল। কিন্তু যন্ত্রপাতি প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকেই শ্রমিক শ্রমের হাতিয়ারের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ পুঁজির বস্তুরূপী অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। উৎপাদনের উপায়ের এই বিশেষ রূপের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ, কেননা এটাই হচ্ছে পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির বৈষয়িক ভিত্তি।

১৭শ শতাব্দীতে প্রায় গোটা ইউরোপেই ফিতে তাঁতের (রিবন লুম) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটেছিলো — এটি হলো ফিতে ও লেস বুনবার যন্ত্র, যাকে জার্মানিতে বলা হতো Bandmühle, অথবা Schnurmühle এবং Mühlenstuhl । এই যন্ত্রগুলি জার্মানিতে উদ্ভাবিত হয়েছিলো। ১৫৭৯ সালে লিখিত, কিন্তু ১৬৩৬ সালে ভেনিসে প্রকাশিত এক গ্রন্থে ইতালীয় পাদ্রী ল্যানসেলোত্তি লিখেছেন: ‘ডানজিগের অ্যাণ্টনি ম্যুলার ঐ শহরে প্রায় ৫০ বছর আগে এক অভিনব যন্ত্র দেখেছিলেন — যা একই সঙ্গে ৪ থেকে ৬টি জিনিস বুনতে পারে। এই উদ্ভাবন বহুসংখ্যক শ্রমিককে পথে বসাতে পারে, এই কথা আশঙ্কা করে মেয়র এর উদ্ভাবককে গোপনে গলা টিপে বা জলে ডুবিয়ে হত্যার ব্যবস্থা করেছিলেন’। লিডেন-এ এই যন্ত্র ১৬২৯ সালের আগে ব্যবহৃত হয় নি, সেখানে ফিতে তাঁতিদের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত পৌর পরিষদকে বাধ্য করে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে। লিডেন-এ এই মেশিনের প্রবর্তন উল্লেখ করে বক্সহর্ন (Institutiones Politicae, 1663), বলেন: ‘প্রায় ২০ বছর আগে এই শহরে এমন এক বয়ন যন্ত্র আবিস্কৃত হয়েছিলো, যাতে কয়েকজন শ্রমিক যন্ত্র ছাড়া একই সময়ে যে পরিমাণ কাপড় তৈরি করতে পারে, একজন শ্রমিক সহজেই তার চেয়ে বেশি পরিমাণে কাপড় তৈরি করতে পারত। কিন্তু এটা তাঁতীদের অভিযোগ এবং অসন্তুটির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাজিসট্রেট এ যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেন।’ ১৬৩২, ১৬৩৯ প্রভৃতি সালে বহবিধ হুকুম জারি করে এই যন্ত্রের ব্যবহার কার্যত নিষিদ্ধ করে রাখার পর, হল্যান্ডের ব্যবস্থা পরিষদ (স্টেটস জেনারেল) অবশেষে, ১৬৬১ সালের ১৫ ডিসেম্বরের আদেশবলে শর্তসাপেক্ষে এর ব্যবহার অনুমোদন করেন। ১৬৭৬ সালে কলোন-এও তা নিষিদ্ধ ছিলো, ঐ সময়ে ইংলন্ডে এর প্রবর্তন শ্রমজীবীদের মধ্যে অশান্তির সৃষ্টি করছিলো। ১৬৮৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সম্রাটের আজ্ঞাবলে সমগ্র জার্মানিতে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিলো। হামবুর্গে সেনেটের হকুমে প্রকাশ্যে এই যন্ত্র অগ্নিদগ্ধ করা হয়। সম্রাট ষষ্ঠ চার্লস ১৭১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ১৬৮৫ সালের আজ্ঞা পুনর্বার জারি করেন এবং সাক্সনি রাজ্যে (ইলেক্টরেট) ১৭৬৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত তা প্রকাশ্যে ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না। এই যন্ত্র, যা কিনা সমগ্র ইউরোপের ভিত্তিমূল ধরে নাড়া দিয়েছিলো, বস্তুত তা মিউল তাঁত ও বাষ্পশক্তিচালিত তাঁতের, এবং ১৮শ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লবেরই অগ্রদূত ছিলো। এই যন্ত্রের সাহায্যে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ বালকের পক্ষেও শুধু একটি ডান্ডা সামনের ও পিছনের দিকে টেনে বহু মাকুসহ গোটা তাঁতটিকে চালু করা সম্ভব ছিলো, এবং এর উন্নত সংস্করণ একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০ খানা জিনিস উৎপাদন করত।

১৬৩০ সাল নাগাদ জনৈক ওলন্দাজ কর্তৃক লন্ডনের কাছাকাছি স্থাপিত বায়ুচালিত একটি করাত কল জনতার ক্রোধের ফলে ধ্বংস হয়। এমন কি ১৮শ শতাব্দীর শুরুতেও, পার্লামেন্ট দ্বারা সমর্থিত হওয়া সত্ত্বেও জলচালিত করাত কল অতি কষ্টে জনসাধারণের বিরোধিতা অতিক্রম করতে পেরেছিলো। ১৭৫৮ সালে যে মুহূর্তে এভারেট প্রথম জলশক্তি চালিত পশম ছাঁটাইর মেশিন স্থাপন করেছিলেন, সেই মুহূর্তেই, এর দ্বারা কর্মচ্যুত ১,০০,০০০ লোকের জনতা তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পঞ্চাশ হাজার লোক, যারা পশম আঁচড়ানোর কাজ করে আগে জীবিকার সংস্থান করত, তারা আর্করাইটের স্ক্রিবলিং মিল আর কার্ডিং ইঞ্জিনের বিরুদ্ধে পার্লামেণ্টের কাছে আবেদন করেছিল।”

কার্ল মার্কস আরো লিখেছিলেন যে ১৯ শতকের শুরুর ১৫ বছরে ইংলন্ডের শিল্পাঞ্চলের জেলাগুলিতে বাষ্পশক্তিচালিত তাঁত ব্যবহারের দরুন লুড্ডাইট আন্দোলন নামে পরিচিত আন্দোলন দ্বারা যন্ত্রপাতির যে ব্যাপক ধ্বংসসাধন ঘটেছিল, তাই সিডমাউথ, ক্যাসলরি প্রমুখদের জ্যাকোবিন-বিরোধী সরকারিগুলিকে অজুহাত যুগিয়েছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও উৎপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের। কালক্রমে ও অভিজ্ঞতা মারফৎ শ্রমজীবীরা যন্ত্রপাতি ও পুঁজি কর্তৃক তার নিয়োগ এই দুই-এর মধ্যে তফাৎ করতে এবং উৎপাদনের বৈষয়িক উপকরণের বিরুদ্ধে না করে, তার ব্যবহারের সামাজিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতে শিখেছিলো।

তথ্যসূত্র:

১. কার্ল মার্কস, পুঁজি প্রথম খণ্ড, অধ্যায় ‘যন্ত্রপাতি ও আধুনিক শিল্প’; পরিচ্ছেদ ‘শ্রমিক ও যন্ত্রের বিরোধ’, ১৮৬৫, প্রফুল্ল রায় সম্পাদিত, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, পৃষ্ঠা ৫২১ – ৫২৩।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *