You are here
Home > সাহিত্য > প্রবন্ধ > আবুল কাসেম ফজলুল হকঃ প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি

আবুল কাসেম ফজলুল হকঃ প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি

যেসব মানুষের মাঝখানে আবুল কাসেম ফজলুল হক বেঁচে আছেন সেসব মানুষের জন্যই তিনি ভেবেছেন এবং তাদের জন্যই তিনি কলম ধরেছেন। বার বছর বয়সে তিনি লিখে প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন এবং তা এখনো শরতের ছন্দময় স্নিগ্ধ মৃদু হাওয়ার মতোই অব্যাহত আছে। তিনি লিখেছেন বলেই আমরা তার লেখা পড়েছি এবং তার চিন্তার সাথে পরিচিত হয়েছি। আমরা বুঝতে চেষ্টা করেছি যে মানুষটি ‘সৌন্দর্য ও সৌন্দর্যানুরাগ’ নিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন তা আজ সূর্যালোকের পাখায় ভর করে বিকশিত হতে হতে বাংলাদেশের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা এখন স্থির হয়ে দেখতে পারছি যে মানুষটি রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) মতো এই সুন্দর ভূবনে মরিতে না চেয়ে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার অসীম প্রেরণায় কাজ শুরু করেছিলেন তা ধীরে ধীরে দীর্ঘ পাঁচ যুগ ধরে এগিয়ে গেছে আগামীর দিকে। ‘মানুষের স্বরুপ’ উপলব্ধি করে যে প্রবন্ধ তিনি ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে রচনা করেন সেই মানুষকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে, তাদের জন্য লিখতে লিখতে কাটিয়ে দিয়েছেন ছয়টি দশক। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু ঘটনার দর্শক ছিলেন এমন নয়, ঘটনার গভীরে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছেন মানুষের বাইরের চেহারা ও তার অভ্যন্তরীণ রূপ, Essence ও Appearance—এর সম্বন্ধ কোথায়। মানুষের স্বরূপ প্রতিভাত হয়েছে তার কাছে মানুষের দর্শনরূপে। মানুষের সৃষ্টি, তার সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংগ্রাম ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা করতে করতে তিনি দেখেছেন মানুষেরই নীচতা, হীনতা, ক্ষুদ্রতা, সংস্কার, গড্ডালিকা প্রবাহে অবাধে গা ভাসানো।

২৫ এপ্রিল, ২০০১ সালে তিনি আমাকে বলেছিলেন ‘আমি উন্নত, রুচিসম্মত, সুন্দর, জ্ঞান-বিবেক-যুক্তি ও আবেগের দ্বারা পরিচালিত মানুষ চাই’। তিনি জানেন, তিনি কী চান; তিনি জানেন, তিনি কার কাছে চান; তিনি জানেন, তিনি কেন তা চান। তিনি চাওয়ার জন্য চাওয়া, করার জন্য করা, লেখার জন্য লেখা, পড়ার জন্য পড়েননি। তিনি ‘মানুষ ও তার পরিবেশ’ উন্নত করার লক্ষ্যে লিখতে শুরু করেছিলেন। একজন চিন্তাশীল যুক্তিসিদ্ধ লেখক হিসেবে তিনি যে জীবন একদা শুরু করেছিলেন তা আজ পুষ্ট ও পরিপূর্ণরূপে আমাদের সামনে প্রতিভাত। শৈশব কৈশোরে তিনি যা কিছু দেখতেন তাই তার কাছে সুন্দর মনে হতো; যা কিছু শুনতেন তাই মধুর মনে হতো; জীবনের পরিণত বয়সে তার সেই বোধ আর সকলের মতোই তারও থাকেনি। তিনি এক জীবনে দেখেছেন মানুষ কতো ভালো হতে পারে, আবার তারই উল্টোপিঠে দেখেছেন মানুষ  কতো খারাপ হতে পারে। সেই ভালো-মন্দ মিলিয়ে যে মানুষ তাদের জন্য তিনি সৃষ্টি করতে চান এমন এক সমাজ-রাষ্ট্র যেখানে কল্যাণবোধ প্রখর, শুভবোধ অদম্য, বিবেক ক্রিয়াশীল, সামাজিক চেতনা শক্তিশালী, ন্যায়ের পথ সহজ, সংঘশক্তি বলিষ্ঠ, সংগ্রাম বৈষম্যবিরোধি। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৩৮_১৯০৩) কবিতার একটি লাইন তিনি সর্বদাই স্মরণ রাখেন এবং মাঝে মধ্যে আমাদেরকেও শোনান ‘নাচের পুতুল হয় কী মানুষ, তুললে উঁচু করে’[১]। তিনি জানেন প্রাণহীন পুতুল মানুষ নয়, তেমনি নিষ্প্রাণ মানুষও পুতুল নয়; তিনি সেই নিষ্প্রাণ মানুষকে প্রাণ দিতে উদ্যোগি হন, ঘুমন্ত মানুষকে তার ভিত্তি থেকে, তার ভেতর থেকে জাগিয়ে তুলতে চান।

রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও মনে রাখেন ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। চে গ্যেভারা (১৯২৮-৬৭) যেরকম একদা বলেছিলেন ‘মানুষের উপরই আমরা ন্যাস্ত করেছিলাম আমাদের সকল আস্থা’[২] সেরকম তিনিও জানেন এই মানুষই একদা সমস্ত সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে। আজকের পৃথিবীতে মানুষকে যতই দুর্বল, নিষ্ক্রিয়, শক্তিহীন মনে হোক না কেন, মানুষের এই রূপই চিরন্তন নয়। তিনি কখনো কখনো আমাদের সামনে এবং হয়তো মাঝে মাঝে নিজের সংগে আবৃত্তি করেন শরৎচন্দ্রের সেই অবিস্মরণীয় উক্তি ‘ত্রুটি, বিচ্যুতি, অপরাধ, অধর্মই মানুষের সবটুকু নয়। …….মানুষকে তন্ন তন্ন করিয়া দেখিবার চেষ্টা করিলে তাহার ভিতর হইতে অনেক জিনিস বাহির হয়, তখন তাহার দোষ-ত্রুটিকেও সহানুভূতি না করিয়া থাকা যায় না’[৩]। তার আশ-পাশের সমস্ত মানুষ সম্পর্কেই তিনি এরকম ধারণা পোষণ করেছেন সবসময়; তাই শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সুস্থির ও নিরাবেগ থাকতে পারেন। কাছের মানুষগুলোই হয়তো তাকে যন্ত্রণা দেয়; অথচ তিনি ক্রোধান্বিত হন না কখনোই; বুঝতে চেষ্টা করেন মানুষ কোন গুণ হারিয়ে ফেললে অন্যকে শোষণ, পীড়ন, নির্যাতন করতে পারে; তারপর তিনি মানবের সেই মহৎ গুণের চাষ করার জন্যই কলম ধরেন। তিনি শুধু কলম ধরেই ক্ষান্ত হন না, ঐতিহাসিক বস্তুবাদি দৃষ্টিভঙ্গিতে বুঝতে চেষ্টা করেন মানুষ কবে থেকে স্বার্থপর, হিংসুটে, প্রতারক, পরপীড়ক হলো। তিনি টমাস হবসের (১৫৮৮-১৬৭৯) সেই উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করেন বারবার, যেটাতে মানুষকে লোভী নেকড়েরূপে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘… Life of man solitary, poor, nasty, brute and short’[৪] এবং তারপরেই উল্লেখ করেন ‘কিন্তু এটাই মানুষের একমাত্র রূপ নয়। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের ভালো কাজের দৃষ্টান্ত কম নেই’। তিনি আরও বলেন ‘মানুষ প্রেমময় এবং প্রেমের ভিখারি। মানুষ ভালোবেসে আত্মত্যাগ করে, ভালোবাসা পাওয়ার জন্য দুঃখ-কষ্ট বরণ করে— এমনকি জীবন পর্যন্ত উৎরর্গ করে। সমাজে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ কাজ করে এবং কখনো কখনো ঐক্যবদ্ধ হয়’[৪]। কারণ তিনি জানেন পুঁজিবাদ যতই  হবসের জবানিতে মানুষকে লোভি জন্তু হিসেবে দাঁড় করাক না কেন মানুষের এই রূপ সাময়িক। অতি প্রাচিনকাল থেকেই মানুষ সমষ্টিগত সামাজিক জীব; পুঁজিবাদ যতই তাকে স্বার্থপর ও লোভি করুক না কেন মানুষ আবার তার প্রকৃত রূপ ফিরে পাবেই।

মানুষকে নিয়ে ভাবতে গিয়েই তিনি ভেবেছেন তার সময়ের আশপাশের মানুষ ও তার পরিবেশকে। মানুষের আত্মপরিচয়, আত্মপ্রতিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস, স্বাজাত্যবোধ নিয়ে চর্চা করে কাটিয়েছেন পাঁচ দশক, যে সময়টিকে তিনি বলেছেন অবক্ষয়ের কাল। বাঙালির যে রাষ্ট্রটি বাংলাদেশ নাম ধারণ করে টিকে থাকার চেষ্টায় নিয়োজিত সেই রাষ্ট্রটি ও তার মানুষগুলোর কর্মপ্রচেষ্টাকে তিনি বারবার মূল্যায়ন করেন। তার কাছে রাষ্ট্র শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, রাষ্ট্র তার কাছে কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক নয়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ একটি ঐক্যবদ্ধ সুদৃঢ় শক্তিমান সমৃদ্ধিমান মানবজীবনের সারাৎসার; যে জীবন গড়ে তুলেছেন হাজার বছরের চেষ্টায় সেসব মনীষারা যারা নিজেদের বাঙালি বলে আত্মপরিচয় নির্ধারণ করেছেন। এই আত্মপরিচয় এমনি এমনি আসেনি; কত শত লেখক, সাহিত্যিক, দার্শনিক, চিন্তক, রাজনীতিকের চেষ্টার ফলে আজকের এই বাংলাদেশ, যাকে নিয়ে আমরা হতাশাগ্রস্ত। বাংলাদেশ ও বাঙালির শত ব্যর্থতার মাঝেও তিনি সর্বদাই আশাবাদি, তবে এই আশাবাদ নিছক আশার ছলনা নয়; এই আশার সারমর্ম আছে বাঙালির ইতিহাস ও তাদের বেঁচে থাকার অদম্য জীবনীশক্তিতে, যে জীবনীশক্তি না থাকলে অনেক বিলুপ্ত জাতির মতো বাঙালিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।  

বাঙালির জীবনীশক্তির অন্যতম প্রকাশ তার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি আর এসব বিষয়ে তিনি ক্রমাগত লিখে চলেছেন। বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনি কখনোই নিরুদ্বেগ ছিলেন না। বাঙালির রাজনীতি ও সংস্কৃতির শক্তি সম্পর্কেও তিনি ওয়াকিবহাল আর বাংলা ভাষার সহজীকরণের জন্য তার চেষ্টার কমতি নেই।

বিশ শতকের বাঙালি তার আত্মপরিচয় সংক্রান্ত সমস্ত বিতর্ককে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়েছে। মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ উপনিবেশ অতিক্রমকালীন দীর্ঘ প্রায় চারশ বছর (১৫৭৫-১৯৭১) বাঙালির পরাধীনতার কাল; যে পরাধীনতার কালে বাঙালির সৃষ্ট সম্পদ লুট হয়ে চলে গেছে অন্যত্র। আমরা জানি, প্রতিটি জাতির জীবনেই উত্থান-পতন আসে; বাঙালির জীবনেও উত্থান-পতন অবধারিতরূপেই অন্যান্য জাতির মতোই ক্রিয়াশীল ছিলো। দক্ষিণ ভারতীয় সেন শাসনামল এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালীন ১২০৪ সাল পরবর্তী পরাধীনতা কাটিয়ে উঠে যে বাঙালি চতুর্দশ শতকে নিজের আত্মপরিচয় নির্ধারণ করেছিলো তারা আজ বিশ শতকের শেষে একুশ শতকের শুরুতে কীভাবে কোথায় আছে তা গভীর একাগ্রতা ও শ্রমের সাথে খুঁজে বের করেছেন তিনি। বাঙালির জীবন ও সংগ্রামের ইতি-নেতির সমস্ত দিককে বিবেচনায় নিয়ে তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন বর্তমানকালীন ইঙ্গ-মার্কিন আধিপত্য সত্বেও আমাদের ভয় নেই। কোনো কোনো জাতির জীবনে দুর্যোগ-দুর্বিপাক আসে, কিন্তু তা সাময়িক; যৌথ চেষ্টার দ্বারা তা কাটিয়ে ওঠা যায়; বাঙালিও তার অন্ধকার কাল কাটিয়ে উঠবে; বাঙালার মানুষ পৃথিবীতে অগ্রগামি চিন্তার অধিকারী হবে, বদলে দেবে পৃথিবীকে।

ভবিষ্যতের বাঙালি সম্পর্কে তিনি অনুক্ষণ ভাবেন এবং কখনো কখনো মনে হয় এ চিন্তা তাকে সম্মোহিত করে রাখে। বাঙালির জাগরণ, রেনেসাঁস, রাজনীতি, চিন্তা, পুনর্গঠন, অভিব্যক্তি, প্রকৃতি, ক্ষমতাকাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে দীর্ঘদিন তিনি ভেবেছেন এবং এখন অনায়াসে বাঙালি সম্পর্কে মতামত দিতে পারেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন বাঙালি অনতিবিলম্বেই একটি সুসংগঠিত স্বশাসিত জাতি হিসেবে নিজেদেরকে পরিচিত করে তুলবে পৃথিবীতে। এই স্বপ্নের ভেতরে তিনি মোহাচ্ছন্ন নন বরং তিনি বাঙালির দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে সচেতন। ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩ সালেই তিনি লিখেছিলেন‒

“বাঙালির জাতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে দেশি এবং বিদেশি সকল ঐতিহাসিকই মূলত দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেনঃ এক. বাঙালি কল্পনাপ্রবণ, ভাবালু, সৌন্দর্যানুরাগী, স্পর্শকাতর, দুর্বলচিত্ত, চিন্তাশীল, ভাবুক, কবিস্বভাব ইত্যাদি। দুই. বাঙালি কলহপ্রবণ, ঈর্ষাপরায়ণ, পরশ্রীকাতর, অদূরদর্শী, ভীরু, সাহসহীন, স্ত্রীস্বভাব, আরামপ্রিয়, অলস, হুজুগে ইত্যাদি।

প্রথমটি বাঙালির গুণের দিক আর দ্বিতীয়টি দোষের দিক হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। অতীতে ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বাঙালি তার স্বভাব ও চরিত্রের যে স্বাক্ষর রেখে এসেছে, তাতে বাঙালির জাতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এসব মন্তব্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, জাতীয় চরিত্র বা জাতীয় বৈশিষ্ট্য অমোঘ নিয়তির মতো কোনো দুর্লঙ্ঘ্য ব্যাপার নয়; জাতীয় সাধনা ও জাতীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতীয় চরিত্র ও জাতীয় বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব এবং পৃথিবীর অনেক জাতি তা করতে সক্ষম হয়েছে। মানবজাতির ইতিহাসে দুর্বল রাষ্ট্রের প্রবল হওয়ার এবং প্রবল রাষ্ট্রের দুর্বল হওয়ার দৃষ্টান্তের অভাব নেই। সভ্যতার ধারায় উত্থান-পতন আছে। মানুষ নিজেরই কর্মফল ভোগ করে, জাতিও ভোগ করে নিজের কর্মফল। উন্নতি করার মতো কর্মফল ব্যক্তি ও জাতিকে অর্জন করতে হয়।”[৫]

তিনি বাঙালির শক্তিকে জাগরিত করতে চান; এই জাগরণকে তিনি রেনেসাঁস নামে অভিহিত করেন। তার রেনেসাঁস চৌদ্দ, পনের ও ষোলো শতকের ইউরোপে উদ্ভুত শিল্প, সাহিত্য ও চিন্তার ক্ষেত্রে যে নবজাগরণ শুধু তাই নয়। তার রেনেসাঁস শুধু বাঙালির উনিশ শতকের নবজাগরণও নয়। তিনি রেনেসাঁস বলতে বোঝেন ইউরোপের রেনেসাঁস থেকে আরম্ভ করে বর্তমান কাল পর্যন্ত সকল মহান ব্যক্তির চিন্তার সংশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন চিন্তার উদ্ভব। বাঙালির জাগরণ বলতে তিনি বোঝেন অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে মানবজাতির সৃষ্ট সকল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগোনোর পথ নির্মাণ এবং এই পথই তার কাছে রেনেসাঁসের পথ। প্রচলিত চিন্তাধারা ও বিধিব্যবস্থাকে উৎখাত করে উন্নততর নতুন চিন্তাধারা ও বিধিব্যবস্থা প্রণয়নই রেনেসাঁসপন্থিরা করেন। পুরাতন শৃঙ্খলাকে তার ভাঙতে চান উন্নততর নতুন শৃঙ্খলা প্রবর্তন করার জন্য‒বিশৃঙ্খল অবস্থাকে স্থায়ী করার জন্য নয়। রেনেসাঁসপন্থিরা কাজ করেন সদর্থক, ধনাত্মক, গঠনমূলক, সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। উন্নততর নৈতিক চেতনা ও সৃষ্টিশক্তি অবলম্বন করে তারা সামনে চলেন। অদম্য মনোবল নিয়ে যাত্রাপথের বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তারা লক্ষ্য অর্জন করেন। রেনেসাঁস মানেই তার কাছে গতানুগতি, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন সৃষ্টির ও প্রগতির জন্য চিন্তা ও কাজ করা। তিনি জাতীয় ঐক্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও প্রগতিকে অবলম্বন করে বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রেনেসাঁসের পথে হাঁটতে চান। তিনি মানেন, অতীতের রেনেসাঁসে সবকিছুই ভালো, নির্ভুল ছিলো, নিখুঁত ছিলো‒ কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিলো, তা নয়। তবে সকল সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও তাতে মহান এমন কিছু ছিলো যা অতুলনীয়। রেনেসাঁসের মনীষীদের সৃষ্টি পতনশীল জাতিকে নবউত্থানে সহায়তা করে।[৬] রেনেসাঁসকে তিনি গ্রহণ করতে চান বাঙালির জীবন সুন্দর, সমৃদ্ধ, আনন্দময় ও গতিশীল করে উন্নত সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে।

অর্জিত শক্তিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন জ্ঞানকে। তিনি বারবার বলেছেন সেই পুরোনো কথাটি যে জ্ঞানই শক্তি। এই কথাটিকে মার্কিনীরা অক্ষরে অক্ষরে প্রতি মুহুর্তে মেনে চলে অথচ অন্য সব জাতিকে তারা জ্ঞান দিতে চায় না, অন্যান্য জাতিগুলো জ্ঞান অর্জন করুক এটাও মার্কিনীরা চায় না। জ্ঞানের মূল্য বোঝে মার্কিনিরা, তাই জ্ঞানার্জনে তাদের ক্লান্তি নেই; অথচ অন্যান্য জাতিগুলোর জন্য তারা নতুন প্রবাদ তৈরি করেছে তথ্যই শক্তি। জ্ঞানের সমঝদার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদিরা অন্য জাতিগুলোকে তথ্যের জালে আটকাতে চায়। আমরা বাঙালিরাও জ্ঞানার্জন বাদ দিয়ে তথ্যজালে আটকে গেছি। এর বিপরীতে তিনি জ্ঞানার্জনকে প্রাধান্যে রেখে আত্মনির্ভরতাকে সিঁড়ি হিসেবে মেনে নিয়ে অনুশীলনকে আঁকড়ে ধরে বাংলাদেশকে গড়তে চান। জ্ঞানকে শক্তিরূপে তিনি মূল্যায়ন করেন ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানকে অনুশীলনে যুক্ত করে তার ফলাফলকে দেখে নেবার প্রয়াসীও তিনি। দৈনন্দিন জীবনে তিনি আয়েশী-বিলাসী জীবনধারণ করেননি, কারণ তিনি জানেন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক-শ্রমিক বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন না। শ্রমিক-কৃষকের কষ্টকর কর্মবহুল জীবন থেকেই তিনি শিখেছেন জনগণের জন্য কাজ, মানুষের জন্য কাজ কীভাবে করতে হয়। জ্ঞানের সংগে কাজের সম্মিলন ঘটিয়ে তিনি শ্রমিক-কৃষককে মুক্ত করতে চান পার্থিব জড়তা থেকে, তাদেরকে বের করে আনতে চান স্বাধীনতার উন্মুক্ত প্রান্তরে।

তিনি যেসব চিন্তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে চান তার প্রথমটিতেই আসে আত্মনির্ভরতা, আত্মশক্তি, স্বাজাত্যবোধ, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ ও তার পরিপূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ। তিনি আত্মনির্ভর শক্তিমান সমৃদ্ধিমান একটি জাতি চান যারা নিজেরা নিজেদেরকে স্বাধীন রাখবে, নিজেদের আত্মবিকাশের পথ নির্মাণ করবে, বাইরের অপশক্তির হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করবে। তিনি আধিপত্যবাদি, উপনিবেশবাদি, নয়া-উপনিবেশবাদি, সাম্রাজ্যবাদি নীতির তীব্র বিরোধি। তিনি প্রতিটি জাতির স্বাধীনভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পথ উন্মোচনের কাজ করেন, কীভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের জাতিগুলো নিজেদের বিকশিত করবে তার পথ বের করেন। তিনি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্বয়ংসম্পূর্ণতার নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। পরনির্ভরতার, বৃহত শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ও আত্মবিক্রয়ের নীতির তিনি ঘোর বিরোধি। তাই তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন ‘জাতির ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি, শ্রমশক্তি ও সম্পদের সদ্ব্যবহার দ্বারা জাতির আত্মগত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উন্নতি করা যায়’[৭]।

জাতীয় হীনমন্যতাবোধ কাটিয়ে তিনি জাতিকে ঐশ্বর্যশালী করতে চান। সামাজিক আকর্ষণ, সামাজিক সংহতি, পারস্পরিক সম্প্রীতি, ও হৃদ্যতা বাড়িয়ে তিনি একটি সুস্থ, সুন্দর, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চান। তিনি দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল, জাতির অবক্ষয়ের কাল দূর হবেই; জনগণের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন উন্নত করা গেলে জাতি আত্মনির্ভর হবে, নিজেদের শক্তির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। তিনি বলেন ‘জাতির আত্মনির্ভরতাই তো স্বার্বভৌমত্ব’[৮]।

জাতির আত্মশক্তি বলতে তিনি জনগণের আত্মশক্তিকেই বুঝিয়েছেন। জনগণের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের উপরে আস্থশীল এই মানুষটি তাই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে ঘোষণা করতে পারেন ‘যখন জনগণ বিবেকবুদ্ধি অবলম্বন করে সংঘবদ্ধ হয়েছে তখন সেই শক্তির সামনে কোথাও কোনো অত্যাচারি শাসক— কোনো যুদ্ধবাজ শক্তি টিকতে পারেনি[৯]। কেননা জনগণ পারমানবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী, জনগণ জাগলে কোনো অপশক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারে না।

একদা তিনি আমাকে জনগণ বলতে ‘বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যারা বিদেশের দালাল নয়, যারা সাধারণ মানুষের কল্যাণে চিন্তা করেন, যারা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চান, যারা দেশের প্রশাসনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিকব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধাপে ধাপে সংস্কার করে উন্নত করতে চান তাদের সকলকেই’ বুঝিয়েছিলেন। জনগণের সংজ্ঞাকেও তিনি সময়ের প্রবহমানতায় পুননির্ধারণ করে নিতে চান। এই জনগণের উন্নতির কথা বলেই তিনি ক্ষান্ত থাকেন না। তিনি সে কথাকে কাজে পরিণত করার জন্য রচনা করেন ‘আটাশ দফাঃ আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচি’। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে লিখিত বাংলাদেশের এই মুক্তিসনদটির প্রচার শুরু হয় ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এবং ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার কপি বিতরণ ও বিপণন করা হয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এবং স্বদেশ চিন্তা সংঘ[১০]-এর কর্মিরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চেষ্টা করেছেন ২৮ দফাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কার্যকর করতে; এই কর্মসূচিকে রাজনীতিক, লেখক, বুদ্ধিজীবি, ছাত্রনেতাদের হাতে পৌঁছে দিতে। এই সুদীর্ঘ সময় ক্রমাগত লেগে থেকে স্বদেশ চিন্তা সংঘ দৃঢ়ভাবে চেষ্টা ও আশা করেছে ২৮ দফার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিতে সদর্থক পরিবর্তন আনতে এবং দেশে একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, বিজ্ঞানমনষ্ক, সৃষ্টিশীল রাজনৈতিক ধারা বিকশিত করতে। এ-কাজ করতে গিয়ে তিনি মাঝে মাঝে হতাশ হয়েছেন কিন্তু কাজ পরিত্যাগ করেননি। তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন কী কারণে দেশে প্রগতিশীল কর্মসূচিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল গড়ে উঠছে না।

১৯৬০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, এবং তারপর থেকে কখনোই রাজনীতির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি। ফলে তিনি বুঝেছেন এ-দেশে রাজনীতিকে উন্নত করার আকাঙ্খী দলের খুব অভাব। প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনাকারী সংগঠন এদেশে অনেক রয়েছে কিন্তু জনজীবনের সংকট থেকে মুক্তিপ্রত্যাশি রাজনৈতিক দল নেই। তিনি অজস্র উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন এদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সমালোচনার জন্য সমালোচনা, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করেছে; কিন্তু জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক কর্মসূচির ভিত্তিতে জনমত তৈরি করে ঐক্যবদ্ধ করতে চায়নি। তিনি বহুবার বলেছেন এদেশের বামপন্থিদের গত ১১০ বছরের ইতিহাসে ‘রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায় না। নিতান্ত উল্লেখ করার মতো কিছু পাওয়া গেলে যেতেও পারে, কিন্তু একটা জাতিভিত্তিক প্রগতিশীল কর্মসূচি— সমাজতান্ত্রিক অভিমুখি কর্মসূচি নিয়ে, জনসাধারণকে সংগে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগোবার কোনো চেষ্টা— কোনো চিন্তা খুঁজে পাওয়া যায় না’[১১]। এভেবেই তিনি বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলগুলোর ইস্যুভিত্তিক সাময়িক উত্তেজনাকর স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনের বিরোধিতা করেন; একদফাভিত্তিক সরকার পতনের আন্দোলনকে জাতির জন্য আত্মঘাতি বলে মনে করেন। তিনি জাতিকে জাগাতে চান দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক সামগ্রিক প্রগতিশীল বহুল প্রচারিত কর্মসূচির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ ও প্রাণবন্ত করে; হুজুগে মাতিয়ে নয়।

রাজনৈতিক ধারার প্রগতি ঘটানো সবচেয়ে কঠিন, তিনি একথা মানেন এবং গভীর মনোযোগের সাথে বাঙালির রাজনৈতিক কাজকে সমৃদ্ধ করতে করণীয় নির্দেশ করেন। রাজনীতি তার কাছে নিছক একটি আলোচনার বিষয় নয়; রাজনীতি তার কাছে জনগণের সমগ্র জীবনের সমস্যাসমূহ থেকে মুক্ত হবার ক্রমাগত প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টার সাথে বাঙালি জীবনের সম্পৃক্তি অতীতে খুব একটা ছিলো না। তিনি জানেন বাঙালির জ্ঞানগত ঐতিহ্যের সংগে রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সংযোগ ও সমন্বয় অতীতে করা যায়নি। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন ‘চিন্তাকে সম্পূর্ণরূপে অবজ্ঞা করা হয়েছে আমাদের রাজনীতিতে’। এই চিন্তা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন জ্ঞানের ভাণ্ডারকে। জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, ধনাত্মক দৃষ্টিভংগি অবলম্বন করে, দার্শনিক রাষ্ট্রচিন্তকদের মতের ভিত্তিতে, জনগণকে সংগে নিয়ে, রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রগতিশীল করার লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচিকে সামনে এনে ক্রমাগত কাজ চালিয়ে যাওয়ার নাম রাজনীতি। এই রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশের রাজনীতির অধোগামি ধারাকে কটাক্ষ করে তাই তিনি বলতে পারেন,  

‘জনস্বার্থের বিবেচনা যে রাজনীতিতে নেই, সে রাজনীতির অবসান যত দ্রুত ঘটে ততই মংগল। বর্তমান রাজনীতি নিতান্ত রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করার যোগ্যতা রাখে না’[১২]।

তার চিন্তায় রাজনীতির সংগে জড়িয়ে আছে নেতৃত্ব, নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য, নেতৃত্বের গুণাবলী, নেতৃত্বের স্বরূপ, নেতৃত্বের গঠন ও নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতির সমস্যা। তিনি নেতৃত্বকে কোনো ভাববাদি আজগুবি ব্যাপার বলে মনে করেন না। তিনি জানেন জনগণই নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, জনগণ যেরকম নেতৃত্ব আশা করে সেরকম নেতৃত্ব তৈরি করে নেয়। জনগণ উন্নত না হলে নেতৃত্ব উন্নত হবে না একথা তিনি বহুবার বলেছেন এবং জনগণের মান উন্নত করার জন্য রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, পর্যালোচনা, আত্মসমালোচনা ইত্যাদি জনগণের মাঝে বিকশিত করার চেষ্টা করেছেন। আমি যতদিনই তার বক্তৃতা শুনেছি প্রায় সবদিনই দেখেছি, তিনি এ-বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। তার অনেক লেখাতেই নেতৃত্ব ও রাজনীতির বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে। তিনি লিখেছেন,  

‘বাংলাদেশের সমাজে ভালো নেতৃত্ব গড়ে না ওঠার নানা কারণের মধ্যে একটি প্রধান কারণ হলো জনসাধারণের কোনো কোনো অংশের চরিত্রদৈন্য এবং প্রায় সকলের অসতর্কতা, হুযুগপ্রিয়তা, অপরিণামদর্শিতা ও অবিমৃষ্যকারিতা’[১৩]।

নেতৃত্বের গঠনপ্রক্রিয়া একটি বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন গঠনমূলক সচেতন প্রক্রিয়া; এটি সতস্ফূর্ততার ব্যাপার নয়। তাৎক্ষণিক, ভাবাবেগযুক্ত, পরিকল্পনাহীন আন্দোলনের নেতৃত্ব সমস্যার সাময়িক সমাধান করতে পারলেও জনজীবন, রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নতি ঘটাতে পারবে না। কেননা ‘নেতৃত্ব নিতান্তই ব্যক্তিবিশেষের ব্যাপার নয়, দলগত ব্যাপার; কেবল দলগত ব্যাপার নয়, জনগণেরও ব্যাপার’[১৪]। এই দলীয় ব্যাপারটির প্রতি তিনি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং প্রথমেই দলগঠন প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দিতে বলেন। তার রাষ্ট্রচিন্তার ধারাটি হচ্ছে অনেকটা ব্যক্তি-দল-রাজনীতি-রাষ্ট্র-সমাজ এবং বিপরীতক্রমেও চলমান। তিনি আরো অনেক কিছুর মতোই রাজনীতি বিষয়ে পূর্ণাংগ গভীর মনোযোগ দেবার জন্য সদাপ্রস্তুত। আমি দেখেছি রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলে তার কোনো ক্লান্তি নেই, যেমনি সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ে তিনি প্রতিনিয়ত চিন্তাশীল।

তার প্রবন্ধ পাঠ করতে গেলে বা তার আলোচনা শুনলে আমাদের এই অভিজ্ঞতা হয় যে, তিনি কোনো বিষয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একের পর এক সমার্থক শব্দ লিখতে বা বলতে থাকেন। যেমন, তিনি লিখেছেন

‘যে সমাজে বিবেক লোপ পায়, বুদ্ধি বিকারপ্রাপ্ত হয়, নিষ্ঠুরতা ও হিংসা-প্রতিহিংসা ভালোবাসার স্থলাভিষিক্ত হয়, সেখানেই ধর্মের নামে, মানবতা ও ন্যায়বিচারের নামে, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে অনাচার চলে; স্বাধীনতার নামে বারবার স্বেচ্ছাচার-স্বৈরাচার মাথা তোলে; ধূর্ততা-চতুরতা-ভাওতা-প্রতারণার আধিপত্য কায়েম হয়; একটির পর একটি অন্ধকারের শক্তি রাজত্ব করে; ক্ষমতার অত্যাচারে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়; ভিক্ষাবৃত্তি, বেকারত্ব, দুর্নীতি, দারিদ্র, অনাহার, অর্ধাহার, নিরাপত্তাহীনতা, বিদেশি হস্তক্ষেপ, অদৃষ্টবাদ, পরাধীনতা, অন্ধবিশ্বাস, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, বিবেকহীনতা, অযুক্তি, কুযুক্তি, অনাচার, অপচয়, অপব্যয়, অনাস্থা, অপ্রেম, নিষ্ঠুরতা, অবক্ষয়, সামাজিক শিথিলতা, বিচ্ছিন্নতা, বিযুক্তি প্রভৃতি সকল শত্রু মিলে জীবনের সুস্থতা, স্বাভাবিকতা ও গতিশীলতাকে হরণ করে নেয়। সাধারণ মানুষ নিস্তেজ ও নিষ্ক্রিয় থাকলে শূন্যমস্তিষ্ক, ফাঁকাহৃদয়, নির্বোধ দুর্বৃত্তদের নেতৃত্ব দুর্দৈবের মতো স্বেচ্ছাচারি নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়। তাতে নেতৃত্ব আর শোষণ-পীড়ন-প্রতারনা সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়’।[১৫]

এভাবেই তিনি শব্দের পর সমার্থক শব্দ সাজিয়ে নির্মাণ করেন একটি সামগ্রিক চিন্তা; যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে গড়ে তোলেন যুক্তির সমগ্রতা।

বারবার আমার মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে; তাকে কীভাবে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা যায়। আমার মুঠোফোনে তিনি A q f h sir, মুখে বলি কাসেম স্যার, এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে তাকে আমি সত্যিকারভাবে চিনি। সহজ সরল সদালাপী এই মানুষটিকে শত কথার পুনরাবৃত্তির ভিঁড়ে খুঁজে পেলে মনে হবে তিনি নিরহংকার, প্রাণবন্ত, যুক্তিপরায়ণ, সাহসী, সত্যসন্ধিৎসু, আদর্শিক, জীবনমুখি, পার্থিবতাকেন্দ্রিক, গণতান্ত্রিক, নিঃসঙ্গ পথের পথিক এক আলোকোজ্জ্বল মানুষ। আমার মনে হয়েছে তিনি মানবতাবাদ, মার্কসবাদ ও জাতীয়তাবাদের এক অপূর্ব সমন্বয়। তিনি স্বপ্ন দেখে চলেছেন বাংলাদেশ একদিন সারা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, নিপীড়িত জাতিগুলোর পক্ষে লড়াই করে এদেশ পৃথিবীকে এগিয়ে নেবে সমতার ভূমিতে, এদেশের মানুষগুলো ঐক্য গড়ে তুলবে সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করে, সংগঠিত বিবেকের শক্তিতে পরাজিত করবে আধিপত্যকে। এই মানুষটি আমাদের মাঝে কিংবদন্তিতে পরিণত হননি; কেননা তিনি চটকদার কথা বলে অতি দ্রুত পরিচিতি লাভের চেষ্টা করেননি। তিনি তার কর্মে ধীরস্থির ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন বলে সেই ১৯৮৫ সালে আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯) তাকে বাঙলা ভাষায় বিদ্যাচর্চাকারিদের মধ্যে পাঁচজনের একজনরূপে নিয়েছিলেন[১৬] এবং ধীরে ধীরে তা সকলের সামনেই প্রতিভাত হয়েছে।

বহুবার তাকে আমি দেখেছি, তিনি কোলকাতার সংগীত চ্যানেল তারা মিউজিক-এ পুরোনো দিনের গান শুনছেন। গান শুনতে শুনতেই আবৃত্তি করছেন ‘এ-দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধুলি, অন্তরে নিয়াছি আমি তুলি, এই মহামন্ত্রখানি, চরিতার্থ জীবনের বাণী’, তখন আমার মনে হয়েছে যে জীবন ও পরিবেশকে সংগে নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন তাতে যন্ত্রণার চেয়ে আনন্দের পরিমাণই বেশি। অথচ অন্য কোনো বিষাদগ্রস্ত সময়ে যখন দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করেন ‘নির্যাতনই এখনকার বৈশিষ্ট্য’ তখন তারই বেসুরো কণ্ঠে গাওয়া শ্যামল মিত্রের ‘তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর, হাসি আর গানে ভরে তুলবো’ গানটিকে মিথ্যার ভাস্কর্য মনে হয়।

আমার স্বপ্ন ছিলো একবার সারারাত তার সাথে পুরো ঢাকা ঘুরে ঘুরে দেখবো অন্ধকার আর নিয়ন আলো, অভাব আর প্রাচুর্য কত বিচিত্রভাবে মিলেমিশে আছে এই নগরে। আমার সেই স্বপ্ন আজো পূরণ হয়নি।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১; নায়েম ঢাকা।

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ

১. আবুল কাসেম ফজলুল হক; প্রাচুর্যে রিক্ততা; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১০; পৃষ্ঠা ৭৬।

২. দেখুন, সুজিত সেন সম্পা.; লাতিন আমেরিকা ও কিউবা, বিপ্লবী সংগ্রামের ধারা; পুস্তক বিপণী, কোলকাতা; জানুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা ২৮৭।

৩. দেখুন, আবুল কাসেম ফজলুল হক ও মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম সম্পা.; মানুষের স্বরূপ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৭; পৃষ্ঠা ৭৩।

৪. আবুল কাসেম ফজলুল হক; রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৮; পৃষ্ঠা ১৭৫।

৫. আবুল কাসেম ফজলুল হক; শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১১; পৃষ্ঠা ৪০-৪১।

৬. দেখুন, আবুল কাসেম ফজলুল হক; শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১১; পৃষ্ঠা ৩২৫-৩৩৪।

৭. অনুপ সাদি সম্পা.; বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা; ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ; ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১০; পৃষ্ঠা ৯৬।

৮. আবুল কাসেম ফজলুল হক; প্রাচুর্যে রিক্ততা; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১০; পৃষ্ঠা ৮৪।

৯. দেখুন, মিজান রহমান সম্পা.; সাময়িকপত্র লোকায়ত; বর্ষ ২৯, সংখ্যা ১; ফেব্রুয়ারি ২০০৯; পৃষ্ঠা ২১।

১০. একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাঠচক্র ও আড্ডাকেন্দ্র; সংগঠনের বর্তমান সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং মহাসচিব হাসান ফকরী। আহমদ শরীফ(১৯২১-১৯৯৯) ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি।

১১. আবুল কাসেম ফজলুল হক; রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৮; পৃষ্ঠা ২৩৭।

১২. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৯৫।

১৩. আবুল কাসেম ফজলুল হক; শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১১; পৃষ্ঠা ১৪৫।

১৪. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৫৭।

১৫. আবুল কাসেম ফজলুল হক; রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৮; পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৭।

১৬. দেখুন, হুমায়ুন আজাদ; সাক্ষাৎকার; আগামী প্রকাশনী; ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪; পৃষ্ঠা ৪৩।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top