কুলেখাড়া এশিয়া ও আরিকার ভেষজ গুণাগুণ সম্পন্ন একটি শাক

শাক

কুলেখাড়া

বৈজ্ঞানিক নাম: Hygrophila auriculata (Schum.) Heine (1962). সমনাম: Bahel schulli Buch.-Ham. (1824), Astercantha longifolia (L.) Nees; Barleria auriculata Schumach.; Barleria longifolia L.; Hygrophila schulli M. R. Almeida & S. M. Almeida; Hygrophila spinosa T.Anderson ইংরেজি নাম: Starthorn. স্থানীয় নাম: কুলেখাড়া, কান্তা কালিকা, কুলিকারহা, ক্ষরিক, গোকুলকাঁটা সংস্কৃত নাম: कोकिलाक्ष হিন্দি নাম: তালমাখনা
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত:Eudicots বর্গ: Lamiales পরিবার: Acanthaceae গণ: Hygrophila প্রজাতি: Hygrophila auriculata

ভূমিকা: কুলেখাড়া বা গোকুলকাঁটা (বৈজ্ঞানিক নাম: Hygrophila auriculata) একান্থাসি পরিবারের হাইগ্রোফিলা গণের একটি একবর্ষজীবী, খাড়া, শাখাবিহীন বীরুৎ। এটিকে শাক হিসেবে খাওয়া যায়।

কুলেখাড়া গাছে প্রথমদিকে গাছে কোনো কাঁটা হয় না; আশ্বিন-কার্তিকের পর থেকে পাতার গোড়া থেকে কাঁটা বেরোয়, ক্ষুপ জাতীয় গাছ, একে চলতি কথায় কুলেখাড়ার গাছ, আবার কোনো কোনো জায়গায় কুলপো শাক বলে। এদের ফুল ও ফল ধারণ ঘটে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসে বা অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে। ফুলের রং অল্প বেগুনি। মূলে বহু শিকড় হয়, গাছের কাণ্ডটা একটি ফাঁপা এবং চতুষ্কোণ অর্থাৎ চারকোণা হয়। বীজ ভিজালে চটচটে ও লালার মতো হয়। বীজ দ্বারা বংশ বিস্তার ঘটে, তবে সাধারণত পুরনো মূল থেকে ফে’কড়ি বেরিয়ে গাছও হয়। বর্ষাকালে যখন নতুন গাছ গজায় তখন দেখতে অনেকটা হিঞ্জে বা হেলেঞ্চা (Enhydra fluctuans) শাকের গাছের মতো, তবে তার পাতা এই হিণ্ডে বা হেলেঞ্চা শাকের পাতা থেকে একটু লম্বা; সমগ্র পাতার গায়ে সরু শুয়োর মতো কাঁটা আছে।[১]

বর্ণনা: কুলেখাড়ার কাণ্ড কন্টকময়, দেড় দুই ফুট উচু হয়, আবার জায়গা হিসেবে ৩ থেকে৪ ফুটও উচু হতে দেখা যায়। কাঁটা ৬টি, ১.৫-৩.৬ সেমি লম্বা, সোজা বা বক্র কাক্ষিক কণ্টকবিশিষ্ট চতুষ্কোণী এবং পর্বে ৮টি অবৃন্তক বা অর্ধবৃন্তক পাতা বিশিষ্ট।

এদের ফুল কাক্ষিক, আবর্তে, প্রায় ৩৬ সেমি লম্বা, রক্তিম-নীল, মঞ্জরীপত্র ২.২- ২.৬ সেমি লম্বা, পত্রসদৃশ বা পত্রাকার, দীর্ঘায়ত-বল্লমাকার, মঞ্জরীপত্রিকা ১.৫-২.০ সেমি লম্বা, রৈখিক-বল্লমাকার, কোমল দীর্ঘ রোমযুক্ত। বৃতি ৪-খন্ডিত, খন্ড অসমান। দলমণ্ডল ২-ওষ্ঠী, ৫-খন্ডিত, নল ১.৮-২.০ সেমি লম্বা,উপরে প্রসারনশীল ওষ্ঠ অর্ধসমান, উপরের ওষ্ঠ দ্বি-খন্ডিত, নিচের অংশ ৩-খন্ডিত, হলুদাভ-সাদা তালুর উপরে ২টি অণুদৈর্ঘ্য কমলা-হলুদ ক্যালোসাইটিস বিশিষ্ট। পুংকেশর ৪টি, দললগ্ন, অসমান, সব উর্বর। গর্ভাশয় ৩ মিমি লম্বা, শীর্ষ রোমযুক্ত, ৮-ডিম্বকবিশিষ্ট, গর্ভদণ্ড সুত্রাকার, ১.৯ সেমি পর্যন্ত লম্বা, মসৃণ, গর্ভমুণ্ড সরল।

আরো পড়ুন:  হলুদ আমরুল শাক ভেষজ গুণ সম্পন্ন বাংলার উদ্ভিদ

কুলেখাড়ার ফল ক্যাপসিউল, ৮-১০ X ৪-৫ মিমি, রৈখিক-দীর্ঘায়ত, মসৃণ, ৪-৮ বীজবিশিষ্ট, শীর্ষ সূচ্যগ্র। বীজ গোলাকার, আড়াআড়িভাবে প্রায় ৩ মিমি, রেটিনাকুলা লম্বা এবং বক্র।[২]  

ক্রোমোসোম সংখ্যা: ২n = ৩২ (Kumar and Subramaniam, 1986)।

আবাসস্থল ও পরিবেশ: পুকুর পাড়ের আর্দ্র স্থান, নর্দমা এবং ধানক্ষেতে জন্মে থাকে। যেখানে হয় সেখানে ঝোপ হ’য়ে যায়, সাধারণত জমির আলে অথবা রাস্তার পাশে অল্প জল যেখানে থাকে, যাকে আমরা গাঁয়ের ভাষায় পগার বলি, সেখানে হয়ে থাকে।

বিস্তৃতি: ইন্দো-চীন, মায়ানমার, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা। বাংলাদেশে এই প্রজাতি সারা দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত।

কুলেখাড়ার ব্যবহার ও গুরুত্ব:

কুলেখাড়া মূলের এবং পাতার ক্বাথ মূত্রবর্ধক এবং শোথরোগ, জণ্ডিস এবং মূত্রঘটিত রোগের সুচিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। সন্তান প্রসবের সময় বীজের রস মায়ের জন্য উপকারি। পাতার পেষ্ট কটিবাত এবং সন্ধিবাতে বাহিরে প্রয়োগযোগ্য ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।[২] এছাড়াও কুলেখাড়া রক্তপাতরোধে, শীতলীরোগে, দীর্ঘস্থায়ী সম্ভোগসহ প্রায় ১২টি অসুখে কাজে লাগে।[১] কুলেখাড়ার ভেষজ ব্যবহার ও ব্যবহারপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন

কুলেখাড়ার বারোটি ভেষজ চিকিৎসাগুণ 

জাতিতাত্বিক ব্যবহার: পটুয়াখালী জেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই উদ্ভিদের বায়বীয় অংশ এবং ছাই শোথরোগের নিয়াময়ে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের গারো আদিবাসীরা এই উদ্ভিদ কলেরা, আমাশয় এবং কাশি নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করে। সন্ধিবাত নিরাময়ের জন্য পাতার পেষ্ট বাহিরে প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৬ষ্ঠ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) কুলেখাড়া প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র সংকেটর কারণ নেই এবং এটি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় আশংকা মুক্ত (lc)। এটি বাংলাদেশে সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি এবং শীঘ্র সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিষ্প্রয়োজন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা ২১-২৫।

আরো পড়ুন:  বথুয়া, বেতো বা বাসতুগ শাকের ঔষধি গুণাগুণ

২. মমতাজ বেগম, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

1 thought on “কুলেখাড়া এশিয়া ও আরিকার ভেষজ গুণাগুণ সম্পন্ন একটি শাক”

  1. Great post however I was wanting to know if you could write a litte more on this topic? I’d be very thankful if you could elaborate a little bit more. Many thanks!

    Reply

Leave a Comment

error: Content is protected !!