আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রসঙ্গে

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রসঙ্গে

কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের যৌথভাবে রচিত কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার বা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো (ইংরেজি: The Communist Manifesto বা Manifesto of the Communist Party) প্রথম প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ২১, ১৮৪৮ সালে। জার্মান ভাষায় রচিত এই বইটির নাম ছিলো মানিফেস্ট ডেয়ার কোমুনিস্টেন (Manfest Der Kommunisten)।

সাম্যবাদী বিপ্লবের উদ্দীপনার পেছনে এই গ্রন্থের ভূমিকা আজও সমপরিমাণে অটুট আছে। এটি বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের মহত্তম কর্মসূচি-দলিল। ইশতেহারটি পরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলিলগুলির মধ্যে একটি হিসাবে স্বীকৃত হয়। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের এবং অন্যান্য লেনিনবাদী পার্টিগুলো মার্কস-এঙ্গেলসের কাজ জানতে ইচ্ছুক থাকায় এই বইটি খুব গুরুত্ব লাভ করে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নীতি উপলব্ধির ক্ষেত্রে এই বইটি পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের পড়ার প্রয়োজনবোধ করা হয় গত শত বছর ধরেই।

কমিউনিস্ট লীগের’ কর্মসূচি হিসাবে মার্কস ও এঙ্গেলসের লেখা এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় লন্ডনে, ২৩ পাতার একটি পৃথক পুস্তিকাকারে। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের মার্চ-জুলাই মাসে জার্মান রাজনৈতিক দেশান্তরীদের গণতান্ত্রিক মুখপত্র  of- Deutsche Londoner Zeitung-এ এটি কিস্তিতে কিস্তিতে প্রকাশিত হয়। সেই বছরেই জার্মান মূল পাঠটি লন্ডনে ৩০ পাতার একটি পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়, তাতে প্রথম সংস্করণের ছাপার ভুলভ্রান্তি সংশোধন ও যতিচিহ্নাদির প্রয়োগ উন্নত করা হয়। পরবর্তী প্রামাণ্য সংস্করণাদির ভিত্তি হিসাবে এই সংস্করণের পাঠটিই মার্কস ও এঙ্গেলস ব্যবহার করেন। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দে একাধিক ইউরোপীয় ভাষাতে, ফরাসী, পোলীয়, ইতালীয়, ডেনিশ, ফ্লেমিশ ও সুইডীয়, ‘ইশতেহারের’ অনুবাদ হয়। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের, সংস্করণগুলিতে রচিয়তাদের নাম ছিল না। এ নাম প্রথম ছাপা হয় ১৮৫০ খ্রীস্টাব্দে, ইশতেহারের প্রথম ইংরেজী অনুবাদ তখন প্রকাশিত হয় চাৰ্টিস্ট পত্রিকা Red Republican-এ, তার ভূমিকায় পত্রিকার সম্পাদক জর্জ জুলিয়ান হানি তাঁদের নামোল্লেখ করেন।[১]

১৮৭২ খ্ৰীস্টাব্দে কিছু সংশোধন এবং মার্ক্স ও এঙ্গেলস লিখিত একটা ভূমিকাসহ নূতন একটি জামান সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই সংস্করণটি এবং ১৮৮৩ ও ১৮৯০ খ্রীস্টাব্দের জামান সংস্করণের নাম ছিল ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’। এই মহান দলিলের প্রথম রুশ সংস্করণ প্ৰকাশিত হয় ১৮৬৯ খ্রীস্টাব্দে, জেনেভায়; অনুবাদ করেছিলেন বাকুনিন, কয়েকটি অনুচ্ছেদে মূল পাঠের বিকৃতি ঘটে। এই প্রথম রুশ সংস্করণের গলদ দূর হয় ১৮৮২ খ্ৰীস্টাব্দে জেনেভা থেকে প্রকাশিত প্লেখানাভের অনুবাদে। রাশিয়ায় ‘ইশতেহারের’ বক্তব্য ছাড়ানোয় প্লেখানাভের অনুবাদ বহু কাজ দেয়। রাশিয়ায় মার্কসবাদের প্রচারে বিপুল গুরুত্ব দেন মার্কস ও এঙ্গেলস এবং ১৮৮২ খ্ৰীস্টাব্দের সংস্করণের জন্য একটি বিশেষ ভূমিকা লেখেন।[২]

মার্কসের মৃত্যুর পর ‘ইশতেহারের’ অনেকগুলি সংস্করণ এঙ্গেলস দেখে দিয়েছিলেন; তাঁর ভূমিকাসহ ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দের জার্মান সংস্করণ, স্যামুয়েল মুর অনুদিত ১৮৮৮ খ্ৰীস্টাব্দের একটি ইংরেজী সংস্করণ, এঙ্গেলস তার সম্পাদনা করেন এবং একটি ভূমিকা ও কতকগুলি টীকা যোগ করেন; এবং ১৮৯০ খ্রীস্টাব্দের জার্মান সংস্করণ, তাতে এঙ্গেলস নূতন একটি ভূমিকা লেখেন ও এই সর্বশেষ সংস্করণটির জন্য কিছু টীকাও যোগ করেন। মার্কসের দুহিতা লোরা লাফার্গ কৃত ‘ইশতেহারের’ একটি ফরাসী অনুবাদ প্রকাশিত হয়। Socialiste পত্রিকায়, ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দে, এঙ্গেলস এটি দেখে দিয়েছিলেন। ১৮৯২ খ্রীস্টাব্দের পোলীয় সংস্করণে ও ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দের ইতালীয় সংস্করণেও ভূমিকা লেখেন এঙ্গেলস।[৩]

লেনিন কমিউনিস্ট ইশতেহার সম্পর্কে বলেছেন,

“প্রতিভাদীপ্ত স্পষ্টতা ও উজ্জ্বলতায় এই রচনাটিতে রূপায়িত হয়েছে এক নতুন বিশ্ববীক্ষা— সমাজজীবনের ক্ষেত্রের উপরও প্রযোজ্য সুসংগত বস্তুবাদ; বিকাশের সবথেকে সর্বাঙ্গীণ ও সুগভীর মতবাদ— ‘দ্বন্দ্ববাদ’, শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্ব এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের বিশ্ব ঐতিহাসিক বিপ্লবী ভূমিকার তত্ব।”[]

তিনি আরো লেখেন,

“ছোট এই পুস্তিকাখানি বহু বৃহৎ গ্রন্থের মূল্য ধরে; সভ্য জগতের সমস্ত সংগঠিত ও সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত আজও তার প্রেরণায় সজীব ও সচল।”[]

কমিউনিস্ট ইস্তেহারের প্রথম ভাগের নাম “বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত”। এই ভাগে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে পুঁজিবাদের জন্মের কাহিনী বলা হয়। মার্কস পুঁজিবাদের আকাশচুম্বী উৎপাদন ক্ষমতাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেন। তবে পুঁজিবাদের ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ তিনি তাঁর রচনায় উদ্‌ঘাটিত করেছেন। তাঁর মতে অকল্পনীয় হারে পণ্যোৎপাদন বাড়লেও সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হয়নি। তিনি পুঁজিবাদের অন্তর্বিরোধ এবং আর্থিক সংকটের বিশ্লেষণ করেছেন।  ইশতেহারে পুঁজিবাদের  অন্ধকার দিক দেখিয়ে পরিবর্তে অন্য কোনো সমাজব্যবস্থার কথা বলা হয়নি। তবে বলা হয়েছে, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার গতিশীলতা থেকেই ঘটনাক্রমে ধ্বংসাত্মক শক্তির জন্ম হবে।

কমিউনিস্ট ইস্তেহারের দ্বিতীয় ভাগের নাম “প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্টগণ”। এই ভাগে মার্কস ও এঙ্গেলস সমগ্রভাবে প্রলেতারীয়দের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধ বিশ্লেষণ করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, ‘সমগ্রভাবে প্রলেতারিয়েতের স্বাৰ্থ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র কোনো স্বাৰ্থ তাদের নেই।’ তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, ‘কমিউনিস্টরা হলো একদিকে কার্যক্ষেত্রে প্রতি দেশের শ্রমিক শ্রেণির পার্টিগুলির সর্বাপেক্ষা অগ্রসর ও দৃঢ়চিত্ত অংশ—যে অংশ অন্যান্য সবাইকে সামনে ঠেলে নিয়ে যায়। অপরদিকে, তত্ত্বের দিক দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকাংশের তুলনায় তাদের এই সুবিধা যে শ্রমিক আন্দোলনের এগিয়ে যাওয়ার পথ, শর্ত এবং শেষ সাধারণ ফলাফল সম্বন্ধে তাদের স্বচ্ছ বোধ রয়েছে।’

ইশতেহারের তৃতীয় অংশে আলোচনা করা হয়েছে ‘সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য’। মার্কস ও এঙ্গেলস এই অংশকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন যথা প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র, রক্ষণশীল অথবা বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র এবং সমালোচনী — কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম। তাঁরা প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্রকে আবার তিন ভাগে ভাগ করেছেন যথা সামন্ত সমাজতন্ত্র, পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র এবং জার্মান অথবা “খাটি’ সমাজতন্ত্র। সবশেষে চতুর্থ অংশে আলোচনা করেছেন বর্তমান নানা সরকার-বিরোধী পাটির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধ

কমিউনিস্ট ইশতেহারের ভেতর যে মূলচিন্তা প্রবাহমান তা এই যে ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং যে সমাজ-সংগঠন তা থেকে আবশ্যিকভাবে গড়ে উঠে, তাই থাকে সেই যুগের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত ইতিহাসের মুলে। সুতরাং জমির আদিম যৌথ মালিকানার অবসানের পর থেকে সমগ্র ইতিহাস হয়ে এসেছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। আধুনিক বুর্জোয়া সম্পত্তির অনিবার্যভাবে আসন্ন অবসানের কথা ঘোষণা করাই ছিল এই বইয়ের লক্ষ্য।[৬]

তথ্যসূত্রঃ

১. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, সংঘ প্রকাশন, ঢাকা জানুয়ারি ২০১৪ পৃষ্ঠা ৫৯।

২. পূর্বোক্ত,

৩. পূর্বোক্ত,

৪. ভি আই লেনিন, জুলাই-নভেম্বর, ১৯১৪, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৭।  

৫. ভি আই লেনিন, শরতকাল ১৮৯৫, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৪৬।  

৬. কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (ফেব্রুয়ারি ২০১১)। কমিউনিস্ট ইস্তেহার। ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন। পৃ: ৮-৯।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top