Main Menu

যুদ্ধ প্রসঙ্গে

বঙ্গ অঞ্চলের মানুষ মূলত দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ বা দীর্ঘ দশ বছর যুদ্ধ করেছিলেন ১৫৭৫ থেকে ১৫৮৫ অবধি। সেই যুদ্ধটিই মনে হয় এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং মোঘলদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধটিই এই অঞ্চলের জনগণের শ্রেষ্ঠতম যুদ্ধ। বাংলার জমিদারদের বশ্যতা স্বীকার করাতে মোগলদের ১৬০৮ থেকে ১৬১২ সাল পর্যন্ত মোট চার বছর সময় লেগেছিলো।[১] ব্রিটিশ আমলের বিদ্রোহগুলো ছিলো খাপছাড়া ও স্থানিক এবং সেগুলো হটাত হটাত বিভিন্ন স্থানে জ্বলে উঠেছে, সেই বিদ্রোহগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেগুলো ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত হয়নি। এতদঞ্চলের লোকজন সর্বশেষ যে যুদ্ধটি করেছিলেন তা ছিলো চাপিয়ে দেয়া এবং সে যুদ্ধটিতে বঙ্গের অর্ধাংশ বা পশ্চিমবঙ্গ সরাসরি যুক্ত ছিলো না। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়লেও এবং সে সময় দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী মহাযুদ্ধ গোটা দুনিয়ায় চললেও বঙ্গাল মুলুকে গৃহযুদ্ধ না লাগা একটা রহস্য বটে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ২ কোটি বাঙাল স্রেফ না খেয়ে মারা গেল, অথচ তারা একটা গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত লাগাতে পারেনি। অথচ তখন গৃহযুদ্ধের সব পরিস্থিতিই বিরাজমান। তার তিন বছর পরে দাঙ্গাতে লাখ খানেক বাঙালি পরস্পরকে মারলো। অথচ গৃহযুদ্ধে মারলে ইতিহাসটা অন্য হতো।

বঙ্গ অঞ্চলের মানুষের, বিশেষভাবে বাঙালির জ্ঞানগত সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে তারা রাজনীতি এবং যুদ্ধ সম্পর্কে যথাযথ ওয়াকিবহাল নয়। যুদ্ধ কেন[২] লাগে এ সম্পর্কেও তারা জ্ঞাত খুব সামান্যই। বঙ্গাল মুলুকে যুদ্ধ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা এতো কম যে অবাক হতে হয়। যুদ্ধ সম্পর্কে বাঙালি চিন্তাবিদগণ সর্বমোট দশটি প্রবন্ধও লেখেনি। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষ বাঙালি তো কস্মিনকালেও যুদ্ধবাজ জাতি ছিল না। ইংরেজ আমলে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ১৮৯৫ সালে অবলুপ্ত করা হয়, সেসময় সৈন্যের যোগানটা দিত মূলত বিহার। মূঘল, সুলতানি বা হিন্দু যুগেও সেনাবাহিনীতে এই অঞ্চলের লোকদের অংশগ্রহণ ছিল অতি নগন্য।

১৯৯০ পরবর্তীকালে হত্যা, গুম, খুন, আত্মহত্যা, ধর্ষণ সহ দুর্ঘটনায় যত লোক মারা গেছে তা অবশ্যই দু লাখ ছাড়িয়ে যাবে। এতো বিশাল জীবনের অপচয় যে কয়েকটি দেশে গৃহযুদ্ধ চলেছে সেসব দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে ঘটেনি। বাংলাদেশে সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদনির্ভর উচ্চবিত্ত শাসকগোষ্ঠী এবং তার সহযোগী আমলাতন্ত্র যে অন্যায়, নিপীড়ন, অবিচার, বিচার বহির্ভূত হত্যা, গণহত্যা ও বর্বরতাগুলো[৩] চালিয়ে যাচ্ছে তার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হলে আমাদেরকে রাজনীতি এবং যুদ্ধের দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। একটি দীর্ঘমেয়াদী সামগ্রিক গণযুদ্ধ বা গণযুদ্ধ ছাড়া এইরূপ বর্বরতা এখানে বন্ধ হবার আশা করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা ভাবার সময় হয়েছে বলে মনে হয়। 

রাজনীতি এবং যুদ্ধের সম্পর্ক অনুধাবন করার জন্য আমাদের এই দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক জানা দরকার। যুদ্ধ কখন প্রয়োজন হয়ে পড়ে সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে বের করা দরকার। ভি আই লেনিন এবং মাও সেতুং যুদ্ধকে বলেছেন রাজনীতির বর্ধিত রূপ।[৪]  যখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠে। বিশ্বযুদ্ধসহ যে কোনো যুদ্ধকে সাম্যবাদীরা গত শতকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছেন এবং সেসব ক্ষেত্রে কিছুটা সফল হয়েছিলেন। যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে এবং গণযুদ্ধে রূপান্তরের লেনিনবাদি ও মাওবাদী লাইন এখন কিছুটা বিকশিত হয়েছে। যুদ্ধ সম্পর্কে মাওবাদী চিন্তা এবং যুদ্ধ ও রাজনীতির সম্পর্ক বোঝা এখন প্রগতির জন্যও দরকারি।

সাম্রাজ্যবাদীদের আধুনিক মারণাস্ত্র দেখলে মনে হবে, তারাই সর্বদা জিতবে। কিন্তু বাস্তবে কী তাই ঘটে। যুদ্ধকে কি অনবরত ভয় পেতে হয়, বা জনগণ কী আদৌ যুদ্ধকে ভয় পান? ইতিহাস জুড়েই দেখা যায়, অস্ত্রই যুদ্ধের নির্ণায়ক উপাদান নায়। মাও সেতুং দেখিয়েছেন,

“অস্ত্র হচ্ছে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু নির্ধারক উপাদান নয়; নির্ধারক উপাদান হচ্ছে মানুষ, বস্তু নয়। শক্তির তুলনা শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির তুলনাই নয়, বরং জনশক্তি ও নৈতিক শক্তিরও তুলনা। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অপরিহার্যরূপেই মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়।”[৫]  

ইতিহাস জুড়েই দেখা গেছে যারা বিপ্লবী যুদ্ধে নৈতিক দিক থেকে এগিয়ে ছিলো তারাই জিতেছে। যারা যুদ্ধ লাগাবার জন্যে গোঁ ধরেছিল এবং যারা অন্যায় যুদ্ধগুলো চাপিয়ে দিয়েছিল তারাই পরাজিত হয়েছে। মাও সেতুং লিখেছেন, 

“ইতিহাসের সূচনা থেকে বিপ্লবি যুদ্ধে সর্বদাই তারাই জয়ী হয়েছে যাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র ছিল কম এবং যারা অস্ত্রপাতির ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে তারা পরাজিত হয়েছে। আমাদের গৃহযুদ্ধের সময়, জাপবিরোধি প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়, আমাদের দেশব্যাপী রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধুনিক অস্ত্রাগারের অভাব ছিল। যদি সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রপাতি না থাকার কারণে যুদ্ধ করতে কেউ না পারে তাহলে তা নিজেকে নিরস্ত্র করারই সামিল।”[৬]

বাঙালী জাতি বিদেশি বিজাতি শাসিত এই কথা বাঙালির প্রায় সব লেখক স্বীকার করেছেন। বাঙালি বিজাতি শাসিত হলেও তারা যে লড়াই করেনি তা নয়, তবে বাঙালি লড়াইপ্রিয় একথা বলা যায়, তবে তারা সবসময়ে লড়াইপ্রিয় ছিলো না। বাঙালির সাথে বসবাস করেছে এবং লড়াইপ্রিয় হিসেবে অগ্রণী হচ্ছেন সাঁওতালসহ অনেক জাতিসত্ত্বা রয়েছে। ইতিহাসের কোনো কোনো কালে এসব জাতির মানুষেরা জ্বলে উঠেছে এবং প্রায় সময়েই নিভন্ত থেকেছে। বাঙালি প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ লিখেছিলেন যে

“বাঙালী চিরকাল বিদেশী ও বিজাতি শাসিত। সাত শতকের শশাঙ্ক নরেন্দ্র-গুপ্ত এবং পনেরো শতকের যদু-জালালুদ্দীন ছাড়া বাঙালার কোনো শাসকই বাঙালী ছিলেন না। এটি নিশ্চিতই লজ্জার এবং বাঙালী চরিত্রে নিহিত রয়েছে এর গূঢ় কারণ।”[৭]

যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনা করতে হলে শোষণ সম্পর্কেও দুয়েকটি কথা বলা দরকার। শোষণের সাথেই সম্পর্ক আছে দাস, সামন্ত ও পুঁজিবাদী যুগ সৃষ্টির। অর্থাৎ সভ্যতা বলতে, বা সমাজের অগ্রগতি বলতে যা বোঝানো হয়, তা মূলত এই শোষণেরই রকমফের। আর শোষণ চালু করার সবচেয়ে বড় পদ্ধতি হচ্ছে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা এবং অন্য অঞ্চল ও সেসব অঞ্চলের লোককে পরাধীন করা; অন্যকে পরাধীন করার উপায়ই হচ্ছে যুদ্ধ। এক্ষেত্রেই বাঙালি ব্যর্থ হয়েছে; তবে এই ব্যর্থতা দোষের নয় বরং এটি তাঁদের একটি বড় গুণ। কিন্তু গুণ হলেও এই ব্যর্থতা তাদেরকে নিপীড়ন ও ভোগান্তিতে ফেলেছে যথেচ্ছভাবে।

একটি প্রশ্ন আসতে পারে, পারমাণবিক যুদ্ধ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে কী না? আসলে পারমাণবিক যুদ্ধ বা আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদীরা আর সহজে লাগাবে না। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বুর্জোয়া এবং সাম্রাজ্যবাদীদের শিখিয়েছে যে, যুদ্ধ বাঁধলেই সমাজতন্ত্র অভিমুখী দল কোথাও না কোথাও ক্ষমতায় আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ এলাকা সমাজতন্ত্রের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। সর্বশেষ সিরিয়া গৃহযুদ্ধে রোজাভা তার উদাহরণ। তবে ছোটখাট যুদ্ধ এবং হাঙ্গামা বুর্জোয়া এবং সাম্রাজ্যবাদীরা সর্বদাই জিইয়ে রাখবে। পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি-ধামকিটা জাতীয়তাবাদী গর্দভদের কয়েকদিন জোসে রাখতে ওরা কাজে লাগায়।

ছোটখাট যুদ্ধকে এখন সাম্রাজ্যবাদীরা আর দশটা পণ্যের মতোই ব্যবসায়ীক পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। সবচেয়ে বড় পরাজয়ের ভয়ে এরা বড় যুদ্ধ লাগায় না আর। এছাড়া যুদ্ধ যত দ্রুত জনগণকে শিক্ষিত করে তোলে তা অন্য কিছু দিতে সহজে দিতে পারে না। যুদ্ধের সময় সকল পক্ষই অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া যুদ্ধ বাধলে মানুষের ভয় কেটে যায়। শত্রু মিত্র চেনা সহজ হয়। তখন অস্ত্রও সহজলভ্য হয়। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বাড়ে, ফলে বিদ্রোহ বাড়ে।

আরেকটি বস্তুগত শর্ত আপনাদের চোখে পড়বে, সেটি হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। পৃথিবীতে মানুষের পরিমাণ ৭০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, এই বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানুষের গড় গুণগত মানকেও নিচে নামিয়েছে। এছাড়া বুর্জোয়া এবং সাম্রাজ্যবাদীরা দেখেছে মানুষকে যন্ত্রের মতো কাজে লাগালে সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেটদের মুনাফা বাড়ে ত্বরিত গতিতে। মনোবিজ্ঞান বিষয়ক লেখাপড়া সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্য করেছে, বিশেষ করে সাপেক্ষ প্রতিবর্ত [Conditioned reflex]। কীভাবে মানুষকে যন্ত্রের মতো খাটানো যায় তা নিয়ে জাপান-ইউরোপ-মার্কিনীরা গবেষণা চালিয়েছে গত এক শতাব্দী জুড়ে। জাপানিরা এই ক্ষেত্রে সফল হয়েছে শতভাগ। জাপানিরা যন্ত্রের মতো কাজ করতে পছন্দ করে, কাজ করতে করতে স্বাভাবিক চিন্তা প্রক্রিয়া হারিয়ে ফেলে এবং একসময় আত্মহত্যা করে। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশও আত্মহত্যায় পিছিয়ে নেই।

গড়ে এক লক্ষ মানুষের ভেতরে জাপানে আত্মহত্যার হার ১৯১৪ সালে ছিল ১৯৫। রাশিয়া ছিলো সবচেয়ে বেশিতে যার হার ২১৮। ফ্রান্সে এই হার ১৫১, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩৪, জার্মানিতে ১২৬ কানাডায় ১১৩ ইংল্যান্ডে ৭৫ এবং ইতালিতে ৭২। এই পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে উচ্চ কারখানায়িত দেশগুলোর মানুষের গড় মান মোটামুটি নির্বোধের স্তরে নামাতে পেরেছে সাম্রাজ্যবাদীরা।[৮] ফলে একুশ শতকে মানুষ এখন একেকটা মেশিন। এই অভিজ্ঞতা গোটা দুনিয়াতেই নতুন।

সমাজ আপনা থেকেই এগোয় না। সমাজের প্রগতিতে ন্যায়যুদ্ধের বিশেষ ভূমিকা আছে। প্রগতিশীল যুদ্ধগুলোর দিকে চোখ ফেরালে দেখা যাবে কিভাবে যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও বিপ্লবগুলো সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধের সংগে প্রগতির সম্পর্কটি বেশ পুরোনো। যেমন মনে করা যাক ইউরোপীয় রেনেসাঁর উদ্ভব। রেনেসাঁ আরম্ভের মূল সূত্রটি লুকিয়ে আছে ক্রুসেডে খ্রিস্টানদের পরাজয়ে। ইউরোপের লাখ লাখ মানুষের জীবনহানিই তাঁদেরকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দিকে ভাবতে বাধ্য করে, ওরা বুঝে যায় জ্ঞান আর বিজ্ঞান দিয়েই পরাজিত করা সম্ভব শত্রুকে। মূলত বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং যুদ্ধগুলোই মানুষকে অতি দ্রুত শেখাতে পারে। বিপ্লব শিক্ষা দেয় ত্বরিত গতিতে[৯], লেনিনের এই কথাটি ফেলনা নয়। যারা কেবল খাপছাড়াভাবে যুদ্ধের ধ্বংস ও হত্যাকাণ্ডগুলো দেখেন তারা যুদ্ধের বিভিন্ন দিক দেখেন না, বিশেষভাবে তারা প্রগতিশীল ন্যায়যুদ্ধগুলোর ভূমিকা খেয়াল করেন না। সামাজিক অগ্রগতি দেখতে হলে এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি যে কেন আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ যুগ, দাস যুগ,  সামন্ত যুগ ও পুঁজিবাদী যুগের ভেতরে পরেরটি আগেরটির চেয়ে উন্নত। উদাহরণ হিসেবে দেখা যাক, আদিম যুগে দুটি গোষ্ঠীর পারস্পরিক আক্রমণের পর পরাজিত পক্ষের কী হতো? পরাজিতদের খেয়ে ফেলা হতো। এটা বর্বরতা। দাস যুগে এসে পরাজিতরা বাঁচার অধিকার পেলো, এটা সামাজিক অগ্রগতি।[১০] এরকম প্রতিটা সমাজের নানারকম অগ্রগতি আছে।

যুদ্ধ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে গত ৩০০০ বছর ধরেই চলেছে। যুদ্ধে মানুষের হত্যা ও ধ্বংস এক অনিবার্য বিষয় যেমন, তেমনি যুদ্ধ সৃষ্টিও কম করেনি। ইউরোপে কোটি কোটি মানুষের হত্যা তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। প্রাচ্য স্বৈরাচার কতই না ভাবে মানুষকে হত্যা করেছে। ভারতে নারীদের কয়দিন আগেও জ্যান্ত পোড়াতো। কাপালিকেরা মানুষকে বলি দিতো; আর রাজারা ও তাদের হারেম আর খোজাদের করুন কাহিনী, যুদ্ধের সামনে পড়ে হাজার হাজার গ্রামীণ স্বাধীন কৃষক নিশ্চিহ্ন হবার ইতিহাস অনেকেরই জানা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এই যে যুদ্ধের ইতিহাস, তাকে মানুষের ইতিহাস হিসেবেই দেখতে হবে, তার সাফল্য ব্যর্থতা, অগ্রগতি পশ্চাৎগমনসহ।

 ১৯৯০ পরবর্তীকালে স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের বই সভ্যতার সংঘর্ষ আবার যুদ্ধগুলো বা সংঘর্ষগুলোকে সামনে এনেছে এবং বিশ্বের শৃঙ্খলাকে নতুন করে গড়ে নিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীরা মূলত হান্টিংটনের এই বইকে তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক এন্থনি প্যাগডেনের Worlds at War: The 2,500-Year Struggle Between East and West বইটার আলোচনাও একই ধরনের। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনীরা এবং তাঁদের দোসর ইউরোপীয় গণশত্রুরা এখন এসব বইয়ের আলোচনা ও প্রচার হরদম চালাচ্ছে। এসব বইয়ে কি আদৌ এমন নতুন তথ্য বলা হচ্ছে তা কি আমরা খুঁজে দেখেছি? এসব বইয়ে নতুন কোনো কথা নেই; এগুলো মূলত সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের চিন্তাধারা। ইউরোপীয়রা এক সময় মনে করত, সভ্যতা এগোয় না, ওটা বৃত্তের মতো ঘোরে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। ইউরোপীয়রা মনে করত সভ্যতা আলেকজান্দ্রিয়া, এথেন্স, রোম, বাগদাদ, লন্ডন হয়ে এখন ওয়াশিংটনে পৌঁছেছে। যারা Time You Old Gypsy Man কবিতাটি পড়েছেন তারা আমার কথার সত্যতা মনে করতে পারবেন। মূলত ইউরোপীয়রা সমাজের বিকাশের ব্যাখ্যা যতদিন দিতে পারেনি ততদিন এসব কথা খুব গ্রহণ করেছে। সামাজিক বিকাশ ও প্রগতির ইতিহাস, বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লব বিশ্লেষণ করে তারা সমাজপ্রগতিকে চিনতে শিখেছিল, যা এখন তারা আবার ভুলে গেছে। মূলত উত্তরাধুনিকতাবাদী চিন্তাধারা[১১] ইউরোপ ও আমেরিকাকে ইতিহাস সংক্রান্ত বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদী চিন্তা থেকে হটিয়ে দিয়েছে।

যুদ্ধের বিরোধিতা করা যেমন কর্তব্য, তেমনি প্রগতির জন্যে যুদ্ধ করাও কর্তব্য। যতদিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসরেরা দেশে দেশে জনগণের উপর হত্যা নির্যাতন, নিপীড়ন শোষণ চালাবে, ততদিন পৃথিবীতে যুদ্ধ থাকবে। যুদ্ধকে উৎখাত করার জন্যই যুদ্ধ করতে হয়। আর যখন প্রচলিত রাজনীতি সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, তখনই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর যুদ্ধ চললেই জনে জনে যোদ্ধা আসে, যুদ্ধ না চললে খাসি কালচারড রাবিন্দ্রিক মধ্যবিত্তই আসবে।

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ

১. কোকা আন্তোনভা, গ্রিগোরি বোনগার্দ লেভিন ও গ্রিগোরি কতোভস্কি, ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৩৩৬

২. যুদ্ধ কেন শিরোনামে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের লেখাটি আপনারা পড়ে দেখুন।

৩. সিরাজ সিকদার থেকে শুরু করে সাম্প্রতককালের ক্রসফায়ার সমূহ, অবিচার অর্থে বিশ্বজিত দাস এবং অন্যান্য কোর্ট মার্শালসমূহ, গণহত্যা অর্থে পাহাড়ে চালিত গণহত্যাসমূহ।

৪. ‘যুদ্ধ ও বিপ্লব’ প্রবন্ধটি ভি আই লেনিন শুরু করেছেন এই বলে যে, ‘যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে কর্মনীতির অনুবৃত্তি। প্রত্যেক যুদ্ধই সেই যুদ্ধের সৃষ্টিকারী রাজনীতিক ব্যবস্থা থেকে অবিচ্ছেদ্য’। প্রবন্ধটি ২৩ এপ্রিল, ১৯২৯ তারিখে প্রাভদায় প্রকাশিত। প্রবন্ধটি পাবেন প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন থেকে প্রকাশিত সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদীদের প্রসঙ্গে গ্রন্থের ১৪০-১৫২ পৃষ্ঠায়। মাও সেতুং বলেছেন ‘রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ আর যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি’।

৫. মাও সেতুং, “দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সম্পর্কে” মে, ১৯৩৮

৬. মাও সেতুং, ১৯৬১-৬২; ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি’র উপর নোট।

৭. আহমদ শরীফ, বাঙলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা ১৭

৮. Otake, Tomoko. “Suicides down, but Japan Still Second Highest among Major Industrialized Nations, Report Says.” The Japan Times News, The Japan Times, Ltd., 30 May 2017, www.japantimes.co.jp/news/2017/05/30/national/social-issues/preventive-efforts-seen-helping-2016-saw-another-decline-suicides-japan-21897/.

৯. কার্ল মার্কস তাঁর ফ্রান্সে শ্রেণিসংগ্রাম গ্রন্থে বলেছিলেন বিপ্লব হলো ইতিহাসের চালিকাশক্তি। লেনিনের এই কথাটি আছে তাঁর গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রসঙ্গে প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি ২৩ ডিসেম্বর ১৯১৮ তে লেনিন লেখেন যা ৩ জানুয়ারি ১৯১৯ তারিখে প্রাভদার ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত। প্রবন্ধটির বঙ্গানুবাদ পাবেন লেখকের সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র প্রসঙ্গে, বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ১০৫-১১০।

১০. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, অ্যান্টি দ্যুরিং।

১১. এই বিষয়ে পড়ুন রতন খাসনবীশের গ্রন্থ মার্কসবাদ ও উত্তরাধুনিকতা

রচনাকাল: এপ্রিল-আগস্ট, ২০১৭

আরো পড়ুন



« (Previous News)



Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *