You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > রাজনৈতিক যুদ্ধ তৎপরতা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক উপায়ের ব্যবহার

রাজনৈতিক যুদ্ধ তৎপরতা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক উপায়ের ব্যবহার

রাজনৈতিক যুদ্ধ তৎপরতা বা রাজনৈতিক বৈরিতা বা বৈরীমূলক রাজনৈতিক তৎপরতা (ইংরেজি: Political Warfare) হচ্ছে শত্রুতাপরায়ণ ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে প্রতিপক্ষকে কারো নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু করতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক উপায়ের ব্যবহার। প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক বৈরিতা বলতে বোঝায় সাধারণভাবে যুদ্ধ বা যুদ্ধসমূহের ধরনসমূহের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ এবং বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত শব্দটি অন্য একটি রাষ্ট্রের সরকার, সামরিক এবং / বা সাধারণ জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে একটি সরকার এবং একটি অভীষ্ট দর্শকদের মধ্যে হিসাবকৃত মিথস্ক্রিয়া বর্ণনা করে। সরকারগুলি প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপে বাধ্য করতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে, যার ফলে প্রতিপক্ষের তুলনায় আপেক্ষিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হয়।

রাজনৈতিক বিগ্রহের অর্থ ও বৈশিষ্ট্য জাতীয় স্বার্থের উপর প্রতিষ্ঠিত বৈদেশিক নীতিকে সার্থক ও কার্যকরী করে তোলার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক দেশ কূটনীতি ও প্রচারণার (ইংরেজি: Propaganda) মাধ্যমে অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। কূটনীতির সাহায্যে একটি সরকার বিদেশী সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এবং বৈদেশিক প্রচারণারর উদ্দেশ্য হলো নিজের আদর্শ ও নীতির সপক্ষে অন্য রাষ্ট্রের জনমতকে গড়ে তােলা। কূটনীতি বা প্রচারণা বলতে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ বোঝায় না। প্রচারণার কাজ প্রকাশ্যেই সংঘটিত হয় এবং কুটনৈতিক আলােচনা জনসাধারণ ও অন্যান্য সরকারের কাছে গোপন রাখা হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে গােপন রাখার কোনো প্রশ্নই উঠে না।

কিন্তু বৈরীমুলক রাজনৈতিক তৎপরতা বা রাজনৈতিক বৈরিতার কাজ সম্পূর্ণ গােপনে পরিচালিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করাই সেই কার্যের উদ্দেশ্য। যুদ্ধ ঘোষণা না করে অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে তার ক্ষতি সাধন করার চেষ্টাকেই রাজনৈতিক বৈরিতা বলে। একটি দেশ যদি পঞ্চম বাহিনীর সাহায্যে বা বিদেশী রাষ্ট্রের কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসন্তোষের সুযােগ নিয়ে সেই দেশে বিদ্রোহ বা অরাজকতার অবস্থা সৃষ্টি করতে চায় তবে সেই কাজ রাজনৈতিক বৈরিতা বলে বিবেচিত হবে। এই উদ্দেশ্যে একটি দেশ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে পারে—শত্রু রাষ্ট্রের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা অচল করে তোলা, সরকারবিরােধী দলকে বিদ্রোহের জন্য প্ররােচিত এবং সাহায্য করা, নাশকতামূলক কাজের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পোৎপাদন ব্যাহত করা, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করা ইত্যাদি। এই উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কোনো রাষ্ট্রের অসুবিধা সৃষ্টি করার জন্য যদি একটি দেশ সেই রাষ্ট্রে রপ্তানী বন্ধ করে দেয় তবে সেই কাজকে রাজনৈতিক বৈরিতা বলেই গণ্য করা উচিত। 

আরো পড়ুন:  আশ্চর্য ভবিষ্যতবাণী

ইতিহাসে রাজনৈতিক বৈরিতার অনেক দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় জার্মানী তাদের গােপন অনুচরদের সাহায্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিত্রশক্তিকে যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য যে অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত হতো তা ধংস করে ফেলার চেষ্টা করে। এই উদ্দেশ্যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে বহু বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে সমর্থ হয়। রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের পর পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র বলশেভিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিপ্লববিরােধী বিভিন্ন দল ও উপদলকে সমস্ত রকম সাহায্য দিতে থাকে এবং নিজেরাও সৈন্য পাঠায়। ইতিহাসে এই ঘটনা রুশ বিপ্লবের বিরদ্ধে War of Intervention নামে পরিচিত। এই সব কার্য রাজনৈতিক বৈরিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা লাভ করে কমিন্টার্নের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাম্যবাদী বিপ্লব সংগঠন করার জন্য যে আয়ােজন করে তাও রাজনৈতিক বৈরিতা নামেই বিবেচিত হতে পারে। জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনে যখন গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয় তখন হিটলারের জার্মানী ও মুসােলিনীর ইতালী বিদ্রোহীদের সাহায্য করে স্পেনের সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বৈরিতায় লিপ্ত হয়। হিটলারের প্ররােচনায় ও সাহায্যে অস্ট্রিয়ার নাৎসী পাটি ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় কিন্তু ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে তারা সফলতা লাভ করে। এই ঘটনা রাজনৈতিক বৈরিতা-এর একটি উল্লেখযােগ্য দৃষ্টান্ত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৈরীমলক রাজনৈতিক কার্যের তৎপরতা পূর্ণোদ্যমে চলতে থাকে এবং অনেক সময় বা পায়। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানীর আক্রমণে ফ্রান্সের যে পরাজয় ঘটে তাতে পঞ্চম বাহিনীর এক বিশেষ সক্রিয় ভূমিকা ছিল। মিত্রশক্তিও যুদ্ধের শেষ দিকে ইউরােপের বিভিন্ন দেশে নাৎসীবিরােধী শক্তিকে সাহায্য দিয়ে জার্মানীকে দুবল করে তুলতে সমর্থ হয়। একদল নাগার অসন্তোষের সযােগ নিয়ে চীন ও পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বৈরিতা আরম্ভ করে। তারা নাগাদের অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক শিক্ষা দিয়ে ভারতের এক প্রান্তে অশান্তি ও বিশখলা বজায় রাখার চেষ্টা আরম্ভ করেছিল। দক্ষিণ আমেরিকায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সেখানকার কোনো কোন সরকারের বিরুদ্ধে মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈরিতায় লিপ্ত হওয়ার অনেক নজীর আছে । অধুনা ১৯৭৩ সালে জেনারেল আগষ্টো পিনােচেটের নেতৃত্বে চিলিতে আলেন্দে সরকারের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভ্যুত্থান হয় তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা অনেকেই সন্দেহ করেন। নিজের আধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এবং শত্র, মনােভাবাপন্ন রাষ্ট্রকে দুর্বল করে রাখার জন্য শক্তিশালী দেশগনি। প্রয়ােজন হলে এবং সুযােগ পেলে রাজনৈতিক বৈরিতা আরম্ভ করতে কেন দ্বিধা বােধ করে না।

আরো পড়ুন:  যুদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ, জাতি, শ্রেণি ও আধাসামরিক গ্রুপগুলোর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত

বৈরীমূলক রাজনৈতিক তৎপরতাকে কূটনীতি বা প্রােপাগাণ্ডার মত স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক সম্পক বলে মনে করার কোন কারণ নেই। এই ধরনের তৎপরতা একমাত্র শমনােভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা সরকারের বিরুদ্ধেই প্রযােজ্য এবং বৈরীমলক রাজনৈতিক কাজের ফলে যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। শতমনােভাবাপন্ন রাষ্ট্রের কোন এক বিক্ষব্ধ দল বা গােষ্ঠীর সাহায্য ব্যতীত এই ধরনের কার্য সংগঠন করা সম্ভব হয় না।

১. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৪।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top