You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > রাজনৈতিক যুদ্ধতত্ত্ব যুদ্ধ সংঘটনের কারণ হিসেবে মানুষের রাজনৈতিক কার্যকলাপকে দায়ী করে

রাজনৈতিক যুদ্ধতত্ত্ব যুদ্ধ সংঘটনের কারণ হিসেবে মানুষের রাজনৈতিক কার্যকলাপকে দায়ী করে

রাজনৈতিক যুদ্ধতত্ত্ব বা যুদ্ধের রাজনৈতিক তত্ত্ব (ইংরেজি: Political theory of war) হচ্ছে সেই যুদ্ধ তত্ত্ব যাতে যুদ্ধ সংঘটনের কারণ হিসেবে মানুষের রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও রাজনৈতিক মতবাদের সংঘাতকে দায়ী করা হয়। স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য অথবা অর্জন করার জন্য অনেক দেশ যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। সাম্রাজ্য স্থাপন এবং জাতীয় শক্তি ও মর্যাদার বদ্ধি জন্যও অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

শক্তির ভারসাম্য নীতি

শক্তিসাম্য বজায় রাখার জন্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যাতে অধিকতর শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে সেই উদ্দেশ্যেই অনেক রাষ্ট্র যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিসমার্কের নেতৃত্বে প্রাশিয়া যখন সাত সপ্তাহের মধ্যে অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে তখন ইউরােপের শক্তিসাম্য হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইউরােপে প্রাশিয়ার শক্তি খুব বদ্ধি পায় এবং তাই তুলনামূলক বিচারে ফ্রান্সের শক্তি হ্রাস পেল। ফলে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়। সেই যুদ্ধে অবশ্য ফ্রান্স পরাজিত হয়েছিল।[১]

সাংস্কৃতিক ভিন্নতা

সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ফলে একটি দেশের পক্ষে অন্য দেশকে ভাল করে বােঝা কঠিন হয় এবং তার ফলে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। তবে অধিনিক যুগে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের জন্য যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার কোন নজীর নেই। প্রাচীন কালে একটি দেশ যখন অন্য দেশ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল তখন তাদের মধ্যে সংস্কৃতির পার্থক্যের জন্য যুদ্ধ হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। গ্রীকরা সমস্ত বিদেশীকে বর্বর (barbarian) মনে করত এবং ফলে গ্রীক ও বিদেশী রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করা কঠিন ছিল। ধর্ম ও যুদ্ধের মধ্যে নিকট সম্পকের অনেক দুষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া যায়। পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ ইউরােপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক সময়ে যে ইসলামিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার জন্য অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ক্রুসেডের যুদ্ধকে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় যুদ্ধ রুপে বর্ণনা করা যায় না সত্য কিন্তু সেখানে ধর্মের ভূমিকা উপেক্ষণীয় নয়। ধর্মীয় পার্থক্য কি ভাবে রাজনীতিকে প্রভাবিত করে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল প্রােটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। ত্রিশ বৎসর ব্যাপী (1618-1648) এই ধর্মীয় পার্থক্যের ভূমিকা যথেষ্ট। আধুনিক যগে সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সাথে খ্রীষ্টান ধর্মযাজকদের ধর্ম প্রচারের সঙ্কল্প বিশেষভাবে জড়িত। আরব-ইজরাইল সম্পর্ক, ভারতবর্ষের প্রতি পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদির ঘটনার দ্বারা স্পষ্টই বােঝা যায় যে বর্তমান যুগেও ধর্মীয় পার্থক্য রাজনৈতিক সম্পর্ককে বহ, পরিমাণে নিয়ন্ত্রিত করে।

যুদ্ধের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক মতবাদ

বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর রাজনৈতিক মতবাদের (Ideologies) প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে। সাধারণতঃ অনেক যুদ্ধকে রাজনৈতিক মতবাদের যুদ্ধ রুপে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। ফরাসী বিপ্লবকে কেন্দ্র করে ইউরোপে যে যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল তাকে অনেক সময় ‘স্বাধীনতা সাম্য ও মৈত্রীর সাথে রক্ষণশীল ফিউডাল প্রথার যুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রথম মহাযুদ্ধকে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের যুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে ফ্যাসীবাদ বিরােধী যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগের ঠাণ্ডা লড়াইকে ( যদিও এই ঠাণ্ডা লড়াইকে যুদ্ধ বলে গণ্য করা যায় না) কম্যুনিজমের সাথে গণতন্ত্রের যুদ্ধ ইত্যাদি ভাবে আমরা চিন্তা করে থাকি। এইসব যুদ্ধের জন্য মতাদশের পার্থক্যই একমাত্র দায়ী নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতবাদের ভূমিকা একেবারে অস্বীকার করা চলে না। 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যুদ্ধকে অনেকটা অপরিহার্য এবং স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির (political culture) সাথে যুদ্ধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের দেশে ধারণা ছিল যে যুদ্ধ করাই ক্ষত্রিয়ের ধম। মেকিয়াভেলী (Machiavelli) বলেন যে যুদ্ধ এবং সেই সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া রাজার অন্য কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করা বা লেখাপড়া করা উচিত নয়।[২] যুদ্ধের মত হিংস্র এবং বর্বরােচিত ব্যবস্থা মানবসভ্যতায় যে এখনও প্রচলিত আছে তা খুবই আশ্চর্যের কথা। বিভিন্ন দেশেই যুদ্ধের বিরদেধ মতবাদ গড়ে উঠেছে সত্য, কিন্তু তবও যুদ্ধকে বৈদেশিক নীতি রুপায়নের একটি পহারপে আজও সব দেশ ব্যবহার করে থাকে। প্রাচীন যুগে মানুষ ও পশর মধ্যে যখন খুব বেশী পার্থক্য ছিল না তখন বেচে থাকার জন্যই মানুষকে যুদ্ধ করতে হত কিন্তু বর্তমান সভ্যতার যুগেও যুদ্ধের প্রয়ােজন হয় এটাই আশ্চর্য।

এই বিষয়ে সুম্পেটারের (Joseph A. Schumpeter) মতবাদ এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন যে অতীতে দেশের বিশেষ স্বার্থের (concrete interest) খাতিরে রাষ্ট্রকে যুদ্ধ করতে হতো এবং সেই কারণে রাষ্ট্র সেনাবাহিনী ও যুদ্ধের বিভিন্ন সরঞ্জাম গড়ে তােলে। কিন্তু পরে যন্ধ করার প্রয়ােজনীয়তা ফুরিয়ে গেলেও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাধারার পরিবর্তন হয় না। সেনাবাহিনী ও যুদ্ধের সমস্ত সরঞ্জাম থেকে যায় এবং যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে তাও অপরিবতিত থাকে। সুম্পেটার (Schumpeter) বলেন যে পূর্বে যুদ্ধের প্রয়ােজনে সেনাবাহিনী ও সামরিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল কিন্তু পরে সেনাবাহিনী এবং সামরিক সংগঠনের প্রয়োজনে যুদ্ধ চলতে থাকে।[৩] সুম্পেটার এই রকম যুদ্ধকেই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে যে সব যুদ্ধের সাথে দেশের বিশেষ বাথ (concrete interest’) জড়িত থাকে তা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নয়। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে তিনি objectless বা উদ্দেশ্যহীন বলে বর্ণনা করেছেন। সুম্পেটারের মতে পৃথিবীর অধিকাংশ যুদ্ধই এই রকম উদ্দেশ্যবিহীন, অযৌক্তিক এবং অপ্রয়ােজনীয়। সদর অতীতে সংগ্রাম করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়ােজনে মানুষের মনে যে সব ধারণার সৃষ্টি হয় তার প্রভাবেই আজ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে আসছে। বর্তমান যুগেও একদল শ্রেণী যুদ্ধের ফলে লাভবান হয় এবং সুম্পেটার মনে করেন যে তাদের চেষ্টাতেই যুদ্ধের মনােভাব এবং সামরিক সংগঠন আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রচলিত রয়েছে।[৪]

আরো পড়ুন:  স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন চালিত ব্যঙ্গ যুদ্ধ

যুদ্ধের কারণ হিসেবে জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই ধারাকে বিশেষ ভাবে পরিপােষণ করে। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, যুক্তিবাদ ও গণতন্ত্রের যুগেও জাতীয়তাবাদের জঙ্গী মনােভাব খুবই প্রবল। এই প্রসঙ্গে এরিক ফ্রোম (Erich Fromm)-এর স্বাধীনতার ভয় বা fear of freedom সম্বন্ধে যে ধারণা আছে তার উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তিনি বলেন যে গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ফলে অনেক মানুষ নিজেকে অত্যন্ত নিঃসঙ্গ, অসহায় এবং অক্ষম মনে করে জীবন উদ্দেশ্যহীন, ব্যর্থ এবং একঘেয়ে মনে হয়। স্বাধীনতা তখন একটা বােঝায় (burden) পরিণত হয় এবং সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মানুষ পরিত্রাণ পেতে চায়। তখন কোন বহৎ এক সত্তার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে বাধীনতা বা স্বতন্ত্র অস্তিত্বের দায়িত্ব থেকে সে মুক্তিলাভ করে। সেই বহৎ সত্তার সাথে নিজেকে একাত্ম করে সে নিজের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং জীবনকে সার্থক মনে করে। জাতি বা রাষ্ট্রই সেই বহৎ সত্তা হিসেবে দেখা দেয় কোন কোন ক্ষেত্রে শ্রেণী বা দলও হতে পারে ) এবং জাতির গৌরব ও মর্যাদা বদ্ধি করে ব্যক্তিমানুষ নিজের গৌরব ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চায়। জাতি বা রাষ্ট্রের বহত্তর সত্তায় নিজেকে বিলীন করে দিয়ে মানুষ জাতি ও রাষ্ট্রের নামে এমন সব বীভৎস কাজ করতে পারে যা ব্যক্তি হিসেবে তার পক্ষে করা মােটেই স্বাভাবিক নয়। জার্মানীর নাৎসীরা তথাকথিত জাতীয় স্বার্থে ইহুদীদের উপর যে অত্যাচার করেছে ব্যক্তি হিসাবে কোন জার্মানের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। নাৎসীবাদ ও ফ্যাসীবাদের উত্থান বিশ্লেষণ করতে গিয়েই এরিক ফ্রেম (Erich Fiomm) তাঁর বিখ্যাত বই Escape From Freedomএ উক্ত মতবাদ ব্যাখ্যা করেন। পৃথিবীর সব দেশেই জাতির নামে যুদ্ধ করা গৌরবের, যদিও ব্যক্তি মানুষের পক্ষে অন্য মানুষকে হত্যা করা চরম অপরাধ। যুদ্ধ জয়লাভ করাকে প্রত্যেক দেশই জাতীয় গৌরব বলে মনে করে। জাতীয়তাবাদের এই ধারাকে যুদ্ধের একটি কারণ হিসেবে গণ্য করা যায়। 

জাতীয়তাবাদের এই মনােভাব কোন কোন ক্ষেত্রে উগ্র রূপ ধারণ করে। প্রত্যক্ষ ভাবে যুদ্ধের ইন্ধন যোগায়। মসোলিনী প্লটভাবে ঘোষণা করেন যে তাঁর ফ্যাসীবাদ শান্তির আদর্শে বিশ্বাস করে না। যুদ্ধের প্রয়ােজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন যে যুদ্ধের সময়ই মানুষের শক্তি এবং তার শৌর্যবীর্য চরমে উঠে এবং যে জাতির যুদ্ধ করার সাহস আছে সেই জাতিই মহত্ত্ব লাভ করতে পারে। বিশেষ চিরদিনের জন্য শান্তি স্থাপন করা মসােলিনী সম্ভব মনে করেন না এবং তার কোন প্রয়ােজন আছে বলেও তিনি স্বীকার করেন না। মুসােলিনীর কাছে শান্তি কাপরষতারই নামান্তর।[৫] জার্মানীর জেনারেল বার্নহার্ডি (General Friedrich Von Bernhardi) ১৯১৪ সালে প্রকাশিত Germany and the Next Wir পুস্তকে বলেন যে শান্তির আকাঙ্ক্ষা সভ্য জাতিগুলিকে দুর্বল করে তুলেছে। মানবজাতির উন্নতির জন্য যুদ্ধকে তিনি একটি জৈব (biological) প্রয়ােজন বলে মনে করেন এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে সাহস ও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করার ফলে মানবজাতি রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে অনেক উন্নতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।[৬] কোন দেশের রাজনৈতিক মতবাদে এই ধরনের চিন্তা যদি স্থান পায় তবে তা যুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে। যুদ্ধ কোন কোন সময় প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু যুদ্ধের মহিমা কীর্তন করে তাকে সভ্যতা ও প্রগতির বাহন রপে বর্ণনা করা খুবই অস্বাভাবিক। তবে এই ধরনের জঙ্গীবাদী মনােভাবকে জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য মনে করা উচিত নয়। এটা হলো জাতীয়তাবাদের উগ্ররূপ।

যুদ্ধই যুদ্ধের কারণ

অনেক সময় যুদ্ধই যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।[৭] অর্থাৎ একটি যুদ্ধের মধ্যেই অন্য যুদ্ধের বীজ নিহিত থাকে। পরাজিত দেশ তার পরাজয়ের প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য অনেক সময় পরবর্তীকালে যুদ্ধ আরম্ভ করে। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি কর্তৃক পরাজিত হওয়ার পর থেকেই ফ্রান্স প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে আরম্ভ করে এবং প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানীকে পরাজিত করতে সমর্থ হয়। প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় জার্মানীর মধ্যে প্রতিশােধ স্পৃহা জেগে উঠে এবং ফলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হয়। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইথিওপিয়ার কাছে ইতালি পরাজিত হয়। তাই ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুসােলিনী সমস্ত ইথিওপিয়া অধিকার করে পূর্ব পরাজয়ের প্রতিশােধ নিলেন। 

আরো পড়ুন:  পুঁজিবাদী দেশগুলিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বর্ধমান উত্তেজনা – জে. ভি. স্তালিন

যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষের বিভিন্ন মিত্ররাষ্ট্রের মধ্যেও যুদ্ধের পরে পুনর্গঠনের সমস্যা নিয়ে মতবিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ আরম্ভ হতে পারে। প্রথম মহাযুদ্ধে জয়ী হলেও ইতালী প্যারিস শান্তিচুক্তিতে সন্তুষ্ট হয় না এবং শেষ পর্যন্ত নাৎসী জার্মানীর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। একটি দেশ যুদ্ধ আরম্ভ করলে অন্য দেশ যুদ্ধ আরম্ভ করতে সাহসী হয়। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে জাপান কর্তৃক মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ এবং জাতিসংঘের ব্যর্থতা মুসােলিনীকে ইথিওপিয়া আক্রমণ করতে উৎসাহিত করে।

এই সব উদাহরণ থেকে দেখা যায় যে একটি যুদ্ধ অন্য যুদ্ধের কারণ হতে পারে। তবে এই কথা কখনও মনে করা উচিত নয় যে একটি যুদ্ধের ফলেই অন্য একটি যুদ্ধ এবং আর অন্য কোন কারণ থাকে না। তা ছাড়া উপরে যে সব ঘটনার উল্লেখ করা হ’ল তার মধ্যে কার্যকারণ কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ বিজিত দেশ যে বিজয়ী দেশের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করবেই তার কোনো যুক্তি নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাজিত জার্মানী বিজয়ী শক্তিবর্গের বন্ধু হিসেবেই রয়েছে।

রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন

অনেক সময় একটি দেশ তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়ােজনে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। যুদ্ধের সময় একটি জাতি যে ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় অন্য সময় তা হয় না। তাই দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বা দেশের ঐক্য বজায় রাখার জন্য অনেক সময় যুদ্ধের প্রয়ােজন হয়। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিসমার্কের যুদ্ধ ঘােষণার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ জার্মানীর রাষ্ট্রসমূহকে উত্তর জার্মান কনফেডারেশনের (North German Confederation) সাথে একত্র করা। ভারত-পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজের দেশের ঐক্য বজায় রাখার জন্য জনসাধারণের কাছে একে অপরের শত্রু হিসেবে প্রতিপন্ন করার নীতি গ্রহণ করে। অভ্যন্তরীণ বৈপ্লবিক আন্দোলন থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি সরিয়ে আনার জন্য যুদ্ধ অনেক সময় সরকারকে সাহায্য করে।

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে যুদ্ধের কোনো সাধারণ কারণ দেখানাে সম্ভব নয়। একমাত্র এই কথা বলা যায় যে একটি রাষ্ট্র যদি অপর রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয় তবে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সেই রাষ্ট্র যুদ্ধ করবে। তা ছাড়া এমন কিছু বলা যায় না যার ফলে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে একটি দেশ যে সব সময় যুদ্ধ করে তাও ঠিক নয়। হিটলার যুদ্ধ না করে অস্ট্রিয়া এবং চেকোস্লোভাকিয়া অধিকার করে। একটি বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ আরম্ভ হবে কিনা তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির শক্তি, নীতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থার উপর। আন্তর্জাতিক অবস্থা অনুকুল না থাকায় দুর্বল চেকোস্লোভাকিয়ার পক্ষে হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব হয় নি, কিন্তু আন্তর্জাতিক অবস্থা অনুকুলে থাকায় পােল্যান্ড তার দুর্বলতা সত্ত্বেও জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের অভাব

অনেকেই স্বীকার করবেন যে সমস্ত যুদ্ধের একটি সাধারণ কোনো কারণ খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। যুদ্ধের অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও এই সমস্ত কারণগুলো বিদ্যমান থাকে কিন্তু তবু (গৃহযুদ্ধ ছাড়া) একটি দেশের মানুষ মােটামুটি ভাবে শান্তিতে বসবাস করে। একটি দেশে বিভিন্ন মানুষ বা দল বা গােষ্ঠীর মধ্যে যতই মতবিরােধ বা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হােক না কেন তা যুদ্ধের আকার ধারণ করতে পারে না। এর প্রধান কারণ হলো দেশে সরকারের আইন এবং সেই আইনকে বাস্তবে প্রয়ােগ করার মত সরকারের ক্ষমতা। সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকার ফলে একটি দেশের বিভিন্ন দল বা সম্প্রদায়ের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই সরকারী নিয়ন্ত্রণের অভাবের ফলেই আন্তর্জাতিক বিরােধ অনেক সময় যুদ্ধের রপে গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারী নিয়ন্ত্রণ যদি প্রতিষ্ঠা করা যায় তবে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিরােধ ও স্বার্থের সংঘাত থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধকে পরিহার করা সম্ভব হবে। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনাে সরকারী নিয়ন্ত্রণের অভাবকেই অনেকে যুদ্ধের প্রধান কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। 

আরো পড়ুন:  যুদ্ধ ও শান্তি --- মাও সেতুং

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা বিচার করলে এই মতবাদ অনেকটা যথার্থই মনে হয়। নিজ দেশের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই অবশ্য কর্তব্য। এই ব্যাপারে অন্তর্জাতিক আইন বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা অথবা সমষ্টিগত নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থার উপর কোনো রাষ্ট্র সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে বসে থাকতে পারে না। সাধ্য অনুসারে এবং প্রয়ােজন মতো প্রত্যেক রাষ্ট্রকে অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত অথবা সংগ্রহ করতেই হয়। নিরাপত্তার জন্য বহু রাষ্ট্রের সাথে অনেক সময় নানা রকমের চুক্তি স্থাপন করতে হয়। একটি দেশের সামরিক প্রস্তুতি, তা যদি সম্পূর্ণরূপে নিজের নিরাপত্তা বিধানের জন্যও হয়, অন্য দেশের মনে সন্দেহ ও ভয়ের সঞ্চার করে। ফলে অন্য দেশও সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি করার জন্য চেষ্টা করে। এই ভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে অস্ত্রশস্ত্র বাড়াবার প্রতিযােগিতা শুরু হয়। অনেক সময় একটি দেশ অন্য রাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য এবং নীতি স্পষ্ট ভাবে উপলব্ধি করতে পারে না বলে তার মনে অতিমাত্রায় সন্দেহ ও ভয় জাগরিত হয় এবং অনেকে মনে করেন যে অন্য রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞতাই অনেক সময় যুদ্ধের আবহাওয়া সৃষ্টি করে। ভয়, সন্দেহ, অস্ত্রসজ্জা—এ সমস্তই যুদ্ধের অনকুল অবস্থা সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক বিরােধ শান্তিপূর্ণ ভাবে মীমাংসা করার কোনো কার্যকরী উপায় না থাকায় অনেক সময় বল প্রয়ােগ করে যুদ্ধের মাধ্যমেই সেই বিরােধ মীমাংসা করতে হয়।

উপরের আলোচনা থেকে এটাই বোঝা গেল যে পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহ যতদিন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী থাকবে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যতদিন পর্যন্ত নিজেদের প্রস্তুতির উপরই নির্ভর করতে হবে, কোনো আন্তর্জাতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে যতদিন পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রকে একত্র করা যাবে না ততদিন পর্যন্ত এই যুদ্ধ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরকার ব্যতীত কোনো দেশের পক্ষে অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা যেমন সম্ভব নয় তেমনি আন্তর্জাতিক সরকার ভিন্ন আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনও অসম্ভব। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারী নিয়ন্ত্রণের অভাবই যুদ্ধের কারণ।

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ১৮১।

২. “A prince should, therefore, have no other aim or thought, nor take up any other thing for his study, but war and its organization and discipline, for that is the only art that is necessary to one who commands •••••”

৩. “And history, in truth, shows us nation and classes-most nations furnish an example at some time or other- that seek expansion for the sake of expanding, war for the sake of fighting, victory for the sake of winning, dominion for the sake of ruling.” Joseph A Schumpeter, Imperialism and Social Classes.

৪. সুম্পেটার মনে করেন যে আধুনিক যুগের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, গণতন্ত্র এবং যুক্তিবাদের ফলে ধীরে ধীরে যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটবে। পুঁজিবাদের ফলে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধ সৃষ্টি হয় তা তিনি বিশ্বাস করেন না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অন্যান্য বাধা এবং তার ফলে জিনিষপত্র বিক্রি করার জন্য বাজার নিয়ে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপস্থিত হয় তার ফলে যে সংঘর্ষ ও যুদ্ধ বাধে তা তিনি অশ্বীকার করেন না, তবে তিনি মনে করেন যে অবাধ বাণিজ্যের পথে এই সব অন্তরায়ের জন্য পুঁজিবাদকে দায়ী করা চলে না—প্রাক-পুঁজিবাদ যুগের সমাজব্যবস্থা ও চিন্তাধারাই তার জন্য দায়ী।

৫. “Fascism…believes neither in the possibility nor the utility of perpetual peace. It thus repudiates the doctrine of Pacifism—born of a renunciation of the struggle—as an act of cowardice in the face of sacrilice. War alone brings up to its highest tension all human energy and puts the stamp of nobility upon the peoples who have the courage to meet it.”

৬. The desire for peace has rendered most civilized nations anaemic… War is a biological necessity of the first importance, a regulative element in the life of mankind which cannot be dispensed with, since without it an unhealthy development will follow… Wars, begun at the right moment with manly resolution, have effected the happiests results both politically and socially.”

৭. R. G. Hawtrey, “Economic Aspects of Sovereignty”. 1930, The sentence is “the principle cause of war is war itself ”. Quoted in Frederick L. Schuman, Why a Department of Peace.

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top