খাড়া বিষকচু কি? জানুন বিরল এই পাহাড়ি উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য ও বিস্তৃতি

ভূমিকা: খাড়া বিষকচু (বৈজ্ঞানিক নাম: Alocasia acuminata) হলো বাংলাদেশের পাহাড়ি বনাঞ্চলে জন্মানো একটি বিরল প্রজাতির বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এটি আমাদের চিরচেনা কচু পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হলেও সাধারণ ও সমতল এলাকায় এই কচু সচরাচর দেখা যায় না।

বর্তমানে বন উজাড় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের নানা সংকটের কারণে উদ্ভিদটি বেশ হুমকির মুখে রয়েছে। এই কারণে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং গবেষণার উদ্দেশ্যে এখন বাংলাদেশ জাতীয় হার্বেরিয়ামে এটির বিশেষ চাষাবাদ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

ধাপশ্রেণীবিন্যাস
জগৎ / রাজ্য (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ জগৎ)
বিভাগ (Division)Tracheophytes (নালিকাযুক্ত উদ্ভিদ)
শ্রেণী (Clade)Angiosperms (গুপ্তজীবী)
শ্রেণী (Clade)Monocots (একবীজপত্রী)
বর্গ (Order)Alismatales
পরিবার (Family)Araceae (কচু পরিবার)
গণ (Genus)Alocasia
প্রজাতি (Species)A. acuminata

খাড়া বিষকচু-এর বর্ণনা:

এটি একটি সোজা ও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বীরুৎ (herb) জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ২.৫ থেকে ৩.০ সেন্টিমিটার চওড়া হয়ে থাকে।

পাতার বিবরণ

গাছের গোড়ায় প্রায় ৬-৮টি পাতা গুচ্ছ আকারে থাকে। এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • পত্রবৃন্ত: ৩০-৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়।
  • পত্রফলক: ২০-২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • আকৃতি: পাতলা ঝিল্লিযুক্ত পাতাগুলো দেখতে লম্বাটে হীরক বা ডায়মন্ড আকৃতির। এর ওপরের অংশ লেজের মতো লম্বা এবং নিচের অংশটি খণ্ডযুক্ত।

ফুল ও পুষ্পবিন্যাস

উদ্ভিদের ফুলগুলো পাতার নিচের অংশে জোড়ায় জোড়ায় থাকে। এর পুষ্পবিন্যাসের প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • মঞ্জরীদণ্ড: এটি ২০-৩০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং পাতার বোঁটার চেয়ে কিছুটা ছোট হয়।
  • স্পেথ বা চমসা: ১২-১৬ সেন্টিমিটার লম্বা ও সবুজ রঙের এই অংশটি নালি ও দণ্ডের সংযোগস্থলে কিছুটা চাপা থাকে। এর ওপরের অংশটি দেখতে নৌকার মতো এবং রঙ সাদাভ বা হলুদাভ-সবুজ।
  • স্পেডিক্স: চমসার ভেতরে থাকা এই অংশটি আকারে কিছুটা ছোট (১০-১২ সেমি) হয়।

পুং ও স্ত্রী পুষ্পের গঠন

  • স্ত্রী ফুল: এর সাইজ ১.২ সেন্টিমিটার। এতে ফ্যাকাশে সবুজ রঙের গোলাকার গর্ভাশয় থাকে, যা তিন খণ্ডে বিভক্ত।
  • বন্ধ্যা অংশ: স্ত্রী ফুলের ওপরে ৩.৫ সেন্টিমিটার লম্বা একটি সাদাভ বন্ধ্যা অংশ থাকে।
  • পুং ফুল: বন্ধ্যা অংশের ওপরে ২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও অর্ধ-সিলিন্ডার আকৃতির পুরুষ ফুল থাকে। এর মাথায় ৫ সেন্টিমিটার লম্বা সাদা ও সুচালো উপাঙ্গ রয়েছে।

ফল, বীজ ও ক্রোমোসোম

এই উদ্ভিদে আকর্ষণীয় লাল রঙের বেরি জাতীয় ফল ধরে। এর বীজগুলো দেখতে আধ-গোলাকার এবং এই উদ্ভিদের ক্রোমোসোম সংখ্যা ২n = ২৮।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

এই উদ্ভিদটি মূলত পাহাড়ি এলাকায় বেশি দেখা যায়। পাহাড়ের ছায়াযুক্ত এবং স্যাঁতসেঁতে ঢালু জায়গায় এই গাছটি সবচেয়ে ভালো জন্মে।

ফুল, ফল ও বংশবিস্তার

মাধ্যম: মূলত বীজ এবং মাটির নিচের কন্দ (Tubers) ব্যবহার করেই এই উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি করা হয়।

সময়কাল: মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে এই উদ্ভিদে ফুল ফোটে এবং ফল দেখা যায়।

সহজ পদ্ধতি: গাছটির বংশবিস্তার প্রক্রিয়া খুবই সহজ।

বিস্তৃতি:

এই উদ্ভিদটি মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। এর প্রধান বিচরণক্ষেত্রগুলো হলো:

  • বৈশ্বিক অবস্থান: প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে এই উদ্ভিদটি প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।
  • বাংলাদেশে অবস্থান: আমাদের দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এর উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম এবং মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি বনাঞ্চলে এটি বেশি পাওয়া যায়।

উপযোগী পরিবেশ ও জলবায়ু

পাহাড়ের নির্জন, ছায়াযুক্ত পরিবেশ এবং স্যাঁতসেঁতে ঢালু জমি এই উদ্ভিদের বাড়ন্তের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মূলত মিয়ানমার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের এই জেলাগুলোর বিশেষ জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণের কারণেই উদ্ভিদটি এখানে চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) খাড়া বিষকচু প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে এটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে খাড়া বিষকচু সংরক্ষণের জন্য জাতীয় হার্বেরিয়ামে চাষ করা হচ্ছে। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে প্রকৃত আবাসস্থল ও তার বাইরে সংরক্ষণ জরুরি।

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ০১ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ২২ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

ছবিটি নেওয়া হয়েছে ফেসবুক থেকে আলোকচিত্রীর নাম: TK TN

Leave a Comment

error: Content is protected !!