Main Menu

সুখী পরিবার — লু স্যুন

লু স্যুনের গল্প “সুখী পরিবার”

অনুবাদ: মাহফুজ উল্লাহ

—স্যু ছিনওয়েন এর রীতি অনুযায়ী

“…… একজন যা ভাবে তাই লেখে ; অনেকটা সূর্যালোকের মতো, অফুরন্ত। ঔজ্জল্য থেকে উৎসারিত, লোহ বা পাথরে আঘাত করলে উৎসারিত লিঙ্গের মতো নয়। এটাই একমাত্র সত্যিকারের শিল্প। এ ধরণের লেখকই সত্যিকারের শিল্পী …… কিন্তু আমি . . . . . . আমি কোন পর্যায়ের ?”

এ পর্যন্ত ভেবেই সে হঠাৎ বিছানা থেকে লাফিয়ে নামে। তার মনে হয় সংসার চালানোর জন্য লিখে অবশ্যই কিছু পয়সা রোজগার করা উচিত। ইতোমধ্যেই সে “সুখী মাসিক” মুদ্রাকরের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠানো ঠিক করেছে, কেননা সন্মানীর হার বেশ উচু। কিন্তু সেক্ষেত্রে বিষয়বস্তু হবে সীমিত, না হলে লেখাই গৃহীত হবে না। ঠিক আছে সীমিতই হোক। ‘ইয়াং জেনারেশনের’ মনে কোন প্রশ্নটা গুলি সবচে বেশি স্থান দখল করে আছে ? …….নিশ্চয়ই গুটিকয়েক নয়, হয়ত অনেকগুলো, প্রেম, বিয়ে, পরিবার সম্পর্কে . . . . . নিশ্চয়ই বহু লোক এসব প্রশ্ন নিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে আছে, এমনকি এখন আলোচনাও করছে। তাহলে, পরিবার নিয়ে লেখা যাক। কিন্তু কিভাবে লেখা যায় ? ……. অন্যথায় তা গৃহীত হবে না। কুলক্ষণে কিছু ভেবে লাভ কি ? তবু ………

বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে চার পাঁচ কদমে সে টেবিলের কাছে পৌছে যায়। সে সবুজ লাইনওয়ালা কাগজ নিয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে শিরোনামা লেখে : “সুখী পরিবার”।

সঙ্গে সঙ্গে তার কলম থেমে যায়। মাথা তুলে সে সিলিং-এর দিকে চোখ রাখে এবং এই সুখী পরিবারের জন্য একটা পরিবেশ ভাবার চিন্তা করে।

তার মনে হল “বেইজিং? তাতে হবে না। এটা খুব মৃত শহর,  এমনকি আবহাওয়া পর্যন্ত। এমনকি এই পরিবারের চারদিকে উচুঁ দেয়াল তুললেও বাতাসকে ঠেকানো যাবে না। না, তাতে চলবে না। জিয়াংসু এবং যেজিয়াং যেকোনো দিন যুদ্ধ শুরু করতে পারে, এবং ফুজিয়ান প্রশ্নের বাইরে। সিছুয়ান? গুয়াংডোং? এগুলোও যুদ্ধের ভেতর। শানডোং অথবা হোনান হলে কেমন হয়? . . . . . না, এর যেকোনো একটা অপহৃত হতে পারে, তাহলে সুখী পরিবার অসুখী হয়ে যাবে। শাংহাই এবং থিয়ানজিন-এর ‘বিদেশী এলাকায়’ ভাড়া খুব বেশি ……. বিদেশে কোথাও ? হাস্যকর। আমি জানি না ইয়ুন্নান গুইযৌ কেমন, যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব দুর্বল …….”

সে মাথা ঘামাতে থাকে। ভালো জায়গার কথা চিন্তা করতে না পেরে মোটামুটি ঠিক করে A । যাহোক, তার পর সে ভাবে : আজকাল স্থান ও লোকের বানানের ব্যাপারে ইংরেজী বর্ণমালা ব্যবহারে অনেকেই আপত্তি জানায়। তাতে পাঠকের উৎসাহ কমে যায়। বোধ হয় সুবিধের জন্য গল্পে এবার তা ব্যবহার করাই ভালো। তা হলে কোনটা ভালো জায়গা হবে ? হুনানেও যুদ্ধ চলছে। ডালিয়ানে আবার ভাড়া বেড়েছে। শুনেছি ছাহার, জিলিন এবং হেইলোং, জিয়াং-এ রাহাজানি হয়, তাহলে তাতেও চলবে না . . . . . .”

আরেকটি ভালো জায়গার জন্য সে আবার মাথা ঘামাতে থাকে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। তাই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে A হবে সেই জায়গা যেখানে তার সুখী পরিবার বাস করবে।

“যাহোক, এই সুখী পরিবারকে A -এই থাকতে হবে। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। স্বভাবতঃই পরিবারে রয়েছে স্বামী ও স্ত্রী – কর্তা ও গিন্নী – যারা ভালোবেসে বিয়ে করেছে। তাদের বিয়ের কাবিননামায় চল্লিশটির বেশী শর্ত রয়েছে, তাই তাদের রয়েছে বিশেষ সমতা ও পূর্ণ স্বাধীনতা। উপরন্তু তারা দুজনেই উচ্চ শিক্ষিত এবং সংস্কৃত এলিট গোষ্ঠীর……। জাপান ফেরতা ছাত্র আর ফ্যাশন নয়, তাই ধরা যাক তারা পশ্চিম ফের ছাত্র। বাড়ীর কর্তা সবসময় বিদেশী স্যুট পরে, তার কলার বরফের মতো সাদা। তার স্ত্রীর চুল সামনের দিকে চড়ই-এর বাসার মতো কোঁকড়ানো, তার মুক্তার মতো সাদা দাঁত। সবসময় উঁকি মারে, কিন্তু সে চীনা পোশাক পরে …..

“তাতে হবে না, তাতে হবে না! পঁচিশ ক্যাটি!” জানালার বাইরে পুরুষের গলা শুনতে পেয়ে সে অনিচ্ছাভরে তাকায়। জানালার পর্দা দিয়ে আসা সূর্যের আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, শুনতে পায় লাকড়ির বোঝা ফেলার শব্দ।। আবার ফিরে সে ভাবে, “এতে কিছু যায় আসে না। পঁচিশ ক্যাটি’, কিসের ? ।

– তারা সংস্কৃত এলিট’, শিল্পের জন্য নিবেদিত। যেহেতু তারা উভয়েই সুখী পরিবেশে গড়ে উঠেছে তাই রুশীয় উপন্যাস পছন্দ করে না। অধিকাংশ রুশীয় উপন্যাসে নীচু শ্রেণীর বর্ণনা, তাই সেগুলো এমন পরিবারের উপযুক্ত নয়। ‘পচিশ ক্যাটি ? কুছ পরোয়া নেই। তাহলে তারা কি ধরণের বই পড়ে ? – বায়রণের কবিতা? কীটস? তাতে চলবে না, কোনোটাই নিরাপদ নয় – আহ, পেয়েছি। তাদের দু’জনেই পড়তে পছন্দ করে ‘আদর্শ স্বামী’। যদিও নিজেও এ বই পড়িনি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা এই বইয়ের এত প্রশংসা করে যে আমি নিশ্চিত এই দম্পতিও তা উপভোগ করে। এই তুমি পড়, আমি পড়ি – তাদের প্রত্যেকের এক কপি বই আছে, পরিবারে সর্বমোট দু কপি বই ……”

পেটের ভেতর শূন্যতা বোধ করতেই সে কলম রেখে দেয়। হাতের ওপর মাথা রাখে, অক্ষধূরার উপর দাঁড়ানো ভূমণ্ডলের মতো।

সে ভাবে, ……. তাদের দু’জন মাত্র দুপুরের খাওয়া খাচ্ছে। তুষার শুভ্র কাপড়ে টেবিল ঢাকা, বাবুর্চি খাওয়া নিয়ে আসছে – চীনা খাবার। পঁচিশ ক্যাটি’ কিসের ? কুছ পরোয়া নেই। চীনা খাবার হবে কেন ? পশ্চিমারা বলে চীনা খাবার সবচে প্রগতিশীল, খেতে সবচে মজা, সবচে স্বাস্থ্যসম্মত ; তাই তারা চীনা খাবার খায়। প্রথম বাটি আনা হয়েছে, কিন্তু এই প্রথম বাটিতে কি আছে ?

“লাকড়ী ……..” চমকে উঠে সে মাথা ঘুরায়। দেখতে পায় নিজের গিন্নী তার বাঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঘোলাটে চোখজোড়া তার মুখের ওপর।

‘কি’ সে ক্ষেপে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, বুঝতে পারে গিন্নী আসায় তার কাজের ক্ষতি হয়েছে।

“সব লাকড়ী শেষ, তাই আজকে আরো কিছু কিনেছি। গত বার পর্যন্ত দশ ক্যাটির দাম ছিল নগদ দু’শ চল্লিশ, কিন্তু আজকে সে দাবী করছে দু’শ ষাট। ধরো যদি তাকে আড়াই’শ দেই?”

“ঠিক আছে, আড়াই’শ হোক।”

“সে ওজনে খুব ফাঁকি দিয়েছে। সে বলছে সাড়ে চব্বিশ ক্যাটি, কিন্তু ধরো যদি আমি গুনি সাড়ে তেইশ ?”

“ঠিক আছে। সাড়ে তেইশ ক্যাটি গোন।” “তাহলে পাঁচে পাঁচে পচিশ, তিন পাঁচে পনেরো .. “ওহ, পাঁচে পাঁচে পঁচিশ, তিন পাঁচে পনেরো ……” সে আরো এগোতে পারে না। একমুহূর্ত থেমে যে সবুজ লাইনওয়ালা কাগজে লিখেছিল ‘সুখী পরিবার’ তাতে কলম দিয়ে অংক কষতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর বলার জন্য সে মাথা তোলে : নগদ পাঁচ’শ আশি।” “তাহলে আমার কাছে যথেষ্ট নেই। আরো আশি বা নব্বই কম ……”

সে টেবিলের ড্রয়ার খুলে সমস্ত টাকা বের করে – বিশ এবং ত্রিশ তাম্রমুদ্রার মাঝামাঝি – তারপর গিন্নীর বাড়ানো হাতে তা দেয়। তারপর তাকে চলে যেতে দেখে এবং টেবিলে ফিরে বসে। যেন মাথার ভেতর লাকড়ি ঢুকেছে। পাঁচে পাঁচে পচিশ – যত্রতত্র আরবী সংখ্যা তার মগজে তখনো আটকে আছে। সে হাই তুলে আবার জোরে দম ফেলে, যেন এভাবে সে ‘লাকড়ী’ পাঁচে পাঁচে পঁচিশ, এবং মাথায় আটকে থাকা আরবী সংখ্যা দূর করে দিতে পারবে। দম ফেলার পর মনে হয় বুক একটু হাল্কা হয়েছে। তারপর সে আবার এলোমেলো ভাবতে থাকে :

“কোন ডিশ? যতক্ষণ উল্টো কিছু হবে, ততক্ষণ কিছু যায় আসে না। ভাজা শূয়রের মাংস অথবা চিংড়ি, সামুদ্রিক শসা খুব সাধারণ খাবার। আমি তাদের ‘ড্রাগন ও বাঘ’ খাওয়ানো উচিত। কিন্তু সেটা কি ঠিক ? কেউ কেউ বলে এটা সাপ এবং বিড়ালের তৈরী, গুয়াংডোং-এর উঁচু শ্রেণীর খাবার। শুধু বিশেষ ভোজ খাওয়া হয়। এক জিয়াংসু রেস্তোরার খাবার তালিকায় এই নাম দেখেছি। জিয়াংসুর লোকজনের সাপ অথবা বিড়াল খাওয়ার কথা নয়। ঐ যে একজন বলেছে, এটা নিশ্চয়ই ব্যাঙ ও বান মাছের তৈরী। তা হলে এখন এই দম্পতি দেশের কোন অঞ্চলের হবে? কুছ পরোয়া নেই। দেশের যে কোনো অঞ্চলের লোক তাদের সুখী পরিবারের ক্ষতি না করে সাপ ও বিড়াল ডিশ খেতে পারে (অথবা ব্যাঙ ও বান মাছের)। যেভাবেই হোক, প্রথম ডিশটা হতে হবে ‘ড্রাগন এবং বাঘ’ তাতে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না।

“এখন টেবিলের মাঝখানে রয়েছে এই ‘ড্রাগন ও বাঘ’ খাবারের পাত্র। তারা একসঙ্গে কাঠি তোলে, খাবারের দিকে তাক করে, একে অপরের দিকে মিষ্টি করে হাসে, বিদেশী ভাষায় বলতে থাকে :

“My dear, please.”

“Please you eat first, my dear.”

“oh no, please you !.”

তারপর তারা একসঙ্গে কাঠি তোলে এবং একসঙ্গে সাপের একটুকরো মাংস তোলে – না, না, সাপের মাংস খুব অদ্ভুত শোনায়, বান মাছের টুকরো বলাই ভালো হবে। তা হলে, ঠিক হয়ে গেল ‘ড্রাগন ও বাঘ’ খাবার ব্যাঙ ও বান মাছের তৈরী। তারা একসঙ্গে বান মাছের দু টুকরো তুলে নেয়, ঠিক একই আয়তনের। পাঁচে পাঁচে পচিশ, তিন পাঁচে …… কুছ পরোয়া নেই। একই সঙ্গে তারা মুখে পোড়ে……”  ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে ঘুরতে চায় কেননা পেছনে শোরগোল ও আসা-যাওয়া সম্পর্কে সে সচেতন। সে ঘেমে ওঠে এবং চিন্তা করতে থাকে :

“এটা ভাবাবেগপূর্ণ মনে হচ্ছে। কোনো পরিবার এভাবে ব্যবহার করবে না। কিসের জন্য আমার মন এত আনচান করছে? ভয় হয় এমন ভালো বিষয় কখনোই লেখা হবে না – অথবা বোধ হয় তাদের ফেরতা ছাত্র হবার প্রয়োজন নেই, যারা চীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছে তারাও এমনি আচরণ করবে। তারা দু’জনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট, সংস্কৃত এলিট, এলিট, ……. লোকটি একজন লেখক, মহিলাও একজন লেখিকা অথবা সাহিত্য প্রেমিক। অথবা মহিলা একজন কবি, লোকটি কবিতা প্রেমিক, নারীত্বকে সম্মান করে। অথবা……”

শেষ পর্যন্ত সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না, ফিরে তাকায়। তার পেছনে বইয়ের শেলফের পাশে বাঁধাকপির স্তুপ দেখা যাচ্ছে। নীচে তিনটা, তার উপর দুটো, সবচে উপরে একটা। অনেকটা ইংরেজী A -র মতো।

“ওহ চমকে উঠে সে হাই তোলে। মনে হচ্ছে গাল পুড়ে যাচ্ছে, শিরদাঁড়ায় কাঁটা উঠা নামা করছে। “আহ। শিরদাড়ায় কাঁটার অনুভূতি থেকে রেহাই পাবার জন্য সে বড় করে দম ফেলে, তারপর ভাবতে থাকে, “সুখী পরিবারের বাড়ীতে অবশ্যই অনেক কামরা থাকতে হবে। গুদামে বাঁধাকপির মতো জিনিষ রাখা হয়। কর্তার পড়ার ঘর আলাদা, দেয়াল জুড়ে বইয়ের শেলফ, স্বভাবতঃই সেখানে কোনো বাঁধাকপি নেই। বইয়ের শেলফগুলো চীনা ও বিদেশী বইয়ে ভর্তি, অবশ্যই ‘আদর্শ স্বামী’ বইটিও আছে – সবমিলিয়ে দু কপি। শোবার ঘর আলাদা, ঘরে একটি তামার খাট বা প্রথম জেলের কয়েদীদের তৈরী একটি সাধারণ এলম কাঠের খাট হলেও চলবে। বিছানার নীচ খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন … … .।” সে নিজের বিছানার নীচে তাকায়। সব লাকড়ী শেষ, মরা সাপের মত পেঁচানো কিছু খড়ের দড়ি পড়ে আছে।

“সাড়ে তেইশ ক্যাটি। ……….” তার মনে হয় বিছানার নীচে লাকড়ীর অন্তহীন পাহাড় গড়ে উঠছে। তার মাথা আবার ব্যথা করে। সে উঠে তাড়াতাড়ি দরজার কাছে যায় দরজা বন্ধ করার জন্য। দরজায় হাত রাখা মাত্র বুঝতে পারে বাড়াবাড়ি হচ্ছে। ধূলাভর্তি পর্দা টানতে গিয়ে সে ভাবে, “এর সাহায্যে একজনকে বন্দী করা এড়ানো যায়, আবার দরজা খোলা রাখার অস্বস্তিও এড়ানো যায়। এটা ‘মধ্যপন্থার’[১] সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।”

“……. তাহলে, কর্তার পড়ার ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ থাকে।” সে ফিরে গিয়ে বসে ভাবতে থাকে, যে কেউ কোনো কাজে এলে অবশ্যই প্রথমে দরজায় আঘাত করবে, ভেতরে ঢোকার জন্য অনুমতি নেবে। এটাই একমাত্র কাজ যা করা উচিত। এখন ধরা যাক, কর্তা তার পড়ার ঘরে বসে আছেন এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনার জন্য এলেন গিন্নী, তিনিও আঘাত করবেন .. অবশ্য একজন আশ্বস্ত হতে পারে – তিনি কোনো বাধাকপি ভেতরে আনবেন। না।

“Come in, please, my dear.”

সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনার জন্য কর্তার সময় না থাকলে কি হবে? দরজার মদ আঘাত শুনে তিনি কি তাকে উপেক্ষা করবেন ? তাতে বোধ হয় চলবে না। বোধ হয় এর সব কিছুই আদর্শ স্বামী বইতে বলা আছে সেটা নিশ্চয়ই চমৎকার উপন্যাস। এ লেখার টাকা পেলে আমাকে অবশ্যই ঐ বইয়ের একটি কপি কিনতে হবে পড়ার জন্য।”

চড়!

তার পিঠ শক্ত হয়ে যায়। অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে তাদের তিন বছরের মেয়ের মাথায় স্ত্রীর আঘাতের ফলেই এই শব্দ।

তার পিঠ তখনো শক্ত। মেয়ের ফোঁপানি শুনতে শুনতে সে ভাবে, “সুখী পরিবারে . . . . . . দেরীতে ছেলেমেয়ের জন্ম হয়। হ্যা, দেরীতে। অথবা কোনো ছেলেমেয়ে না থাকাই বোধ হয় ভালো হবে, বন্ধনহীন মাত্র দুজন – অথবা হোটেলে থাকাই বোধ হয় ভালো হবে, কোনো কিছু ছাড়াই একজন লোক ……….” মেয়ের ফোঁপানি বাড়ায় উঠে দাঁড়িয়ে পর্দা সরিয়ে সে ভাবে, “ছেলেমেয়েরা যখন চারপাশে কাঁদছে তখন ‘পুঁজি’ বইটি লিখেছিলেন কার্ল মার্কস। তিনি নিশ্চয়ই মহান লোক , . . . . .” সে বাইরে যায়। বাইরের দরজা খোলে এবং তার নাকে এসে লাগে প্যারাফিনের তীব্র গন্ধ। মুখ নীচু করে মেয়েটি দরোজার দক্ষিণে শুয়ে আছে। তাকে দেখতে পেয়েই সে আরো জোরে কাঁদতে থাকে।

“সেখানে, সেখানে সব ঠিক আছে! কেঁদো না, কেঁদো না! লক্ষী মেয়ে।। তাকে ভোলার জন্য সে নীচু হয়।

এটা করে সে ঘুরে তাকিয়ে দেখে দরজার বাম পাশে তার ক্ষিপ্ত বউ দাঁড়িয়ে, তার পিঠও টান করা, হাতজোড়া নিতম্বের উপর, যেন ব্যায়াম করতে যাচ্ছে।

তোমাকে এসেও আমাকে গাল দিতে হয়। তুমি কোনো কাজ করো না,

শুধু ঝামেলা বাড়াও – এমনকি প্যারাফিন বাতিটিও উল্টে গেছে। আজ সন্ধ্যায় কি জ্বালাব? ……..

‘সব, সব ঠিক আছে! কেদো না, কেদো না। স্ত্রীর কাঁপা গলা উপেক্ষা করে সে মেয়েকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায় এবং মাথায় হাত বুলাতে থাকে। সে আবার বলে, “লক্ষী মেয়ে। তারপর সে তাকে নামিয়ে দেয়; একটি চেয়ার টানে এবং বসে পড়ে। পায়ের মাঝখানে তাকে রেখে সে হাত তোলে। বলে, “কেঁদো না, লক্ষী মেয়ে। বাবা তোমার জন্য বিড়াল’ খেলবে।’ একই সময়ে সে ঘাড় বাঁকায়, জিহ্বা বের করে দূর থেকে দুবার হাতের তালু চাটে, তার পর গোলাকারভাবে সেগুলো মুখের কাছে নিয়ে আসে।

“আহা! পুসি!” মেয়েটি হাসতে শুরু করে।

“এইত, এইত, পুসি।” সে আরো কয়েকবার হাত ঘোরায়, তার পর বন্ধ করে। চোখে জল নিয়ে মেয়েটি তখনো হাসছে। হঠাৎ তার মনে হয় তার মিষ্টি, নির্দোষ মুখ পাঁচ বছর আগে ঠিক তার মায়ের মুখের মতো, বিশেষ করে তার উজ্জ্বল ঠোট জোড়া, যদিও সেগুলো আরো  ছোট। সে এক উজ্জ্বল শীতের দিন যখন সে তার জন্য সব বাধা অতিক্রমের, সব কিছু বিসর্জনের সিদ্ধান্ত শুনতে পায়, চোখে জল নিয়ে হাসতে হাসতে সেও ঠিক এমনিভাবে তার দিকে তাকিয়ে ছিল । সে হতাশ হয়ে বসে পড়ে, যেন একটু নেশাগ্রস্ত।

ভাবে, “আহা, মিষ্টি ঠোঁট। হঠাৎ দরজার পর্দা সরে গিয়ে ভেতরে ঢোকানো হয় লাকড়ী। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এলে সে দেখতে পায় তখনো চোখে জল নিয়ে লাল ঠোট জোড়া ফাক করে মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোট . . . . . .” সে পাশ কাটিয়ে তাকায় লাকড়ী কোথায় আনা হচ্ছে দেখার জন্য। বোধ হয় এটা কিছু না, পাঁচে পাঁচে পচিশ, নয়-এ নয়-এ একাশি, সেই একই কথা! …. এবং এক জোড়া বিষন্ন চোখ . . . . . .” একথা ভাবতে ভাবতে শিরোনাম ও সংখ্যা লেখা সবুজ লাইন দেয়া কাগজটি ছিনিয়ে নেয়, মুড়ে ফেলে, আবার খোলে মেয়ের নাক ও চোখ মুছে দেয়ার জন্য। “লক্ষী মেয়ে, গিয়ে নিজে নিজে খেলা কর।” বলতে বলতে সে তাকে সরিয়ে দেয় এবং কাগজের দলটি আবর্জনার ঝুড়িতে ছুড়ে মারে।

তৎক্ষণাৎ মেয়ের জন্য তার দুঃখ হয়। তার চোখজোড়া চলে যাওয়া মেয়েটিকে অনুসরণ করে, কানে আসে লাকড়ীর শব্দ। মনোযোগ দেয়ার জন্য সে ফিরে চোখ বন্ধ করে, সকল এলোমেলো চিন্তা হটিয়ে দেয়ার জন্য, চুপচাপ ও শান্তভাবে সেখানে বসে থাকে।

দেখতে পায় একটি গোল, কালো বডার দেয়া, মাঝখানে গোলাপী ফুল বাম চোখের বাম দিক থেকে ঠিক উল্টো দিকে গিয়ে হারিয়ে গেল, তারপরে আসে মাঝখানে গভীর সবুজ ওয়ালা একটি উজ্জ্বল সবুজ ফুল, সবশেষে এক বোঝা বাঁধাকপি যেগুলো তার চোখের সামনে বিরাট ইংরেজী অক্ষর A-র, মতো ধরা দেয়।[২]

ফেব্রুয়ারী ১৮, ১৯২৪

টীকা:

১. কনফুসিয়াসের বাণী।

২ রোদ্দুরেতে প্রকাশের জন্য গল্পটি মাহফুজ উল্লাহ কর্তৃক অনূদিত লু স্যুনের নির্বাচিত গল্প সংকলন, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, বেইজিং দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৮২ থেকে প্রকাশিত পৃষ্ঠা ১৪৫-১৫২ থেকে নেয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *