Main Menu

শ্রেণিযুদ্ধই মুক্তির পথ

যুদ্ধকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন ভি আই লেনিন, ন্যায়যুদ্ধ এবং অন্যায় যুদ্ধ। শ্রেণি উদ্ভবের পর থেকে যেসব যুদ্ধ হয়েছে তার বেশ কিছু যুদ্ধই শ্রেণিযুদ্ধ। তবে শোষকেরাও পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, যেমন দুজন দাসমালিকের একজনের আছে একশ জন দাস, এবং অন্যজনের আছে দুইশ জন দাস, তাঁরা যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে দাসের সমবণ্টনের জন্য যুদ্ধ শুরু করে তবে তা শ্রেণিযুদ্ধ নয়, সেটি দুজন বা দুদল শোষকের যুদ্ধ। প্রথম ও দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ একচেটিয়া পুঁজিপতিদের দুনিয়াকে ভাগবাটোয়ারা করার যুদ্ধ ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিলো লুটের বখরা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ভাগবাটোয়ারার জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ। লেনিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত পুঁজিবাদের নিয়মটি সম্পর্কে বলেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

“তার পরিণামফল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে লুটের বখরা নিয়ে দস্যুদের যে-যুদ্ধ তাতে পুঁজিবাদের সাধারণ নিয়মটা কী: যে ছিলো সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে প্রবল সে মুনাফা তুলেছে ও লুট করেছে সবার চেয়ে বেশি; যে ছিলো সবচেয়ে দুর্বল, সে হয়েছে চূড়ান্তরূপে লুণ্ঠিত, নিপীড়িত, দমিত ও দলিত।”[১]

উনিশ এবং বিশ শতকে বিভিন্ন জাতির মুক্তিসংগ্রামগুলোকে বলা হয়েছে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং এই সংগ্রাম যখন যুদ্ধে রূপ নিয়েছে তখন সেটির নাম হয়েছে মুক্তি যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধও একধরনের শ্রেণিযুদ্ধ কেননা এতে নিপীড়িত জাতিটি উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করে। তবে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যখন অনেকগুলো জাতি বসবাস করে তখন সেসব জাতির ভেতরে সমানাধিকার বাস্তবায়ন করা চাই। কিন্তু এটি সমাজতন্ত্র ছাড়া সম্ভব নয়, এই কারণেই পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ দেশের অভ্যন্তরে ছোট ও পশ্চাৎপদ জাতিসমূহকে শোষণ করে এবং বাইরের অন্য দেশ ও জাতিসমূহকে শোষণ ও নিপীড়ন করে। লেনিন এই বিষয়ে লিখেছেন, 

“আমাদের জাতীয় সমানাধিকার অবশ্যই বাস্তবায়িত করা চাই; চাই সকল জাতির জন্য সমান “অধিকারের” ঘোষণা, রূপায়ণ ও বাস্তবায়ন। … … কিন্তু এতে উদ্ভূত যে-প্রশ্নটি এড়ান হয় তা হল: জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার অস্বীকার কি সমানাধিকার অস্বীকৃতি নয়?

অবশ্যই। এবং অটল, অৰ্থাৎ সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র এই অধিকার রূপায়িত ও বাস্তবায়িত করবে। এটা ছাড়া জাতিসমূহের পরিপূর্ণ স্বেচ্ছাভিত্তিক আপোস ও মিলনের আর কোনো পথ নেই।”[২]

সাম্যবাদীগণ মূলত শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণিযুদ্ধকে আঁকড়ে ধরে সংগ্রাম চালান। ফলে যেসব বামপন্থি শ্রেণিযুদ্ধ শব্দটিই উচ্চারণ করতে ভুলে গেছেন তারা সংশোধনবাদকে গ্রহণ করেছেন। সংশোধনবাদী নেতৃত্বকে সরিয়ে সমাজতন্ত্রের লড়াই বেগবান করেই কেবল শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণিযুদ্ধকে এগিয়ে নেয়া যাবে। সমাজতন্ত্রের নামে সংশোধনবাদীদের ব্যবসা বন্ধ করেই কেবল সমাজতন্ত্রের লড়াইকে এগিয়ে নেয়া যাবে। শোষকশ্রেণির শাসনের উচ্ছেদের মধ্য দিয়েই সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটাতে হবে। স্তালিন শ্রেণিসংগ্রাম ঘটানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেছেন,

“মার্কস বলেছেন প্রতিটি শ্রেণি-সংগ্রামই একটি রাজনেতিক সংগ্রাম। এর অর্থ হলো যদি আজ শ্রমিকেরা ও পুঁজিপতিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রাম চালায়, তাহলে আগামী কাল তারা রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে বাধ্য হবে এবং এইভাবে একটি সংগ্রামে, তারা তাদের নিজ নিজ শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করবে। এই সংগ্রামের দুটি ধরণ আছে। পুঁজিপতিদের বিশেষ ব্যবসাগত স্বার্থ আছে, এবং এই সমস্ত স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই তাদের অর্থনীতি ভিত্তিক সংগঠনগুলি বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু তাদের ব্যবসাগত স্বার্থের অতিরিক্ত তাদের সাধারণ শ্রেণিস্বার্থ রয়েছে, যে স্বার্থ হলো পুঁজিবাদকে জোরদার করা। এবং এই সমস্ত সাধারণ স্বার্থ রক্ষা করতে তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হবে এবং তাদের প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক পার্টি।… …

বিপরীত দিকে শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি আন্দোলনেও আজ অনুরূপ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণির পেশাগত স্বার্থ রক্ষা করার জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হচ্ছে এবং এগুলি উচ্চতর মজুরি অর্জন, কাজের দিনের সময় কমানো ইত্যাদির জন্য সংগ্রাম করছে। কিন্তু পেশাগত স্বার্থের অতিরিক্ত শ্রমিক শ্রেণির অভিন্ন শ্রেণিস্বার্থও আছে; তাহলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সংগঠন এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণি যতদিন একটি ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য শ্রেণি হিসাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় না করে, ততদিন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদন করা অসম্ভব। এই জন্যই শ্রমিক শ্রেণিকে অতি অবশ্যই রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হবে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাবাদর্শগত নেতা হিসাবে কাজ করার জন্য তার একটি রাজনৈতিক দল প্রয়োজন।”[৩]

শ্রেণিসংগ্রামের বদলে যারা শ্রেণিসমন্বয়ের পথে শোষকশ্রেণির সাথে সুবিধাজনক শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখে তারা সমাজতন্ত্র ও সর্বহারা শ্রেণির সাথে বেইমানি করছে। সাম্যবাদ ব্যবসায়ী কিছু সুবিধাবাদি বামপন্থি সারা পৃথিবীতেই রয়েছে। চীনের বর্তমান নেতৃবৃন্দ সংশোধনবাদকে শুধু গ্রহণই করেনি, তারা সম্পত্তির পাহাড় গড়েছে এবং চিনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিও সেইসব কোটি কোটি টাকার মালিক নেতৃবৃন্দকে কেন্দ্রিয় কমিটি থেকে বহিষ্কার করছে না। গ্রিসের ভুয়া সমাজতন্ত্রি মধ্যবামপন্থি প্রধানমন্ত্রি পাসোক ও মধ্য ডানপন্থি নিউডেমোক্রেসি পার্টি একত্রে যতদিন ক্ষমতায় ছিল ততদিন গ্রিসকে ডুবিয়েছেন কিন্তু সমাজতন্ত্রি নাম ছাড়েননি। অবশেষে ৬ মে, ২০১২ তারিখের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গোহারা হেরে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের; অথচ জনগণের মরণপণ আন্দোলনের দিকে কর্ণপাত করেনি। ব্রিটেনের লেবার পার্টি সাম্রাজ্যবাদিদের প্রধান পার্টি হয়ে গেছে প্রায় শত বছর ধরে; ব্রিটেনের এই শ্রমিক দলের টনি ব্লেয়ার বর্বরতার চূড়ান্ত দেখিয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া আগ্রাসনের সময়। ফ্রান্সে মে, ২০১২ তে নতুনভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে হোলান্দেও; মজার ব্যাপার তার নামের আগেও সমাজতন্ত্রি তকমা রয়েছে।  আর এই হচ্ছে বর্তমান ইউরোপের অবস্থা! ইউরোপের সমাজতন্ত্রব্যবসায়ি বামপন্থিদের কাছ থেকে পৃথিবীর মেহনতি মানুষের আশা করার কিছু নেই। ইউরোপে বামপন্থী বলে যারা পরিচিত তারা এই বিশ্বের জনগণের শত্রু, গণতন্ত্র ও মানবতার শত্রু।  

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দুটি গ্রুপ সিপিআই এবং সিপিআই এম ভারতের বুর্জোয়া দল কংগেসের লেজুড়বৃত্তি করছে প্রায় ৬০ বছর ধরে। এরা জাতিসমূহের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, জনগণের বিরুদ্ধে অনেকগুলো গণহত্যায় সাহায্য করেছে। তাদের এই বোধটুকুও লোপ পেয়েছে যে কংগ্রেসের লেজ হয়ে টিকে থেকে তারা দিল্লির পুঁজিবাদ, সম্প্রসারণবাদ, আধিপত্যবাদ, আমলাতন্ত্রকেই শুধু শক্তিশালী করেছে। কংগ্রেস দলের আধিপত্যবাদি ও শোষণবাদি নীতির সমর্থক থেকে ভারতের কমিউনিস্ট নামধারী সংশোধনবাদি লেজুড় পার্টি দুটি সেখানকার শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে বহু আগে।

বাংলাদেশের ইতিহাসও ভিন্ন নয়। বাংলাদেশেও বুর্জোয়া ধারার দল আওয়ামি লিগের পেটের ভেতরে বাম রাজনীতির পরিবেশ পেয়েছে বেশ কিছু বামপন্থি এবং আরো অনেকে সেই পরিবেশে গিয়ে সাম্যবাদ কায়েমের স্বপ্ন দেখছে। যারা বুর্জোয়াদের সংসদে এমপি মন্ত্রি হয়ে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদকে বিক্রি করেছে তারা  সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদকে পণ্যই করেছে। আর কে না জানে ব্যাবসায়িদের কাজই তো এটা, ব্যাবসায়ীরা তাদের কাজ করেই; একজন ব্যাবসায়ি সম্ভব হলে নাকি মঙ্গল গ্রহকেও বিক্রি করে। ব্যাবসায়িরা যদি দেখতে পায় সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের প্রতীক ভাল দামে বিক্রি করা যায় তাহলে তারা তা করবেই।

এক সময় শেখ মুজিবও সমাজতন্ত্রের কাণ্ডারী সেজেছিলো, নেহেরু ইন্দিরারাও সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা উড়াইছিলো; এখন আওয়ামি লিগের নৌকার উপরে উঠে লাল দিন আনার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের বেশ কিছু সংশোধনবাদি পার্টি। সমাজতন্ত্রিদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই ব্যাবসায়ীদের মুখোস উন্মোচন করা। বাংলাদেশে এখন লুটপাটের রাজত্ব চলছে। আর এই লুটপাটের ভাগিদার হয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি ও জাসদ আওয়ামি লিগের শরিক হয়ে। ১৯৭১ পরবর্তিকালে যখন আওয়ামি লিগ গণধিক্কৃত হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত সেইসময় সিপিবি ও ন্যাপ আওয়ামি লিগের সাথে যুক্ত হয়ে আওয়ামি লিগের অপকর্মের ভাগিদার হয়েছে।

অনেক বামপন্থি মনে করেন বামপন্থিদেরকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহানুভুতি দিয়ে কথা বলে তাদেরকে পরিবর্তন করতে হবে। যারা এরকম মত পোষণ করেন তারা বুঝতে চান না, যেসব বাম দল এখনও আত্মনির্ভর নয়,  তারা আসলে কোনোভাবেই বামপন্থি নেই। তাই তাদেরকে শ্রদ্ধা করারও দরকার নেই। মার্কসবাদে অভ্যন্তরীণ শক্তি বলে দ্বন্দ্বের একটি ব্যাপার আছে। যেসব বামপন্থি সমস্যা দেখলেই আওয়ামি লিগের মাথার উপরে ছাতা ধরে সেইসব পরনির্ভর বাম দলকে দিয়ে বাংলাদেশে সাম্যবাদ সম্ভব নয়। লেজুড়বাদ সর্বদাই শ্রমিক কৃষকের শত্রু। লেজুড়বাদী সুবিধাবাদী সেইসব দলকে শ্রদ্ধা করারও কিছু নাই।

তথ্যসূত্রঃ

১. ভি আই লেনিন, মার্কিন শ্রমিকদের নিকট চিঠি, ২০ আগস্ট, ১৯১৮, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৩৪৩।

২. ভি আই লেনিন, মার্কসবাদের রঙ্গরস ও ‘সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতিবাদ’, আগস্ট-অক্টোবর, ১৯১৬, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৯০

৩. জে ভি স্তালিন, শ্রেণিসংগ্রাম, ১৪ নভেম্বর, ১৯০৬, উৎসঃ Works, Vol. 1, November 1901 – April 1907

রচনাকালঃ ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *