আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > শিল্প > সঙ্গীত > কবিগান হচ্ছে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে কবিয়ালদের গাওয়া গান

কবিগান হচ্ছে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে কবিয়ালদের গাওয়া গান

কবি গান

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ হতে আরম্ভ করে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত কবিয়াল নামক এক ধরনের গীত ব্যবসায়ী যে, সংগীত দ্বারা বাংলার জনসাধারণের সকল কৌতুহল আকর্ষণ করেছিল তাই কবিয়ালের গান বা কবিগান (ইংরেজি: Kobigaan) বলে পরিচিত।[১] কবিয়ালদের লোকসংগীতের এই ধারা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে এসেছে।

কবিগান বিশেষ কোন কবিয়াল স্বয়ং রচনা করে থাকে। গ্রাম বাংলার স্বশিক্ষিত মানুষের মধ্যে কবি প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে স্বাভাবিক সহজাত নিয়মে। তাদের কেউ হয়ে যান পল্লী কবি, কেউবা আখ্যানমূলক পৌরাণিক বিষয় সম্বলিত গানের অধিকার অর্জন করেন। এ কথাও মিথ্যা নয় যে, বহু উচ্চ শিক্ষিত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরাও কবি দল গঠন করে বিখ্যাত হয়েছিলেন।[২]

কবিয়ালের রচনা ও গাওয়া রীতির মধ্যে অনেক সময় লৌকিক রূপ আরোপ করে থাকে। রাধা-কৃষ্ণের স্বর্গীয় লীলা কাহিনী তাদের মধ্যে স্বর্গীয়তার পবিত্র বন্ধন হতে মুক্তি লাভ করে তার পরিবর্তে পার্থিব রস ও রুচি দ্বারা পরিপুষ্টি লাভ করেছিল। বৈষ্ণব পদাবলীর শেষ অধঃপতিত নাগরিক রূপ হচ্ছে এই কবিগান। এই বিস্তৃত সময়ের মধ্যে বহু সংখ্যক খ্যাত ও অখ্যাত কবিওয়ালার নাম ও তাহাদের রচিত সঙ্গীতের সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলার পল্লী অঞ্চলে বহু অজ্ঞাতনামা কবিওয়ালাও এই সঙ্গীত রচনা করিয়া সাধারণ লোকের মনোরঞ্জন করেছিল। তাদের রচনা অনাবশ্যক ভাষার আড়ম্বর এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাব দ্বারা ভারাক্রান্ত—স্বতঃস্ফুর্ত কবিত্বের অভাব তাদের ব্যাপক প্রচারের অন্তরায়।

কবিগানের মতো তর্জা গানও চাপান-উতোরের মাধ্যমে খুবই আকর্ষণীয় হয়। আগে কবিগানের মধ্যেই, তর্জাগান থাকায় দুই দলের মধ্যে প্রশ্নোত্তর বাচক ছড়াজাতীয় গান হতো। কিন্তু এখন কবিগানের দল থেকে তর্জা গান আলাদা গিয়ে স্বাধীন ভাবে গীত হয়। তর্জাগানে একজন ছড়াদার প্রশ্ন করে অপর জন তার উত্তর দেয়। কবিগান ও তর্জা গান সাধারণত পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, উত্তর-দিনাজপুর, দক্ষিণ-দিনাজপুর, নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম-মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হাওড়া, উভয় ২৪ পরগনা জেলাতে প্রচলিত আছে। তবে এই গানের আসর এখন খুব বেশি অনুষ্ঠিত হয় না। আগে পূজা-পার্বনে ধনীদের বাড়ীতে, বা গ্রাম্য পূজায় কবিগান হতো। কবিগানের বিষয়-বস্তু পৌরাণিক হলেও সামাজিক ও সাধারণ মানুষের জীবনও এই গানের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। কবিগানে সংগীতের মাধ্যমেই প্রশ্ন-উত্তর, উক্তি-প্রত্যুক্তি জনসাধারণকে মজা দেয়। দুই দলের দুইজন মূল কবিয়ালের লড়াই যখন জমে উঠে, তখন শ্রোতা-দর্শকরা মনোযোগ দিয়ে তা অনুধাবন করে।

আরো পড়ুন:  লোকসংগীত গ্রামীণ সংগীতের ধারা যা বিশ শতকের লোক পুনর্জাগরণের সময়ে উদ্ভূত

তথ্যসূত্র

১. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বঙ্গীয় লোক-সঙ্গীত রত্নাকর, প্রথম খন্ড, এ মুখার্জি এন্ড কোম্পানি প্রা. লিমিটেড, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা ৪৮১।
২. দিনেন্দ্র চৌধুরী, গ্রাম নগরের গান (১৮০০-২০০৫) লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০০৯, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page