You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > এঙ্গেলস > কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

চতুর্থ অংশ

প্রথম অংশ, দ্বিতীয় অংশ, তৃতীয় অংশ,

পুরানো সমাজের নিম্নতম স্তর থেকে ছিটকে-পড়া যে সব লোক নিস্ক্রিয়ভাবে পচছে, সেই সামাজিক আবর্জনাটাকে, সেই ‘বিপজ্জনক শ্রেণিকে’ শ্রমিক বিপ্লব এখানে ওখানে আন্দোলনের মধ্যে ঝেঁটিয়ে নিয়ে আসতে পারে; কিন্তু এদের জীবনযাত্রার ধরনটা এমনই যে তা প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রের ভাড়াটে হাতিয়ারের ভূমিকার জন্যই তাঁদের অনেক বেশি তৈরি করে তোলে ।

পুরানো সমাজের সাধারণ পরিস্থিতিটা প্রলেতারিয়েতের জীবনে ইতিমধ্যেই প্রায় লোপ পেতে বসেছে। প্রলেতারিয়েতের সম্পত্তি নেই; স্ত্রী-পুত্ৰ-কন্যার সঙ্গে তার যা সম্বন্ধ সেটা আর বুর্জোয়া পারিবারিক সম্বন্ধের সঙ্গে মেলে না; আধুনিক শিল্পশ্রম, পুঁজির কাছে আধুনিক ধরনের অধীনতা, যা ইংল্যান্ড বা ফ্রান্স, আমেরিকা অথবা জার্মানিতে একই প্রকার, তাতে তার জাতীয় চরিত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্যই লোপ পেয়েছে। তার কাছে আইন, নীতি, ধর্ম হলো কয়েকটা বুর্জোয়া কুসংস্কার মাত্র যার পিছনে ওঁৎ পেতে আছে বুর্জোয়া স্বার্থ।

অতীতের যে সব শ্রেণি কর্তৃত্ব পেয়েছে তারা সবাই অর্জিত প্রতিষ্ঠা দৃঢ়তর করতে চেয়েছে গোটা সমাজের ওপর তাদের দখলির শর্তটা চাপিয়ে দিয়ে। প্রলেতারিয়েতের পক্ষে তাদের দখলির নিজস্ব পূর্বতন পদ্ধতি উচ্ছেদ না করে এবং তাতে করে দখলির প্রত্যেকটি ভূতপূর্ব পদ্ধতির অবসান না ঘটিয়ে, সমাজের উৎপাদন-শক্তির উপর প্রভুত্ব লাভ সম্ভব নয়। তাদের নিজস্ব বলতে এমন কিছু নেই যাকে রক্ষা অথবা দৃঢ়তর করতে হবে; ব্যক্তিগত মালিকানার সমস্ত পূর্বতন নিরাপত্তা ও নিশ্চিতি নির্মূল করে দেওয়াই তাদের ব্ৰত।

অতীত ইতিহাসে প্রতিটি আন্দোলন ছিলো সংখ্যাল্পের দ্বারা অথবা সংখ্যাল্পের স্বার্থে আন্দোলন। প্রলেতারীয় আন্দোলন হলো বিরাট সংখ্যাধিকের স্বার্থে বিপুল সংখ্যাধিকের আত্মসচেতন স্বাধীন আন্দোলন। প্রলেতারিয়েত আজকের সমাজে নিম্নতম স্তর; তাকে নড়তে হলে, উঠে দাঁড়াতে হলে, উপরে চাপানো সরকারি সমাজের গোটা স্তরটিকে শূন্যে উৎক্ষিপ্ত না করে উপায় নেই।

বুর্জেয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের লড়াইটা মৰ্মবস্তুতে না হলেও আকারের দিক থেকে হলো প্রথমত জাতীয় সংগ্রাম। প্ৰত্যেক দেশের প্রলেতারিয়েতকে অবশ্যই সর্বাগ্রে ফয়সালা করতে হবে স্বদেশি বুর্জোয়াদের সঙ্গে ।

প্রলেতারিয়েতের বিকাশের সাধারণতম পৰ্যায়গুলির ছবি আঁকতে গিয়ে আমরা দেখিয়েছি যে বর্তমান সমাজের ভিতরে কমবেশি প্রচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধ চলেছে, যে যুদ্ধ একটা বিন্দুতে এসে প্রকাশ্য বিপ্লবে পরিণত হয় এবং তখন বুর্জোয়াদের সবলে উচ্ছেদ করে স্থাপিত হয় প্রলেতারিয়েতের আধিপত্যের ভিত্তি।

আমরা আগেই দেখেছি যে আজ পর্যন্ত সব ধরনের সমাজ গড়ে উঠেছে অত্যাচারী ও অত্যাচারিত শ্রেণির বিরোধের ভিত্তিতে। কিন্তু কোনো শ্রেণির উপর অত্যাচার বজায় রাখতে হলে তার জন্য এমন কিছুটা অবস্থা নিশ্চিত করতে হয় যাতে সে তার দাসোচিত অস্তিত্বটুকু অন্তত চালিয়ে যেতে পারে। ভূমিদাসত্বের যুগে ভূমিদাস নিজেকে কমিউন-সভ্যোর পর্যায়ে তুলেছিলো ঠিক যেমন সামন্ত স্বৈরতন্ত্রের পেষণতলেও পেটি বুর্জোয়া পেরেছিলো বুর্জোয়া রূপে বিকশিত হতো। পক্ষান্তরে, আধুনিক শ্রমিক কিন্তু যন্ত্রশিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উপরে ওঠে না, স্বীয় শ্রেণীর অস্তিত্বের যা শর্ত, তারও নিচে ক্রমশই বেশি করে তাকে নেমে যেতে হয়। মজুর হয়ে পড়ে দুঃস্থ (pauper), আর দুঃস্থাবস্থা বেড়ে চলে জনসংখ্যা ও সম্পদবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুততর তালে। এই সূত্রেই পরিষ্কার প্রতিপন্ন হয় যে বুর্জোয়া শ্রেণির আর সমাজের শাসক হয়ে থাকার যোগ্যতা নেই, নিজেদের অস্তিত্বের শর্তটাকে চরম আইন হিসাবে সমাজের ঘাড়ে চাপিয়ে রাখার অধিকার নেই। বুর্জোয়া শ্রেণি শাসন চালাবার উপযুক্ত নয়, কারণ তারা দাসত্বের মধ্যে দাসের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে অক্ষম, তাদের এমন অবস্থায় না নামিয়ে পারে না যেখানে দাসের দৌলতে খাওয়ার বদলে দাসকেই খাওয়াতে হয়। এই বুর্জোয়ার শাসনে সমাজ আর বেঁচে থাকতে পারে না, অর্থাৎ অন্য ভাষায় বলতে গেলে তার অস্তিত্ব আর সমাজের সঙ্গে খাপ খায় না।

বুর্জোয়া শ্রেণির অস্তিত্ব ও আধিপত্যের মূলশর্ত হলো পুঁজির সৃষ্টি ও বৃদ্ধি; পুঁজির শর্ত হলো মজুরি-শ্রম। মজুরি-শ্রম সম্পূর্ণভাবে মজুরদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যন্ত্রশিল্পের যে অগ্ৰগতি বুর্জোয়া শ্রেণি না ভেবেই বাড়িয়ে চলে, তার ফলে শ্রমিকদের প্রতিযোগিতা-হেতু বিচ্ছিন্নতার জায়গায় আসে সম্মিলন-হেতু বিপ্লবী ঐক্য। সুতরাং, যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি উৎপাদন করে ও উৎপন্ন দখল করে, আধুনিক শিল্পের বিকাশ তার পায়ের তলা থেকে সেই ভিত্তিটাই কেড়ে নিচ্ছে। তাই বুর্জেয়া শ্রেণি সৃষ্টি করছে সর্বোপরি তারই সমাধিখনকদের। বুর্জোয়ার পতন এবং প্রলেতারিয়েতের জয়লাভ, দুইই সমান অনিবার্য।[৬]

টীকাঃ

১. বুর্জোয়া বলতে আধুনিক পুঁজিপতি শ্রেণি বোঝায়, যারা সামাজিক উৎপাদনের উপায়গুলির মালিক এবং মজুরিশ্রমের নিয়োগকর্তা। প্রলেতারিয়েত হলো আজকালকার মজুরি-শ্রমিকেরা, উৎপাদনের উপায় নিজেদের হাতে না থাকার দরুন যারা বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচিতে বাধ্য হয়। (১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

২. অর্থাৎ সমগ্ৰ লিখিত ইতিহাস। ১৮৪৭ খ্ৰীস্টাব্দে সমাজের প্রাগৈতিহাসিক (pre-history), লিখিত ইতিহাসের পূৰ্ববতী কালের সামাজিক সংগঠনের বিবরণ প্রায় অজ্ঞাতই ছিল। তারপরে, হাকস্তহাউজেন রুশদেশে জমির উপর যৌথ মালিকানা আবিষ্কার করেন, মাউরার প্রমাণ করেন যে, সকল টিউটনিক জাতির ইতিহাস শুরু হয় এই সামাজিক ভিত্তি থেকে, ক্ৰমে ক্ৰমে দেখা গেল যে ভারত থেকে আয়ার্ল্যান্ড পর্যন্ত সর্বত্র গ্রাম গোষ্ঠীই (village communities) সমাজের আদি রূপ ছিল কিংবা রয়েছে। গোত্রের (gens) আসল প্রকৃতি এবং উপজাতির (tribe) সঙ্গে তার সম্পর্ক বিষয়ে মর্গানের চূড়ান্ত আবিষ্কার এই আদিম কমিউনিস্ট ধরনের সমাজের ভিতরকার সংগঠনের বিশিষ্ট রূপটি খুলে ধরল। এই আদিম গোষ্ঠীগুলি ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ভিন্ন ভিন্ন এবং শেষ পর্যন্ত পরস্পরবিরোধী শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়তে থাকে। এই ভাঙনের ধারাটা অনুসরণের আমি চেষ্টা করেছি আমার ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’, গ্রন্থটিতে, দ্বিতীয় সংস্করণ, স্তুতগাৰ্ত, ১৮৮৬। (১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

৩. গিল্ড-কর্তা, অর্থাৎ গিল্ড সঙ্ঘের পূর্ণ সদস্য, গিল্ডের অন্তর্ভুক্ত কর্তা, উপরিস্থিত প্ৰভু নয়। (১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

৪. ফ্রান্সে নবোদ্ভূত শহরগুলি সামন্ত মনিব ও প্ৰভুদের কাছ থেকে স্থানীয় স্বশাসন ও রাজনৈতিক অধিকার আদায় করে ‘তৃতীয় মণ্ডলী’ (Third Estate) রূপে প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই ‘কমিউন’ নাম গ্রহণ করে। মোটামুটি বলা চলে যে বুর্জোয়া শ্রেণির অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে এখানে ইংল্যান্ডকে আদর্শ দেশ ধরা হয়েছে, রাজনৈতিক বিকাশের বেলা ফ্রান্সকে। (১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।) ইতালি ও ফ্রান্সের শহরবাসীরা তাদের সামন্ত প্ৰভুদের হাত থেকে আত্মশাসনের প্রাথমিক অধিকার কিনে অথবা কেড়ে নেবার পর নিজেদের নগর-সমাজের এই নাম দিয়েছিল। (১৮৯০ খ্রীস্টাব্দের জার্মান সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

৫. মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের পরবর্তী রচনাগুলিতে ‘শ্রমের মূল্য’ ও ‘শ্রমের দামে’র পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন মার্কসের প্রবর্তিত আরো যথাযথ শব্দ ‘শ্রমশক্তির মূল্য’ ও ‘শ্রমশক্তির দাম’। 

৬. কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসের এই অনুবাদটি নেয়া হয়েছে ২০১৪ সালে ঢাকার সংঘ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটি থেকে, যদিও বানান এবং কিছু বাক্যের উন্নতি সাধন করেছে রোদ্দুরে

কমিউনিস্ট ইশতেহারের সূচিপত্রে যান এই লিংক থেকে

আরো পড়ুন:  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তার ইতিহাস ও ফলাফল
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top