You are here
Home > সংকলন > এঙ্গেলস > কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

তৃতীয় অংশ

প্রথম অংশ, দ্বিতীয় অংশ, চতুর্থ অংশ,

মধ্য শ্রেণির নিম্ন স্তর — ছোটোখাট ব্যবসায়ী, দোকানদার, সাধারণত ভূতপূর্ব কারবারীরা সবাই, হস্তশিল্পী এবং চাষীরা— তারা ধীরে ধীরে প্রলেতারিয়েতের মধ্যে নেমে আসে। তার এক কারণ, যতখানি বড় আয়তনে আধুনিক শিল্প চালাতে হয় এদের সামান্য পুঁজি তার পক্ষে যথেষ্ট নয় এবং প্রতিযোগিতায় বড় পুঁজিপতিরা এদের গ্রাস করে ফেলে; অপর কারণ, উৎপাদনের নূতন পদ্ধতির ফলে এদের বিশিষ্ট নৈপুণ্যটুকু অকেজো হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং প্রলেতারিয়েতের পুষ্টিলাভ হতে থাকে জনগণের প্রতিটি শ্রেণি থেকে আগত লোকের দ্বারা।

বিকাশের নানা পর্যায়ের মধ্য দিয়ে প্রলেতারিয়েতকে যেতে হয়। বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে এদের সংগ্রাম শুরু হয় জন্ম মুহূর্ত থেকে। প্রথমটা লড়াই চালায় বিশেষ বিশেষ মজুরেরা; তারপর লড়তে থাকে গোটা ফ্যাক্টরির মেহনতীরা; তারপর কোনও একটা অঞ্চলের একই পেশায় নিযুক্ত সকল শ্রমিকেরা তাদের সাক্ষাৎ শোষণকারী বিশিষ্ট পুঁজিপতিটির বিরুদ্ধে লড়ে। তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হয় উৎপাদনের উপকরণ, উৎপাদনের বুর্জোয়া ব্যবস্থাটা নয়; যে আমদানি মাল তাদের মেহনতের প্রতিযোগিতা করে সেগুলি তারা ধ্বংস করে, কল ভেঙে চুরমার করে দেয়, কারখানায় আগুন লাগায়, মধ্যযুগের মেহনতকারীর যে মর্যাদা লোপ পেয়েছে, গায়ের জোরে চায় তা ফিরিয়ে আনতে।

এই পর্যায়ে মজুরেরা তখনও দেশময় ছড়ানো এলোমেলো জনতামাত্র, পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় ছত্রভঙ্গ। কোথাও যদি তারা অধিকতর সংহত সংস্থায় একজোটও হয়, তবু সেটা তখনও নিজস্ব সক্রিয় সম্মিলনের ফল নয়, বরং বুর্জোয়া শ্রেণির সম্মিলনের ফলমাত্র। এ শ্রেণি নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য গোটা প্রলেতারিয়েতকে সচল করতে বাধ্য হয়, তখনও কিছু দিনের জন্য সে চেষ্টায় সফলও হয়। সুতরাং এই পর্যায়ে মজুরেরা লড়ে নিজেদের শক্রির বিপক্ষে নয়, শক্রর শত্ৰু, অর্থাৎ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ, জমিদার, শিল্প বহির্ভূত বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় ইতিহাসের সমস্ত গতিটি বুর্জোয়া শ্রেণির হাতের মুঠোর মধ্যে থাকে; এভাবে অর্জিত প্রতিটি জয় হলো বুর্জোয়ার জয়।

কিন্তু যন্ত্রশিল্প প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণি কেবল সংখ্যায় বাড়ে না; তারা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে বৃহত্তর সমষ্টিতে, তাদের শক্তি বাড়তে থাকে, আপন শক্তি তারা বেশি করে উপলব্ধি করে। কলকারখানা যে অনুপাতে বিভিন্ন ধরনের শ্রমের পার্থক্য মুছে ফেলতে থাকে আর প্রায় সর্বত্র মজুরি কমিয়ে আনে একই নিচু স্তরে, সেই অনুপাতে প্রলেতারিয়েত বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন স্বার্থ ও জীবনযাত্রার অবস্থা ক্রমেই সমান হয়ে যেতে থাকে। বুর্জোয়াদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এবং তৎপ্রসূত বাণিজ্য-সংকটে শ্রমিকের মজুরি হয় আরও বেশি দোদুল্যমান। যন্ত্রের অবিরাম উন্নতি আরো দ্রুততালে বাড়তে থাকে, মজুরের জীবিকা হয়ে পড়ে আরও বিপন্ন; এক একদল মজুরের সঙ্গে এক একজন বুর্জোয়ার সংঘর্ষ ক্রমেই বেশি করে দুই শ্রেণির দ্বন্দ্বের রূপ নেয়। তখন মজুরেরা মিলিত সমিতি গঠন শুরু করে (ট্রেড ইউনিয়ন) বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে; মজুরির হার বজায় রাখার জন্য জোট বাঁধে; মাঝে মধ্যে ঘটা এই বিদ্রোহের আগে থাকতে প্ৰস্তুতির জন্য স্থায়ী সংগঠন গড়ে। এখানে ওখানে দ্বন্দ্ব পরিণত হয় অভ্যুত্থানে।

মাঝে মাঝে শ্রমিকেরা জয়ী হয়, কিন্তু কেবল অল্পদিনের জন্য। তাদের সংগ্রামের আসল লাভ আশু ফলাফলে নয়, মজুরদের ক্রমবর্ধমান একতায়। এই একতার সহায় হয় যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা, আধুনিক শিল্প যার সৃষ্টি করেছে এবং যার মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার মজুরেরা পরস্পরের সংস্পর্শে আসে। এক জাতীয় অসংখ্য স্থানীয় লড়াইকে দেশব্যাপী এক শ্রেণি সংগ্রামে কেন্দ্রীভূত করার জন্য ঠিক এই সংযোগটারই প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু প্রত্যেকটা শ্রেণিসংগ্রামই হলো রাজনৈতিক সংগ্ৰাম। শোচনীয় রাস্তাঘাটের দরুন যে ঐক্য আনতে মধ্যযুগের নাগরিকদের শতাব্দীর পর শতাব্দী লেগেছিলো, আধুনিক শ্রমিকেরা তা অর্জন করে রেলপথের কল্যাণে মাত্র কয়েক বছরে।

মজুরদের পরস্পরের মধ্যেই প্রতিযোগিতা আবার তাদের শ্রেণি হিসাবে সংগঠিত হওয়া এবং তার ফলে এক রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়াকে প্রতিক্ষণে ব্যর্থ করে দেয় । কিন্তু প্ৰতিবারই প্রবলতর, দৃঢ়তর, আরও শক্তিশালী হয়ে সংগঠন মাথা তোলে। এরই চাপে বুর্জোয়াদের মধ্যে বিভেদের ফলে শ্রমিকদের এক একটা স্বার্থকে আইনত মেনে নিতে হয়। ইংল্যান্ডে দশ ঘন্টার আইন এইভাবে পাশ হয়েছিলো।

মোটের উপর, পুরনো সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে সংঘাত প্রলেতারিয়েতের বিকাশে নানাভাবে সাহায্য করে। বুর্জোয়া শ্রেণিকে লিপ্ত থাকতে হয় অবিরাম সংগ্রামে। প্ৰথমে লড়াই হয় অভিজাতদের সঙ্গে; পরে বুর্জোয়া শ্রেণিরই যে যে অংশের স্বার্থ যন্ত্রশিল্প বিস্তারের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় তাদের বিরুদ্ধে; আর সর্বদাই বিদেশের বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে। এইসব সংগ্রামেই বুর্জোয়াদের বাধ্য হয়ে শ্রমিক শ্রেণির কাছে আবেদন করতে হয়, সাহায্য চাইতে হয় তাদেরই কাছে, তাদের টেনে আনতে হয় রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে। সুতরাং বুর্জোয়ারা নিজেরাই প্রলেতারিয়েতকে তাদের রাজনৈতিক ও সাধারণ শিক্ষার কিছুটা জোগাতে থাকে; অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়বার অস্ত্র প্রলেতারিয়েতকে তারাই জোগায়।

এছাড়া আমরা আগেই দেখেছি যে শিল্পের অগ্রগতির ফলে শাসক শ্রেণির মধ্য থেকে গোটাগুটি এক একটা অংশ প্রলেতারিয়েতের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে, তাদের জীবনযাত্রার অবস্থা অন্তত বিপন্ন হয়। এরাও আবার প্রলেতারিয়েতকে জোগায় জ্ঞানলাভ ও প্রগতির নূতন নূতন উপাদান।

শেষ পর্যন্ত শ্রেণিসংগ্রাম যখন চূড়ান্ত মুহূর্তের কাছে এসে পড়ে, তখন শাসক শ্রেণির মধ্যে, বস্তুতপক্ষে পুরানো সমাজের গোটা পরিধি জুড়ে ভাঙ্গনের যে প্রক্রিয়া চলেছে তা এমন একটা প্রখর হিংস রূপ নেয় যে শাসক শ্রেণির একটা ছোট অংশ পর্যন্ত ছিড়ে বেরিয়ে আসে, হাত মেলায় বিপ্লবী শ্রেণির সঙ্গে, সেই শ্রেণির সঙ্গে যার হাতেই ভবিষ্যত। সুতরাং আগেকার এক যুগে যেমন অভিজাতদের একটা অংশ বুর্জেয়া শ্রেণির দিকে চলে গিয়েছিলো, ঠিক তেমনই এখন বুর্জোয়াদের একটা ভাগ যোগ দেয় শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে, বিশেষ করে বুর্জোয়া ভাবাদর্শীদের কিছু কিছু, যারা ইতিহাসের সমগ্র গতিকে তত্ত্বের দিক থেকে বুঝতে পারার স্তরে নিজেদের তুলতে পেরেছে।

আজকের দিনে বুর্জোয়াদের মুখামুখি যেসব শ্রেণি দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে শুধু প্রলেতারিয়েত হলো প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণী। অপর শ্রেণীগুলি আধুনিক যন্ত্রশিল্পের সামনে ক্ষয় হতে হতে লোপ পায়; প্রলেতারিয়েত হলো সেই যন্ত্রশিল্পের বিশিষ্ট ও অপরিহার্য সৃষ্টি।

নিম্ন মধ্যবিত্ত, ছোট হস্তশিল্প কারখানার মালিক, দোকানদার, কারিগর, চাষী—এরা সকলে বুজোঁয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে মধ্য শ্রেণির টুকরো হিসাবে নিজেদের অস্তিত্বটাকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচাবার জন্য। তাই তারা বিপ্লবী নয়, রক্ষণশীল। বলতে গেলে প্রতিক্রিয়াশীলও, কেননা ইতিহাসের চাকা পিছনে ঘোরাবার চেষ্টা করে তা । দৈবক্রমে যদি এরা বিপ্লবী হয় তবে তা হয় কেবল তাদের প্রলেতারিয়েত রূপে আসন্ন রূপান্তরের কারণে; সুতরাং তারা তখন রক্ষা করে তাদের বর্তমান স্বাৰ্থ নয়, ভবিষ্যৎ স্বার্থ; নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে তারা গ্ৰহণ করে প্রলেতারিয়েতের দৃষ্টিভঙ্গি।

শেষ অংশ পড়ুন এই লিংক থেকে

কমিউনিস্ট ইশতেহারের সূচিপত্রে যান এই লিংক থেকে

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top