আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > শিল্প > অযান্ত্রিক চলচ্চিত্র মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের প্রকাশ

অযান্ত্রিক চলচ্চিত্র মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের প্রকাশ

অযান্ত্রিক

চলচ্চিত্র জগৎতে ঋত্বিক ঘটক মানেই গতানুগতিক চিন্তাধারার উর্ধ্বের ব্যক্তিত্ব। তিনি বলতেন শিল্প হতে হবে সত্য, সুন্দর, বস্তুনিষ্ঠ। নাগরিক ছিলো তার প্রথম চলচ্চিত্র। যা মুক্তি পেয়েছে মৃত্যুর দেড় বছর পড়ে। বিষয়টা খুবই পীড়াদায়ক ছিলো তার জন্য। সমাজের এমন কিছু বাস্তবতাকে সেলুলয়েডে বন্দি করতে চেয়েছে ও করেছে যা সমসাময়িক শাসকদের জন্য হুমকির ছিলো। সেই কারণে নানা বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিজের বাহ্যিক আচরণ ও অবাণিজ্যিক কাহিনী নির্বাচনের কারণে প্রযোজক তেমন পেতেন না। তাই মাঝ পথে অনেক কাজ থেমে গিয়েছে। ‘নাগরিক’ চলচ্চিত্র মুক্তি না পাওয়ায় ব্যথিত হয়েছিলেন। এরপরে প্রায় ছয় বছর কোন নতুন চলচ্চিত্র হাতে নেন নি। এরপরে ‘অযান্ত্রিক’ ছবিটি পরিচালনা করেন।

সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের ছোটগল্প ‘ফসিল’ যার বিষয়বস্তুর বৈচিত্র ও ব্যতিক্রমী আঙ্গিকের কারণে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছেন। সেই ফসিল গল্প থেকেই ‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্র রূপ নেওয়া হয়েছে। ‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্র বিশ্বদরবারে বেশ সাড়া ফেলেছিলো। চলচ্চিত্রকার হিসাবে ঋত্বিক ঘটকের এক নতুন পরিচয় প্রকাশ পায়। তার চিন্তার দীপ্তি, সুক্ষ্মতা, স্বতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ‘অযান্ত্রিক’।  উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে ভিন্ন মাত্রার সংযোজন হয়। যদিও এটি ছিলো ঋত্বিকের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। প্রথমটি নাগরিক, ১৯৫২ সালে নির্মিত হলেও মুক্তির আলো দেখে ‘৭৬ সালে ঋত্বিকের জীবনাবসানের পর। তাই প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি হিসাবে এটাকেই ধরা হয়। ব্রিটিশ অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র সমালোচক মারী সিটন বলেছিলেন, ‘ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে চিন্তাসমৃদ্ধ এবং সবচেয়ে সংহত চিত্র সৃষ্টি হলো অযান্ত্রিক। ভবিষ্যতই প্রমাণ করবে যে ছবিটি খুবই উঁচু জাতের। এর কাহিনী একেবারে নতুন ধরনের, কিছুটা অদ্ভুতও’। 

অযান্ত্রিক ভিন্ন আঙ্গিকেই তৈরি করা। এই চলচ্চিত্রের জন্য ঋত্বিক অনেক সময় পেয়েছিলেন। জীবনে নানা ঘটনা, চড়াই উতরাই, বেদনা থেকে উঠে নতুন ভাবে বাঁচার প্রেরণা নিয়ে চলচ্চিত্র জগৎতে ফিরে আসেন। তারই অসাধারণ ফলাফল হলো এই ছবি। অযান্ত্রিক ছিল একটা Sheer experimental ছবি। এটা সম্পর্কে ঋত্বিকের নিজে বলেন, সর্বজনগ্রাহ্য বস্তুর মধ্যে দিয়ে ব্যাপারটিকে টেনে আনতে পারিনি। কিন্তু উপায়ও ছিল না। বিষয়বস্তু এবং পটভূমিকার কারণে। কাজেই esoteric হয়ে থাকতে হলো সাধারণ গ্রাহ্য হওয়া গেল না’।[১] 

আরো পড়ুন:  মেঘে ঢাকা তারা চলচ্চিত্র: কলকাতার অর্থনীতি ও উদ্বাস্তুর জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি

‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্রটি ঋত্বিকের এক অনবদ্ধ সৃষ্টি। দেশ ভাগের পড়ে একদিকে বাংলার বুকে হাহাকার, অশিক্ষা, কুসংস্কার অন্যদিকে বোম্বে ‘যান্ত্রিক শহরের সমস্ত পচা নোংরামি’ ক্রমশ ঋত্বিকে পাগল করে তুলেছিলো; তখনই ‘বাংলায় একটি ছবি পুর্ণ করার সুযোগ’ পেয়ে গেলেন। তিনি সেইসময় সুযোগটির অপব্যবহার করেন নি। দ্বন্দ্বিক বস্তুবাদকে প্রযোগ করেছেন চলচ্চিত্রটিতে। যন্ত্রের সাথে মানুষের যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সেটাকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন ছবিতে।[২] 

নতুন কোনো যন্ত্র সম্পর্কে সাধারণ জনগণের অন্য রকম ভীতি থাকে। এটা জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেই হয়। সেইজন্য নানাভাবে যন্ত্রকে ভক্তি করে। তাই সেই যন্ত্রের মধ্যে মানবিকতা আরোপ করার মনোভাব অতি প্রাচীন এক ঐতিহ্য। ভারতবর্ষে ট্রেন আগমনের পর বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় কর্তৃক ট্রেনকে বিশেষ এক দানব ভেবে তাকে তুষ্ট করার জন্যে বিভিন্ন পূজাযজ্ঞ ইত্যাদি করাকে অপদেবতাকে সন্তুষ্ট করার বিষয়টি তুলে ধরে। এসব সংস্কার কুসংস্কারের মাধ্যমে যন্ত্রের প্রতি অযান্ত্রিকতা আরোপের বিষয়টিই প্রতিভাত হয়। ঋত্বিক বলছেন-

‘আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যে বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে আমরা যদি আবার অনুপ্রবেশ না করি তাহলে কোন জাতীয় শিল্পই গড়ে উঠতে পারবে না। পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিকরা আমাদের দেশে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছিল বলেই আমাদের এই সার্বিক, অবৈজ্ঞানিক উদাসীনতা। পশ্চিমী জীবনের শূন্যতাবোধও অনেকখানিই আমাদের মনোজগতে বিপরীত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বস্তুত মূল্যবোধের এই দ্বান্দ্বিকতার ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্রের পটভূমি।

যন্ত্রের প্রতি মানুষের ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন ও সীমিত ক্ষমতার অক্ষমতার কারণে তার ওপর অনাস্থার প্রতিস্থাপন এই দ্বান্দ্বিকতায় যা কিনা মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঋত্বিক ঘটকের অযান্ত্রিকে একটি ভগ্নপ্রায় পুরোনো গাড়ি ও তার চালককে ঘিরে গড়ে উঠছে এ ছবি। গাড়ি জগদ্দল ও তার চালক বিমল এই দুজনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের পরতে পরতে বিস্তৃত হয়েছে মানবতার জয়গীতি। এখানে গাড়ি জগদ্দল একটি মানবীয় চরিত্রে রূপান্তরিত হয় আর দানবের বেশে আসে তাকে কেনার পর ভাঙতে আসা মাড়োয়ারী লোহালক্কড় ব্যবসায়ীটি । জগদ্দল আর বিমলের পারস্পরিক সম্পর্কটা মানবিক হয়ে ওঠে। এজন্য বিমল সুন্দরী যাত্রীর ইশারাকে অস্বীকার করে অবলীলায়। পরিবার পরিজনহীন ছন্নছাড়া বিমল তার নিজের গাড়ি ‘জগদ্দল’এর ড্রাইভার। প্রাণের চাইতে বেশি ভালোবাসে গাড়িকে। আদর করে হাত বুলায় তার শরীরে। সাজায় মনোমতো। কথা শুধোয় । অভিমান করে। বিমলের এসব দেখে অনেকেই হাসে। কিন্তু বিমলের এসবে ভ্রূক্ষেপ নেই। জগদ্দলকে কেউ কিছু বললে সে তেড়ে আসে। নতুন শিফন গাড়ি, রেলগাড়ির চেয়ে আগে চলতে পারে জগদ্দল। বিমলের জীবনের না পাওয়া, দুঃখ, বেদনা সব কিছুকে ভুলিয়ে দেয় জগদ্দল। যন্ত্র হলেও বিমলের কাছে সে আপন জন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বস্ব দিয়েও যখন সারিয়ে তুলতে পারেনা, তখন মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীর লোহালক্কড়ের কারখানায় সস্তা দামে বেচে দিতে হয়। জগদ্দলকে ভেঙ্গে টুকরো করার শব্দে কেঁপে কেঁপে ওঠে বিমল। শেষ পর্যন্ত দেখে একটি শিশু হাতে গাড়ির হর্ণ  নিয়ে খেলার ছলে বাজাচ্ছে। তা দেখে বিমল অনেকটাই আশান্বিত হয়। সে কল্পনা করে জগদ্দল তাকে দেখে হাসছে, কথা বলছে, ডাকছে।[৩] 

আরো পড়ুন:  শিল্প ও সততা

বিমল ও জগদ্দলের সম্পর্কে ঋত্বিক দিয়েছে পুর্ণাঙ্গ প্রেম। চলচ্চিত্রে দেখা যায় পাগলটির একমাত্র সম্বল গামলাটি যখন গাড়ির নিচে পড়ে চ্যাপটা হয়ে যায় তখন সে অকূল পাথারে কাঁদে। কিন্তু পরে সে যখন আরেকটি নতুন গামলা পায় তখন পুরনোটির স্মৃতি ভুলে আঁকড়ে ধরে নতুনটিকে। কিন্তু শত বিদ্রুপ আর যন্ত্রণার পরেও বিমল তার জগদ্দলকে ছাড়ে না। পুরনো স্মৃতিকে আঁকড়ে থাকে সে। ঋত্বিক ঘটকের দীর্ঘবছরের চিন্তার ফসল অযান্ত্রিক। ঋত্বিকের ভাষ্য- 

আমরা বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যের অন্বেষণ না করে বস্তুর বাহ্যিক প্রকাশগুলোকেই একমাত্র সত্য হিসেবে মনে করেছি। কিন্তু ভারতবর্ষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই রক্ষণশীল মনোভাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না। প্রযুক্তিবিদ্যার নবতম আবিষ্কারকে বাঁধতে হবে ঐতিহ্যের সঙ্গে। আর তার সঙ্গে যন্ত্রের আত্মিক যোগসূত্রের। 

অযান্ত্রিকের প্রধান বিষয়বস্তু the law of life; যেটাকে আমরা জীবনের নিয়ম বলতে পারি। পাগলের নতুন গামলা পেয়ে পুরোনোটিকে ভুলে যাওয়ার সেই নিষ্ঠুর দৃশ্য এবং সর্বশেষে এক শিশুর হাতে জগদ্দলের ক্রিংকার ধ্বনি, যাতে বিমলকে উপলব্ধির হাসিতে ভুলিয়ে দিয়েছিল। সেই কথাই প্রকাশ করছে। পুরনোকে ভুলে যাওয়া নিষ্ঠুর হলেও বাস্তবতা হলো স্বাভাবিক সুন্দর জীবন যাপন করতে ভুলে যাওয়াটাই প্রযোজন। এটা সময়ের দাবি। 

তথ্যসূত্র:

১. ঋত্বিক কুমার ঘটক, চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, “চলচ্চিত্র চিন্তা” দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ নভেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা, ১৪৪-১৪৮।

২. নয়ন আচার্য, শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য সম্পাদিতঃ সাক্ষাৎ ঋত্বি, ‘‘অযান্ত্রিক’’ দীপায়ন, কলকাতা, প্রথম  প্রকাশ ২০০০, পৃষ্ঠা, ২২৭।

৩. শৈবাল চৌধুরী, সাজেদুল আউয়াল সম্পাদিত, ঋত্বিকমঙ্গল, “চিরায়ত চলচ্চিত্র: অযান্ত্রিক”- থেকে উদ্ধৃত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জুন ২০০১, পৃষ্ঠা, ৩৫১-৩৫৫।

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page