আপনি যা পড়ছেন

আগুন ও ঘুম

দুপুরে খাবার পরে আমাদের গল্পের নায়ক অমৃত অন্তর জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বসন্তকালের স্বচ্ছ সুনীল আকাশ, মেঘের কোনো আনাগোনা নেই। তার সাততলার এই ঘরটি থেকে বোঝার উপায় নেই বাইরের প্রকৃত আবহাওয়া কী রকম। নিশ্চয় তীব্র গরম হবে। সে এমন জায়গায় তার চেয়ার টেবিলগুলোকে রেখেছে যেখান থেকে আকাশটাকে সুন্দরভাবে দেখা যায়।
সাধারণত দুপুরে খাবার পরে সে দশ-পনেরো মিনিট চেয়ারে শরীর এলিয়ে বিশ্রাম নেয়; শুধুমাত্র চোখ বন্ধ রেখে ধীরে ধীরে শ্বাস নেয়া, এই দশ-পনেরো মিনিটের বিশ্রামের পর কাজে গতি আসে, মনোযোগ দেয়া যায় সবকিছুতে; আজও খাবারের পরে সে স্বচ্ছ নীল আকাশ দেখে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে শুরু করেছে, হয়তো তন্দ্রামতো এসেছিলো; যখন চোখ খুললো তখন বাইরে প্রচুর ধোঁয়া দেখতে পেল। জানালার বাইরে প্রচুর ধোঁয়া দেখেই সে আগুন লেগেছে বলে অনুমান করলো যেমন আমরা সবাই করে থাকি। সে চতুর্দিকে দ্রুত চোখ বুলালো, না, তার ঘরের ভেতর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি; আবার বাইরে তাকালো, তার মনে পড়লো কিছুক্ষণ পূর্বে দেখা স্বচ্ছ নীল আকাশ, কিন্তু এখন আর আকাশ নেই, এখন আকাশে শুধুই কালো ধোঁয়া; সে নিশ্চিত হতে চাইলো, কোথায় আগুন লেগেছে।

তার এখন অফিস হতে বের হবার কথা নয়; তবুও সে অনিচ্ছাকৃত অফিস হতে বের হলো; সিঁড়ি দিয়ে ছয় তলায় নামলো, সেখানে সে দু’একজন লোককে দেখতে পেল, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো উদ্বেগের ছাপ চোখে পড়লো না। সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকলো, সে বুঝতে পারলো চার তলায় সিঁড়ির শেষে আগুন জ্বলছে, তবে তেমন বেশি নয়, তার নাকে মুখে ধোঁয়া এসে লাগছে, কাগজপত্র পোড়া গন্ধও সে এখন পাচ্ছে। চার তলার সিঁড়ির সামান্য আগুনটুকু সে নিরাপদেই পার হলো; সিঁড়ি দিয়ে সে নিচে তিন তলার দিকে নামতে থাকলো, না, তেমন ভীত হবার মতো সে কোনো কারণ খুঁজে পেল না।

তিন তলার সিঁড়িতে সে টুকরো টুকরো আগুন দেখতে পেল, দু’এক জায়গায় কেউ পানিও ঢেলেছে, হয়তো প্রথমদিকে আগুন নেভাতে চেষ্টা করেছিলো, সফল হয়নি। সে নিচে নামতে থাকল এবং দু’তলার সিঁড়িতে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো; তাকে সে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় আগুন লেগেছে। সে ব্যক্তি বললো টিভির খবরে সে শুনেছে রাজধানী হতে অনেক দূরের এক শহরে আগুন লেগেছে, কিন্তু সেটাতো অনেক দিন আগের কথা, বেশ কয়েক বছর হবে। ইদানিংকালের কোনো আগুনের কথা সিঁড়ির লোকটি বলতে পারলো না। অমৃত অন্তর দেখলো দু’তলার নিচে সিঁড়ি জুড়েই আগুন জ্বলছে, সে সাহস করে আগুনের উপর দিয়েই লাফ দিলো; লাফ দেয়ার পর সে বুঝলো তার পায়ে সামান্য ব্যথা লেগেছে, কিন্তু তার শরীরের কাপড়ে কোনো আগুন লাগেনি। সে ভাবলো, যাক এ যাত্রায় বাঁচা গেল। সে সামান্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যখন নিচে নেমে আসলো তখন বুঝতে পারলো নিচে ফায়ার ব্রিগেডের উদ্ধার কর্মিরা এসেছে। তারা তাকে হাসপাতালে নিতে চাইলো। কিন্তু আমাদের অমৃত অন্তর বললো, সে সুস্থ আছে, হাসপাতালে যেতে হবে না।

কিছুক্ষণ সে রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করলো এবং রাস্তার শেষ প্রান্তে যেখানে বাসগুলো এসে দাঁড়ায় সেখানে দেখলো একটি বাড়ির ভেতরে আগুন জ্বলছে। সে ভালো করে বাড়িটির ভেতরে তাকালো এবং বুঝতে পারলো বাড়ির লোকজন তেমন উদ্বিগ্ন নয়, যে যার মতো বাড়ির কাজ করছে। দুজন নারী একটি শিশুকে নিয়ে খেলা করছে, একটি কিশোর শব্দ করে পড়ছে এবং একটি তরুণী সেজেগুজে বাইরে বের হচ্ছে, হয়তো কোনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। বাড়িতে আগুন জ্বলছে অথচ লোকজনের কাজকর্ম স্বাভাবিক দেখে তার অবাক লাগলো।

সে একটি সিগারেট ধরালো, প্রথমবার সিগারেটটিতে আগুন জ্বললো না, দ্বিতীয়বার সিগারেট হতে মুখের মধ্যে ধোঁয়া গেল; সে বুঝল, সিগারেট ধরেছে। সে ভাবল বাড়ি গেলে কেমন হয়, সব পরিবেশটাই তার কাছে একটু অস্বাভাবিক লাগছে। বাড়িতে যদি আগুন লাগে, সিঁড়ির লোকটির কথা মনে পড়লো, আরো মনে পড়লো বাসস্ট্যান্ডের পাশের আগুন লাগা বাড়িটির কথা।
সে বাসায় যাবার উদ্দেশে একটি বাসে উঠলো এবং জানালার পাশের একটি সিটে বসলো যেন রাস্তার সবকিছু বা রাস্তার ধারের দৃশ্যগুলো দেখতে পায়।

বাসে যেতে যেতেই সে আরো একটি বাড়িকে আগুনে পুড়তে দেখলো। তবে এখানেও সে নিরুদ্বেগ লোকজন দেখে অবাক হলো। সে তার পাশের যাত্রীকে জিগ্যাসা করলো শহরের কোথায় আগুন লেগেছে, কিন্তু সে যাত্রী বললো আগুন লাগার কথা সে শোনেনি তবে সে শুনেছে গত এক মাসে শহরের বেশ কিছু লোক ঘুম থেকে আর জাগেনি। অমৃত অন্তর জিগ্যেস করলো তারা কি মারা গেছে, কিন্তু সে যাত্রীটি জানাল যে তারা একদা ঘুমিয়েছিলো এবং আর কখনো জাগ্রত হয়নি; এবং বেশি কিছু সে জানে না।

যাত্রীসহ আমাদের নায়ককে নিয়ে বাসটি যখন তার বাসা থেকে সামান্য দূরে তখন সে রাস্তা দিয়ে উল্টোদিকে একটি গাড়ি যেতে দেখলো যেটিতে আগুন জ্বলছে। কিন্তু মজার ব্যাপার গাড়িটিতে যে দু’একজন লোক আছে তারা স্বাভাবিক, ড্রাইভারও গাড়িটিকে চালিয়ে নিয়ে গেল। এটিও তাকে অবাক করলো।

সে তার বাসার পাশের বাসস্টপে নামলো। সে দেখল সব মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিত্যদিনের কাজকর্ম করছে। দোকানদার ও হকারেরা তাদের বিক্রিতে ব্যস্ত, লোকজন দ্রুত হাঁটছে, দু’একজন তাকে ধাক্কা দিলো দ্রুত যাবার জন্য, একজন হকার তার কাছে টুথব্রাশ বেঁচতে চাইলো, কিন্তু তার প্রয়োজন ছিলো কলম, তাই সে হকারের কাছ থেকে কিছু কিনলো না। সে একটি দোকানে গিয়ে কলম কিনতে চাইলো, কিন্তু দোকানদার জানাল যে গত কয়েকবছর ধরে বাজারে কোনো কলম নেই, কারণ এখন আর কেউ কলম কেনে না।

সে বাসায় ফিরে এলো এবং ভাবলো আজকে সন্ধ্যায় সে টিভিতে খবর দেখবে। তার চিন্তায় শুধু আগুন খেলা করছিলো এবং সে ভাবছিলো সারা দেশে নিশ্চয় কোনো দুর্যোগ এসেছে। কিন্তু তার পাশের বাসাগুলোর লোকজনের উৎকন্ঠাহীন ভাব দেখে সে নিশ্চিত হতে পারলো না দেশে সত্যিই কোনো দুর্যোগ এসেছে কী না।

সন্ধ্যায় যখন সে টিভির সামনে বসলো তখন সে ভীত হবার মতো তেমন কোনো খবর পেল না। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে সারাদেশেই কিছু কিছু শহর ও গ্রামে আগুন লাগে এবং কিছু সম্পদ পোড়ে, এরকম দু’একটি খবর সেদিনও টিভিতে বললো, সেগুলো তেমন উদ্বেগের কিছু নয়।

রাতের খাবার শেষ করে যখন সে ঘুমাতে গেল তখন প্রায় মাঝরাত। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়লো। যখন ঘুম ভাঙলো তখন সে শুনতে পেল তার শিশুটি তাকে জোরে জোরে ডাকছে, ‘বাবা ওঠো, দ্রুত ওঠো, আগুন, আগুন, বাবা, আগুন ওঠো’। সে দ্রুত উঠলো এবং সবাইকে জাগাতে চেষ্টা করলো, কিন্তু কেউই তার কথা শুনছে না। সে পাশের বাসায় দেখলো আগুন জ্বলছে এবং বাসার লোকজন সবাই ঘুমাচ্ছে। সে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে তাদের ঘুম ভাঙাতে চেষ্টা করলো কিন্তু তাদের ঘুম ভাঙলো না।

সে আরেকটি বাসাতে গিয়ে আগুন আগুন বলে চিৎকার করলো কিন্তু এখানেও কারো ঘুম ভাঙাতে পারলো না। সে হঠাৎ খেয়াল করলো তার শিশুটিও তার সাথে আগুন আগুন বলে চিৎকার করছে, কিন্তু কেউই জাগছে না। তারা একের পর এক ৮-১০টি বাসার সামনে চেঁচালো, কেউই দরজা খুললো না, সে এতক্ষণে বুঝলো তার ডাক কেউই শুনতে পাচ্ছে না, কারণ সবাই গভীর ঘুমে অচেতন। তার মনে হলো সে অন্যায় করছে, কেননা বাড়ির লোকগুলো যদি ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা যায় তবে তারা কম যন্ত্রণা পাবে? বরং জাগলে যন্ত্রণা পাবে বেশি।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top