আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > ভূরাজনীতি > স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই প্রসঙ্গে

স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই প্রসঙ্গে

স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা যুদ্ধ বা ঠান্ডা লড়াই বা শীতল যুদ্ধ (ইংরেজি: Cold war) হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর প্রায় দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে চালিত এক অঘোষিত ব্যঙ্গ যুদ্ধ (ইংরেজি: Mock-war)। এই স্নায়ুযুদ্ধ নামটিও সাম্রাজ্যবাদী বুদ্ধিজীবীদের প্রদত্ত এবং তারাই জনপ্রিয় করে। সত্যবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাপদ্ধতিতে এটি একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই যুদ্ধটিকে আমরা বলছি ব্যঙ্গ যুদ্ধ বা ভেংচির যুদ্ধ কারণ এই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সেই সময় সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাত ঘটেনি। সোভিয়েত মহানেতা স্তালিনের মৃত্যুর পরে রাশিয়া সংশোধনবাদীপুঁজিবাদী পথ গ্রহণ করলে মূলত সারবস্তুতে দুদেশ একই আদর্শের অনুসারী হয়ে যাওয়ায় দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের কোনো বাস্তব সম্ভাবনাও ছিলো না।

গোড়ার দিকে এই লড়াই মূলত দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কালক্রমে এটি পর্যবসিত হয় পুঁজিবাদ বনাম সমাজতান্ত্রিক শক্তিজোটের এক দীর্ঘ, অঘোষিত যুদ্ধে। গোড়া থেকেই এই ধারণাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলো সকল রকমের স্বাধীনতার শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সাম্যবাদ বা কমিউনিজম অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং সাম্রাজ্যবাদ কথিত এই লাল আতঙ্ক বা ‘লাল জুজু’কে রুখে দেওয়ার জন্য তৎপর ও উদ্যোগী হয় গোটা দুনিয়ার জনগণের শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যানের নির্দেশে চালিত কমিউনিজমের গতি রোধ করার এই নীতি ইতিহাসে ‘ট্রুম্যান নীতি’ নামে পরিচিত এবং এভাবেই সূত্রপাত হয় ঠাণ্ডা যুদ্ধের।[১]

দুই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ও ইতালী, এই ৪টি ইউরোপীয় দেশ দ্বারাই মুলতঃ বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। তার পরে অস্ট্রিয়া ও জারশাসিত রাশিয়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলো। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে সোভিয়েত রাশিয়া পুঁজিবাদী জগতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে, এবং নিজের নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের কাজেই বিশেষ ভাবে ব্যস্ত থাকে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতিতে এক অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগলিতে সমাজতন্ত্র প্রসারিত হওয়ার ফলে এবং পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলির অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েতের গুরুত্ব অনেকখানি বৃদ্ধি পায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমকক্ষ কোনো দেশ ইউরোপে আর ছিলো না। সেই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েতের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দেয়। এই দুই শক্তির মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়, এবং সেই প্রতিযোগিতাই ঠাণ্ডা লড়াই বা cold war নামে পরিচিত। এই ঠাণ্ডা লড়াই-ই হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল শক্তি।[২]

১৯৪৭ সালে মার্কিন কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে মার্কিন ধনকুবের ও রাষ্ট্রপতির এক পরামর্শদাতা, বারনার্ড বারুচ প্রথম ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ কথাটি ব্যবহার করেন। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে সফল হয় এবং এর ফলে একদিকে যেমন দুই বৃহৎ শক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় সামরিক ভারসাম্য, অপরদিকে শুরু হয় কমিউনিজমের প্রসার ও কমিউনিজমকে রোখার এক দীর্ঘস্থায়ী অঘোষিত যুদ্ধ, যা ১৯৪৯ সালে চিন বিপ্লবের পর আরো এক নতুন মাত্রা অর্জন করে। এই যুদ্ধ তীব্রতম আকার ধারণ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এবং নব্বই দশকের প্রারম্ভে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান হয়।[৩]

১৯৬০ সালে মুক্তিকামী সোভিয়েত প্রভাবিত এলাকা

কার্যকরভাবে ঠাণ্ডা যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৪৮ সালে, যখন পশ্চিম ইউরোপে কমিউনিজমকে রোখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল প্লানের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিমি দেশগুলিকে মার্কিন অর্থ সাহায্য প্রদান করে যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় অর্থনীতিতে তার নিয়ন্ত্রণকে কায়েম করে। এই বিপুল আর্থিক সাহায্যের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো পশ্চিম ইউরোপের ভেঙে যাওয়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির দ্রুত পুনর্গঠন, যাতে বিধ্বস্ত আর্থিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে এই সব দেশে কমিউনিজম মাথা চাড়া না দিতে পারে। এক বছর পরে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয় কমিউনিজমের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের প্রধান কয়েকটি দেশকে নিয়ে ন্যাটো বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা নামের সামরিক জোট। শুধুমাত্র ইউরোপে নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে সচেষ্ট হয় লাতিন আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলিতেও কমিউনিজমের অগ্রগতিকে রোখার জন্য যে কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী সরকারকে উচ্ছেদ করতে। এইভাবে ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায়, ১৯৬৫ সালে কিউবার বিপ্লবের পরে ডমিনিকান রিপাবলিকে ও ১৯৭৩ সালে চিলিতে প্রগতিশীল সরকারকে কখনো সরাসরি সাময়িক হস্তক্ষেপ ঘটিয়ে কিংবা পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনকে মদত যুগিয়ে উচ্ছেদ করা হয়।

১৯৫৫ সালে ‘ন্যাটো’র জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে নিয়ে গড়ে তোলা হয় ওয়ারশ চুক্তির নামে পালটা সাময়িক জোট। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে এবং ১৯৬৮ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপে নতুন শক্তিজোটকে ভেঙে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে সমাজতন্ত্রের গণতন্ত্রীকরণের নামে নতুন যে কোনো শক্তির উত্থান আসলে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে মার্কিন মদতপুষ্ট সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই যুক্তিকে সামনে রেখেই ১৯৬৮ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ায় ওয়ারশ জোটের সাময়িক হস্তক্ষেপের পরে ঘোষিত হয় ব্রেজনেভ নীতি, যার মর্মার্থ হলো যে পূর্ব ইউরোপের যে কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্র বিপন্ন হলে সেই দেশকে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত করার অধিকার ওয়ারশ জোটভুক্ত দেশগুলির থাকবে। এইভাবে ইউরোপের দেশগুলিকে কেন্দ্র করে ঠাণ্ডা যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হয় সংস্কৃতি ও মতাদর্শগত স্তরে দুই বৃহৎ শক্তির পারস্পরিক আক্রমণ ও বিদ্বেষ। ঠাণ্ডা যুদ্ধ কোনো সময়েই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘর্ষের রূপ নেয়নি, তবে ১৯৬২ সালে কিউবাতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় সরাসরি সংঘাতের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচভের নেতৃত্বে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তার পরিণতিতেই শেষ পর্যন্ত ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে। ১৯৮৯ সালে ওয়ারশ জোটভুক্ত দেশগুলির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের এক সম্মেলন থেকে প্রথম ঘোষণা করা হয় যে এই দেশগুলি তাদের নিজেদের ভবিষ্যত স্থির করে নেওয়ার পক্ষে কোনো বাধার সম্মুখীন হবে না। ১৯৯০ সালে ঘটে দুই জার্মানির পুনর্মিলন। ২১শে নভেম্বর ১৯৯০ সালের পরেই ইউরোপের ৩৪টি দেশ প্যারিস সম্মেলনে ঘোষণা করে যে ইউরোপের দীর্ঘদিনের সংঘর্ষের পরিসমাপ্তি ঘটল। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে ওয়ারশ জোটের ও ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান হয়।

তথ্যসূত্র:

১. শোভনলাল দত্তগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা  ১৯৩-১৯৪।

২. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ২৩৫।

৩. শোভনলাল দত্তগুপ্ত, পূর্বোক্ত।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top