আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বাংলাদেশ > বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস

আসামের ইতিহাস বাংলার ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাস (ইংরেজি: History of Bangladesh) হচ্ছে ১৭০৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই সংগ্রাম ও মুক্তি সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস। ১৭০৪ সালে সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়। এ ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই যে, এর ফলে বিগত শত বর্ষে মুগল রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব লাভ করেছিল তার অবসান ঘটে। মুগল সেনাবাহিনী, সুবাদারি প্রতিষ্ঠানাদি, আমির-ওমরাহ, প্রশাসনিক শ্রেণি, বিপুল আমদানি রপ্তানি প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল তার অবলুপ্তি ঘটে রাজধানী স্থানান্তরের ফলে। পূর্ব বাংলা পরিণত হয় মুগল সাম্রাজ্যের এক অবহেলিত প্রান্তিক অঞ্চলে। অপর দিকে, ঢাকার ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন মহানগরী হিসেবে আবির্ভূত হয় মুর্শিদাবাদ। অতএব, ১৭০৪ পূর্ব বাংলার ইতিহাসে একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ তারিখ। স্বাধীন নবাবি যুগেরও গােড়াপত্তন হয় এই সনে, যখন দীউয়ান মুর্শিদকুলী খান সুবা বাংলার প্রকৃত স্বায়ত্তশাসকে পরিণত হন। সুতরাং বাংলাদেশের ইতিহাস বা পূর্ব বঙ্গের ইতিহাসের প্রারম্ভিক কাল হিসেবে ১৭০৪ একটি যুক্তিসঙ্গত মাইলফলক। আবার পূর্ব বঙ্গ সার্বভৌম নয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয় ১৯৭১ সালে।

নবাবি আমল থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত এ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রধান প্রধান ধারা-প্রবণতাগুলাে সনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ বাংলাদেশের ইতিহাসের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আঠারাে শতককে সমান দু’ভাগে ভাগ করা যায়—এর প্রথমার্ধে নবাবি শাসনের উত্থান ও বিকাশ এবং দ্বিতীয়ার্ধে নবাবি শাসনের পতন এবং বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা। গােটা উনিশ শতক ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের উন্মেষপর্ব। বিশ শতকের রাজনীতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিকগুলাে হচ্ছে বৃটিশবিরােধী আন্দোলন, শাসনতান্ত্রিক হস্তান্তর ও আপোষ, মুসলিম-হিন্দু ঘৃণা, সর্বভারতীয় বাঙালি বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং পরিশেষে বাংলা ও ভারত বিভাগ। বিভাগােত্তর যুগের রাজনীতির লক্ষণীয় দিক হচ্ছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের বদলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শােচনীয় এবং চূড়ান্ত পরাজয় ছিল আসলে বাঙালি বিদ্বেষের আর কথিত মুসলিম জাতীয়তাবাদেরই পরাজয়। বাঙালি জাতীয় সত্তা সংরক্ষণের প্রতিজ্ঞা প্রথম প্রকাশ পায় ভাষা আন্দোলনে ও মুসলিম লীগের পরাজয়ে এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে।[১]

আরো পড়ুন:  মুঘল আমলের পরাধীন বাংলা হচ্ছে স্বাধীন সুলতানি আমল পরবর্তী ২০০ বছরের মুঘল শাসন

বাংলাদেশে ক্ষুদে মালিকানার বিকাশ

বাংলাদেশে ১৯৫০-এর দশকে জমিদারী বিলুপ্ত হয়ে কৃষক কিছু জমির মালিক হয়েছিল। এর ফলে কৃষকের সাময়িক লাভ হয়েছিল নিশ্চয়। কৃষক জমি পেলে সাময়িক লাভ হয়। কিন্তু কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন না হলে কী কৃষক মুক্ত হতে পারেন? জমিদারি প্রথা উচ্ছেদকেই উচ্চ রবে সমর্থন করলে, এবং অবশ্যই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি থেকে, তাহলে তাতে অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। ফলে ১৯৭০-এর দশক থেকেই জমির মালিকানা নিয়ে গেছে বড় মালিকেরা, সব শহরেই রিয়েল এস্টেট প্রকল্প খুলেছে ঊর্ধ্বমুখী দালান তোলার। যে বাঙালি উগ্র জাতীয়তাবাদের আস্ফালন বাংলাদেশে দেখা যায় তা মূলত এই ক্ষুদে মালিকদের বৃহৎ মালিকানা দখলের আস্ফালন এবং জনগণকে অবিরাম নিপীড়নের ইতিহাস।

কমিউনিস্টদেরকে তো সামাজিক মালিকানার কথা বলতে হয়েছে। ঐটা না বললে তো কমিউনিস্ট থাকা যায় না। আর জমিদারী উচ্ছেদ হয়ে বাংলাদেশ-ভারতে ক্ষুদে মালিকানা বেড়েছে। ক্ষুদে মালিকানা বাড়লে তো বড় মালিকানাও বাড়বে। যেহেতু দেশটা শিল্প কারখানায় উন্নত হলো না, ফলে মুৎসুদ্দি পুঁজি বাড়লো। এখনকার কৃষকরা যে ভয়ংকর নিপীড়নের আর ফসলের ন্যায্য মূল্যহীনতার শিকার, তার কারণ, বৈজ্ঞানিক দিক দিয়ে অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ না করা। যেসব নেতা কমিউনিজমের বিরোধীতা করতে গিয়ে কেবল জমিদারী উচ্ছেদকেই বড় করে দেখেছিলেন তারা মুৎসুদ্দি মালিকানার পক্ষে কথা বলেছিলেন, দেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন।

ব্রিটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত হিন্দুবিদ্বেষ আর ইসলামবিদ্বেষের মূল নীতিটি ছিল একত্রে বাঙালি বিদ্বেষ। কারণ এই দুটো বিদ্বেষেরই নির্মাতা ছিলো ব্রিটিশরা, সাথে পেয়েছিল স্বাধীনতার শত্রু কংগ্রেস আর মুসলিম লিগকে। হিন্দুবিদ্বেষ আর ইসলামবিদ্বেষ তো মূলত বাঙালি বিদ্বেষ, যাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা গেছিল বাঙালি বিদ্বেষী মাড়োয়ারি-গুজরাটি-পাঞ্জাবিদের ঘরে। কারণ হিন্দু-মুসলিম খেলা খেলিয়েই তো বাংলা আর ভারত ভাগ করে কংগ্রেস-মুসলিম লিগ ক্ষমতায় বসেছিল। ফলে যারা আজো হিন্দু-মুসলিম খেলা খেলে তারা মাড়োয়ারি গুজরাটি পাঞ্জাবীদের পক্ষে কথা বলে। তারাই মূলত বাঙালি, বাংলাদেশের ছোট ছোট জাতিসমূহ এবং বাংলাদেশের শত্রু।

আরো পড়ুন:  অনুশীলন সমিতি ছিল বাংলার বিপ্লববাদী উপনিবেশবাদবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন

অনুশীলন যুগান্তর দলের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা এবং কমিউনিস্ট পার্টির বিরামহীন স্বাধীনতার সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে প্রশস্ত করে। বাংলাদেশ আজো কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন শক্তির বদৌলতে জনগণকে মুক্তির পথে চালিত করছে। বাংলার জনগণের মুক্তির সংগ্রাম হচ্ছে অনুশীলন-যুগান্তর-কমিউনিস্ট পার্টির বিরামহীন সংগ্রাম। এই তিন সংগঠনের বিরোধীতা মানে ব্রিটিশরা যা চেয়েছে, সাম্রাজ্যবাদীরা যা চেয়েছে তাকেই সমর্থন করা; মানে কংগ্রেস আর মুসলিম লিগকে মেনে নাও। ইতিহাসের চাকাকে আরেকটু আগালে দেখা যাবে সেই কথার মানে বিজেপি কংগ্রেস-আওয়ামি বিএনপিকে মেনে নাও। বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে কমিউনিজমের পথে লড়াইয়ের ইতিহাস।

তথ্যসূত্র

১. সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট, প্রথম খণ্ড, মিত্র ঘোষ এন্ড পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১-৩

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

One thought on “বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page