ভূমিকাঃ বাংলাদেশের পাখির তালিকায় Dendrocygna গণে ২টি প্রজাতি রয়েছে এবং পৃথিবীতে রয়েছে ৮টি প্রজাতি। বাংলাদেশের প্রজাতি দুটি হচ্ছে রাজ শরালি এবং পাতি শরালি। আমাদের আলোচ্য পাখিটি হচ্ছে পাতি শরালি।
বর্ণনা: পাতি শরালি কালচে-বাদামি রঙের লম্বা ঘাড়ওয়ালা হাঁস (দৈর্ঘ্য ৪২ সেমি, ওজন ৫০০ গ্রাম, ডানা ১৮.৭ সেমি, ঠোঁট ৪ সেমি, পা ৪.৫ সেমি, লেজ ৫.৫ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির ধূসরাভ ও পীত রঙের মাথায় গাঢ় বাদামি টুপি; ঘাড়ের উপরিভাগ ধূসর পীতাভ; ওড়ার পালক কালচে; ডানার আগা, কোমর, ও লেজ-ঢাকনি উজ্জ্বল তামাটে; বগল হালকা হলুদ; পিঠে আঁইশের মত দাগ; হালকা হলুদ তলপেটসহ দেহতল তামাটে। এর চোখ মলিন বাদামি, ঠোঁট স্লেট-ধূসর ও চোখের পাতা উজ্জ্বল হলুদ; পা ও পায়ের পাতা ফ্যাকাসে-নীল; আঙুলের পর্দা ও নখর কালচে। পুরুষ ও স্ত্রীপাখির চেহারা অভিন্ন। অনুজ্জ্বল অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহতল ধূসরাভ-পীতাভ।[১]
স্বভাব: পাতি শরালি মিঠাপানির পুকুর, বিল, ঝিল, নদীতীর ইত্যাদি অগভীর জলাশয়ে বিচরণ করে; সাধারণত ঝাঁকে থাকতে দেখা যায়। রাতে জলমগ্ন জমিতে অল্প ডুব দিয়ে, সাঁতরে বা হেঁটে এরা আহার খোঁজে; খাদ্যতালিকায় আছে জলজ আগাছা, কচিকা-, শস্যদানা, মরা মাছ, পোকামাকড় ও জলজ অমেরুদন্ডী প্রাণী। দিনে এরা পানিতে, মাটিতে অথবা গাছে বিশ্রাম নেয় অথবা ঘুমায়। ওড়ার সময় এদের ডানার বিশেষ পালক থেকে নূপুরের মত ঝন্-ঝন্ শব্দ হয়; তা ছাড়া সাধারণত শিস দিয়ে ডাকে: হুই-হুয়ি..। জুন-অক্টোবর মাসের প্রজনন ঋতুতে গাছের গর্তে, তাল ও নারকেল গাছের মাথায়, নলবনে ও জলবেষ্টিত ঝোপে লতাপাতা ও ঘাস স্তূপ করে বাসা বেঁধে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ৭-১২ টি, মাপ ৪.৭-২.৬ সেমি। স্ত্রীপাখি একা ডিমে তা দেয়; ২২-২৪ দিনে ডিম ফোটে। পুরুষ ও স্ত্রীপাখি উভয়ে মিলে ছানা পাহারা দেয়।[১]
বিস্তৃতি: পাতি শরালি বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি; শীতে অনেক পরিযায়ী পাতি শরালি এ দেশে আসে; দেশের সব বিভাগের সব জলাশয়ে এদের দেখা যায়। পৃথিবীতে এর বিস্তৃতি দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, চিন, তাইওয়ান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোচিন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
অবস্থা: পাতি শরালি বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা কমছে, তবে এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছেনি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।[২] বাংলাদেশের ১৯৭৪[১] ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত।[৩]
বিবিধ: পাতি শরালির বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ জাভা দ্বীপের বৃক্ষবাসী-হাঁস (গ্রিক : dendron = বৃক্ষ, cygnus = হাঁস, javanica = জাভা দ্বীপের, ইন্দোনেশিয়া)।
আরো পড়ুন
- পাতি মার্গেঞ্জার বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- স্মিউ হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- পাতি সোনাচোখ বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- বেয়ারের ভুতিহাঁস বিশ্বে মহাবিপন্ন এবং বাংলাদেশের বিরল পরিযায়ী পাখি
- পাতি ভুতিহাঁস বিশ্বে বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- টিকি হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- মরচেরঙ ভুতিহাঁস বিশ্বে প্রায়-বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- বড় স্কপ বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- গোলাপি হাঁস পৃথিবী ও বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত পাখি
- ধলা বালিহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি
- মান্দারিন হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- পিয়াং হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- গিরিয়া হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- দেশি মেটেহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি
- নীলমাথা হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের বিরল পরিযায়ী পাখি
- ইউরেশীয় সিঁথিহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী হাঁস
- বৈকাল তিলিহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- ফুলুরি হাঁস বিশ্বে প্রায়-বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের বিরল পরিযায়ী পাখি
- পাতি তিলিহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- উত্তুরে খুন্তেহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- নাকতা হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত ও বাংলাদেশে মহাবিপন্ন পরিযায়ী পাখি
- বাদি হাঁস বিশ্বে বিপন্ন এবং বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখি
- পাতি চকাচকি বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- খয়রা চকাচকি বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
- দাগি রাজহাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি
- মেটে রাজহাঁস বিশ্বে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের বিরল পরিযায়ী পাখি
- বড় ধলাকপাল রাজহাঁস বিশ্বে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি
- পাতি শরালি বিশ্বে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি
- রাজ শরালি বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি
তথ্যসূত্র:
১. মো: আনোয়ারুল ইসলাম ও মো: শাহরিয়ার মাহমুদ, (আগস্ট ২০০৯)। “পাখি”। আহমাদ, মোনাওয়ার; কবির, হুমায়ুন, সৈয়দ মোহাম্মদ; আহমদ, আবু তৈয়ব আবু। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ২৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা -১৩-১৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।
২. “Dendrocygna javanica“, http://www.iucnredlist.org/details/22679758/0, The IUCN Red List of Threatened Species। সংগ্রহের তারিখ: ২৩ আগস্ট ২০১৮।
৩. বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, জুলাই ১০, ২০১২, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা-১১৮৪৪৯।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১২টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।