বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে ঘড়িয়াল দশটির কম এবং বিশ্বে এটি মহাবিপন্ন প্রজাতি

ভূমিকা: ঘড়িয়াল (বৈজ্ঞানিক নাম: Gavialis gangeticus ইংরেজি নাম: Gharial বা Gavial) ক্রোকোডিলিয়া বর্গের সরীসৃপের একটি প্রজাতি। বাংলাদেশের সরীসৃপগুলোর যে তালিকা রয়েছে তাতে ঘড়িয়াল এক অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণী। ঘড়িয়াল বাংলাদেশ ও বিশ্বে মহাবিপন্ন প্রজাতি। বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে ঘড়িয়াল আছে দশটির কম। আমরা কী বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রাণীটিকে ফিরিয়ে আনতে পারি না।

বাংলাদেশে ঘড়িয়ালের ইতিহাস: এক সময় পদ্মা ও যমুনা নদীতে প্রচুর ঘড়িয়ালের আনাগোনা ছিল। একদল বন্য প্রাণী গবেষক ১৯৯০ সালের দিকে সর্বশেষ পদ্মার উচ্চ অববাহিকায় একটি মাত্র ঘড়িয়ালের সাক্ষাৎ পেয়েছে। গবেষকদল সেদিন ঘড়িয়ালের ডিম সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। পরে ডিম ফোটাতে পেরেছে কি না তা জানা যায়নি। একই সালে একই স্থানে জেলেদের জালে চারটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা ধরা পড়েছে। তারপর থেকে এ প্রাণীটি বাংলাদেশের নদ-নদীতে আর দেখা যায়নি। মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রকৃতিতে আর কোনো ঘড়িয়াল নেই।

ঘড়িয়াল উদ্ধার: ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপকরা পদ্মার চরে একটি বাচ্চা ঘড়িয়ালের সন্ধান পান। পরে সেটিকে কক্সবাজারের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে অবমুক্ত করা হয়। ২০০৯ সালে পদ্মা নদীর জেলেদের জালে আটকা পড়ে আরো একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা। সেটিকে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রাখা হলেও পরে সেটি মারা যায়। ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পাচারকালে ঢাকা বিমানবন্দরে প্রায় এক হাজার কচ্ছপের সঙ্গে একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চাও উদ্ধার করা হয়। সবশেষ ২০১০ সালের ৩১ অক্টোবর মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরুয়া ইউনিয়নসংলগ্ন পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে আটকা পড়ে আরো একটি বাচ্চা ঘড়িয়াল। পরদিন আড়াই ফুট দীর্ঘ ও দেড় বছর বয়সী ঘড়িয়ালটিকে আবার পদ্মাতেই অবমুক্ত করা হয়। এছাড়া ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ শিলাইদহের কাছে, কুষ্টিয়াতে পদ্মা নদীতে ধরা পড়ে একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা। ২১ সেপ্টেম্বর ২০১১ বুধবার রাজবাড়ি জেলার সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়ন এর আম্বারিয়া চরের পদ্মা নদীতে ওরাকান্দা গ্রামের আমজাদ হোসেনের জালে আটকা পড়ে একটি ঘড়িয়াল। তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার ও ফরেস্টার ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ঘড়িয়ালটি উদ্ধার করেন। আনুমানিক দুই বছর বয়সী ঘড়িয়ালটি লম্বায় ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি, ওজন ৪.৫ কেজি। এছাড়া গত ৩০ মে ২০১৩ রাজশাহীর গোদাগাড়ি থেকে উদ্ধার করা ঘড়িয়াল ছানাটি চিড়িয়াখানা বা অন্য কোথাও সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় আবার পদ্মা নদীতেই অবমুক্ত করা হয়।

আরো পড়ুন:  গফরগাঁওয়ে গ্রাম সাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে প্রকৃতি রক্ষার জন্য মাসব্যাপী প্রচারণা
মায়ের পাহারায় ঘড়িয়াল ছানা, আলোকচিত্র: Sujoy Banerjee

ঘড়িয়াল কমে যাবার কারণ: বাংলাদেশ এবং ভারত দুদেশেই ঘড়িয়ালের ওপর অত্যাচার করে কিছু মানুষ। ওরা নানাভাবে ঘড়িয়াল শিকার করে ডিম ছিনিয়ে নিয়ে ওদের বংশবিস্তার রোধ করে দিয়েছে। চোরাই শিকারিদের কাছে ঘড়িয়াল অত্যন্ত লোভনীয় শিকার। শিকার করতে পারলে চড়াদাম পায় ওরা। সাধারণত ঘড়িয়ালের চামড়া দিয়ে লেডিস ব্যাগ, মানিব্যাগ, জুতা তৈরি হয়। আর এদের তেল ও চর্বি ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা হয়। ঘড়িয়াল দ্রুত বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে জেলেদের জালে ধরা পড়া। জেলেরা বাগে পেলেই ঘড়িয়ালদের নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। ওদের ধারণা এরা কুমিরজাতীয় প্রাণী এবং মানুষখেকো। আসলে ঘড়িয়ালরা মানুষখেকো হওয়া তো দূরের কথা, এগুলো মানুষের ধারে-কাছেও পারতপক্ষে ঘেঁষে না। এর কারণ ঘড়িয়াল শুধু মাছ, সাপ, ব্যাঙ ছাড়া অন্যকিছু খায় না। কালেভদ্রে জলজ পাখি খায়; অর্থাৎ মৎস্যভূক প্রাণী এগুলো। এভাবে ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেক ঘড়িয়ালকে জেলেদের হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

বাংলাদেশে ঘড়িয়ালের সংখ্যা: বর্তমানে ঢাকা চিড়িয়াখানায় ৪টি, রাজশাহী চিড়িয়াখানায় ৩টি, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পুকুরে ২টি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, কক্সবাজারে ১টি ঘড়িয়াল আছে।

বিবিধ: ২০০৭ সালে কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অব এনডেঞ্জার্ড স্পিসিস (সিটস) ঘড়িয়ালকে বিশ্বের অতিবিপন্ন প্রাণী হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছে। ঘড়িয়াল নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত, বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্ত। ২০০৬ সালের এক জরিপ অনুসারে ভারতে ২০০টি পূর্ণবয়স্ক ঘড়িয়াল টিকে আছে। এই প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভারতে ঘড়িয়ালের অন্তত ৯টি নিরাপদ আবাসস্থল ঘোষণা করা হয়েছে। আইইউসিএন-এর ২০০৬ সালের তথ্য মতে ৪৮% ঘড়িয়াল চম্বল নদীতে টিকে আছে। চম্বল নদীর অবস্থান উত্তর প্রদেশের আগ্রায়।

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঘড়িয়াল টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি জরুরিভিত্তিতে ভারত ও নেপালের মতো এ দেশে কৃত্রিম প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন।

আরো পড়ুন:  বাংলাদেশের নাটোরে পাখি শিকারি লাল মিয়ার কারাদণ্ড

ছবির ইতিহাস: তিন চার দিন বয়স্ক ঘড়িয়াল ছানারা সাতার কাটছে চম্বল নদীর অল্প জলে। পাশে তাদের মা-বাবারা খুব সতর্ক দৃষ্টিতে পাহারা দিচ্ছে। লেখক সুজয় ব্যানার্জি ১৫টি বাসায় আনুমানিক ৫০০ ঘড়িয়ালছানা দেখেছেন। সময়কাল আগস্ট, ২০১৩। খবর স্যাংচুয়ারি এশিয়া ডটকমের।

তথ্যসূত্র: ১. Sujoy Banerjee, IFS, “The First SwimSanctuary Asia Vol. XXXIII No. 4, August 2013, http://www.sanctuaryasia.com/magazines/features/9574-the-first-swim.html.

1 thought on “বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে ঘড়িয়াল দশটির কম এবং বিশ্বে এটি মহাবিপন্ন প্রজাতি”

Leave a Comment

error: Content is protected !!