তারাগাছের অবিশ্বাস্য ঔষধি গুণ, বৈশিষ্ট্য ও জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার

তারা

বৈজ্ঞানিক নাম: Alpinia nigra (Gaertn.) Burtt., Not. Roy. Bot, Gard, Edinb. 35: 213 (1977). সমনাম: Zingiber nigrun Gaertn. (1788), Heritiera allughas Retz. (1791), Hellonia allughas (Retz.) Willd. (1797), Alpinia allughas (Retz.) ROSC. (1807). ইংরেজী নাম: জানা নেই। স্থানীয় নাম: তারা।
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae, বিভাগ: Tracheophytes. অবিন্যাসিত: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Monocots. বর্গ: Zingiberales. পরিবার: Zingiberaceae. গণ: Alpinia, প্রজাতি: Alpinia nigra.

ভূমিকা: তারাগাছ (বৈজ্ঞানিক নাম: Alpinia nigra) হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ বিরুৎ। এটি বাগান বা টবে লাগানো যায়। তবে বনাঞ্চলের পরিবেশ এদের জন্য উপযুক্ত।

তারা-এর বর্ণনা:

এই গাছটি সাধারণত ২ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কান্ডটি পত্রল, অর্থাৎ পাতা দিয়ে ঘেরা থাকে। এর পাতাগুলোর কোনো বোঁটা থাকে না (অবৃন্তক), অথবা থাকলেও তা খুবই ছোট ও অপ্রকাশ্য। পাতাগুলো দেখতে লম্বাটে এবং ল্যান্স বা বল্লমের ফলার মতো আকৃতির (আয়ত-ল্যান্সাকার) হয়। পাতাগুলো লম্বায় প্রায় ৩৫ থেকে ৭৭ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ৯ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাতার অগ্রভাগ বেশ সুচালো ও দীর্ঘ হয়। পাতার ওপর ও নিচের—উভয় পিঠই বেশ মসৃণ এবং চকচকে দেখায়। তবে পাতার নিচের অংশের মাঝখানের মোটা শিরার দুই পাশে সামান্য রোম বা চুলার মতো অংশ দেখা যায়। পাতার গোড়ার দিকে ৪-৫ মিলিমিটার লম্বা চামড়ার মতো গোল আকৃতির একটি অংশ (লিগিউল) থাকে, যা রোমশ ও অখণ্ড। তারাগাছের ফুলগুলো শাখার একেবারে অগ্রভাগে থোকা আকারে বা প্যানিক্যাল পদ্ধতিতে ছড়ানো অবস্থায় ফুটে থাকে। যে ডালে ফুলগুলো সাজানো থাকে (মঞ্জরীঅক্ষ), সেটি কিছুটা রোমশ হয়। ফুল ফোটার প্রাথমিক অবস্থায় দুটি লম্বা রেখার মতো পাতা (ইভলিউকার) পুরো ফুলটিকে ঢেকে রাখে। ফুলটি যখন পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়, তখন এই রক্ষাকারী পাতা দুটি শুকিয়ে যায় এবং ফুলের নিচের দুটি শাখার সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে থাকে।

তারাগাছের উপ-মঞ্জরীপত্রটি দেখতে নল বা চোঙার মতো এবং এটি পাতলা ঝিল্লির মতো হলেও বেশ স্থায়ী হয়, যা লম্বায় ১০-১৫ মিলিমিটার, রোমশ এবং এর মাথাটি বেশ সুচালো থাকে। এর বৃতি বা ফুলের বাইরের অংশটিও নলাকার এবং ১.০-১.৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, যা দুই থেকে তিন ভাগে বিভক্ত, রোমশ এবং একপাশ দিয়ে কিছুটা চেরা বা ফাটা থাকে। ফুলের ভেতরের দল অংশটি বৃতিকে ছাড়িয়ে যায় না এবং এর সমান আকৃতির তিনটি পাপড়ি ১.৩-২.০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ডিম্বাকার হয়, যার রঙ সবুজ-সাদা হলেও মাথার দিকটা গোলাপী আভাযুক্ত, বাইরের অংশ রোমশ এবং পেছনের চওড়া পাপড়িটি ঢাকনার মতো ও মাথায় একটু বাড়তি অংশ থাকে। ফুলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ বা লেবেলামটি দেখতে অনেকটা চাপা উল্টো-ত্রিকোণাকৃতির, যার গোড়া সরু, আকার ২.৫-২.৭ x ১.৮ সেন্টিমিটার এবং এটি গভীরভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিটি অংশ আবার সামান্য দ্বিখণ্ডিত রূপ নেয়। হালকা গোলাপী রঙের এই লেবেলামের মাঝখান দিয়ে দুটি গাঢ় গোলাপী রেখা চলে গেছে এবং এর গোড়ার দুই পাশে একজোড়া সুচালো অঙ্গ বা স্টেমিনোড অবস্থিত, যা ফুলটিকে একটি অনন্য পূর্ণতা দেয়।

তারাগাছের পরাগধানীটি আকর্ষণীয় গোলাপী রঙের এবং ০.৮-১.০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, যার ভেতরের কোষগুলো ছড়ানো, শীর্ষভাগ কোণাকৃতির এবং পরাগদণ্ডটি ১০-১২ মিলিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। এর গর্ভাশয়টি আকারে ৪-৫ x ২.৩ মিলিমিটার, যা তিনটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত এবং ঘন রোম বা চুলে ঢাকা থাকে। ফুলটির গর্ভদণ্ডটি গোলাপী রঙের এবং এর হালকা-সবুজ রঙের গর্ভমুণ্ডটি বেশ প্রসারিত, বাঁকানো, দেখতে অনেকটা ত্রিকোণাকৃতির এবং সূক্ষ্ম লোমে (সিলিয়েট) ঘেরা থাকে। এই গাছের ফল বা ক্যাপসিউলটি গোলাকার হয়, যার ব্যাস ১.৫-২.০ সেন্টিমিটার এবং এটি দেখতে কালো বা কালচে বাদামী রঙের, ওপরের অংশটি প্রায় মসৃণ হলেও এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর বা সহজে ভেঙে যাওয়ার মতো প্রকৃতির হয়। এই ফলের ভেতরে কোণাকৃতির কালো রঙের বীজ থাকে এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই উদ্ভিদের ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো ২n = ৪৮।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

তারাগাছ সাধারণত স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি, নিচু এলাকা এবং খাল ও নালার পাড়ে প্রাকৃতিক উপায়ে জন্মে ও বেঁচে থাকে। এই উদ্ভিদে মে মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল দেখা যায়। তারাগাছের বংশ বিস্তার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ, যা মূলত মাটির নিচের রূপান্তরিত কাণ্ড বা রাইজোম (Rhizome) এবং পরিপক্ব বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই করা সম্ভব।

বিস্তৃতি:

তারাগাছের ভৌগোলিক বিস্তৃতি বেশ বিশাল, যা মূলত ভারত থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া পর্যন্ত সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চলে দেখা যায়। আমাদের বাংলাদেশেও এই উদ্ভিদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে এবং দেশের প্রায় সব এলাকাতেই এটি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়।

তারা-এর অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

তারাগাছ মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি উদ্ভিদ এবং এর রয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক ও ঔষধি গুরুত্ব। এই গাছের মাটির নিচের রূপান্তরিত কাণ্ড বা রাইজোম শরীরের ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর করতে প্রাকৃতিক টনিক হিসেবে চমৎকার কাজ করে। এটি মানুষের শারীরিক শক্তি ও স্ট্যামিনা বাড়াতে সাহায্য করে। ঔষধি গুণের পাশাপাশি এই উদ্ভিদের একটি চমৎকার জাতিতাত্ত্বিক বা লোকজ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যুগ যুগ ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন জীবনে এই গাছটিকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করে আসছে, যা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে।

লিভার ও পাকস্থলীর সুরক্ষায়: হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং পাকস্থলীর কার্যক্ষমতা জোরদার করতে তারাগাছের ব্যবহার বেশ কার্যকরী। এটি প্রাকৃতিকভাবে মূত্রের পরিমাণ বাড়ায় এবং পেটের গ্যাস বা বায়ু দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া যকৃত বা লিভারের জ্বালাপোড়া এবং বহুমূত্র বা ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা উপশমে এই গাছের রাইজোম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঠাণ্ডা ও বাতের ব্যথা উপশমে: প্রচলিত লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের জ্বর, সর্দি-কাশি এবং ফুসফুসে জমে থাকা কফ সহজে বের করে দিতে এই উদ্ভিদ দারুণ কাজ করে। এর পাশাপাশি তীব্র মাথাব্যথা এবং বাতের ব্যথার মতো শারীরিক কষ্ট দূর করতেও তারাগাছের ঔষধি গুণ ব্যবহার করা হয়, যা শরীরে তাৎক্ষণিক উদ্দীপনা জোগাতে জুড়ি নেই।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী রান্না ও সুগন্ধি মসলা: বিশেষ করে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসী এবং স্থানীয় মানুষরা এই গাছের কাণ্ডের ভেতরের নরম অংশটি দৈনন্দিন রান্নায় ব্যবহার করেন। তরকারিতে এক অনন্য স্বাদ যুক্ত করার পাশাপাশি এটি খাবারে চমৎকার প্রাকৃতিক সুঘ্রাণ এনে দেয়। রান্নায় এই উদ্ভিদের ব্যবহার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

পরিবেশ ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: পাহাড়ি ও গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষরা এই গাছের সহজলভ্যতার কারণে এটিকে একটি সাশ্রয়ী মসলা ও ভেষজ উপাদান হিসেবে বেছে নেন। এটি একদিকে যেমন তাদের খাবারের পুষ্টি ও স্বাদ বাড়ায়, অন্যদিকে স্থানীয় ভেষজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার চিকিৎসার খরচ কমাতে সাহায্য করে।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১২ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) তারাগাছ প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত।বাংলাদেশে তারাগাছ সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। 

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র:

১. মোহাম্মদ ইউসুফ (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪৪৭-৪৪৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flowersofindia ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Nidhan Singh

Leave a Comment

error: Content is protected !!