আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > দর্শন > দর্শন সম্পর্কে আলোচনা

দর্শন সম্পর্কে আলোচনা

শ্রেণিসংগ্রাম আছে, তাই দর্শন আছে

(আগষ্ট ১৮, ১৯৬৪)
উৎস: মাও চু-শি তুই পেঙ, হুয়া-ঙ, চ্যাঙ, চৌউ ফ্যান-তাঙ চি-তুয়ান তি পি-প্যান

যেখানে শ্রেণিসংগ্রাম রয়েছে কেবল সেখানেই দর্শন থাকতে পারে। অনুশীলন বিচ্ছিন্নভাবে দর্শন চর্চা সময়ের অপচয়। যেসকল কমরেড দর্শন অধ্যয়ণ করেন তাদের গ্রামে যাওয়া উচিত। তাদেরকে এই শীতে অথবা সামনের বসন্তে যেতে হবে শ্রেণীসংগ্রামে অংশ নিতে। যাদের স্বাস্থ্য ভাল নয় তাদেরকেও যেতে হবে। গেলে লোক মারা যাবেনা। যা হতে পারে তা হলো ঠাণ্ডা লাগা, আর যদি তারা কয়েকটা অতিরিক্ত জামা গায়ে দেন তাহলে সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলবে।

বর্তমানে যেভাবে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছেন তা ভাল নয়, তারা বই থেকে বইয়ে, ধারণা থেকে ধারণায় গমন করছেন। দর্শন কীভাবে বই থেকে আসতে পারে? মার্কসবাদের তিনটি মূল অঙ্গ হচ্ছে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, দর্শন ও রাজনৈতিক অর্থনীতি। [১] ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞান, শ্রেণীসংগ্রাম। সর্বহারা ও বুর্জোয়ার মধ্যে রয়েছে সংগ্রাম। মার্কস ও অন্যরা এটা অবলোকন করেছেন। ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রীরা সর্বদাই বুর্জোয়াদের দয়ালূ হতে প্ররোচিত করার প্রয়াস চালান। এটা কাজে দেবেনা, সর্বহারা শ্রেণীর শ্রেণীসংগ্রামের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন। সেসয় ইতিমধ্যেই বহু ধর্মঘট হয়েছিল। ইংরেজ সংসদীয় তদন্ত স্বীকার করেছিল যে পুঁজিবাদীদের স্বার্থের পক্ষে বার ঘন্টা কর্মদিবস আট ঘন্টা কর্মদিবসের চেয়ে কম অনুকুল ছিল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু হয়েই কেবল মার্কসবাদ উদ্ভূত হয়। ভিত্তি হচ্ছে শ্রেণীসংগ্রাম। দর্শনের অধ্যয়ন কেবল তার পরেই আসতে পারে। কার দর্শন? বুর্জোয়া দর্শন না সর্বহারা দর্শন? সর্বহারা দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদী দর্শন। সর্বহারা অর্থনীতিও রয়েছে যা ধ্রুপদী অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করেছিল। যারা দর্শনে নিয়োযিত তারা বিশ্বাস করেন দর্শন আগে আসে। অত্যাচারীরা অত্যাচারিতদের নিপীড়ণ করে, তখন অত্যাচারিতদের প্রয়োজন হয় পাল্টা লড়াইয়ের আর তারা দর্শনের খোঁজ করার আগে একটা সমাধান চান। কেবল তখনই জনগণ একে তাদের সূচনা বিন্দু হিসেবে নেন যা হচ্ছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ আর তারা দর্শন আবিষ্কার করেন। আমরা সকলেই এর মধ্য দিয়ে এসেছি। অন্যরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল; চিয়াং কাই-শেক আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। এভাবে আমরা শ্রেণীসংগ্রামে নিয়োযিত হয়েছি, দার্শনীকিকরণে নিয়োযিত হয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এই শীতে যাওয়া উচিত-আমি মানবিক ছাত্রদের কথা বলছি। প্রকৃতি বিজ্ঞানের ছাত্রদের এখন যাওয়া উচিত নয়, যদিও আমরা একবার দুইবারের জন্য তাদের নিতে পারি। যারা মানবিক-ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি, সাহিত্য, আইন-অধ্যয়ন করছেন তাদের সবাইকেই যেতে হবে।  অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রশাসনিক কর্মী ও ছাত্রদের সবাইকেই যেতে হবে পাঁচ মাসের একটা সীমিত সময়ের জন্য। তারা যদি গ্রামে অথবা কারখানায় পাঁচ মাসের জন্য যান তারা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান অর্জন করবেন। ঘোড়া, গরু, ভেড়া, মুরগী, কুকুর, শুকর, ধান, ভুট্রা, সিম, গম, বিভিন্ন ধরণের বাদাম ইত্যাদি সবকিছুর ওপর তারা দৃষ্টিপাত করতে পারেন। তারা যদি শীতে যান তারা ফসল কাটা দেখতে পাবেননা, কিন্তু অন্ততঃ তখনো তারা ভুমি ও জনগণ দেখতে পাবেন। শ্রেণীসংগ্রামের কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করা-যাকে আমি বলি একটা বিশ্ববিদ্যালয়। তারা বিতর্ক করেন যে কোন্ বিশ্ববিদ্যালয় বেশি ভাল, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় নাকি গণবিশ্ববিদ্যালয়।[২] আমার কথা বলতে গেলে আমি গ্রীনউড-এর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট, আমি সেখানে কিছু শিখেছি। অতীতে আমি কনফুসিয়াস অধ্যয়ন করেছি এবং চার গ্রন্থ ও পাঁচ ধ্রুপদী নিয়ে ছয় বছর কাটিয়েছি।[৩] আমি সেগুলো মুখস্থ করতে শিখেছি, কিন্তু আমি সেগুলো বুঝিনি। সেসময় আমি কনফুসিয়াসে গভীরভাবে বিশ্বাস করতাম, এমনকি প্রবন্ধও রচনা করেছিলাম [তার ভাবধারা বিশদ করে]। পরে আমি একটা বুর্জোয়া স্কুলে যাই সাত বছরের জন্য। সাত আর ছয় মিলে তের বছর। আমি সমস্ত বুর্জোয়া বিষয়বস্তু অধ্যয়ণ করি-প্রকৃতি বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান। তারা কিছু শিক্ষণবিজ্ঞানও শেখায়। তার মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচ বছর, দুই বছরের মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগারে আমি যে সময় অতিবাহিত করেছি তা।[৪] সেসময় আমি কান্টের দ্বৈতবাদে বিশ্বাস করতাম, বিশেষত তার ভাববাদে। মূলগতভাবে আমি ছিলাম একজন সামন্তবাদী, আর বুর্জোয়া গণতন্ত্রের এক প্রবক্তা। সমাজ আমাকে ঠেলে দিয়েছে বিপ্লবে যোগ দিতে। আমি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে অল্প কয়েক বছর এবং চার বছরের বিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে কাটিয়েছি। আমি একটি ছয় বছরের বিদ্যালয়ে ইতিহাস ও চীনা ভাষাও পড়িয়েছি। আমি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অল্প কিছুকাল পড়িয়েছি, কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি। যখন আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলাম আমি জানতাম যে আমাদেরকে বিপ্লব করতে হবে, কিন্তু কার বিরুদ্ধে? আর কীভাবে আমরা এতে এগোব? অবশ্যই আমাদেরকে সাম্রাজ্যবাদ ও পুরোনো সমাজের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদ কী জিনিস তার আমি কিছুই বুঝতামনা, তার চেয়েও কম বুঝতাম এর বিরুদ্ধে আমরা কিভাবে বিপ্লব করবো। তের বছরে আমি যা শিখেছি তা বিপ্লবের জন্য কোন উপকারে আসেনি। আমি কেবল হাতিয়ার-ভাষা ব্যবহার করলাম। প্রবন্ধ রচনা করা হচ্ছে একটা হাতিয়ার। আমার অধ্যয়ণের বিষয়বস্তুর একটুও আমি ব্যবহার করিনি। কনফুসিয়াস বলেছেনঃ ‘দয়া হচ্ছে মানবতার একটা বিশিষ্ট উপাদান।’ ‘দয়ালু ব্যক্তি অপরদের ভালবাসেন।’ [৫] তিনি কাকে ভালবাসেন? সকল মানুষকে? মোটেই না। তিনি কি শোষকদের ভালবেসেছেন? ঠিক তাও না। তিনি কেবল শোষকদের একটা অংশকে ভালবেসেছেন। অন্যথায়, কেন কনফুসিয়াস একজন উচ্চ কর্মকর্তা হতে পারলেন না? জনগণ তাকে চায়নি। তিনি তাদের ভালবেসেছেন, তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু অনাহারের মুখোমুখি এবং  “শ্রেষ্ঠতর মানুষ দারিদ্রকে সহ্য করতে পারে’[অনুশাসন]-এর ফলে তিনি প্রায় তার জীবন হারাতে বসেছিলেন, কুয়াঙের জনগণ তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।[৬] তারাও ছিল যারা পশ্চিমে তার ভ্রমণের সময় ছিনে না যাওয়ার জন্য তাকে সমালোচনা করেছিল। বাস্তবে, ওডেস এর গ্রন্থ-এর ‘অগ্নি নক্ষত্র মধ্যরেখা অতিক্রম করে সপ্তম মাসে’ শেনসির ঘটনাবলীর প্রতি নির্দেশ করে। আরো আছে ‘হলুদ পাখি’ যা ছিনের ডিউক মুর সাথে তিন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা কীভাবে মারা গেল ও সমাধিস্থ হলো সে গল্প করে।[৭] ওডেসের গ্রন্থ-এর ওপর শু-মা ছিয়েন [৮]-এর খুবই উচ্চ মূল্যায়ণ ছিল। তিনি বলেন এতে যে ৩০০ কবিতা রয়েছে তা সেই প্রাচীন কালে আদি মুনি-ঋষিদের দ্বারা রচিত। ওডেস-এর গ্রন্থ-এর বিরাট অংশ কবিতাই বহুবিধ অবস্থার ধরণে লেখা, সেগুলো হচ্ছে সাধারণ জনগণের লোক সঙ্গীত, মুনি-ঋষিরা কেউ নয় সাধারণ জনগণ। ‘যখন সেগুলো উদ্ভূত হলো তখন রচিত হলো’এর অর্থ হলো যখন কারো হৃদয় ক্ষোভে পুর্ণ হয় তিনি একটা কবিতা লেখেন!

না তুমি বপন করো না ফসল তোল;

কী করে তোমার তিন শত ঝুরি করবে পুরণ??

তুমি শিকারের পেছন ছোটনা;

কী করে তোমার বারান্দায় কোয়েল ঝুলে থাকতে দেখবো?

সেই যে শ্রেষ্ঠতর মানুষ!

যে অলসতার রুটি করবেনা ভক্ষণ! [৯]

‘বেতন নিয়ে দপ্তরের কর্তব্যে অবহেলা করা’র প্রকাশ এখান থেকে আসে। এটা একটা কবিতা যা স্বর্গকে দায়ী করে এবং শাসকদের বিরোধিতা করে। কনফুসিয়াসও বরং গণতান্ত্রিক ছিলেন। তিনি একজন পুরুষ ও নারীর মধ্যেকার ভালবাসাকে অন্তর্ভুক্ত করেন [ওডেসের গ্রন্থ-এ]। তার মন্তব্যে ছু শি সেগুলোকে গোপন প্রেম কাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।[১০] বাস্তবে সেগুলোর কতগুলি তাই আবার কতগুলো তা নয়; পরেরগুলো পুরুষ ও নারীর চিত্রকল্প ধার করে রাজা ও প্রজার মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে লিখতে। শু [বর্তমান কালের শেচুয়ান] তে পাঁচ রাজবংশ ও দশ দেশের সময়কালে ওয়েই চুয়াঙ কর্তৃক রচিত ‘ছিনের স্ত্রী শীতে ক্রন্দন করে’ শীর্ষক একটা কবিতা ছিল।[১১] তিনি তার যৌবনকালে লেখেন আর তা ছিল তার রাজন্যের জন্য তার আকুলতা।

মাঠে যাওয়ার ব্যাপারে আবার ফিরে আসি, লোকেদের উচিত এই শীতের শুরুতে ও বসন্তে গ্রুপে গ্রুপে ও চক্রাকারে যাওয়া শ্রেণীসংগ্রামে অংশ নিতে। কেবল এই ভাবেই তারা কিছু শিখতে পারেন, বিপ্লব সম্পর্কে শিখতে পারেন। আপনারা বুদ্ধিজীবিরা প্রতিদিন সরকারী দপ্তরে বসেন, ভাল খাবার দাবার খান, সুন্দর পোষাক আশাক পরেন আর এমনকি হাটেনওনা। এজন্যই আপনারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাপড় চোপড়, খাদ্য, গৃহ ও অনুশীলন হচ্ছে চার মহা উপাদান যা রোগ বয়ে আনে। যদি জীবনের ভাল পরিস্থিতি থেকে আপনারা পরিবর্তন করে কিছুটা খারাপ পরিস্থিতিতে যান, যদি আপনারা শ্রেণীসংগ্রামে অংশ নিতে নেমে আসেন, যদি আপনারা ‘চার পরিষ্কারকরণ’ ও ‘পাঁচ বিরোধী’ [১২]র মধ্যে ঢোকেন, এবং এক প্রচণ্ডতার মধ্যে দিয়ে যান, তখন আপনারা বুদ্ধিজীবিরা নিজেদের সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গী পাবেন।

আপনারা যদি শ্রেণীসংগ্রামে নিয়োযিত না হন, তাহলে আপনারা কোন্ দর্শনে নিয়োযিত?

কেন নেমে পড়া ও চেষ্টা চালানো নয়? যদি অসুস্থতা মারাত্মক রূপ নেয় আপনাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে-আপনাদের মৃত্যুর সীমারেখা টানতে হবে। আপনারা যখন এতই অসুস্থ যে মৃত্যুর মুখোমুখি তখন আপনাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। নেমে পড়ার সাথে সাথেই আপনারা কিছু চেতনা পাবেন। (কাঙ সেঙ বলে ওঠলেনঃ ‘দর্শন বিভাগের গবেষণা অনুষদ এবং বিজ্ঞান একাদেমীর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সকলেরও নেমে পড়া উচিত। বর্তমানে তারা প্রাচীন নিদর্শনের অধ্যয়নের এক অনুষদে রূপান্তরের এবং ক্ষোভের নৈবেদ্যের গন্ধ শুঁকে নিজেকে এক উদ্যানে রূপান্তরের মুখোমুখি। দর্শন অনুষদের কেউই কুয়াঙ-মিঙ জিহ-পাও পড়েনা।’) আমি কেবল কুয়াঙ-মিঙ জিহপাও এবং ওয়েন-হুই পাও পড়ি, [১৩]। আমি পিপল্স ডেইলি পড়িনা, কারন পিপল্স ডেইলি কোন তাত্ত্বিক নিবন্ধ ছাঁপেনা; আমরা একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তারা তা প্রকাশ করে। দৈনিক দি লিবারেশন আর্মি  জীবন্ত, এটা পঠন যোগ্য। (কমরেড কাঙ সেঙঃ ‘সাহিত্য অনুষদ চৌ কুছেঙ-এর প্রতি কোন মনোযোগ দেয়না, [১৪] এবং অর্থনীতি অনুষদ সুন ইয়েহ-ফ্যাঙ [১৫]-এর প্রতি ও এর উদারতাবাদের দিকে যাওয়ার এবং পুঁজিবাদের দিকে যাওয়ার প্রতি কোন মনোযোগ দেয়না।’)

তাদেরকে পুঁজিবাদের দিকে যেতে দিন। সমাজ খুবই জটিল। যদি সবাই সমাজতন্ত্রের দিকে যায় আর কেউ পুঁজিবাদের দিকে না যায়, তাকি অতি সরল নয়? তাহলে তখন কি আমাদের বিপরীতের একত্বের অভাব ঘটবেনা এবং আমরা কি একতরফা হয়ে যাবনা? তাদেরকে তা করতে দিন। তাদেরকে আমাদের ওপর উন্মত্তের মত আক্রমণ করতে দিন, রাস্তায় মিছিল করতে দিন, অস্ত্র হাতে নিয়ে বিদ্রোহ করতে দিন-আমি এসবই অনুমোদন করি। সমাজ খুবই জটিল, এমন একটাও কমিউন নেই, একটাও শিয়েন, কেন্দ্রিয় কমিটির বিভাগ নেই যেখানে এক নিজেকে দুইয়ে বিভক্ত করবেনা। তাকিয়ে দেখুন, গ্রামীন কাজের বিভাগকে কি ভেঙে দেওয়া হয়নি?[১৬] এটা সম্পুর্ণত স্বতন্ত্র গৃহস্থালির ভিত্তিতে হিসেব করায় এবং ‘চার স্বাধীনতা’-টাকা ধার দেওয়া, ব্যবসা করার স্বাধীনতা, শ্রম ভাড়া করা এবং ভমি ক্রয় ও বিক্রয় করার স্বাধীনতা প্রচারে নিজেকে নিবেদিত করেছিল। অতীতে তারা একটা ঘোষণা দিয়েছিল [একে কার্যকর করতে]। তেঙ ঝু-হুই আমার সাথে বিতর্ক করেছিল। কেন্দ্রিয় কমিটির এক সভায় সে চার বিরাট স্বাধীনতা বাস্তবায়নের ধারণা তুলে ধরেছিল। [১৭]

নয়া গণতন্ত্রকে সংহত করা এবং চিরকালের জন্য তা সংহত করতে যাওয়া হচ্ছে পুঁজিবাদে নিয়োযিত হওয়া। [১৮] নয়া গণতন্ত্র হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে একটা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এটা কেবল ভুস্বামী ও মুতসুদ্দি বুর্জোয়াদের স্পর্শ করে, জাতীয় বুর্জোয়াদের একেবারেই স্পর্শ করেনা। জমি ভাগ করে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে সামন্ত ভুস্বামীদের সম্পত্তিকে কৃষকদের ব্যক্তি সম্পত্তিতে পরিণত করা, আর তা তখনো বুর্জোয়া বিপ্লবের সীমার মধ্যে থাকে। জমি ভাগ করা উল্লেখযোগ্য কিছূ নয়-ম্যাক আর্থার জাপানে তা করেছে। নেপোলিয়নও জমি  ভাগ করে দিয়েছিল। ভুমিসংস্কার না পুঁজিবাদকে বিলোপ করতে পারে, না সমাজতন্ত্রের দিকে চালিত করতে পারে।

আমাদের রাষ্ট্রে ক্ষমতার প্রায় এক তৃতিয়াংশ শত্রুদের হাতে অথবা শত্রুদের সহানুভূতিশীলদের হাতে রয়েছে। আমরা পনের বছর অতিক্রম করেছি আর এখন আমরা দুই তৃতিয়াংশ ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করি। আপনি বর্তমানে একজন [পার্টি] শাখা সম্পাদককে কয়েক প্যাকেট সিগারেটের বিনিময়ে কিনতে পারেন, তার কোন কন্যাকে বিয়ের কথা নাহয় নাই বললাম। কিছু এলাকা রয়েছে যেখানে ভুমি সংস্কার শান্তিপুর্ণভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, এবং ভুমি সংস্কার টিমগুলি ছিল খুবই দুর্বল, এখন আপনি দেখতে পারেন যে সেখানে প্রচুর সমস্যা রয়েছে।

আমি দর্শন সম্পর্কে বস্তুগুলো পেয়েছি। [এটা দ্বন্দ্বের সমস্যা সংক্রান্ত বস্তুগুলোর প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে-স্টেনোগ্রাফারের নোট] আমি রূপরেখার ওপর দৃষ্টিপাত করেছি। [এটা ‘দুয়ে মিলে এক হয়’ কে সমালোচনাকারী একটা নিবন্ধের রূপরেখার প্রতি নির্দেশ করছে[১৯]-স্টেনোগ্রাফারের নোট] আমি বাকিগুলো পড়তে পারিনি। আমি বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ সম্পর্কে বস্তুগুলোর প্রতিও দৃষ্টিপাত করেছি।

বিপরীতের একত্বের নিয়ম সম্পর্কে, বুর্জোয়ারা এসম্পর্কে কি বলে, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্তালিন এসম্পর্কে কী বলেন, সংশোধনবাদীরা এসম্পর্কে কী বলে এরকম জিনিস সংগ্রহ করা ভাল । বুর্জোয়াদের কথা বলতে গেলে, ইয়াং শিয়েন-চেন এসম্পর্কে আলোচনা করে, এবং প্রাচীন হেগেল এসম্পর্কে আলোচনা করে। এ ধরণের লোকেরা প্রাচীন কালে ছিল। বর্তমানে তারা আরো খারাপ। বগদানভ ও লুনাচারস্কি ছিল যারা একাত্মবাদ (ধর্মে বা ঐশি প্রত্যাদেশে আস্থা ছাড়াই এক পরমসত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস-বাংলা অনুবাদক] নিয়ে কথা বলতো। আমি বগদানভের অর্থনীতি পড়েছি। [১৯] লেনিন এটা পড়েছেন, আর মনে হয় তিনি আদিম সঞ্চয়ের অংশটি অনুমোদন করেছিলেন। (কাঙ সেঙঃ ‘বগদানভ’এর অর্থনীতি সম্ভবত আধুনিক সংশোধনবাদীদের চেয়ে বেশি আলোকপ্রাপ্ত ছিল।  কাউতস্কির অর্থনৈতিক মতবাদ সম্ভবত ক্রুশ্চেভের চেয়ে বেশি আলোকপ্রাপ্ত, আর যুগোস্লাভিয়াও সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে বেশি আলোকপ্রাপ্ত। মোটের ওপর ডিজিলাস স্তালিন সম্পর্কে কিছু ভাল কথা বলেছে, সে বলেছে চীন প্রশ্নে স্তালিন একটা আত্মসমালোচনা করেছিলেন।’)

স্তালিন অনুভব করেছিলেন যে চীন প্রশ্ন বোঝাপড়ায় তিনি ভুল করেছিলেন, আর সেগুলো কোন ছোটখাট ভুল ছিলনা। আমরা কয়েক দশক কোটি মানুষের এক বিরাট দেশ, আর তিনি আমাদের বিপ্লবকে, আমাদের ক্ষমতা দখলকে বিরোধিতা করেছিলেন। সারা দেশে ক্ষমতা দখলের জন্য আমরা অনেক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছি, সমগ্র জাপবিরোধি যুদ্ধ একটা প্রস্তুতি গঠণ করে। আপনারা যদি নয়া গণতন্ত্র সম্পর্কে সমেত সেসময়ের কেন্দ্রিয় কমিটির দলিলসমূহের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তাহলে দেখবেন এটা খুবই পরিষ্কার। তাই বলতে গেলে, আপনারা একটা বুর্জোয়া একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননা, কেবল সর্বহারা নেতৃত্বাধীনে নয়া গণতন্ত্রই কেবল প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, কেবল সর্বহারার নেতৃত্বে একটা জনগণতান্ত্রিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। আমাদের দেশে আশি বছর যাবত বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে সকল গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের নেতৃত্বাধীন গনতান্ত্রিক বিপ্লব নিশ্চিতভাবে জয়যুক্ত হবে। এটাই হচ্ছে একমাত্র সমাধান, অন্য কোন সমাধান নেই। এটা হচ্ছে প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ হবে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা। তাই, নয়া গণতন্ত্র  ছিল একটা পুর্ণাঙ্গ কর্মসুচি। এটা রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সেইসাথে সংস্কৃতি আলোচনা করেছে; এটা কেবল সামরিক বিষয়াদি আলোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। (কাঙ সেঙঃ ‘ নয়া গণতন্ত্র সম্পর্কে হচ্ছে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য বিরাট তাতপর্যময়। আমি স্প্যানিশ কমরেডদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তারা বলেছে যে তাদের জন্য সমস্যাটা ছিল বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্টা করা, নয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নয়। তাদের দেশে তারা তিনটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করেনিঃ বাহিনী, গ্রামাঞ্চল, রাজনৈতিক ক্ষমতা। তারা সম্পুর্ণত সোভিয়েত পররাষ্ট্র নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, কিছূই অর্জন করেনি।’) এগুলো হচ্ছে চেন তু-সিউয়ের কর্মনীতি! (কমরেড কাঙ সেঙঃ ‘তারা বলে কমিউনিস্ট পার্টি একটা বাহিনী গড়ে তোলে আর তারপর অন্যদের কাছে তা ন্যাস্ত করে।’) এটা অর্থহীন, বৃথা।

আরো পড়ুন:  সমাজদর্শন কাকে বলে

(কমরেড কাঙ শেঙঃ ‘তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাও চায়নি, তারা কৃষকদেরও সমাবেশিত করেনি। সেসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বলেছিল যদি তারা সর্বহারা নেতৃত্ব আরোপ করে তাহলে ইংলন্ড ও ফ্রান্স তা বিরোধিতা করতে পারে, আর তা সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থের

পক্ষে যাবেনা।’)

কিউবার ব্যাপারটা কী? কিউবাতে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় ও সৈন্যবাহিনী প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত করে, এবং কৃষকদেরকে সমাবেশিত করে, যেমনটা অতীতে [আমরা করেছিলাম], তাই তারা সফল হয়েছিল।

(কমরেড কাঙ শেঙঃ ‘তারাও [স্প্যানিশরা] যখন লড়াই করেছিল, তারা বুর্জোয়াদের মতন করে নিয়মিত যুদ্ধ চালায়, তারা শেষ পর্যন্ত মাদ্রিদকে রক্ষা করে চলে। [২০] সব বিষয়ে তারা সোভিয়েত পররাষ্ট্র নীতির অধীন করে নিজেদের।’)

এমনকি তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ভেঙে দেওয়ার আগেও আমরা তৃতিয় আন্তর্জাতিকের নির্দেশ অমান্য করেছিলাম। সুনাই সম্মেলনে আমরা তা মান্য করিনি, এবং পরে দশ বছর ধরে শুদ্ধি অভিযান সমেত সপ্তম কংগ্রেস পর্যন্ত যখন আমরা একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম (‘আমাদের পার্টি ইতিহাসের কিছু সিদ্ধান্ত’), [২১] এবং ‘বামপন্থা’ [এর ভ্রান্তি]— সংশোধন করলাম, আমরা সেগুলো একেবারেই মান্য করিনি। সেসব গোঁড়ামীবাদীরা চীনের বিশেষত্ব অধ্যয়ণ করতে সম্পূর্ণত ব্যর্থ হলো; তাদের গ্রামে নিয়ে যাওয়ার এতগুলো দশটি বছর পার করেও তারা গ্রামাঞ্চলের ভুমি, সম্পত্তি ও শ্রেণীসম্পর্ক অধ্যয়ণে সম্পুর্ণত ব্যর্থ হলো। স্রেফ গ্রামে গিয়েই আপনি গ্রাম বুঝতে পারবেননা। আপনাকে গ্রামাঞ্চলের সকল শ্রেণী ও স্তরসমূহের মধ্যকার সম্পর্ককে অধ্যয়ণ করতে হবে। এসকল সমস্যার অধ্যয়ণে আমি দশটি বছর নিবেদন করেছি চুড়ান্তত সেগুলি নিজের কাছে পরিষ্কার করার আগে। আপনাকে সকল ধরণের জনগণের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে চাখানায় আর জুয়ার আসরে এবং তাদের তদন্ত করতে হবে। ১৯২৫-এ আমি কৃষক আন্দোলন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সক্রিয় ছিলাম, [২২] এবং গ্রামীন সার্ভে পরিচালনা করেছিলাম। আমার নিজ গ্রামে আমি গরীব কৃষকদের মধ্যে গেলাম তদন্ত চালাতে। তাদের জীবন ছিল শোচনীয়, তাদের খাওয়ার মতো কোন খাদ্য ছিলনা। একজন কৃষক ছিল যার সাথে আমি ডোমিনো খেলি ( স্বর্গ, পৃথিবী, মানুষ, ভারসাম্য, মেই ছিয়েন, চ্যাঙ সাঙ এবং বেঞ্চ নিয়ে), পরে তাকে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। খাদ্য গ্রহণের আগে, সময়কালে ও পরে আমি তার সাথে কথা বলি আর বুঝতে সক্ষম হই যে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীসংগ্রাম কেন এত তীব্র ছিল। যে কারণে সে আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী ছিল তা ছিলঃ প্রথম, আমাকে একজন মানুষ মনে হয়েছে, দ্বিতীয়, আমি তাকে খাদ্য গ্রহণে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, এবং তৃতিয়, সে কিছু টাকা কামাই করতে পারে। আমি হারতে লাগলাম; আমি একটা অথবা দুটা রৌপ্য ডলার হারলাম, এবং ফলে সে খুবই সন্তুষ্ট হলো। আমার এক বন্ধু মুক্তির পরও দুবার আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। ঐদিন গুলোতে একবার সে সত্যিই খারাপভাবে আমাকে খুঁজছিল আমার কাছ থেকে এক ডলার ধার নিতে। আমি তাকে তিনটি দিলাম অফেরতযোগ্য সহযোগিতা হিসেবে। তখনকার দিনে এমন অফেরতযোগ্য সহযোগিতা পাওয়াটা খুবই কঠিণ ছিল। আমার বাবা মনে করতেন যদি কেউ তার নিজের দেখভাল নিজে না করে স্বর্গ ও মর্ত্য তাকে শাস্তি দেবে। আমার মা তাকে বিরোধিতা করেন। আমার বাবা মারা গেলে খুব কম লোক তার শেষকৃত্য শোভাযাত্রা অনুসরণ করেছিল। যখন আমার মা মারা গেলেন বহুলোক শোভাযাত্রা অনুসরণ করলো। একবার কো লা হুই আমাদের পরিবারে ডাকাতি দেয়। আমি বলেছিলাম এটা তারা ঠিকই করেছে, যেহেতু জনগণের কিছুই ছিলনা। আমার মাও এটা একেবারেই গ্রহণ করতে পারেননি।

একবার চাঙশায় ভাতের দাঙ্গা দেখা দেয় যাতে প্রাদেশিক গভর্ণর প্রহৃত হয়। সিয়াঙ সিয়াঙ থেকে কিছু হকার এসেছিল যারা তাদের প্রশস্থ সিম বিক্রী করে বাড়ীর দিকে ছুটছিল। আমি তাদের থামিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলাম। গ্রামাঞ্চলে লাল ও সবুজ গ্যাঙেরাও সভা করছিল আর বড় বড় পরিবারগুলোকে খেয়ে ফেলছিল। সাংহাই সংবাদপত্রে এর রিপোর্ট এসেছিল, সমস্যাটা দমিত হলো যখন চাঙশা থেকে সৈন্যদল প্রেরিত হলো। তারা ভাল শৃংখলা মেনে চললোনা আর মাঝারি কৃষকদের ধান নিয়ে গেল, এভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। তাদের অন্যতম একজন নেতা এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়ালো, শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে আশ্রয় নিল, কিন্তু সে সেখানে ধরা পড়লো ও নিহত হল। পরে গ্রামীন ভদ্র সম্প্রদায় একটা সভা করলো আর কিছু গরীব কৃষককে হত্যা করলো। সেসময় তখনো এখনকার মত কোন কমিউনিস্ট পার্টি ছিলনা; এগুলো ছিল স্বতস্ফুর্ত শ্রেণীসংগ্রাম।

সমাজ আমাদের রাজনৈতিক স্তরে ঠেলে দিয়েছে। আগে কেই বা মার্কসবাদে দীক্ষিত হওয়ার কথা ভেবেছে? আমি এমনকি এর কথা শুনিওনি। যা আমি শুনেছি ও পড়েছি তাহচ্ছে কনফুসিয়াস, নেপোলিয়ন, ওয়াশিংটন, পিটার দি গ্রেট, মেইজি পুনরুত্থান, তিন বিশিষ্ট ইতালীয় [দেশপ্রেমিক]-অন্য কথায়, পুঁজিবাদের সেই সব [বীরদের]। আমি ফ্রাংকলিনের একটা জীবনিও পড়েছি। তিনি এক দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছেন; পরে তিনি একজন লেখকে পরিণত হন, এবং বিদ্যুতের পরীক্ষাও চালান। (চেন পো তাঃ ‘ফ্রাংকলিনই প্রথম এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেন যে মানুষ হচ্ছে একজন কলকব্জা প্রস্তুতকারক পশু।’)

তিনি এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন যে মানুষ হচ্ছে এক কলকব্জা প্রস্তুতকারক পশু। আগে তারা বলতেন যে মানুষ এক চিন্তাশীল পশু, ‘হৃদয় অঙ্গ চিন্তা করতে পারে’ [২৩], তারা বলেন যে মানুষ হচ্ছে সকল সৃষ্টির আত্মা। কারা সভা ডেকেছিল আর তাকে [এ পদে] নির্বাচিত করেছিল? তিনি এ মর্যাদা নিজের ওপর ন্যাস্ত করেন। সামন্ত যুগে এই প্রস্তাবনার অস্তিত্ব ছিল। পরে, মার্কস এই মত তুলে ধরেন যে মানুষ হচ্ছে কলকব্জা প্রস্তুতকারক এবং মানুষ হচ্ছে এক সামাজিক পশু। বাস্তবে কেবল এক মিলিয়ন বছর [বিবর্তনের]-এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরই মানুষ এক বৃহত মস্তিষ্ক ও এক জোড়া হাত গড়ে তোলে। ভবিষ্যতে প্রাণীরাও বিকশিত হতে থাকবে। আমি বিশ্বাস করিনা যে মানুষেরই কেবল দুই হাত হতে পারে। ঘোড়া, গরু, ভেড়ারা কি বিবর্তিত হতে পারেনা? কেবল বানরেরাই কি বিবর্তিত হতে পারে? অধিকন্তু সকল বানরের মধ্যে কেবল একটি প্রজাতিই কি বিবর্তিত হতে পারে, অন্যরা কি বিবর্তনে অক্ষম? এক মিলিয়ন বছর পর, দশ মিলিয়ন বছর পর ঘোড়া, গরু ও ভেড়ারা আজকে যেমনটা তেমনটাই কি থাকবে? আমার মনে হয় তারা পরিবর্তিত হতে থাকবে। ঘোড়া, গরু, ভেড়া ও কীটপতঙ্গ সবাই পরিবর্তিত হবে। প্রাণীরা উদ্ভিত থেকে আর উদ্ভিদেরা সামুদ্রিক আগাছা থেকে বিবর্তিত হয়েছে। চ্যাঙ তাই-ইয়েন এসবই জানতেন। যে বইয়ে তিনি কাঙ ইউ-ওয়েইয়ের সাথে মিলে বিপ্লবের কথা বলেছেন সেখানে এই নীতিমালা বিশদ করেছেন। [২৪] পৃথিবী ছিল মূলতঃ মৃত, কোন উদ্ভিদ ছিলনা, কোন পানি ছিলনা, কোন বাতাস ছিলনা। পরে, আমি জানিনা কত কোটি বছর পর পানি গঠিত হয়; হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দ্রুতই পুরোনো পথে পানিতে রূপান্তরিত হয়না। পানিরও নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। তারও আগে এমনকি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনেরও অস্তিত্ব ছিলনা। হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন উতপন্ন হওয়ার পরই কেবল দুই উপাদান মিলে পানি উতপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আমাদেরকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের ইতিহাস অধ্যয়ণ করতে হবে, এবিষয়কে অবহেলা করলে চলবেনা। আমাদের অল্প কয়েকটি বই পড়তে হবে। আমাদের বর্তমান সংগ্রামের প্রয়োজন থেকে পড়া আর লক্ষ্যহীনভাবে পড়ার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। ফু ইং [২৫] বলেন যে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন শত সহস্রবার একত্রিত হওয়ার পরই কেবল পানি গঠণ করে; এটা দুয়ে মিলে এক হওয়ার সরল কোন ঘটনা নয়। এ ব্যাপারেও তিনি সঠিক ছিলেন; আমি তাকে খুঁজতে চাই এবং আলাপ করতে চাই (লু পিঙের [২৬] সাথে কথোপকথন;) আপনাদের উচিত নয় ফু ইংয়ের সবকিছুকে পরমভাবে বিরোধিতা করা।

এর আগে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণকে পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। বিশ্লেষণ অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার, কিন্তু সংশ্লেষণ সম্পর্কে বেশি কিছু বলা হয়নি। আমি একবার আই সু-চির সাথে কথা বলেছি। [২৭] তিনি বলেন যে আজকাল কেবল ধারণাত্মক সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের কথা বলা হয়, বিষয়গত ব্যবহারিক সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের কথা বলা হয়না। কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাঙকে, সর্বহারা ও বুর্জোয়াকে, ভুস্বামী ও কৃষকদের এবং চীনা ও সাম্রাজ্যবাদীদের আমরা কীভাবে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করি? আমরা কীভাবে তা করি, উদাহারণস্বরূপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাঙের ক্ষেত্রে? বিশ্লেষণ হচ্ছে সরলভাবে এই প্রশ্ন যে আমরা কতটা শক্তিশালি, আমাদের কী পরিমাণ ভুখণ্ড রয়েছে, আমাদের কত সংখ্যক সদস্য রয়েছে, কত সৈন্য রয়েছে, ইয়েনানের মত আমাদের কতগুলি ঘাঁটি রয়েছে, আমাদের দুর্বলতাগুলি কী কী? কোন বড় শহর আমাদের দখলে নেই, আমাদের বাহিনী সদস্য কেবল ১২,০০০,০০। আমাদের কোন বিদেশী সাহায্য নেই, যেখানে কুওমিনতাঙের রয়েছে প্রচুর বিদেশী সাহায্য। আপনি যদি সাংহাইয়ের সাথে ইয়েনানের তুলনা করেন, ইয়েনানের কেবল ৭,০০০ জনসংখ্যা, এর সাথে [পার্টি ও সরকারী] শাখাসমূহের লোকবল ও সৈন্যদল [ইয়েনানে স্থিত] যোগ করলে মোট হয় ২০,০০০। এখানে কেবল হস্তশিল্প ও কৃষি রয়েছে। কীভাবে তাকে এক বিরাট শহরের সাথে তুলনা করা যায়? আমাদের শক্তিশালি দিক হচ্ছে এই যে আমাদের রয়েছে জনসমর্থন যেখানে কুওমিনতাঙ গণবিচ্ছিন্ন। তোমাদের অধিক ভুখণ্ড, সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, কিন্তু তোমাদের সৈন্য জোরজবরদস্তিতে অর্জিত, এবং অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে রয়েছে বিরোধিতা। স্বভাবতই, তাদের সৈন্যবাহিনীর বিরাট অংশেরই বিবেচনাযোগ্য লড়ার সামর্থ রযেছে, সর্বক্ষেত্রে এমন না যে তারা এক আঘাতে ধ্বংস হবে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে তাদের চাবিকাঠি দুর্বল দিক। আমরা ব্যাপক জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হই; তারা ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন।

তারা তাদের প্রচারে বলে যে কমিউনিস্ট পার্টি সাধারণ সম্পত্তি ও সাধারণ স্ত্রী প্রতিষ্ঠা করে; তারা এগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রচার করে। তারা একটা গান বানিয়েছিলঃ ‘যখন চুতে ও মাও সে-তুঙ আবির্ভুত হবে, খুন খারাপি, জ্বালাও পোড়াও চালাবে, তখন তুমি কী করবে?’ তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এটা গাইতে শেখায়, আর তারা গাওয়া মাত্রই ছাত্রাছাত্রীরা বাড়ীতে গিয়ে বাবা মা, ভাই ও বোনেদের জিজ্ঞেস করলো, এভাবে আমাদের জন্য প্রচারের বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। একটি ছোট্র ছেলে গানটিতে [শুনে] তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো। তার বাবা উত্তর দিলঃ ‘তুমি অবশ্যই প্রশ্ন করবেনা; বড় হলে তুমি নিজেই দেখবে, তখন বুঝবে।’ সে ছিল একজন মধ্যপন্থী। তখন ছেলেটি তার কাকাকে জিজ্ঞেস করলো। কাকা তাকে তিরষ্কার করে জবাব দিলঃ ‘এই এসব খুন খারাপি, জ্বালাও পোড়াও ব্যাপারটা কী? তুমি যদি আমাকে আবার জিজ্ঞেস করো, আমি কিন্তু পিটুনি দেব‘। তার কাকা আগে কমিউনিস্ট যুব লীগের সদস্য ছিল। সকল সংবাদপত্র ও রেডিও স্টেশন আমাদের আক্রমণ করে। প্রচুর সংবাদপত্র ছিল, প্রতিটা শহরে কয়েক ডজন করে, প্রতিটা উপদল একটা করে চালাতো, আর ব্যতিক্রমহীনভাবে সকলেই ছিল কমিউনিস্ট-বিরোধি। সমস্ত সাধারণ মানুষ কি সেগুলোতে কর্ণপাত করেছে? মোটেই না। চীনা সম্পর্কের আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা আছে, চীন হচ্ছে একটা ‘চড়–ই পাখি’। [২৮] বিদেশেও এটা ধনী ও গরীব, প্রতিবিপ্লব ও বিপ্লব, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও সংশোধনবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। অবশ্যই বিশ্বাস করবেননা যে প্রত্যেকেই কমিউনিস্ট বিরোধি প্রচারে গলে যাবে, আর কমিউনিজমের বিরোধিতায় যোগ দেবে। আমরা কি সেসময় সংবাদপত্র পড়িনি? তথাপি আমরা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হইনি।

আমি ড্রিম অব রেড চেম্বার পড়েছি। কিন্তু এর দ্বারা প্রভাবিত হইনি। আমি একে ইতিহাস হিসেবে পড়েছি। প্রথমে আমি একে একটা গল্প হিসেবে পড়েছি তারপর ইতিহাস হিসেবে। যখন লোকে ড্রিম অব রেড চেম্বার পড়েন, তারা চতুর্থ অধ্যায় যতন সহকারে পড়েননা, বস্তুত, এই অধ্যায় এই বইয়ের সার ধারণ করে। লেঙ জু-সিংও রয়েছে যে কিনা জুঙ-কুও প্রাসাদের বর্ণনা দেন, গান ও নোট তৈরি করেন। চতুর্থ অধ্যায়ে ‘লাউয়ের বৈরাগী লাউ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, ‘কর্মকর্তাদের জন্য তেলেসমাত’-এর কথা বলে, এটা চার বৃহত পরিবারের পরিচয় দেয়ঃ

হৈ হৈ রৈ রৈ

নানকিং চিয়া!

কলসি দিয়ে মাপে তারা স্বর্ণ

আহ-প্যাঙ প্রাসাদ

আকাশ ছোঁয়া

কিন্তু নানকিং সি-এর আবাস

হয়না তাতেও

মহাসমুদ্রের রাজা যায়

নানকিং ওয়াঙের কাছে

যখন তার স্বর্ণ বিছানার অভাব ঘটে

নানকিং শুয়ে

এত ধনী তারা

গুণতে তাদের অর্থ

লেগে যাবে সারাটাদিন… …[২৯]

লাল ঘরের স্বপ্ন [ড্রিম অব দি রেড চেম্বার] চার বৃহত পরিবারের প্রতিটার বর্ণনা দেয়। এটা ব্যাপৃত হয় এক সাংঘাতিক শ্রেণীসংগ্রাম নিয়ে যার সাথে বহু ডজন লোকের ভাগ্য জড়িত, যদিও এর মধ্যে কেবল কুড়ি অথবা তিরিশ জন শাসক শ্রেণীর। (হিসেব করে দেখা গেছে যে [এই বর্গে] রয়েছে তেত্রিশ জন।) অন্যরা সবাই হচ্ছে দাস, তিনশ জনেরও অধিক সবাই, যেমন ইউয়েহ ইয়াঙ, সু-চি, দ্বিতীয় বোন ইউউ, তৃতীয় বোন ইউউ প্রমুখ। ইতিহাস অধ্যয়ণে, আপনি যদি শ্রেণীসংগ্রামের দৃষ্টিকোণ গ্রহণ না করেন যাত্রাবিন্দু হিসেবে, আপনি বিভ্রান্ত হবেন। বিষয়সমূহকে পরিষ্কারভাবে কেবল শ্রেণীসংগ্রামের দ্বারাই বিশ্লেষণ করা যায়। লাল ঘরের স্বপ্ন লেখার পর দুশ বছরেরও অধিক কেটে গেছে, এই বইয়ের ওপর গবেষণা এবিষয়টিকে পরিষ্কার করেনি, এমনকি বর্তমান পর্যন্ত, এথেকে আমরা সমস্যার জটিলতা বুঝতে পারি। ইউ পিঙ-পো এবং ওয়াঙ কুন-লুন উভয়ে হচ্ছে বিশেষজ্ঞ। [৩০] হো চি-ফ্যাঙও একটা ভুমিকা লিখেছেন। উ-শিহ চ্যাঙ [৩২] নামের এক ভদ্রলোকও পর্দায় আবির্ভুত হয়েছেন। এসবই লাল ঘরের স্বপ্ন-এর ওপর সাম্প্রতিক গবেষণা নির্দেশ করে, পুরোনো অধ্যয়ণগুলোকে আমি এমনকি গুণে বলতে পারবোনা। লাল ঘরের স্বপ্ন -এর ওপর সাই ইউয়ান-পেইর মত ছিল ভুল; হু শিহ ছিল কিছুটা বেশি সঠিক। [৩৩]

আরো পড়ুন:  দর্শনের স্বরূপ হচ্ছে প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সংশ্লেষণ

সংশ্লেষণ কী? আপনারা সবাই দেখেছেন কীভাবে দুটি বিপরীত কুওমিনতাঙ ও কমিউনিস্ট পার্টি মূল ভুখণ্ডে সংশ্লেষিত হয়েছে। সংশ্লেষণ ঘটেছে এভাবেঃ তাদের বাহিনী আসতো আমরা গিলে ফেলতাম, আমরা তাদের খেয়ে ফেলতাম এক গ্রাস এক গ্রাস করে। এটা ইয়াঙ শিয়েন-চেন বর্ণিত দুইয়ে মিলে এক হওয়ার ঘটনা নয়, এটা শান্তিপুর্ণভাবে পাশাপাশি অবস্থানরত দুই বিপরীতের সংশ্লেষণ নয়। তারা শান্তিপুর্ণভাবে পাশাপাশি অবস্থান করতে চায়নি, তারা আপনাকে গিলে ফেলতে চেয়েছে। অন্যথায়, কেন তারা ইয়েনান আক্রমণ করলো? তাদের সৈন্য বাহিনী উত্তর শেনসির সর্বত্র অনুপ্রবেশ করেছিল, তিন সীমান্তের তিন শিয়েন ছাড়া। তোমাদের রয়েছে তোমাদের স্বাধীনতা, আমাদের রয়েছে আমাদের। তোমাদের রয়েছে ২,৫০,০০০ জন, আমাদের রয়েছে ২৫,০০০ জন। [৩৪] অল্প কয়েকটি ব্রিগেড, ২০,০০০-এর বেশি কিছু লোক। বিশ্লেষণ সহকারে আমরা কীভাবে সংশ্লেষণ করি? তোমরা যদি কোথাও যেতে চাও সোজা এগিয়ে যাও। আমরা তখনো তোমাদের বাহিনীকে এক গ্রাস এক গ্রাস করে ভক্ষণ করি। আমরা যদি জয়ী লড়াই চালাতে পারি, আমরা চালিয়েছি; আমরা যদি জিততে না পারি, আমরা পশ্চাদপসারণ করেছি। মার্চ, ১৯৪৭ থেকে মার্চ ১৯৪৮ তে [শত্রুর] একটা সমগ্র বাহিনী দৃশ্যপট থেকে মিলিয়ে গেল, যেহেতু আমরা তাদের কয়েক দশক সহস্রের সৈন্যদলকে ধ্বংস করলাম। যখন আমরা আই-চুয়ান ঘিরে ফেললাম, লিউ কান শহর রক্ষা করতে এল, কমান্ডার ইন চিফ লিউ কান নিহত হল, তার তিন ডিভিশন কমান্ডারের দুইজন নিহত আর বাকী একজন বন্দী হলো, এবং সমগ্র বাহিনী লুপ্ত হলো। এটা ছিল সংশ্লেষণ। তাদের সকল বন্দুক ও গোলন্দাজ আমাদের পক্ষে সংশ্লেষিত হলো, তাদের সৈন্যরাও সংশ্লেষিত হলো। যারা আমাদের সাথে থাকতে চেয়েছে তারা থাকতে পেরেছে, যারা আমাদের সাথে থাকতে চায়নি তাদের আমরা ভ্রমণ খরচা দিয়েছি। লিউ কানকে আমরা খতম করার পর আই চুয়ানে স্থিত ব্রিগেড বিনা লড়াইয়ে আত্মসমর্পণ করলো। আমাদের তিন অভিযান লিয়াও-শেন, হুয়েই-হেই এবং পিকিং-তিয়েনশিনে আমাদের সংশ্লেষণ পদ্ধতি কী ছিল? ফু সো-ই আমাদের পক্ষে সংশ্লেষিত হয় তার ৪.০০,০০০ সদস্যের বাহিনীসহ বিনা লড়াইয়ে এবং তারা তাদের সকল রাইফেল হস্তান্তর করে। [৩৫] একটা আরেকটাকে খেয়ে ফেলে, বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে, এটাই হচ্ছে সংশ্লেষণ । বইতে এটা কখনোই এভাবে বলা হয়নি। আমিও আমার বইয়ে কখনো এভাবে বলিনি। ইয়াং শিয়েন-চেন বিশ্বাস করেন দুইয়ে মিলে এক হয়, এবং সংশ্লেষণ হচ্ছে দুই বিপরীতের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। বিশ্বে কোন্ অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে? বস্তুসমূহকে বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু শেষে তাদের অবশ্যই ভেঙে যেতে হবে। এমন কোন কিছূ নেই যাকে ভাঙা যায়না। দীর্ঘ কুড়ি বছরের সংগ্রামের পর আমাদের অনেককেই শত্রু গিলে খেয়েছে। যখন ৩,০০,০০০ শক্তিশালি লালফৌজ শেন কান-নিঙ এলাকায় পৌঁছলো, কেবল ২৫,০০০ বাকী থাকলো। বাকীদের অনেককেই শত্রু গিলেছে, অনেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, অনেকে মারা গেছে অথবা আহত হয়েছে।

বিপরীতের একত্ব আলোচনা করার সময় জীবনকে আমাদের যাত্রাবিন্দু হিসেবে নিতে হবে। (কমরেড কাঙ শেঙঃ ‘স্রেফ ধারণার ব্যাপারে কথা বললে চলবেনা।’)

যখন বিশ্লেষণ চলে তখন সেখানে সংশ্লেষণও থাকে, যখন সংশ্লেষণ চলে তখন বিশ্লেষণও থাকে।

যখন লোকে প্রাণী ও উদ্ভিদ খায়, তারাও বিশ্লেষণ দিয়ে শুরু করে। আমরা কেন বালুকণা খাইনা? যখন ভাতের সাথে বালুকণা থাকে তা খেতে ভাল নয়। আমরা কেন ঘোড়া, গরু ও ভেড়াদের মতো ঘাশ খাইনা বরং বাঁধাকপির মতো জিনিস খাই? আমাদেরকে সবকিছু বিশ্লেষণ করতে হবে। শেন নুঙ শত শত ওষধির স্বাদ নিয়েছেন; [৩৬] তাদের ওষধি গুণাগুণ আবিষ্কার করেছেন। বহু দশক সহস্র বছর পরে বিশ্লেষণ পরিষ্কারভাবে উন্মোচিত করেছে কী খাওয়া যাবে আর কী খাওয়া যাবেনা। ফড়িং, সাপ ও কচ্ছপ খাওয়া যায়। কাঁকড়া, কুকুর ও জলজ প্রাণী খাওয়া যায়। কিছু বিদেশী আছে যারা তা খায়না। উত্তর শেনসিতে তারা জলজ প্রাণী খায়না। তারা মাছ খায়না। তারা বিড়ালও খায়না। একবছর পীত নদীতে বড় বন্যা হলো, যা দশক দশক সহস্র টন মাছ তীরে আছরে ফেললো, আর তারা সেগুলো সব সার হিসেবে ব্যবহার করলো।

আমি একজন দেশী দার্শনিক, আপনারা বিদেশী দার্শনিক।

(কমরেড শেঙঃ ‘চেয়ারম্যান কি তিন বর্গের সমস্যা সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন?’)

এঙ্গেলস তিন বর্গের কথা বলেছেন, কিন্তু আমার কাছে, আমি বিশ্বাস করি তার দুই বর্গে। (বিপরীতের ঐক্য হচ্ছে সবচেয়ে মৌলিক নিয়ম, গুণ ও পরিমাণের পারস্পরিক রূপান্তর হচ্ছে গুণ ও পরিমাণ-এই দুই বিপরীতের ঐক্য, এবং নেতিকরণের নেতিকরণ বলতে কিছু নেই)। গুণ ও পরিমাণের পারস্পরিক রূপান্তর, নেতিকরণের নেতিকরণ এবং বিপরীতের ঐক্যের নিয়মের একই স্তরে পারস্পরিক সহাবস্থান ‘ত্রয়ীবাদ’, অদ্বৈতবাদ নয়। সবচেয়ে মৌলিক জিনিস হচ্ছে বিপরীতের একত্ব। গুণ ও পরিমাণের পরস্পর রূপান্তর হচ্ছে গুণ ও পরিমাণ-এই দুই বিপরীতের ঐক্য। নেতিকরণের নেতিকরণ বলতে কিছু নেই। ইতিকরণ, নেতিকরণ, ইতিকরণ, নেতিকরণ…বস্তুর বিকাশের ঘটনার শেকলের প্রতিটি সংযোগ উভয়ত ইতিকরণ ও নেতিকরণ। দাস সমাজ আদিম সমাজকে নেতিকরণ করে, কিন্তু সামন্ত সমাজের প্রেক্ষিতে ফলত তাহচ্ছে ইতিকরণ। দাস সমাজের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে সামন্ত সমাজ নেতিকরণ গঠণ করে, কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজের দিক থেকে তা ফলত ইতিকরণ। পুঁজিবাদী সমাজ সামন্ত সমাজের দিক থেকে নেতিকরণ, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজের দিক থেকে ফলত, ইতিকরণ।

সংশ্লেষণের পদ্ধতি কী?  এটা কি সম্ভব যে দাস সমাজের পাশাপাশি আদিম সমাজ অবস্থান করতে পারে? তারা পাশাপাশি অবস্থান করে, কিন্তু সমগ্রের একটা ছোট অংশ হিসেবে। সমগ্র চিত্র হচ্ছে যে আদিম সমাজ অপসারিত হতে যাচ্ছে। সমাজের বিকাশ, অধিকন্তু, সংঘটিত হয় স্তরে স্তরে; আদিম সমাজও বহু স্তরে বিভক্ত। সেসময় তখনো মৃত স্বামীর সাথে স্ত্রীদের কবর দেওয়ার অনুশীলন ছিলনা, কিন্তু তারা পুরুষের অধীন হতে বাধ্য ছিলেন। প্রথমে পুরুষেরা নারীদের অধীন ছিল, তারপর জিনিসগুলো বিপরীতে ধাবিত হলো, এবং নারীরা পুরুষের অধীনে চলে গেল। ইতিহাসের এই স্তর এখনো স্বচ্ছকৃত হয়নি যদিও এটা চলে আসছে এক মিলিয়ন এবং তারো বেশি বছর ধরে। শ্রেণী সমাজ এখনো ৫০০০ বছর অতিক্রম করেনি, লুঙ সান ও ইয়াঙ সাও [৩৭]-এর মতো সংস্কৃতি আদিম যুগের শেষে মৃতশিল্পকে বৈশিষ্টমণ্ডিত করে। এক কথায়, একটা আরেকটাকে গিলে খায়, একটা আরেকটাকে উচ্ছেদ করে, এক শ্রেণী অপসারিত হয়, আরেকটা উদিত হয়, এক সমাজ অপসারিত হয়, আরেকটা উদিত হয়। স্বাভাবিকভাবে, বিকাশের প্রক্রিয়ায় সবকিছু পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়। যখন এটা সামন্ত সমাজে যায়, তখনো দাসমালিক ব্যবস্থার কিছু অবশিষ্ট থেকে যায়, যদিও সমাজ কাঠামোর বৃহত্তর অংশ সামন্ত ব্যবস্থার দ্বারা বৈশিষ্টমণ্ডিত হয়। এখনো কিছু ভুমিদাস রয়ে গেছে, কিছু বেগার শ্রমিকও যেমন হস্তশিল্পীরা। পুঁজিবাদী সমাজও সর্বাংশে খাঁটি নয়, এবং অধিকতর অগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজেও একটা পশ্চাদপদ অংশ রয়েছে। উদাহারণস্বরূপ দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাস ব্যবস্থা ছিল। লিংকন দাস ব্যবস্থার বিলোপ ঘটান, কিন্তু এখনো কৃষ্ণাঙ্গ দাস রয়েছে আজকে, তাদের সংগ্রাম খুবই প্রচণ্ড। দুই কোটিরও বেশি জনগণ এতে অংশগ্রহণ করছেন আর সেটা যথেষ্ট অল্প।

একটা জিনিস আরেকটাকে ধ্বংস করে, জিনিসেরা আবির্ভুত হয়, বিকশিত হয় এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, সর্বত্র একই রকম। যদি জিনিসসমূহ অন্যদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয়, তারা নিজেরা নিজেদের ধ্বংস করে। লোকে মারা যায় কেন? অভিজাততন্ত্রও কি মারা যায়? এটা হচ্ছে একটা প্রাকৃতিক নিয়ম। বনেরা মানুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে, তথাপি তারা বাঁচে কেবল কয়েক হাজার বছর। যদি মৃত্যুর মতো কোন কিছু না থাকতো তা হতো অসহনীয়। কনফুসিয়াস যদি আজও বেঁচে থাকতেন পৃথিবী এতো লোককে জায়গা দিতে পারতোনা। আমি চুয়াঙ-ঝুর দৃষ্টিভঙ্গী অনুমোদন করি। [৩৮] তার স্ত্রী যখন মারা গেলেন তিনি একটা বেসিন ধরে গান গাইলেন। লোকে মারা গেলে দ্বন্দ্ববাদের বিজয় উদযাপন করতে অনুষ্ঠান করা উচিত, পুরাতনের ধ্বংস উদযাপন করতে। সমাজতন্ত্রও অপসারিত হবে, এটা অপসারিত না হলে চলবেনা, তা না হলে কোন সাম্যবাদ হবেনা। সাম্যবাদ হাজার হাজার বছর ধরে থাকবে। আমি বিশ্বাস করিনা যে সাম্যবাদের অধীনে কোন গুণগত রূপান্তর হবেনা, এটা গুণগত রূপান্তরের দ্বারা স্তরে স্তরে বিভক্ত হবেনা! আমি এটা বিশ্বাস করিনা! পরিমাণ গুণে রূপান্তরিত হয় এবং গুণ পরিমাণে। আমি বিশ্বাস করিনা কোটি কোটি বছর ধরে এটা গুণগতভাবে পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকবে! দ্বন্দ্ববাদের আলোকে এটা অচিন্ত্যনীয়। তারপর রয়েছে ‘প্রত্যেকে দেবে সাধ্যমতো, প্রত্যেকে নেবে প্রয়োজনমত’ নীতি। আপনি কি বিশ্বাস করেন এক মিলিয়ন বছর ধরে তারা একই অর্থনীতি দিয়ে চলতে পারবেন? আপনারা কি এটা চিন্তা করেছেন? সেক্ষেত্রে আমাদের কোন অর্থনীতিবিদ প্রয়োজন হবেনা, অথবা যেকোন ক্ষেত্রে আমরা একটা পাঠ্যপুস্তক নিয়ে চলতে পারি, আর দ্বন্দ্ববাদ হয়ে পড়বে মৃত।

দ্বন্দ্ববাদের জীবন হচ্ছে বিপরীতে ধাবমান অব্যাহত গতি। মানবজাতিও চুড়ান্ততঃ ধ্বংস হবে। ধর্মবাদীরা যখন কেয়ামতের কথা বলে তারা হতাশাবাদী আর জনগণকে ভয় দেখায়। আমরা বলি যে মানবজাতির বিলোপ হচ্ছে এমন একটা কিছু যা মানবজাতির চেয়ে আরো অধিকতর অগ্রসর কিছু সৃষ্টি করবে। মানবজাতি এখনো তার শৈশবে। এঙ্গেলস প্রয়োজনের ক্ষেত্র থেকে স্বাধীনতার ক্ষেত্রের দিকে গতির কথা বলেছেন, এবং বলেছেন যে স্বাধীনতা হচ্ছে প্রয়োজনের উপলব্ধি। এই বাক্য সম্পুর্ণ নয়, এটা কেবল অর্ধেক বলে আর বাকী অব্যক্ত রেখে দেয়। স্রেফ উপলব্ধি কি আপনাকে মুক্ত করবে? স্বাধীনতা হচ্ছে প্রয়োজনের উপলব্ধি এবং প্রয়োজনের রূপান্তর-আমাদের কিছু কাজও করার রয়েছে। আপনি যদি কোন কাজ করা ছাড়া কেবল খান, আপনি যদি স্রেফ উপলব্ধি করেন, তাকি পর্যাপ্ত? আপনি যখন কোন নিয়ম আবিষ্কার করেন, আপনাকে তা প্রয়োগ করতে সক্ষম হতে হবে, আপনাকে এক নতুন পৃথিবী সৃজন করতে হবে, আপনাকে মাটি খুঁড়ে দালান তৈরি করতে হবে, আপনাকে খনি খনন করতে হবে, শিল্পায়ন করতে হবে। ভবিষ্যতে আরো বেশি মানুষ হবে, আর পর্যাপ্ত শস্য হবেনা, তাই মানুষকে খনিজ থেকে খাদ্য পেতে হবে। তাই কেবল রূপান্তরের মাধ্যমেই স্বাধীনতা অর্জন করা যায়। ভবিষ্যতে কি সম্পুর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব হবে? লেনিন বলেছেন যে ভবিষ্যতে আকাশে মাছির মতো বিমান থাকবে, এখানে ওখানে ভোঁ ভোঁ করে ওড়বে। সর্বত্র তাদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটবে, আর আমরা এ ব্যাপারে কি করবো? আমরা কিভাবে এদের নিয়ন্ত্রণ করবো? আর আমরা যদি করি জিনিসগুলো কি একেবারে মুক্ত হবে? পিকিঙে বর্তমানে ১০,০০০ বাস রয়েছে; টোকিওতে ১০০,০০০ [গাড়ি] (অথবা ৮০০,০০০?) রয়েছে, তাই অধিক মটর দুর্ঘটনা রয়েছে। আমাদের অপেক্ষাকৃত কম গাড়ি রয়েছে তাই আমরা ড্রাইভার ও জনগণকে প্রশিক্ষিত করতে পারি, তাই স্বল্প দুর্ঘটনা রয়েছে। তাহলে ১০,০০০ বছর পরে তারা পিকিঙে কি করবে? তখনো কি ১০,০০০ বাস থাকবে? তারা নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারেন, যাতে তারা পরিবহনের এই উপায়কে বন্টন করতে পারেন, যাতে মানুষ উড়তে পারে কিছু সরল যান্ত্রিক কলকব্জা ব্যবহার করে এবং যেকোন স্থানে উড়ে যেতে পারে এবং যেখানে খুশি অবতরণ করতে পারে। স্রেফ প্রয়োজনের উপলব্ধি কাজে দেবেনা, আমাদের অবশ্যই রূপান্তর ঘটাতে হবে।

আমি বিশ্বাস করিনা যে সাম্যবাদ স্তরে স্তরে বিভক্ত হবেনা এবং কোন গুণগত পরিবর্তন থাকবেনা। লেনিন বলেন যে সকল জিনিসকে বিভক্ত করা যায়। তিনি পরমাণুকে একটা উদাহারণ হিসেবে আনেন এবং বলেন যে পরমাণুকে যে শুধু বিভক্ত করা যায় তাই নয়, ইলেক্ট্রণকেও বিভক্ত করা যায়। আগে এটা মনে করা হতো যে একে বিভক্ত করা যায়না; বিজ্ঞানের যে শাখা পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের বিভাজনে নিবেদিত এখনো খুবই তরুণ, কেবল কুড়ি অথবা ত্রিশ বছর বয়সী। সাম্প্রতিক দশকসমূহে বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের অঙ্গগুলোকে বের করেছেন, যথা প্রোটন, এন্টিপ্রোটন,নিউট্রিনো, এন্টিনিউট্রিনো, মেসন ও এন্টিমেসন। এগুলো হচ্ছে ভারীগুলো। হালকাগুলোও রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারগুলি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কালে ও পরে হয়েছে। পারমাণবিক নিউক্লিয়াস থেকে ইলেক্ট্রণ আলাদা করার ব্যাপারটা আবিষ্কার হয়েছে কিছু কাল আগে। একটা ইলেক্ট্রিক তার কপার অথবা এলুমিনিয়ামের বাইরের বিচ্ছিন্ন ইলেক্ট্রনগুলোকে ব্যবহার করে হয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ৩০০ লি তে এটাও আবিষ্কার হয়েছে যে ইলেক্ট্রণের বিচ্ছিন্ন স্তরসমূহ রয়েছে। এখানেও পারমাণবিক নিউক্লিয়াস আর ইলেক্ট্রণসমূহ আলাদাকৃত। এখনো যদিও ইলেক্ট্রণকে বিভাজিত করা হয়নি, কিন্তু একদিন তারা নিশ্চিতভাবে একে বিভাজিত করতে সক্ষম হবেন। চুয়াঙ-ঝু বলেন, ‘এক ফুট দুরত্বকে প্রতিদিন আধাআধি ভাগ করে কখনই শুণ্য বানানো যাবেনা।’ (চুয়াঙ-ঝু, অধ্যায় [৩৩ জি] ‘বিবিধ স্কুল সম্পর্কে’ কুঙ সুন লুঙকে উদ্ধৃত করে।) এটা হচ্ছে সত্য। আপনি যদি এটা বিশ্বাস না করেন, একে স্রেফ বিবেচনায় নিন। একে যদি শুণ্যে কমিয়ে আনা যায় বিজ্ঞান বলে কোন কিছু থাকবেনা। অগণন জিনিস অব্যাহত ও সীমাহীনভাবে বিকশিত হয়, আর তারা হচ্ছে অসীম। সময় ও স্থান হচ্ছে অসীম। স্থানকে সমগ্রবীক্ষণভাবে ও অণুবীক্ষণভাবে উভয়ত পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় এটা অসীম, একে অসীমভাবে বিভাজিত করা যায়। তাই এমনকি এক মিলিয়ন বছর পরেও বিজ্ঞানীদের করার মতো কাজ থাকবে। সাকাতা কর্তৃক প্রকৃতি বিজ্ঞানের বুলেটিন-এ মৌলিক কণা সম্পর্কে নিবন্ধের আমি প্রশংসা করি। [৩৯] আমি এধরণের নিবন্ধ আগে দেখিনি। এটা হচ্ছে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। তিনি লেনিনকে উদ্ধৃত করেন।

আরো পড়ুন:  ইতিহাসের দর্শন হচ্ছে মানুষের আর্থনীতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিকাশের অন্তর্নিহিত আলোচনা

দর্শনের দুর্বলতা হচ্ছে এটা ব্যবহারিক দর্শন সৃষ্টি করেনি, বরং কেবল পুঁথিগত দর্শন সৃষ্টি করেছে।

আমাদের সর্বদাই নতুন জিনিস তুলে আনতে হবে। অন্যথায় আমরা কিসের জন্য? পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা কী চাই? বাস্তবতার মধ্যে নতুন জিনিস খুঁজে বের করতে হবে, আমাদেরকে বাস্তবতাকে আঁকড়ে ধরতে হবে। শেষ বিশ্লেষণে, জেন ছি-উ [৪০] কি মার্কসবাদী নাকি তা নন? বৌদ্ধবাদ সম্পর্কে তার সেই নিবন্ধগুলোকে আমি বিরাটভাবে প্রশংসা করি। [এগুলোর পেছনে] কিছু গবেষণা রয়েছে, তিনি তাঙ ইউয়াঙ-তুঙের একজন ছাত্র। [৪১] তিনি তাঙ রাজবংশের বৌদ্ধবাদ নিয়ে কেবল আলোচনা করেন, পরবর্তীকালের বৌদ্ধবাদকে সরাসরি স্পর্শ করেননি। তাঙ রাজবংশের ছান স্কুল থেকে সুঙ ও মিঙ অধিবিদ্যা গড়ে ওঠেছে, আর এটা হচ্ছে বিষয়ীগত ভাববাদ থেকে বিষয়গত ভাববাদে গতি। [৪২] বৌদ্ধবাদ ও তাওবাদ রয়েছে, আর এদের মধ্যে পার্থক্য না করা ভুল। এগুলোর প্রতি মনোযোগ না দেওয়া কীভাবে যথার্থ হতে পারে? হান উ বোধ নিয়ে কথা বলেননি। তাঁর শ্লোগান ছিল, ‘তাদের ভাবধারা থেকে শিখুন, তাদের প্রকাশের ধরণ থেকে নয়।’ তার ভাবধারাগুলো সমগ্রত অন্যদের থেকে অনুলিপি করা, তিনি রূপ ও রচনার গড়নের ধরণ পাল্টে দিয়েছেন। তিনি বোধ নিয়ে কথা বলেননি, অল্পবিস্তর তিনি যা করেছেন তা হচ্ছে মূলতঃ প্রাচীনদের থেকে নেওয়া। শিক্ষকদের কথোপকথন এর মতো লেখাগুলোতে অল্পবিস্তর নতুন কিছু আছে। লিউ ঝু-হৌ ছিলেন ভিন্ন, তিনি বিশদভাবে বৌদ্ধ ও তাও বস্তুবাদের সম্পর্কে জানতেন। [৪৩] আর তথাপি তাঁর স্বর্গের উত্তর আতি সংক্ষিপত, স্রেফ অল্প। তার স্বর্গের উত্তর হচ্ছে ছু ইউয়ানের স্বর্গের প্রশ্ন-এর ফল। [৪৪] কয়েক হাজার বছর ধরে কেবল এই এক ব্যক্তিই লিখেছেন স্বর্গের উত্তর-এর মতো গ্রন্থ লিখেছেন। স্বর্গের প্রশ্ন এবং স্বর্গের উত্তর  কী নিয়ে? একে ব্যাখ্যা করে বিশদকরণ না থাকলে আপনি এটা পড়ে বুঝতে পারবেননা, কেবল সাধারণ ধারণা পাবেন। স্বর্গের প্রশ্ন সত্যিই চমতকার, হাজারো বছর আগে এটা মহাবিশ্ব, প্রকৃতি ও ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত সকল ধরণের প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

(দুয়ে মিলে এক হওয়ার প্রশ্নে আলোচনা সম্পর্কে;) হুঙ ছিকে অল্পকিছু ভাল জিনিস পুনমুদ্রণ এবং একটা রিপোর্ট লিখতে দিন।

নোট:

১.     ১) অর্থাত মার্কসবাদী দর্শন, অর্থাত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, যা প্রকৃতি, মানব সমাজ ও মানুষের চিন্তাধারায় বিদ্যমান দ্বন্দ্বসমূহের বিকাশের সাধারণ নিয়ম নিয়ে আলোচনা করে; ২) মার্কসবাদী অর্থনীতি যা সমাজের অর্থনীতির বিকাশের পরিচালক নিয়মসমূহ ব্যাখ্যা করে এবং পুঁজিপতিরা কীভাবে শ্রমিকশ্রেণীকে শোষণ করে তা উন্মোচন করে (উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব); এবং ৩) বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র যা দেখায় যে পুঁজিবাদী সমাজ এক উচ্চতর সমাজে বিকশিত হতে বাধ্য এবং সর্বহারা শ্রেণী হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কবর খোদক। ( বিস্তারিতের জন্য দেখুন লেনিনের মার্কসবাদের তিনটি উতস ও তিনটি অঙ্গ।)

২.     পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ত পুরোনো পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় যা ১৯১৯তে চৌঠা মে আন্দোলন পরিচালনা করেছে এবং আমেরিকার তৈরি ইয়েঞ্চিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জন্ম নিয়েছে। ১৯৪৯ থেকে এটা সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক চমতকারিত্বের জন্য উচ্চতম সম্মান ভোগ করে। গণ বিশ্ববিদ্যালয় (জেন-মিন তা-শিউয়েহ)ও পিকিংয়ে অবস্থিত, এটা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শ্রমিক ও কৃষক থেকে আগত ছাত্রদের জন্য অধিক উপযোগী কোর্স যোগান দিতে।

৩.     কনফুসিয়ান ক্লাসিকের মধ্যে চার গ্রন্থ প্রারম্ভিক অধ্যয়নের সারকে প্রতিনিধিত্ব করে, পাঁচ ক্লাসিক হচ্ছে বৃহত্তর পরিসরের।

৪.     তাঁর বিচিত্র শিক্ষা অভিজ্ঞতার মধ্যে মাও সেতুঙ বাছাই করেছেন ১৯১২-১৩র শীতে তিনি হুনান প্রাদেশিক গ্রন্থাগারে যে অধ্যয়ণে কাটিয়েছেন তাকে সর্বাধিক মূল্যবাণ হিসেবে।

৫.     প্রথম বাক্যটি দরিদ্রের মতবাদ থেকে আর দ্বিতীয়টি মেনশিয়াস, চতুর্থ গ্রন্থ থেকে।

৬.     উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে কনফুসিয়ান সাহিত্য সংগ্রহ থেকে। যে ঘটনায় কুয়াঙের লোকেরা কনফুসিয়াসকে বন্দী করেছিল এবং তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তা এই সাহিত্য সংগ্রহে নির্দেশিত।

৭.     মাওয়ের যুক্তি আপতিকভাবে এই যে, সেখানে তিনি যান আর না যান, কনফুসিয়াসের ছিনের বিরুদ্ধে কিছু ছিলনা (একটা রাষ্ট্র যা বর্তমান কালের শেনসিতে অবস্থিত ছিল খৃষ্টপুর্ব প্রথম শতকে, যার শাসকেরা শেষপর্যন্ত পুরো চীন জয় করে এবং ২২১ খৃষ্টপুর্বাব্দে ছিন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে), যেহেতু তিনি অডেস-এর গ্রন্থ-তে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাতে তিনি ঐ এলাকা থেকে মাও উল্লেখিত দুটি সহ বেশকিছু কবিতা খুব সম্ভবত সম্পাদনা করেছেন।

৮.     শু-মা ছিয়েন (১৪৫-৯০ খৃষ্টপুর্ব) ছিলেন চীনের প্রথম মহান ঐতিহাসিক, যিনি গোড়া থেকে তার দিন পর্যন্ত চীনের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত শিহ-চি (ঐতিহাসিক রেকর্ড) প্রস্তুত করেন।

৯.     উপরের কবিতাটির এবং আগে উল্লেখিত দুটোর শিরোনাম-এর অনুবাদ ওডেস-এর গ্রন্থ-এর লে¹গ্নি সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে।

১০.    প্রেমের কবিতাসমুহ চীনা সমালোচকগণ কর্তৃক প্রচলিতভাবে বিবৃত হয় এক কমকর্তা ও তার রাজন্যের মধ্যে সম্পর্কের রূপকল্প হিসেবে; চু শি (নীচে নোট ৪২ দেখুন) মনে করেছেন যে তাদেরকে আক্ষরিক অর্থে নিতে হবে। মাও সাধারণ বিবেচনা বোধ থেকে মত পোষণ করেন যে তাদেরকে কখনো আক্ষরিকভাবে নিতে হবে আবার কখনো তা নয়।

১১.     ওয়েই চুয়াঙ (৮৫৮-৯১০ খৃঃ) ছিলেন তাঙ রাজত্বের শেষভাগে এবং পাঁচ রাজত্বের (৯০৭ খৃষ্টাব্দে শুরু হয়) প্রথমদিকের পর্বের একজন খ্যাতনামা কবি। মাও মত রাখছেন যে ওডেস-এর গ্রন্থ এবং সকল ধ্রুপদী কাব্যের ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যার নীতি প্রয়োগ করতে হবে।

১২.     “চার পরিষ্কারকরণ” এবং “পাঁচ বিরোধী”র জন্য দেখুন এই খন্ডের [ইন্টারনেট] পৃষ্ঠা ৯-এর নোট ৫।

১৩.    চীনা গণতান্ত্রিক লীগের পত্রিকা কুয়াঙ-মিঙ ঝিহ-পাও এপ্রিল, ১৯৫৭তে পার্টির সমালোচনায় নেতৃত্ব দেয়, যখন ‘ফুল ফোটা ও প্রতিযোগিতা’ ছিল পুর্ণ মাত্রায়। সাংহাইয়ে প্রকাশিত ওয়েন-হুই পাও যা ছিল একটা অ-পার্টি পত্রিকা, তা এর বুর্জোয়া প্রবণতার জন্য ১৯৫৭তে মাও কর্তৃক সমালোচিত হয়। ১৯৬৫-এর নভেম্বর-এ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সুচনা চিত্রায়ণের জন্য উতসারক হিসেবে এটা কাজ করে।

১৪.     চৌক কু-চ্যাঙ ছিলেন চীনা ও বিশ্ব ইতিহাসের ওপর বহুবিধ গ্রন্থের লেখক। ১৯৫০ থেকে সাংহাইয়ের ফুতান বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৬২তে ইতিহাস ও শিল্পকলার ওপর একটা নিবন্ধ লেখেন যাতে তিনি ‘জেইতজিইস্ট’’ ভাবধারা প্রকাশ করেন যাকে বলা হয়েছে সৌন্দর্যতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইয়াঙ শিয়েন-চেন’র দার্শনিক তত্ত্বের প্রকাশ (দেখুন এই পাঠের নোট ১৯)।

১৫.    সুন ইয়েহ-ফ্যাঙ ছিলেন এসময় বিজ্ঞান একাদেমীর অর্থনীতি অনুষদের পরিচালক; তাকে ১৯৬৬ সালে অপসারণ করা হয়। যেমনটা কাঙ শেঙের মন্তব্য ইঙ্গিত করে, তিনি কিছু সোভিয়েত ও পুর্ব ইউরোপীয় অর্থনীতিকের ধারণা গ্রহণ করেন যাদের সাথে তিনি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে লাভ প্রবণতার ভুমিকা নিয়ে পেশাদার সম্পর্ক রাখতেন।

১৬.    ১৯৫৫-এর গ্রীস্মে ঐবছরের জুলাই ৩১-এ মাওয়ের যে বক্তৃতা কৃষি উতপাদকদের সমবায়সমূহ গঠনে নতুন বেগবর্ধন করে তার কিছু পুর্বে পার্টির গ্রামীন কর্ম বিভাগ (লিউ শাউ-চির প্ররোচনায়) বেশ কিছু সমবায় ভেঙে দেয় যাদেরকে বলা হয়েছে তাড়াহুড়া করে ও অপরিপক্কভাবে গঠন করা হয়েছে।

১৭.     তেঙ ঝু-হুই (১৮৯৫-১৯৭২) ছিলেন ১৯৫২ থেকে গ্রামীন কর্ম বিভাগের প্রধান, যদিও ১৯৫০ দশকের শেষের দিক থেকে তার প্রভাব ছিল অবনতিশীল ১৯৫৫তে সমবায়সমূহ ‘ভেঙে দেওয়া’ অথবা ‘উতপাটিত করা’ তে তার অংশের দায়ের কারণে। এটা প্রতীয়মাণ হয় যে মাওয়ের মতসমূহকে বিরেধিতায় তার মতসমূহ তুলে ধরার মতো যথেষ্ট প্রতিপত্তি তখনো তার ছিল যখন ১৯৬০ দশকের শুরুর দিকে মাও কর্তৃক এখানে বিশদীকৃত কর্মনীতিনসমূহ পার্টির মধ্যে একটা বিতর্কের বিষয় ছিল। সমবায় রূপান্তরের সম্পর্কে বিতর্কের সময়কালে উভয়ত গ্রামীন কর্ম বিভাগ ও তেঙ ঝু-হুই মারাত্মকভাবে মাও কর্তৃক সমালোচিত হন। [আরো বিস্তারিতের জন্য দেখুন পৃ ২২৪-২২৫, নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড ৫]

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শুরুর সময় থেকে ‘সানজি ইয়াবো’ ( তিন স্বাধীনতা এবং একটা ধ্রুব, অথবা নিশ্চয়তা’)র চেয়ে বৈষয়িক প্রণোদনা, ব্যক্তিগত নীল নকশার ভুমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে সমগ্র ঝাঁক বাঁধা কর্মনীতিসমূহকে লুকানোর প্রতীক হিসেবে ‘চার বিরাট স্বাধীনতা’ প্রকাশ ছিল প্রকাশিত দলিলাদিতে কম লক্ষনীয়। এ ধারণা সম্পর্কে দেখুন ‘চীনের গ্রামাঞ্চলে দুই পথের মধ্যেকার সংগ্রাম’ নিবন্ধ, পিকিং রিভিউ, নং ৪৯ (১৯৬৭), পৃ. ১১-১৯, যা গ্রামাঞ্চলে লিউ শাউ-চি ও তার সহানুভূতিশীলদের প্রতিক্রিয়াশিল লাইনকে সারসংক্ষেপিত করার জন্য রচিত।

১৮.    লিউ শাউ-চি ও অন্যদের কর্তৃক একটা ডান সুবিধাবাদী মত। এ সম্পর্কে দেখুন সিপিসির সিসির পিবি সভায় মাওয়ের বক্তৃতা “ডান বিচ্যুতিবাদী মতসমূহকে খণ্ডন করুন যা সাধারণ লাইন থেকে বিচ্যুত হয়”, নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড ৫, পৃ ৯৩-৯৪।

১৯.    ‘দুইয়ে মিলে এক হয়’ মত ১৯৬০ দশকের প্রথম দিকে ইয়াঙ শিয়েন-চেন (১৮৯৯ খৃ-) তুলে ধরে, যে ১৯৫৫ থেকে উচ্চতর পার্টি স্কুলের সভাপতি ছিল। ১৯৬৪র জুলাইয়ের শুরুতে এই মতকে প্রচণ্ডভাবে সংবাদপত্রে আক্রমণ করা হয় এই ভিত্তিতে যে এটা সংগ্রাম ও দ্বন্দ্বের গুরুত্বকে সংকুচিত করেছে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছে মাওয়ের ‘এক নিজেকে দুইয়ে বিভক্ত করে’ মতের সাথে যা হচ্ছে সংগ্রাম, নির্দিষ্টভাবে শ্রেণীসংগ্রাম যা অব্যাহতভাবে পুন উদ্ভূত হয়, এমনকি যখন নির্দিষ্ট দ্বন্দ্বসমূহ সমাধা হয় তখনও। স্টেনোগ্রাফারের নোটে নির্দেশিত ‘একটি নিবন্ধের রূপরেখা’ ছিল খুব সম্ভবত ইয়াঙের ওপর আসন্ন আক্রমণের সারসংক্ষেপ যা চেয়ারম্যানের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে।

২০.    মাদ্রিদের প্রতিরক্ষা অক্টোবর ১৯৩৬-এ শুরু হয়ে দুই বছর ও পাঁচ মাস টিকে ছিল। ১৯৩৬-এ ফ্যাসিস্ট জার্মানী ও ইতালী স্প্যানিশ ফ্যাসিস্ট যুদ্ধবাজ ফ্রাঙ্কোকে ব্যবহার করে স্পেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ চালাতে। পপুলার ফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্বে স্প্যানীয় জনগন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরত্বব্যাঞ্জকভাবে গণতন্ত্রকে রক্ষা করেন। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের যুদ্ধ ছিল সমগ্র যুদ্ধের মধ্যে সর্বাধিক তিক্ত। মার্চ, ১৯৩৯-এ মাদ্রিদের পতন ঘটে কারণ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি তাদের “কোন হস্তক্ষেপ নয়”-এর ভণ্ড কর্মনীতি দ্বারা আগ্রাসীদের সহযোগিতা করে এবং কারণ পপুলার ফ্রন্টের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। সমালোচনার বিষয় এই নয় যে স্প্যানিশ রিপাবলিকানরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে, বরং তারা এই প্রবাদ আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হয় যে ভৌগলিক শক্তিশালি স্থানসমূহ নিজে থেকে নির্ধারক নয়।

২১.     অনুগ্রহ করে দেখুন এপ্রিল ২০, ১৯৪৫-এ গৃহিত “আমাদের পার্টির ইতিহাসের কতিপয় প্রশ্নে সিদ্ধান্ত”, নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড ৩, পৃ ১৭৭-২২৫ (১৯৬৫ সংস্করণ)।

২২.     মাও এই অনুষদে তার ততপরতা শুরু করেন ১৯২৫-এ, কিন্তু ১৯২৬-তেই তিনি প্রকৃতপক্ষে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার প্রধান অবদান রাখেন।

২৩.    উদ্ধৃতিটি মেনশিয়াস, ষষ্ঠ পাঠ, খণ্ড ক, অধ্যায় ১৫ থেকে।

২৪.     এটা খুব সম্ভবতঃ ১৯০৩ সালে প্রকাশিত ‘বিপ্লব সম্পর্কে কাঙ উ-ওয়েই-এর চিঠির খণ্ডন’ শীর্ষক চ্যাঙ পিঙ-লিনের উদ্যাপিত প্রবন্ধের একটা নির্দেশিকা। এই প্রবন্ধে চ্যাঙ কাঙের ওপর শুধু বিপ্লব বনাম ক্রমিক সংস্কার প্রশ্নেই ক্ষুরধার আক্রমণ চালাননি, বরং চীনা ও মাঞ্চুদের মধ্যে জাতিগত বৈষম্যের প্রশ্নেও যা কাঙ সংকুচিত করতে চেয়েছে। চ্যাঙ মত রাখেন মাঞ্চুরা এক বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়িষ্ণু জাতি, চীনকে শাসনের সম্পুর্ণ অনুপযুক্ত। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি বিবর্তন আলোচনা করেছেন এটা নির্দেশ করে যে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্য হচ্ছে ইতিহাসের ফল।

২৫.    ফু ইং একজন চীনা বিজ্ঞানি প্রতীয়মান যিনি ১৯৬৪ সালে জীবিত ছিলেন, যেহেতু মাও বলেন তিনি তাকে খুঁজতে চান।

২৬.    লু পিং (১৯১০ খৃঃ-) সেসময় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন; জুন, ১৯৬৬-এ ‘তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানো হয়’ এবং তিনি অপসারিত হন।

২৭.     আই সু-তি (১৯১০-৬৬ খৃঃ) তার মৃত্যুকালীন সময়ে উচ্চতর পার্টি স্কুলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন পার্টির একজন নেতৃস্থানীয় দার্শনিক মুখপাত্র যিনি রুশ থেকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ওপর গ্রন্থরাজি অনুবাদ করেছেন এবং বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন যার লক্ষ্য ছিল মার্কসবাদকে জনসাধারণের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। ‘দুইয়ে মিলে এক হওয়া’র নীতির সাথে সম্পর্কিত প্রশ্নে এই আলোচনায় আগে মাও যে ‘বর্জোয়া’ দার্শনিকের কথা বলেছেন সেই ইয়াং শেন-চেনকে আক্রমণ করে নভেম্বর ১, ১৯৬৪তে তিনি পিপল্স ডেইলিতে এক নিবন্ধ প্রকাশ করেন।

২৮.    ‘চড়–ই পাখি বিদ্ধ করা’ হচ্ছে এক রূপক যা তত্ত্বে প্রযুক্ত হয় এবং জ্ঞান অর্জন ও অভিজ্ঞতার সারসংকলনে এক কর্মপদ্ধতি। বিপুল সংখ্যক ঘটনার পুনরাবৃত্তিকে সাধারণীকরণ করার প্রচেষ্টার পরিবর্তে এই কর্মপদ্ধতি গভীর বিশ্লেষণ, গভীর অধ্যয়ণ, কোন নমুণার তদন্ত এবং বিশ্লেষণের সাহায্যে অভিজ্ঞতার সারসংকলনের কথা বলে। “চুড়–ই পাখি ছোট কিন্তু সকল নির্ধারক অঙ্গই এর রয়েছে”এই প্রবাদ বাক্য থেকে শ্লোগানটি আসে। এখানে মাও এই বিষয়টি তুলে ধরেন যে ব্যাপকতর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চীন হচেছ আজকের দুনিয়ার বিপ্লবের সমস্যার এক ক্ষুদ্র পৃথিবী।

২৯.    লেঙ ঝু-সিং (প্রস্তরের কাহিনী) গ্রন্থের ২য় অধ্যায়ে জুঙ-কুওর ডিউকের প্রাসাদের বর্ণনা দেন। ‘উচ্চ পদস্থ’দের জন্য তেলেসমাত’ ছিল ঐ এলাকার ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারসমুহের তালিকা যা লাউয়ের মন্দিরের প্রাক্তন শিক্ষানবীশ বলেছেন যে প্রত্যেক পদস্থকে বহন করতে হবে তাদেরকে আক্রমণ এড়াতে এবং এভাবে নিজ জীবিকার ক্ষতি এড়াতে (প্রস্তরের কাহিনী)।

৩০.    এই প্রশ্নে কমরেড মাওয়ের সমালোচনার জন্য দেখুন “লাল ঘরের স্বপ্ন সম্পর্কে চিঠি”(নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড ৫, পৃঃ ১৫০-১৫১), “লঙলুমেঙ ইউয়ানজিয়াকে সমালোচনা সম্পর্কে” (নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড ৫, পৃঃ ২৯৩-২৯৪)।

উ-পিঙ-পোকে মাওয়ের সমালোচনার জন্য দেখুন উপরের পাঠ ৮, নোট ৮। ওয়াঙ কুন-লুন ছিলেন ১৯৫০ দশকে পিকিঙের ভাইস মেয়র।

৩১.    হো চি-ফ্যাঙ (১৯১১-) একজন গীতি কবি এবং শিল্প জগতের এক শক্তিশালি চরিত্র। তিনি উ পিঙ-পোকে তার বিরুদ্ধে অভিযান চলার সময় একটা পর্যায় পর্যন্ত রক্ষা করেন এটা বলে যে উ লাল ঘরের স্বপ্ন সম্পর্কে বলার সময় ভুল ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নীতিবান। তিনি নিজে মহান অগ্রগামী উলম্ফণের সময়কালে আক্রমণে পড়লেন।

৩২.    উ শি-চ্যাঙের এই বিষয়ে বই ইংরেজীতে অনুদিত হয়েছেঃ ‘দি রেড চেম্বার ড্রিম’ (ক্লেরেনডন প্রেস, ১৯৬১।)

৩৩.    এখানে মাওয়ের বিবৃতি লু শুনের সাথে মিলে।

৩৪.    ঐতিহাসিক বর্তমানে দাঁড়িয়ে কুওমিনতাঙের সাথে চুড়ান্ত প্রদর্শন স্মরণ করে যে আকৃতি দেন তা ১৯৪৬-এ নবায়িত গৃহযুদ্ধের শুরুর চেয়ে বরং জাপবিরোধি যুদ্ধের সুচনার সময়কার যখন গণ মুক্তি বাহিনী অন্ততঃ অর্ধ মিলিয়ন সদস্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল।

৩৫.    জানুয়ারি, ১৯৪৯-এ পিপিঙ (তখন একে যেভাবে বলা হতো)-এর জাতীয়তাবাদী গ্যারিসনের কমান্ডার শহরকে সমর্পণ করেন বিনা লড়াইয়ে অযথা ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে। পরে তিনি পিকিং সরকারের পানি সংরক্ষণ মন্ত্রী হন।

৩৬.    রূপকথার সম্রাট শেন নুঙকে বলা হয়ে থাকে তিনি খৃষ্টপুর্ব তৃতিয় শতকে কৃষির শিল্পকলা শিখেছিলেন, এবং নির্দিষ্টভাবে উদ্ভিদের ওষধি গুণাগুণ আবিষ্কার করেছিলেন।

৩৭.    লুঙ শান এবং ইয়াং শাও সংস্কৃতি উত্তর-পুর্ব এবং উত্তর-পশ্চিম চীনে অবস্থিত, এরা হচ্ছে নিওলিথিক যুগের দুই সর্বাধিক খ্যাতনামা সংস্কৃতি। মাও যেমনটা ইঙ্গিত করেন, তারা বিশেষভাবে মৃতশিল্পের জন্য বিখ্যাত।

৩৮.    চুয়াঙ-ঝু নামের গ্রন্থটি সম্ভবত অংশত রচিত হয়েছে একই নামের সেই লোকের দ্বারা যিনি খৃষ্টপুর্ব চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জীবিত ছিলেন। এটি তাওবাদ( লাও-ঝু এবং পরিবর্তনের গ্রন্থ সহকারে)-এরই শুধু যে এক ধ্রুপদী পাঠ তাই নয়,বরং চীনের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম।

৩৯.    নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জাপানী পদার্থবিদ মনে করেন যে ‘মৌলিক কণাসমূহ হচ্ছে একক, বাস্তব, অন্তরকৃত এবং অসীম বর্গ যা প্রাকৃতিক ধারা গঠণ করে’। এসব মত ব্যাখা করে তার একটা নিবন্ধ জুন, ১৯৬৫-এ রেড ফ্লাগ-এ প্রকাশিত হয়। (এই খণ্ডের পরবর্তী প্রবন্ধসমূহও দেখুন)

৪০.    মাও সম্ভবত ১৯৬৩-তে প্রকাশিত ও ১৯৭৩-এ পুনঃপ্রকাশিত সংগৃহিত রচনাবলীর প্রতি নির্দেশ করেছেনঃ হান তাঙ ফো-চিয়াও শু-শিয়াঙ লুন চি (হান ও তাঙ রাজত্বে বৌদ্ধবাদী চিন্তাধারার ওপর সংগৃহীত রচনাবলী) (পিকিংঃ জেন-মিন চু-পান-সে, পৃঃ ৩৪৮) এই অধ্যয়ণে তিনি দ্বন্দ্ববাদ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লেনিন থেকে উদ্ধৃত করেন।

৪১.     জেন চি-উ যাকে তার শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন সেই তাঙ ইয়ুঙ-তুঙ (১৮৯২-১৯৬৪) ছিলেন বৌদ্ধবাদের একজন নেতৃস্থানীয় ঐতিহাসিক, যিনি হান, ওয়েই, চিন এবং উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজবংশের অধীনে চীনা বৌদ্ধবাদের ওপর এবং ভারতীয় চিন্তাধারা প্রভৃতির ওপর লিখেছেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে তিনি অসুস্থ হওয়া অবধি তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিকের ডীন ছিলেন।

৪২.     চান (এর জাপানী নাম জেন দ্বারা ভালভাবে পরিচিত) বৌদ্ধবাদের প্রভাবাধীনে সুঙ ও মিঙ রাজত্বের চীনা দার্শনিকেরা, যাদের মধ্যে চু শি (১১৩০-১২০০) হচেছন সর্বাধিক বিখ্যাত, কনফুসিয়াসবাদ ও বৌদ্ধবাদের এক সংশ্লেষণ বিকশিত করেন যার মধ্যে এর লি (যুক্তির নীতি) ধারণা কেন্দ্রিয় ভুমিকা পালন করে, সাধারণভাবে যা নয়া-কনফুসিয়াসবাদ হিসেবে পরিচিত। এসব মতবাদের সাথে সম্পর্কের ওপর মাওয়ের মতো একইরকম চীনা মত জানতে দেখুন হোউ ওয়েই-লু, চীনা দর্শনের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (পিকিংঃ বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, ১৯৫৯), পৃঃ ৩৩-৫১। পশ্চিমা একজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের জন্য দেখুন, এইচ, জি, ক্রীল, কনফুসিয়াস থেকে মাও সেতুঙ, চীনা চিন্তাধারা (শিকাগোঃ শিকাগো প্রেস বিশ্ববিদ্যালয়; এবং লন্ডনঃ আয়ার ও স্পটিসউডে, ১৯৫৩), অধ্যায়, ১০।

৪৩.    হান উ এবং লিউ সুঙ-ইউয়ান। হান উ অত্যধিক নৈরাজ্যবাদ এড়িয়ে ধ্রুপদী কালের সরলতা পুনসৃজনে আকাংখিত। মাও কর্তৃক উদ্ধৃত ‘তাদের ভাবধারা থেকে শেখা’র শ্লোগান প্রকাশের সেকেলে রূপ এড়িয়ে প্রাচীন কনফুসিয়ান মুনিদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার সেই লক্ষ্যকে নির্দেশ করে। তিনি বৌদ্ধবাদের ওপর এক সমালোচক দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করেন, কিন্তু এর থেকে ভাবধারা ধার করেন তার চেয়ে কম নয়। লিউ সুঙ-ইউয়ান, যাকে মাও তার সাহিত্যিক নাম লিউ ঝু-হৌ-এ এখানে ডেকেছেন, ছিলেন হান উর ঘণিষ্ঠ বন্ধু।

৪৪.     লিউ সুঙ-ইউয়ানের রচনা তিয়েন তুই (স্বর্গের উত্তর) চু ইউয়ান কর্তৃক তার কবিতা তিয়েন ওয়েন (স্বর্গের প্রশ্ন)য় তুলে ধরা  মহাবিশ্বের উতস ও প্রকৃতি সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেয়। পরেরটা লি সাও এবং চু ইউয়ানের অন্যান্য কবিতা, পৃঃ ৭৯-৯৭, তে “ধোঁয়াশা” শিরোনামে অনুদিত হয়েছে। এটা, মাও যেমনটা বলেন, পরামর্শদায়ক, কিন্তু অতি দ্ব্যার্থতাবোধক।

মাও সেতুং
মাও সেতুং বা মাও জেদং (ইংরেজি: Mao Tse-Tung; ২৬ ডিসেম্বর ১৮৯৩ – ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ খ্রি.) মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, চীনা বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং চীন ভূখন্ডের প্রায় শতাব্দীকালের সামাজিক রাজনীতিক মুক্তি ও বিপ্লবের নায়ক। জাপানি দখলদার শক্তি এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার কুওমিনটাং নেতা চিয়াং কাইশেকের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক বিপ্লবের জন্য চীনের অগণিত এবং অনুন্নত কৃষকদের সংঘবদ্ধ করার কৌশলী হিসেবে মাও সেতুং এক সময় সমগ্র পৃথিবীতে সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণাদায়ক উপকথায় পরিণত হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page