You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > দর্শন > রাষ্ট্রদর্শন > মন্টেস্কুর রাষ্ট্রচিন্তা প্রসঙ্গে

মন্টেস্কুর রাষ্ট্রচিন্তা প্রসঙ্গে

চার্লস দ্য মন্টেস্কুর রাষ্ট্রদর্শন আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার স্পর্শে ঝলমলিয়ে উঠেছে। যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের সংমিশ্রণে তিনি তাঁর রাষ্ট্রদর্শনকে সাজিয়েছেন। ঘটনা বা পরিস্থিতির প্রকৃতি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাই তাঁর রাষ্ট্রদর্শন অভিজ্ঞতা নির্ভর। আধুনিক কালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি বলে থাকেন। মন্টেস্কু তাঁর রাষ্ট্রচিন্তাকে স্থায়ীভাবে রূপ দিতে ঐতিহাসিক ও পর্যবেক্ষণমূলক পদ্ধতির সূত্র ধরে সম্মুখ পানে এগিয়েছেন। তাঁর রাষ্ট্রদর্শনকে বিন্যাস করা হয়েছে আইন ও সরকারের প্রকারভেদ সম্পর্কে।

আইন সম্বন্ধে মন্টেস্কুর ধারণা:

মন্টেস্কুর আইন সম্পর্কিত ধারণা তাঁর পূর্বসূরী চিন্তানায়ক থেকে আলাদা। প্লেটো থেকে শুরু করে জন লক পর্যন্ত সকলেই আইনকে ব্যাখ্যা করেছেন একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির আদলে। আইনকে তাঁরা সকলেই ‘যুক্তিসঞ্জাত বিধান’ (Dictates of reason) সার্বভৌমের আদেশ (Command of the sovereign) হিসেবে অভিহিত করেছেন। আইন সম্পর্কিত এরূপ ধারণায় “কার্যকারণ সম্পর্কের সাধারণ নীতি” প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। যার ফলে মন্টেস্কু আইনের এরূপ পূর্বতন চিন্তাবিদদের ধারণার সাথে একমত হতে পারেননি। তাই তিনি নবতর দৃষ্টিভঙ্গি “কার্যকারণ সম্পর্কের” উপর ভিত্তি করে তাঁর চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন ।

মন্টেস্কু তাঁর The spirit of law  গ্রন্থে আইনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, বস্তুর প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত প্রয়োজনীয় সম্পর্কই আইন (Laws are the necessary relations arising from the nature of things)। এ ক্ষেত্রে জড়বাদী বস্তু যেমন সুনিদিষ্ট কতগুলো আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অনুরূপ মানব সমাজও পরিচালিত হয় আইন দ্বারা। সাধারণভাবে মানুষের যুক্তিবাদিতাকে আইন বলে ধরা হয়। কিন্তু আইনকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বলে কখনো মেনে নেয়া যায় না। মানুষের আচরণের নিয়মই হলো আইন। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব বিধায় তাদের মধ্যে নানাবিধ পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। যেখানে সম্পর্ক সেখানেই রয়েছে আইনের অস্তিত্ব, আইন মানুষের সম্পর্কে পরিচালিত করে।

মন্টেস্কু আইনের মূল তত্ত্ব উদঘাটন করতে গিয়ে মানব রচিত আইনকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যথা— ১) আন্তর্জাতিক আইন, ২) রাজনৈতিক আইন এবং ৩) সামাজিক আইন। দেশে দেশে বিভিন্ন জাতি সত্তার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইনের সৃষ্টি হয়েছে। সকল সমাজে এ আইন অভিন্ন প্রকৃতির। আন্তর্জাতিক আইনের মূল কথা হলো প্রত্যেকটি দেশ নিজ স্বার্থকে অক্ষুন্ন রেখে শান্তির সময় চেষ্টা করবে সর্বাধিক কল্যাণ সাধন করতে এবং যুদ্ধের সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখবে কম ক্ষতি সাধনে। রাজনৈতিক আইন মূলত শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আর শাসিতের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক আইনের। রাজনৈতিক ও সামাজিক আইন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকৃতির। প্রত্যেক দেশের স্থানীয় জলবায়ু, জনসংখ্যার পরিমাণ, নাগরিকের পেশা, আচার-আচরণ, ধর্ম প্রভৃতির ক্ষেত্রে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সে ক্ষেত্রে এ দুটি আইনের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় বেশি করে।

মন্টেস্কুর আইন সম্পর্কিত ধারণাকে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সমালোচনা করেছেন। সেবাইন বলেছেন, “আইনের সংজ্ঞার মধ্যে যে অস্পষ্টতা আছে তা দূর করার জন্য মন্টেস্কু কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি। (The vague formula covers as always an ambiguity which he does nothing to clear up)। তবে ডানিং বলেছেন, মন্টেস্কুর আইনের ত্রুটি না খুঁজে তিনি যে আইনকে স্বৈরাচারিতা ও খামখেয়ালীর গণ্ডি থেকে মুক্ত করতে পেরেছেন এটাই তাঁর কৃতিত্ব।

সরকারের প্রকারভেদ সম্পর্কে:

মন্টেস্কু প্রধানত দুটি উপাদানকে আশ্রয় করে সরকারের শ্রেণিকরণ (Forms of Government) করেছেন। এ উপাদানের একটি হচ্ছে প্রকৃতি (Nature) এবং অন্যটি হচ্ছে নীতি (Principle)। সরকারের শ্রেণিকরণের এ দুটি উপাদানের মধ্যে সমন্বয় সাধনকে তিনি অপরিহার্য বলে মনে করেছেন। এরিস্টটল সরকারকে তিন ধরণের রূপ রেখায় দেখেছেন। মন্টেস্কু এ ধরণের বিভাজনকে সমর্থন জানিয়ে তিনিও সরকারকে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। যেমন — প্রজাতন্ত্র, রাজতন্ত্র, এবং স্বৈরতন্ত্র। মন্টেস্কু প্রবর্তিত তিন ধরণের সরকার কাঠামোকে নিম্নোক্ত ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

প্রজাতন্ত্র (Republic): এ সরকারে জনগণের হাতেই থাকে সার্বভৌম ক্ষমতা। তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানকে নিয়োগ করে।

রাজতন্ত্র (Monarchy): রাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা থাকে একজনের হাতে। তিনিই রাজা, তিনিই সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ তাঁর অঙ্গুলী নির্দেশে সরকারের সকল চাকা আবর্তিত হয়। তবে তিনি আইনের বেড়াজালে আবদ্ধ।

স্বৈরতন্ত্র (Tyranny): স্বৈরতান্ত্রিক সরকারেও দেশ পরিচালনার সকল ক্ষমতা একজনের হাতেই ন্যস্ত থাকে। সার্বভৌম ক্ষমতার হয়ে আইনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন নিজের খেয়াল খুশি মতো।

মন্টেস্কু মনে করেন বিভাজিত প্রত্যেকটি সরকারের একটি আলাদা নীতি রয়েছে। যেমন — প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিশেষ নীতি হলো রাজনৈতিক সদগুণ (Political culture), রাজতন্ত্রে সম্মান (Honour) এবং স্বৈরতন্ত্রের রয়েছে ভয়-ভীতি (Fear)।

মন্টেস্কু সরকারি ব্যবস্থা সম্পর্কে যে বক্তব্য রেখেছেন তার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি এরকম যে শাসনব্যবস্থার বা সরকারের পার্থক্য তাদের প্রকৃতি অনুসারে অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় ন্যস্ত, কে শাসন করে, আইনের রূপ কি বা লক্ষ্য কি তা দিয়ে বুঝতে হবে। শাসনের নীতির সঙ্গে শাসনের প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সাধারণভাবে মন্টেস্কুর তত্ত্ব একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছে। প্রতিনিধিত্বমূলক রাজতন্ত্রের ধারণাকেও সমর্থন করেছেন তিনি। রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্র উভয় শাসনেই মধ্যবর্তী, অধীনস্থ ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেছেন। অভিজাত সম্প্রদায়ই হলো এই অধীনস্ত ক্ষমতা। প্রতিনিধি সভা বা সংসদের প্রয়োজনকেও তিনি স্বীকার করেছেন। নরমপন্থা, সংযমী শাসনই তাঁর মতে শ্রেষ্ঠ শাসন তা রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র যাই-ই হোক না কেন; সংযমী শাসনই সরকারের স্বকীয়তার শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ বলে তিনি মনে করতেন। 

তথ্যসূত্র:

১. ওদুদ, মো. আবদুল (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “চার্লস দ্য মন্টেস্কু”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩১৯-৩২২।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top