আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > প্রাণী > কচ্ছপ > চীনা নরম খোলসধারী কচ্ছপ চাষ, প্রজনন ও চাষ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি

চীনা নরম খোলসধারী কচ্ছপ চাষ, প্রজনন ও চাষ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি

কচ্ছপ চাষ

কচ্ছপ চাষ (ইংরেজি: Turtle farming) হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ এবং কচ্ছপ লালনপালনের রীতি। প্রতিপালিত প্রাণী ভোজনবিলাসী খাবার, ঐতিহ্যবাহী ওষুধের উপাদান বা পোষা প্রাণী হিসাবে ব্যবহারের জন্য বিক্রি হয়। কিছু খামারগুলি অন্য খামারগুলিতে ছোট ছোট প্রাণী বিক্রিও করে, হয় বংশবৃদ্ধি করার মজুত হিসাবে বা আরও সাধারণভাবে সেখানে পুনরায় বিক্রয়ের জন্য আরও বড় আকারে লালনপালন করা হয়।

কচ্ছপ খামারগুলি প্রাথমিকভাবে মিঠা পানির কচ্ছপগুলি প্রতিপালন করে। মূলত, খাদ্যের উৎস হিসাবে চীনা নরম খোলস কচ্ছপ (ইংরেজি: Chinese softshell turtle, বৈজ্ঞানিক নাম: Pelodiscus sinensis) এবং পোষা ব্যবসায়ের জন্য বাহারি ধরনের (Pseudemys এবং Trachemys গণের কচ্ছপ) কচ্ছপ চাষ করা হয়। সুতরাং কচ্ছপ চাষকে সাধারণত জলজ চাষ হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

উল্লেখ্য বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে কচ্ছপ ধরা, শিকার, মারা, চাষ করা, বিপণন ইত্যাদি নিষিদ্ধ। ফলে এখানে কেবল চীনা নরম খোলসধারী কচ্ছপ এবং বিদেশী বাহারি দর্শনীয় কচ্ছপ চাষ করা যাবে।

চীনা নরম খোল কচ্ছপ চাষ পদ্ধতি

পরিচিতি

চীনা নরম খোলসধারী কচ্ছপ বা চীনা নরম খোল কচ্ছপ (বৈজ্ঞানিক নাম: Pelodiscus sinensis) এমন এক প্রজাতির নরম খোলসের কচ্ছপ যা চীনের (অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া থেকে হাইনান পর্যন্ত) স্থানীয়। এই প্রজাতির কচ্ছপকে চাষের জন্য কয়েকটি এশীয় দেশগুলিতে চালু করা হয়েছে, এবং বিস্তৃত পরিসরেও স্পেন, ব্রাজিল এবং হাওয়াই অঞ্চলে এদের সংখ্যা বেড়েছে।

চীনা নরম খোল কচ্ছপ একটি সংকটাপন্ন প্রজাতি, এটি আবাসস্থল হুমকির কারণে এবং কচ্ছপের স্যুপের মতো খাবার সংগ্রহের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। খাদ্য শিল্পকে সমর্থন করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন বিশেষত চীনে এই কচ্ছপের খামারি করা হয়েছে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কচ্ছপ।

ডিম সংগ্রহ ও পোনা উৎপাদন

চীনা নরম খোল কচ্ছপ ২-৩ বছর বয়সে ডিম দেয়। সাধারণত ২০০ বর্গমিটার বা অপেক্ষাকৃত বড় প্রজনন পুকুরে ৩:১ অনুপাতে স্ত্রী  ও পুরুষ কচ্ছপ মজুদ করে ভাল ফল পাওয়া যায়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে এর সারা বছর ডিম দেয়। এ প্রজাতি পর্যায়ক্রমে ১০-১৫টি ডিম ছাড়ে। পুকুরের এক পাড়ে ১.৫-২.৫  বর্গমিটার স্থানে ১৫-২৫ সেন্টিমিটার পুরু বালি বিছিয়ে তার ১.০-১.২ মিটার উপরে ছাউনি দিয়ে প্রজননের স্থান তৈরি করা হয়। কচ্ছপ প্রজনন স্থানে সহজে উঠার জন্য পানি হতে প্রজননের স্থান পর্যন্ত কাঠের তৈরি ঢালু সিঁড়ি স্থাপন করা হয়।

আরো পড়ুন:  বাংলাদেশের কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিমের তালিকায় আছে মোট ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ

চীনা নরম খোল কচ্ছপের প্রজননের স্থানে কচ্ছপের পায়ের দাগ ও গর্তের চিহ্ন দেখে প্রত্যহ সকালে বালির নীচ থেকে ডিম সংগ্রহ করে কাঠের বাক্সে ১-২ দিন রেখে দিলে নিষিক্ত ও অনিষিক্ত ডিম সনাক্ত করা যায়। নিষিক্ত ডিমের মাথায় সাদা মুকুট তৈরি হয়। অন্যদিকে অনিষিক্ত ডিমের খোলসে সাদা দাগ দেখা যায়। অতঃপর নিষিক্ত ডিমগুলোর সাদা মুকুট উপরের দিকে রেখে হ্যাচারীতে রাখা বালির স্তুপে প্রতিটি ১-২ সেন্টিমিটার দূরত্বে বসিয়ে ৫ সেন্টিমিটার পুরু বালি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। ডিমের সাদা মুকুট উপরের দিকে না রাখলে ডিম ফোটার হার কমে যায়। ডিম ফোটার স্থানে সরাসরি সূর্যালোক ও বৃষ্টি পড়তে না দেয়া বাঞ্ছনীয়। সাধারণত ২৫ ডিগ্রী – ৬০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৪৫-৬০ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। ডিম ফোটার স্থানের এক প্রান্তে অল্প গভীরতায় পানি রাখলে ডিম থেকে বাচ্চা বেরিয়ে গিয়ে পানিতে আশ্রয় নেয়। সদ্য প্রস্ফুটিত বাচ্চার দেহের দৈর্ঘ্য ২-৩ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২-৪ গ্রাম হয়ে থাকে ।

মালয়েশিয়া ও সিংগাপুরে কচ্ছপের বাচ্চা লালনের কৃত্রিম খাদ্য পাওয়া যায়। কৃত্রিম খাদ্য ছাড়াও মাছ, কেচোঁ ও মুরগির মাংস খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এরা আট  সপ্তাহে ৪-৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৯-১৯ গ্রাম ওজনের হয়। এদের দৈহিক বৃদ্ধির হার পানির গুণাগুণ, মজদ ঘনত্ব এবং খাদ্যের গুণগতমানের উপর নির্ভর করে। বাচ্চার দৈহিক আকারে তারতম্য দেখা দিলে বড়গুলোকে আলাদাভাবে লালন করতে হয়। তা না হলে এদের মধ্যে স্বখাদকতা বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। বাচ্চার দৈর্ঘ্য ১০-১২ সেন্টিমিটার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লালন পুকুরে মজুদ রাখা হয়।

মজুদ পুকুরে কচ্ছপ কচ্ছপ চাষ কৌশল

উন্নত ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে মজুদ পুকুরের আকার ২০০-১০০০ বর্গমিটার এবং পানির গভীরতা ৫০-৭০ সেন্টিমিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুকুরের পাড়ে বেড়া দিয়ে কচ্ছপের বহির্গমন পথ বন্ধ করতে হয়। পুকুর শুকিয়ে তলায় চুন প্রয়োগ করে পানি সরবরাহ দিয়ে প্রতি বর্গমিটারে ৮-১২ টি পোনা মজুদ করা যায়।

আরো পড়ুন:  বাটাগুড় বা বোদো কাইট্টা বাংলাদেশ ও পৃথিবীর মহাবিপন্ন কচ্ছপ

চীনা কচ্ছপের সম্পূরক খাদ্য

কচ্ছপের খাদ্যে কম চর্বি এবং কমপক্ষে ৪৫-৫৫% প্রোটিন থাকা বাঞ্ছনীয়। ছোট মাছ, মুরগির মাংস ও নাড়ী-ভুড়ি কচ্ছপের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। পুকুরে প্রতিদিন এক থেকে দুবার খাদ্য সরবরাহ করতে হয়।

পানির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণ ব্যবস্থাপনা

কচ্ছপ চাষের পুকুরকে তন্তুজাতীয় শেওলা ও আগাছা হতে মুক্ত রাখতে হয়। কেননা কচ্ছপ অধিকাংশ সময় পুকুরের তলায় কাদার ভিতরে বাস করে বিধায় পুকুরে জৈবিক পদার্থের পচন ক্রিয়া বেশি হলে অক্সিজেনের অভাব ঘটে কচ্ছপের ব্যাপক মৃত্যু ঘটার আশাংকা থাকে। সেজন্য পানির স্বচ্ছতা ১৫-৩০ সেন্টিমিটার রাখা বাঞ্ছনীয়।

কচ্ছপের উৎপাদন

বাংলাদেশে কচ্ছপ চাষের কলাকৌশল উন্নয়ন সম্পর্কিত গবেষণা এখনও তেমন পরিচালিত হয়নি। ফলে কচ্ছপের বাণিজ্যক উৎপাদন এবং মুনাফা সম্পর্কিত তথ্যাদি অত্যন্ত অপ্রতুল। উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চীনা নরম খোলসধারী কচ্ছপ চাষকালে বছরে এদের দেহের ওজন ৫০০-৬০০ গ্রাম হয়ে থাকে।

কচ্ছপ চাষ চলাকালীন সতর্কতা

কচ্ছপ পরিণত বয়সের পুরুষ ও স্ত্রীকে আলাদা করে রাখতে হয়। অন্যথায় পুরুষ কচ্ছপ স্ত্রীকে কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। পুকুরে জাল টেনে বা পুকুর শুকিয়ে কচ্ছপ আহরণ করে জীবিত অবস্থায় বাজারজাত করা হয়। আমরা আশা করি বাংলাদেশে কেবল চীনা নরম খোল কচ্ছপ চাষ বৃদ্ধি পাবে।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page