You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > মার্কসবাদী যুদ্ধতত্ত্ব যুদ্ধের কারণকে আপাত-আধা-অর্থনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করে

মার্কসবাদী যুদ্ধতত্ত্ব যুদ্ধের কারণকে আপাত-আধা-অর্থনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করে

যুদ্ধ

মার্কসবাদী যুদ্ধতত্ত্ব বা যুদ্ধের মার্কসবাদী তত্ত্বটি (ইংরেজি: The Marxist theory of war) যুদ্ধের কারণকে আপাত-আধা-অর্থনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করে। এই তত্ত্ব বলে যে সমস্ত আধুনিক যুদ্ধ বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে সম্পদ এবং বাজারের জন্য প্রতিযোগিতার কারণে ঘটেছিল; এবং এই মার্কসবাদী তত্ত্ব আরো দাবি করে যে এই যুদ্ধগুলি মুক্তবাজার এবং শ্রেণিব্যবস্থার একটি প্রাকৃতিক ফলাফল। মার্কসবাদী তত্ত্বের একটি অংশ হলো একবার বিশ্ব বিপ্লব ঘটার ফলে মুক্ত বাজার এবং শ্রেণি ব্যবস্থা উৎপাটিত করা গেলে যুদ্ধ অদৃশ্য হয়ে যাবে।

ভি আই লেনিন এবং মাও সেতুং যুদ্ধকে বলেছেন রাজনীতির বর্ধিত রূপ।[১]; যখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠে। বিশ্বযুদ্ধসহ যে কোনো যুদ্ধকে সাম্যবাদীরা গত শতকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছেন এবং সেসব ক্ষেত্রে কিছুটা সফল হয়েছিলেন। যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে এবং গণযুদ্ধে রূপান্তরের লেনিনবাদি ও মাওবাদী লাইন এখন কিছুটা বিকশিত হয়েছে। যুদ্ধ সম্পর্কে মাওবাদী চিন্তা এবং যুদ্ধ ও রাজনীতির সম্পর্ক বোঝা এখন প্রগতির জন্যও দরকারি।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সবকিছু নির্ধারণ করে, অস্ত্র নয়

ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সমাজবিকাশের পথ দেখায়, অস্ত্র সবকিছু নির্ধারণ করে না। তবে আধুনিক সংশোধনবাদীরা প্রচার করে যে, পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রের উদ্ভবের ফলে সমাজবিকাশের নিয়মগুলি আর কার্যকর থাকছে না এবং যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব সেকেলে হয়ে গেছে। মূলত ইতালির পার্টির নেতা কমরেড তোগলিয়াত্তিরা ১৯৬০-এর দশকে এসব কথাবার্তা প্রচার করতেন।[২] অনেকেই সাম্রাজ্যবাদীদের আধুনিক মারণাস্ত্র দেখে মনে করেন যে, তারাই সর্বদা জিতবে। কিন্তু বাস্তবে কী তাই ঘটে? যুদ্ধকে কি অনবরত ভয় পেতে হয়, বা জনগণ কী আদৌ যুদ্ধকে ভয় পান? ইতিহাস জুড়েই দেখা যায়, অস্ত্রই যুদ্ধের নির্ণায়ক উপাদান নয়। মাও সেতুং দেখিয়েছেন,

“অস্ত্র হচ্ছে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু নির্ধারক উপাদান নয়; নির্ধারক উপাদান হচ্ছে মানুষ, বস্তু নয়। শক্তির তুলনা শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির তুলনাই নয়, বরং জনশক্তি ও নৈতিক শক্তিরও তুলনা। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অপরিহার্যরূপেই মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়।”[৩]

ইতিহাস জুড়েই দেখা গেছে যারা বিপ্লবী যুদ্ধে নৈতিক দিক থেকে এগিয়ে ছিলো তারাই জিতেছে। যারা যুদ্ধ লাগাবার জন্যে গোঁ ধরেছিল এবং যারা অন্যায় যুদ্ধগুলো চাপিয়ে দিয়েছিল তারাই পরাজিত হয়েছে। মাও সেতুং লিখেছেন,

“ইতিহাসের সূচনা থেকে বিপ্লবি যুদ্ধে সর্বদাই তারাই জয়ী হয়েছে যাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র ছিল কম এবং যারা অস্ত্রপাতির ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে তারা পরাজিত হয়েছে। আমাদের গৃহযুদ্ধের সময়, জাপবিরোধি প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়, আমাদের দেশব্যাপী রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধুনিক অস্ত্রাগারের অভাব ছিল। যদি সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রপাতি না থাকার কারণে যুদ্ধ করতে কেউ না পারে তাহলে তা নিজেকে নিরস্ত্র করারই সামিল।”[৪]

গণ যুদ্ধ

গণযুদ্ধ, যাকে দীর্ঘমেয়াদী জনগণের যুদ্ধও বলা হয়, হচ্ছে একটি মাওবাদী সামরিক কৌশল। চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং (১৮৯৩-১৯৭৬) দ্বারা প্রথম বিকশিত করেন। গণযুদ্ধের পেছনের মূল ধারণাটি হচ্ছে এই যে জনসংখ্যার সমর্থন রক্ষা করা এবং শত্রুদের গ্রামাঞ্চলের দিকে গভীরভাবে প্রলুব্ধ করা; শত্রুরা গ্রামাঞ্চলে আসলে জনগণ তাদেরকে চলমান যুদ্ধ এবং গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে আক্রমণ করবে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী জাপানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং চীনের গৃহযুদ্ধে চীনা সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মাধ্যমে চীনা কমিউনিস্টরা ব্যবহার করেছিল।

আরো পড়ুন:  যুদ্ধ ও শান্তি --- মাও সেতুং

যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনা করতে হলে শোষণ সম্পর্কেও দুয়েকটি কথা বলা দরকার। শোষণের সাথেই সম্পর্ক আছে দাস, সামন্ত ও পুঁজিবাদী যুগ সৃষ্টির। অর্থাৎ সভ্যতা বলতে, বা সমাজের অগ্রগতি বলতে যা বোঝানো হয়, তা মূলত এই শোষণেরই রকমফের। আর শোষণ চালু করার সবচেয়ে বড় পদ্ধতি হচ্ছে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা এবং অন্য অঞ্চল ও সেসব অঞ্চলের লোককে পরাধীন করা; অন্যকে পরাধীন করার উপায়ই হচ্ছে যুদ্ধ।

তথ্যসূত্র:

১. ‘যুদ্ধ ও বিপ্লব’ প্রবন্ধটি ভি আই লেনিন শুরু করেছেন এই বলে যে, ‘যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে কর্মনীতির অনুবৃত্তি। প্রত্যেক যুদ্ধই সেই যুদ্ধের সৃষ্টিকারী রাজনীতিক ব্যবস্থা থেকে অবিচ্ছেদ্য’। প্রবন্ধটি ২৩ এপ্রিল, ১৯২৯ তারিখে প্রাভদায় প্রকাশিত। প্রবন্ধটি পাবেন প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন থেকে প্রকাশিত সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদীদের প্রসঙ্গে গ্রন্থের ১৪০-১৫২ পৃষ্ঠায়। মাও সেতুং বলেছেন ‘রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ আর যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি’।
২. চীনের রেড ফ্লাগ পত্রিকার তাত্ত্বিক নিবন্ধ, সমকালীন বিশ্বে লেনিনবাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা প্রসঙ্গে, কমরেড তোগলিয়াত্তি ও আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রসঙ্গে আরো মন্তব্য, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৫৮
৩. মাও সেতুং, “দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সম্পর্কে” মে, ১৯৩৮
৪. মাও সেতুং, ১৯৬১-৬২; ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি’র উপর নোট।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top