খেসারির ডালের ১০টি ভেষজ গুণ

খেসারি (বৈজ্ঞানিক নাম: Lathyrus sativus) হচ্ছে ফেবাসি পরিবারের ডাল জাতীয় শস্য।

খেসারির ডাল খাওয়ার নিয়ম:

খেসারি ডালে গর্ভপত্র খঞ্জতাকারক। এইটি থেকে সর্বদা আমাদের সাবধান হওয়া দরকার; বাংলা, বিহার বিশেষত উড়িষ্যার গ্রামাঞ্চলে খেসারির বহু চাষ হয় এবং আহার্য ডাল হিসেবে বৎসরের পর বৎসর তাঁরা ব্যবহার করে আসছেন কিন্তু তাঁরা এর দ্বারা কোনো কুফল পাননি সেটা কারণ হচ্ছে, তাঁরা এই ডালটিকে প্রথমে বালির সঙ্গে ভেজে নিয়ে যাঁতায় ভেঙ্গে খোসাটা ঝেড়ে বের করে দিয়ে থাকেন; এর দ্বারা ঐ গর্ভপত্রের দোষ অংশটা বালির উত্তাপে নষ্ট হয়ে যায়। তারপর ব্যবহার করা হয় বলেই ঐ দোষমুক্ত হয়। আর বাজারে যেগুলি বিক্রি হয় সেগুলি ভাজা নয়, সুতরাং ঔষধার্থে ব্যবহার করতে গেলে তাকে ভাল করে ঝেড়ে, বেছে, ফুটন্ত গরমজলে ধুয়ে নিয়ে, শুকিয়ে রাখতে হবে।

রোগ প্রতিকারে

১. কার্শ্যরোগ (রিকেট): আধ তোলা বা এক তোলা শোধিত খেসারির ডাল আধ সের জলে সিদ্ধ করে আধ পোয়া থাকতে নামিয়ে, থিতিয়ে গেলে উপকার জলীয়াংশ খেতে দিতে হবে; একদিন অন্তর কিছুদিন খাওয়ালে স্বাস্থ্য ভাল হবে।

২. হাড়ের ও গাঁটের ব্যথা: ফোলা নেই অথচ গাঁটে ব্যথা, সেক্ষেত্রে ঐ শোধিত ডান্স অরুপ কুটে নিয়ে (অর্ধ কুটিত করে) ডালের মাত্রার আট গুণ উৎকৃষ্ট মদে ভিজিয়ে রাখতে হবে, এক সপ্তাহ বাদে ছে’কে নিয়ে, ঐ মদ ২ চামচ করে আধ কাপ দুধের সঙ্গে কিছুদিন খেলে ঐ ব্যথা চলে যায়।

৩. কোষ্ঠকাঠিন্যে: যাঁদের এ অসুবিধেটা আছে তাঁরা খেসারির ডালের জলে অল্প লবণ দিয়ে কয়েক দিন রাত্রে খাওয়ার অভ্যাস করুন, পরের দিন দাস্ত পরিষ্কার হবে। এইজন্য দেশগাঁয়ে একটি প্রবাদ প্রচলিত ‘“স্বর্গে ছিলি খেসারি, তোকে মর্তে আনলে কে। তোর পায়ে পড়ি খেসারি, তুই কাছা খুলতে দে’।

৪. জানায় দুলে: যাঁরা মাঝে মাঝে ভুল হওয়ার জন্য অসুবিধেয় পড়ে যাচ্ছেন তারা ১ কাপ গরম জলে ৩ থেকে ৪ গ্রাম খেসারির ডাল ভিজিয়ে ঐ জলটা খাবেন। কিছুদিন খেলে এর দ্বারা ঐ অসুবিধেটা চলে যাবে।

আরো পড়ুন:  কলাই বা মাষকলাই ডাল খাওয়ার উপকারিতা ও রান্নার পদ্ধতি

৫. বমি বা বমনের ইচ্ছা: বিশেষভাবে শরৎ কাল আর বসন্ত কালে যাঁরা সর্বদা বমি বমি ভাব ভোগেন , অথবা বমিও করেন, তারা খেসারির ডাল ৩/৪ গ্রাম মাত্রায় গরমজলে ভিজিয়ে রেখে পরে ঠাণ্ডা হলে সেই জল সকালে অথবা বিকালের দিকে খাবেন। এর দ্বারা ঐ বমনভাবটা চলে যাবে।

৬. অরুচিতে: অনেক কারণেই অরুচি হয়, এটা যদি পিত্তরে প্রাবল্যে হয়ে থাকে তা হলে ঐ ৩/৪ গ্রাম খেসারি গরমজলে ভিজিয়ে খেলে ঐ অরুচিটা সেরে যাবে, অনেক সময় এর সঙ্গে ক্রিমির উপদ্রবও দেখা যায়, এটাতে সেটাও চলে যায়।

৭.  মাড়ি হাজায়: বর্ষাকালে অনেকের দাঁতের মাড়ি হেজে যায় বা হাজা ভাব হয়, এমন কি কিছুদিন বাদে তা থেকে রক্তও পড়ে; এক্ষেত্রে ৭/৮ গ্রাম খেসারির ভাল গরমজলে ভিজিয়ে রেখে, কয়েক ঘণ্টা পরে ঐ জলে কুলকুচি করলে অথবা মখে পুরে খানিকক্ষণ রেখে (যাকে বলে কবল ধারণ করা) ফেলে দিলে ওটার উপশম হয়।

৮. হাজায়:  যাঁরা জল বেশী ঘাঁটেন তাঁদেরই বেশী হতে দেখা যায়, আর বর্ষাকালে দেশগাঁয়েও হয়; সেক্ষেত্রে খেসারির ডাল বেটে গরম করে লাগালে কমে যাবে এবং সেরেও যায়; তবে রোগের কারণটা যদি বন্ধ করা না যায় তা হলে আবার হবে।

৯. গেটে বাতে: খেসারির পাতা, যাকে খেসারি বা তেউড়ি শাক বলে, বেটে গরম করে গেটে বাতে প্রলেপ দিলে বাতের ব্যথা কমে যায়।

১০. নখকুনিতে: খেসারির কচি দানা বেটে গরম করে প্রলেপ দিলে ওর যন্ত্রণা কমে যাবে। আরও ভাল কাজ হয় যদি ওর সঙ্গে একটু জনকপুরী খয়ের মিশিয়ে দেওয়া যায়।

প্রাসঙ্গিক কথা:

গত ১৮২৯ বা ৩০ খৃষ্টাব্দে উত্তরপ্রদেশে ঝরা, খরা ও ঝড়ে ৩ বৎসর যাবত প্রধান খাদ্য যব, গম ও ধানের চাষ নষ্ট হয়ে যায়, আসে দুর্ভিক্ষ, সেখানকার সাধারণ মানুষকে ডাল কলাই সিদ্ধ করে খেয়ে কোনো রকমে বেচে থাকতে হয়েছিলো, কিছুদিন বাদে দেখা গেল ঐ অঞ্চলের বহু লোকের নিম্নাঙ্গ বিকল হয়ে যাচ্ছে, চলতে পারছে না, বৃটিশ সরকারের টনক নড়লো; অনুসন্ধানও চালালো, শোনা গেল অধিকাংশ দিনই ঐ অঞ্চলের এই সব লোককে খেসারির ডাল খেয়ে জীবন ধারণ করতে হয়েছে; পরীক্ষা নিরীক্ষায় স্থিরীকৃত হলও, খেসারির ডালই এই বিকলাঙ্গ রোগের উৎস, যত লোক এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলো তার মধ্যে আবার বেশীর ভাগই পুরুষ। এই অদ্ভুত বাস্তব ঘটনাটি স্বল্পসংখ্যক মনীষীদের গ্রন্থে খেসারির পঙ্গুত সৃষ্টির ক্ষমতা আছে এই নিশ্চয়াত্মক ইঙ্গিত থাকলেও স্মরণাতীত কাল থেকে জনসাধারণের স্মৃতিতে তা অবিলুপ্ত ছিল, কিন্তু দৈবদুর্বিপাকজনিত দুর্ভিক্ষের তাড়নায় খেসারি ভোজনের কুফলটিকে ইংরাজ জাতি তাঁদের investigation -এর ফল বলে অজ্ঞ ভারতবাসীকে চমকিত করলেন।

আরো পড়ুন:  খেসারি এশিয়ায় জন্মানো সহজলভ্য ভেষজ উদ্ভিদ

খেসারি বেশি খাওয়া ভাল নয়

আয়ুর্বেদ মতে খেসারির ডাল রুক্ষ, বায়ুবর্ধক, অম্ল ও শূল উৎপাদক, মলরোধ করে, কফ, পিত্ত, অরুচিবমন নাশ করে। এই ডাল খাদ্য হিসেবে একেবারেই উৎকৃষ্ট নয়। শীতকালে মুলো দিয়ে খেসারির ডাল খাওয়ার প্রচলন গ্রামাঞ্চলে আছে। এইভাবে রান্না করা খেসারির ডাল অরুচি নাশ করে। কাশি, কফ, গলগন্ড রোগ ও বেশি মোটা হয়ে যাওয়ার রোগ (মেদবৃদ্ধি) রোধ করে। খেসারির ডাল বেশি পরিমাণে খেলে দৃষ্টিশক্তি হারাবার ভয় থাকে।  এই ডাল খেতে ভাল লাগলেও চোখের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বেশি না খাওয়াই ভাল।

রাসায়নিক গঠন:

(a) Starchy materials. (b) Salt of phytic acid. (c) Betaoxalylamino alanine.

(d) Beta-N-oxalylalphabetadiaminopropionic acid. (e) Glucose.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা,২৪৪-২৪৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!