ভূমিকা: প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে চিরসবুজ উদ্ভিদ সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের তেমনই একটি অনন্য উদ্ভিদ হলো হরিণা শাক (বৈজ্ঞানিক নাম: Aglaonema hookerianum)। এটি মূলত একটি বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, যা তার দৃষ্টিনন্দন পাতার জন্য সুপরিচিত। আজ আমরা জানব গহীন অরণ্যের এই উদ্ভিদটি সম্পর্কে বিস্তারিত।
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| স্থানীয় নাম | হরিণা শাক |
| বৈজ্ঞানিক নাম | Aglaonema hookerianum Schott, Bonpland. 7: 30 (1859) |
| সমনাম (Synonym) | Aglaonema clarkei Hook. f. (1893) |
| ইংরেজি নাম | Chinese Evergreen (চায়নিজ এভারগ্রিন) |
হরিণা শাক-এর বর্ণনা:
হরিণা শাক (বৈজ্ঞানিক নাম: Aglaonema hookerianum) মূলত একটি চিরসবুজ বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। চমৎকার শারীরিক কাঠামোর কারণে এটি সহজেই সবার নজর কাড়ে। বনের এই সুন্দর উদ্ভিদটির কাণ্ড সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ১.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত মোটা হয়ে থাকে। এর কাণ্ডের প্রতি দুটি পর্বের মাঝের দূরত্ব ১.৫ থেকে ৩.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
পাতার গঠন ও বৈশিষ্ট্য
হরিণা শাকের পাতাগুলো বেশ লম্বা ও দৃষ্টিনন্দন হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- পাতার বৃন্ত: এর পাতার বোঁটা বা বৃন্ত প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর গোড়ার দিকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা একটি পাতলা ঝিল্লিযুক্ত অংশ থাকে।
- আকার ও আকৃতি: পাতাগুলো সাধারণত ২৭ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৭ থেকে ১২ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। এগুলো দেখতে অনেকটা ডিম্বাকার, উপবৃত্তাকার বা ভল্লাকার (তীরের ফলার মতো) হয়ে থাকে।
- রঙ ও শিরা: সম্পূর্ণ পাতাটি নিরেট গাঢ় সবুজ রঙের হয়ে থাকে, এতে অন্য কোনো দাগ বা নকশা থাকে না। পাতার মাঝখানের মূল শিরা থেকে ৭-১৩টি উপশিরা স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ফুল ও ফলের বিবরণ
উদ্ভিদটির প্রজনন সময়ে কাণ্ডের মাথায় ১ থেকে ৩টি মঞ্জরীদণ্ড দেখা যায়, যা ২১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর ফুলটি ৩-৭ সেন্টিমিটার লম্বা একটি বিশেষ আবরণ বা চমসা (Spathe) দিয়ে ঢাকা থাকে। এই আবরণের ভেতরেই থাকে এর পুংকেশর ও শক্ত গর্ভদণ্ডযুক্ত ডিম্বাকার গর্ভাশয়। পরিপক্ক বা পাকা অবস্থায় এই উদ্ভিদে ৩ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ১.৪ সেন্টিমিটার মোটা ফল ধরে। এই ফলগুলোই পরবর্তীতে প্রাকৃতিকভাবে এর বংশবিস্তারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
হরিণা শাক প্রাকৃতিকভাবে বড় বড় বনের ছায়াযুক্ত এবং ভেজা বা আর্দ্র মাটিতে জন্মাতে পছন্দ করে। তীব্র রোদ বা সরাসরি সূর্যের আলো এই গাছের বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। বরং মৃদু আলো, স্নিগ্ধ ও শীতল পরিবেশ এই চিরসবুজ উদ্ভিদের দ্রুত বেড়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
ফুল-ফল ধারণের সময় ও বাহারি গুরুত্ব
এই উদ্ভিদের জীবনচক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো এর ফুল ও ফল ফোটার ঋতু। সাধারণত প্রতি বছরের জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে হরিণা শাকে ফুল ও ফল দেখা যায়।
বর্তমানে এর সুন্দর গঠন এবং সারাবছর সবুজ থাকার বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ইনডোর বা আউটডোর প্ল্যান্ট হিসেবে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শৌখিন বাগানবিলাসীদের কাছে ঘর বা বাগান সাজানোর জন্য একটি আকর্ষণীয় বাহারি উদ্ভিদ (Ornamental Plant) হিসেবে এর কদর দিন দিন বাড়ছে।
বংশবিস্তার ও টিকে থাকার কৌশল
হরিণা শাকের বংশবৃদ্ধি করার পদ্ধতিটি বেশ সহজ এবং চমৎকার:
প্রতিকূল পরিবেশ জয়: এই বিশেষ বংশবিস্তার ক্ষমতার কারণে দুর্যোগ বা প্রতিকূল পরিবেশেও উদ্ভিদটি সহজে মরে যায় না এবং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।
মূল বা গ্রন্থিক (Rhizome): এই গাছ মূলত তার মাটির নিচের মূল বা গ্রন্থিকের (Rhizome) মাধ্যমে নতুন চারা তৈরি করে।
সহজে ছড়িয়ে পড়া: গ্রন্থিক পদ্ধতির কারণে এটি অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিস্তৃতি:
হরিণা শাক মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। এটি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের আর্দ্র জলবায়ু এবং পাহাড়ের ঢালু স্থানে প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে বেশি জন্মে থাকে।
বৈশ্বিক বিস্তৃতি
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে, এই চিরসবুজ উদ্ভিদটি মূলত দুটি দেশে বেশি দেখা যায়:
- উত্তর-পূর্ব ভারত: বিশেষ করে ভারতের খাসিয়া পাহাড় এবং কাছার অঞ্চলে এটি প্রচুর পরিমাণে জন্মায়।
- মায়ানমার: মায়ানমারের পাহাড়ি আরাকান অঞ্চল জুড়ে এর বিস্তৃতি রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
আমাদের বাংলাদেশেও প্রাকৃতিকভাবে হরিণা শাক জন্মানোর বেশ কিছু অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। দেশের যেসব এলাকায় এই উদ্ভিদটি দেখা যায়, সেগুলো হলো:
পার্বত্য চট্টগ্রাম: বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটির কাসালং নদী সংলগ্ন পাহাড়ি জেলাগুলো।
সিলেট অঞ্চল: সিলেটের আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত বনাঞ্চল।
চট্টগ্রাম অঞ্চল: বিশেষ করে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকা।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) হরিণা শাক প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অরণ্য উৎখাত ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশে এটি সঙ্কটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে হরিণা শাক সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে আবাসস্থল ও তার বাইরে সংরক্ষণের চেষ্টা করা দরকার।
আরো পড়ুন:
- কাইনজাল গাছ (Bischofia javanica) এর পরিচিতি ও ভেষজ উপকারিতা
- খয়ের গাছের ঔষধি গুণাগুণ ও উপকারিতা: পানের লাল আভা থেকে মহৌষধ
- চাকুয়া কড়ই গাছের পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও এর নানাবিধ ব্যবহার
- শিল কড়ই বা মটর কড়ই গাছের পরিচিতি: বৈশিষ্ট্য, চাষাবাদ ও এর বহুমুখী গুরুত্ব
- সাদা কড়ই বা লোহা শিরিষ গাছের বৈশিষ্ট্য ও বহুমুখী ব্যবহার: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
- রবীন্দ্রনাথের সোনাঝুরি বা আকাশমণি গাছ কেন ক্ষতিকর? জানুন এর আসল রহস্য ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা!
- রাজকুমারী গাছ পাউলোনিয়া (Paulownia) কী? বাংলাদেশে এটি চাষের ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক ও মরুকরণের ঝুঁকি!
- দেশি গাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভেষজ ফলদ সপুষ্পক বৃক্ষ
- শিমুল গাছ চাষের নিয়ম, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও শিমুল মূলের ভেষজ গুণাবলী
- তেন্দু বা বিড়িপাতা গাছের বৈশিষ্ট্য, উপকারিতা ও আদিবাসী ব্যবহার
- পাহাড়ি শিমুল: বিরল এই বৃক্ষের বিস্ময়কর উপকারিতা ও পরিচিতি
- গামার বা গামারি গাছের ভেষজ গুণাগুণ
- পিতাং বা বকম এশিয়ার বনাঞ্চলে জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- পাতা খোঁই বা হরিনহারা বাংলাদেশে জন্মানো ভেষজ উদ্ভিদ
- পাহাড়ি শিয়াল বুকা অরণ্যে জন্মানো ফলজ ও ভেষজ গুনসম্পন্ন বৃক্ষ
- গগণ শিরিষ হচ্ছে উদ্যানের শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ
- কালা কড়ই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভেষজ গুণসম্পন্ন চিরহরিৎ বৃক্ষ
- গোলাপী শিরিষ উষ্ণ-নাতিশীতোষ্ণ দেশের শোভাবর্ধক ও ভেষজ বৃক্ষ
- জিগা বা জিকা অরণ্যে জন্মানো পত্রমোচী ভেষজ গুণসম্পন্ন বৃক্ষ
- কাজুবাদামের বিস্ময়কর স্বাস্থ্য উপকারিতা, ভেষজ গুণ ও চাষ পদ্ধতি
- দেবদারু এশিয়ায় জন্মানো শোভাবর্ধক ও ভেষজ বৃক্ষ
- শিমুল গাছ-এর বিবরণ ও ষোলটি ভেষজ গুণাগুণ
- তেলশুর দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দীর্ঘ গোলাকৃতি পত্রমোচী বৃক্ষ
- খিরনি বা খির খেজুর বৃহৎ চিরহরিৎ শুষ্ক অঞ্চলের উদ্ভিদ
- মালয় পাতি এবোনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দারুবৃক্ষ
- চাপালিশ মোরাসি পরিবারের আর্টোকারপাস গণের একটি বৃহৎ বৃক্ষ
- আর্টোকারপাস হচ্ছে তুঁত পরিবারের বৃক্ষের একটি গণের নাম
- মালাইং মাঝারি আকারের পত্রঝরা বৃক্ষ
- টালি বাংলাদেশের রক্ষিত মহাবিপন্ন বৃক্ষ
- তমাল ছোট থেকে মাঝারি আকারের বাংলাদেশের সংরক্ষিত দারুবৃক্ষ
তথ্যসূত্র:
১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৪-২৫। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
বি. দ্র: ছবিটি নেওয়া হয়েছে flowersofindia.net ওয়েব সাইট থেকে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।