আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > ঘাস > বাঁশের পুষ্পায়ন বা বাঁশের ফুল হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যখন সব বাঁশে ফুল ধরে

বাঁশের পুষ্পায়ন বা বাঁশের ফুল হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যখন সব বাঁশে ফুল ধরে

বাঁশের ফুল

বাঁশের পুষ্পায়ন বা বাঁশের ফুল বা বাঁশ ফুল (ইংরেজি: Bamboo blossom) একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যেখানে কোনও অবস্থানে থাকা বাঁশগুলি প্রস্ফুটিত হয় এবং বাঁশের বীজের সাথে ঝুলে থাকে। এটি সাধারণত চীন, মায়ানমার এবং ভারতে দেখা যায়। অতি প্রয়োজনীয় এই বাঁশ গাছটির শুধু অবয়বে নয় স্বভাবেও এদের পুষ্পায়ন একটি অদ্ভুত আচরণ। নানা প্রকার বাঁশঝাড়ে নানা সময়ে ফুল ধরে; কোনোটিতে ফি-বছর, কোনোটিতে ৩ বছর, কোনোটিতে ৫০ বছর, কোনোটিতে বা একশো-সোয়াশো বছর পরেও।

বাঁশগুলিতে প্রায় ৪০ থেকে ৮০ বছর বয়সে একটি জীবনচক্র থাকে, যা বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য অনুসারে পরিবর্তিত হয়। ভারতের নিজোরাম রাজ্য, বার্মার চিন আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে Melocanna baccifera নামে একপ্রকার মুলি বাঁশ জন্মে যাতে ৪৮ বছর পরে ফুল ধরে। এদিকে জাপানী বাঁশ Phyllostachys bambusoids ১৩০ বৎসর পর পর্যন্ত ফুলবতী হতে পারে। তিমুর দ্বীপের কালো বাঁশের ফুল ধরে ১২০ বছর অন্তর।

এই গাছের বীজ বা রাইজোম নিয়ে যদি একই সময়ে লাগানো হয় আমেরিকা, ইউরোপ বা আমাজনের অরণ্যে তবু একই সময়ে ফুল ফুটবে তাতে। পরিবেশ, আবহাওয়া কোনো কিছুই তাদের এই ৪৮ বছর পর ফুলফোটার নিয়মকে ভাংতে পারবে না। কেন এমন হয়, এর সঠিক কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো অনুসন্ধান করে চলেছেন। তবে এই বাঁশ গাছের প্রতিটি উদ্ভিদকোষের ভেতরে এর ফুলফোটার আঙ্কিক নিয়ম-নীতি নির্ধারিত থাকে বলে মনে করা হয়।

নিয়মিত ফুল ধরলে কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু বহু বছর পর যদি বাঁশঝাড়ে হঠাৎ একছড়া ফুল ফুটে ওঠে তাহলে প্রমাদ গোণে মিজোরামের দরিদ্র মানুষ। এই ফুল কয়েক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে অবিরাম ফুটতে থাকবে ২-৩ বছর ধরে। পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের ভেতর প্রচণ্ড ভীতি ঢুকে পড়লে তারা কঞ্চির খোঁচা খেয়ে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে ঘিঞ্চি বাঁশের ঝাড়ে গিয়ে অশুভ ফুলের ছড়া কেটে ফেলে দিয়েছে পাগলের মতো। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি তাতে। আবার সেই একই জায়গা থেকে বেরিয়েছে সর্বনাশা ফুলের ছড়।

আরো পড়ুন:  রাং চিতা বাংলাদেশ এবং ভারতের বাগানে চাষযোগ্য ঔষধি ও আলংকারিক গুল্ম

এই ফুল থেকে ফল হয়, অন্য বাঁশের তুলনায় বেশ বড়সড় ফল, জলপাইয়ের চেয়েও বড়। ফল পড়ে গাছের তলা বিছিয়ে থাকে। আর আশেপাশের সাত গ্রামের ইঁদুর আসে এই ফল খেতে; মাটি থেকে খায়, গেছো ইঁদুর, গাছে চড়েও খায়। এই ফলের পুষ্টিগুণ অনেক, এর পরে এটা আবার আফ্রোডিসিয়াক। তাই ইঁদুরের সংখ্যা বাড়তেই থাকে, হাজারে হাজারে লক্ষে লক্ষে। বাঁশতলা থেকে এবার ইঁদুরের দল মাঠে নেমে আসে, ফসলের দিকে মনোযোগী হয়। ফসল শেষ করে চলে আসে শস্যের ডোলে। সারারাত জেগে ইঁদুর তাড়িয়ে মাত্র দশ ভাগ শস্য যা তারা উঠিয়েছিল শস্যাধারে তাও শেষ হয়ে যায়। মিজোরা এবার শিকড়বাকড় কচু-ঘেঁচু আর মেটে আলু খায়, সেগুলো শেষ হলে প্রাণে বাঁচার জন্যে ধরে ধরে ইঁদুরই খেতে থাকে চুলোর ওপরে রোস্ট করে।।

এ সময় এলাকাবাসীদের মধ্যে নানারকম রোগ ছড়িয়ে দেয় ইঁদুর, টাইফয়েড, টাইফাস, প্লেগ। রোগ আর পুষ্টির অভাবে দুর্বল শরীর নিয়ে তারা আর গাছের গোড়া খুঁড়ে কন্দ জাতীয় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। যথকিঞ্চিৎ সরকারি রিলিফের খাদ্য আর ওষুধ আসার আগেই প্রাণহানি ঘটে অজস্র মানুষের। এরপর লক্ষ লক্ষ ইঁদুরও মরে যেতে বাধ্য হয় খাদ্যের অভাবে। বাঁশঝাড়ও মরে যায়, যে প্রচণ্ড শক্তি ব্যয় করে সে বংশ-ফসল ফলায় তাতে তার আর জীবনীশক্তি থাকে না। বাঁশঝাড়তলায় লক্ষ লক্ষ ভুক্ত ফলের মধ্যে তখনো অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক ফল থেকে জন্ম নেয় নতুন বাঁশের চারা। আবার গড়ে ওঠে বাঁশের নতুন জনপদ।

এই গণপুষ্পায়ণ ও সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে টিভিতে ইন্টারভিউ দিয়েছেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডানিয়েল জ্যানজেন। গাছ তার বংশরক্ষার জন্যেই এমন কৌশল অবলম্বন করেছে বলে তার বিশ্বাস। এ ব্যাপারে তিনি আরো উল্লেখ করেন প্রাণীজগতের স্যামন মাছ ও প্যাসেঞ্জার পিজিয়নের কথা।

প্রকৃতি বিষয়ক চ্যানেলে আমরা প্রায়ই দেখি, জলের কিনার থেকে অল্প পানিতে থাবা দিয়ে স্যামন মাছ তুলে নিচ্ছে ভল্লুক। যুগ যুগ ধরে ভল্লুকের শিকার হয়ে হয়ে এখন বেবি স্যামনরা কি তবে পালিয়ে যায় সমুদ্রে? যেখানে সে বাস করে ৪-৫ বছর, খেয়ে দেয়ে স্বাস্থ্য লাভ করে অসংখ্য স্যামন একযোগে ফিরে আসে নদীতে। তারপর সেখানে তারা ডিম পাড়ে, যে ডিম ফুটে এত অধিক সংখ্যক বাচ্চা হয় যে সারা নদীতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এখন যত মাছই পশু পাখি মানুষ খাক না কেন স্যামনের বংশ ধ্বংস করার সাধ্য কারো থাকে না।

আরো পড়ুন:  হলুদ ঘাস ফুল বাগানের শোভাবর্ধনকারী বিরুৎ

সব ওক গাছের ফল (একর্ন) যদি মোটামুটি পরিমাণমত ধরতো তবে হরিণ, কাঠবিড়ালি আর কবুতর নিঃশেষে খেয়ে ফেলতো সব ফল, ওকের আর বংশ রক্ষা হত না। তাই ৩ বছর পর পর একর্নের বাম্পার ফলন হয় যা পশুপাখি খেয়ে শেষ করতে পারে না কিছুতেই। ওদিকে অন্তরবর্তীকালীন সময়ে খাবার সংগ্রহে কষ্ট হয় বলে পশু-পাখির সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণে থাকে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

ভারতের মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্যে বাঁশের গণপুষ্পায়ন হয়েছে ১৯৫৮-৫৯ সনে। এর ৪৮ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬-০৭ সনেও এর প্রভাব দেখা গেছে ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের বান্দরবাণ, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িতে। জুম চাষ নষ্ট হবার ফলে এতে আদিবাসী লোকজন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী পুষ্পায়ন হবে ২০৫৪-৫৫ সনে।

প্রকৃতিতে খাদ্য পুষ্টি বাসস্থান নিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে পরস্পরের মধ্যে নিদারুণ প্রতিযোগিতা চলে। হঠাৎ ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাবার ঘটনা থেকে সাহিত্যক্ষেত্রে রচিত হয়েছে রবার্ট ব্রাউনিং-এর অনন্য কাহিনী “হ্যামিলনের বংশীবাদক”, আলোচিত হয়েছে লন্ডন শহরের গ্রেট প্লেগ, ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের জন্যে হেলিকপ্টার দিয়ে বিড়াল নামাতে হয়েছে মালয়েশিয়ার এক দ্বীপে।

আমরা প্রকৃতির এক বিপুল অংশ। লুপ্ত প্রাণীর তালিকায় আমরাও রয়েছি বেশ ওপরের দিকেই, ১১ নম্বরে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে সফলভাবে বেঁচে থাকার জন্যে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে আমাদেরও বেঁচে থাকতে হবে।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page