দোপাটি ফুল বাগান বা গৃহের আলংকারিক বর্ষজীবী বীরুৎ

ভূমিকা: দোপাটি (বৈজ্ঞানিক নাম: Impatiens balsamina ইংরেজি নাম: Garden Balsam, Lady Slipper) হচ্ছে বলসামিনাসি পরিবারের ইম্পেসেন্স গণেরএকটি সপুষ্পক বিরুৎ।  এই গণে প্রায় ৭০০ প্রজাতি আছে। দোপাটি গ্রীষ্ম ও বর্ষার ফুল। এটিকে বাংলাদেশে আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে বা গৃহে চাষাবাদ করা হয়। বাড়ির টবে বা বাগানের শোভাবর্ধন করে এই  বিরুৎ।  এর আকার বেশি বড় হয় না তাই অল্প জায়গাতেই জন্মাতে পারে।[১]

বৈজ্ঞানিক নাম: Impatiens balsamina L., Sp. Pl.: 938 (1753). সমনাম: Impatiens cornuta L. (1753). ইংরেজি নাম : Garden Balsam, Lady Slipper. স্থানীয় নাম: দোপাটি। জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত: Edicots অবিন্যাসিত: Asterids বর্গ: Ericales পরিবার: Balsaminaceae  গণ: Impatiens প্রজাতি: Impatiens balsamina.

বর্ণনা:

দোপাটি বর্ষজীবী বীরুৎ। প্রায় ৮০ সেমি উঁচু হয়। এদের কান্ড ঋজু, সরল বা অনিয়মিত শাখান্বিত, তরুণ অবস্থায় রোম বিহীন বা রোমশ। পাতা একান্তর, ভল্লাকার-উপবৃত্তাকার দৈর্ঘ্য ২.৭ থেকে ৯.০ সেমি ও প্রস্থ ১.২ থেকে ২.৫ সেমি। নিচেরপ্রান্ত কীলকাকার, শীর্ষ সূক্ষ্মাগ্র, প্রান্ত দপ্তর, বৃন্ত ৩-১০ সেমি লম্বা, গ্রন্থিল, মঞ্জরীপত্র রৈখিক-ভল্লাকার, অস্পষ্ট।

ফুল একটি বা ২ বা ৩ টির গুচ্ছে, সাদা বা ফ্যাকাশে লাল হতে পারে। বৃন্ত সরু, ১-২ সেমি লম্বা, রোমশ বা রোম বিহীন। বৃত্যংশ ৩ টি, পার্শ্বীয় বৃত্যংশ ২ টি, সরু ডিম্বাকৃতি-ভল্লাকার, নিচের বৃত্যংশ স্পষ্ট নৌকাকৃতি, ফুল লম্বায় ১৩-১৯ মিমি লম্বা হয়, দলপুট সূত্রাকার, রোম বিহীন বা সর্বত্র বা আংশিক সূক্ষ্ম রোমশ। পাপড়ি ৫টি, পৃষ্ঠীয় পাপড়ি আবরণযুক্ত, ১০-১৪ মিমি লম্বা, পার্শ্বীয় ৪ যুক্ত পাপড়ি ২৩-২৫ মিমি লম্বা, প্রতি জোড়ার উপরের পাপড়ির আকার নিচের পাপড়ির আকারের এক তৃতীয়াংশ, উপরের পাপড়ি দীর্ঘায়ত, ৯-১১ X ৪-৭ মিমি, অসম।

পুংকেশর ৫ টি, পুংদন্ড খাটো, পরাগধানী সংযুক্ত। গর্ভাশয় ঘন রোমশ, ৫-কোষী, ডিম্বক অনেক, গর্ভমুন্ড গর্ভদন্ডবিহীন, ৫ দন্তক। ফল ক্যাপসিউল, ঘন ক্ষুদ্র কোমল রোমাবৃত। বীজ গোলাকার, জালিকাকার।[২]

আরো পড়ুন:  দোলক লংকা জবা বিশ্বব্যাপী চাষকৃত আলংকারিক উদ্ভিদ

বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ: 

উন্মুক্ত পরিবেশে ও ভিজা মাটিতে, সচরাচর আবাদী জমি বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এই দোপাটির বীজ বোপন করলে পুষ্ট চারা জন্মে। দোপাটির পাকা ফল চাপ দিলে বীজ ফেটে বের হয়। দোপাটি প্রধানত খরিপ মৌসুমের ফুল। বীজ দ্বারাই এর বংশবিস্তার হয়।[৩] মার্চ থেকে অক্টোবর মাসে দোপাটির ফুল ফোটে ও বীজ হয়। [২]

দোপাটি শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ৩ ঋতুতেই দেখা যায়। তবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এই গাছে প্রচুর ফুল ফোটে ও বড় হয়। হালকা উর্বর মাটি ও প্রচুর পানি দোপাটি চাষের সহায়ক। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এর বীজ বপন করা হয়। আমাদের দেশে সাদা, লাল, গোলাপী, বেগুনী প্রভৃতি রঙের সিঙ্গেল ও ডাবল দোপাটি চাষ করা হয়। বালসাম ও ক্যামোলিয়া এই দুটি জাতই চাষ করা হয়।

সূর্যালোকিত উঁচু জায়গা নির্বাচন করতে হবে। মাটির প্রকৃতি অবশ্যয় দো-আঁশ বা বেলে মাটি হতে হবে তাহলে ফুলের আকার ও রং ভালো হবে। মাটি কুপিয়ে নরম ও ঝুরঝরে করতে হবে। নজর রাখতে হবে বীজতলায় জেনো জলাবদ্ধতা না হয়। চারা লাগানোর ২/৩ মাসের মধ্যেই দোপাটি ফুল ফোটে।[৪]  

ক্রোমোসোম সংখ্যা:

2n = ১০, ১২, ১৪ [৫]

বিস্তৃতি:

আদিনিবাস সম্ভবত ভারত, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ ও শীতপ্রধান অঞ্চলের সর্বত্র বাহারি উদ্ভিদরূপে জন্মে। বাংলাদেশর সব জেলার মাটিতে জন্মাতে দেখা যায়।[১]

ভেষজ গুণ ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

পাতা ও মূলের পুলটিস তৈরি করে ক্ষত, তৃকের প্রদাহ ও ফাটল নখে ব্যবহার করা হয়। ফুল বলবর্ধক এবং পোড়া ঘা, বাষ্পদাহ ঠান্ডা রাখতে এবং বাতরোগে উপকারী। আঙ্গুলের নখ রং করতে ফুল ব্যবহার করা হয়। বাহারি উদ্ভিদরূপে চাষ করা হয়।

ব্রুনাইয়ে মহিলারা অনিয়মিত রজ:স্রাবের জন্য মূলের ক্বাথ ব্যবহার করে থাকেন।[৬] বীজ আহার্য। দোপাটি ফলে পোড়া ঘায়ে, গরম পানি কিংবা বাষ্পে পুড়ে গেলে এবং নরম মাংস পেশীর সংযোজনায় উপকারী। পাতা ও গাছের রস বমনকারক, বিরেচক বলে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।[১]

আরো পড়ুন:  নাগ টগর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার বনজ গুল্ম

 অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) দোপাটি প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে দোপাটি সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।[২]

তথ্যসূত্র:                                                                   

১.  শেখ সাদী, উদ্ভিদকোষ, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা, ২২৯, আইএসবিএন ৯৮৪-৪৮৩-৩১৯-১।

২.  এম আহসান হাবীব (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ২-৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৩. ড. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ফুলের চাষ প্রথম সংস্করণ ২০০৩ ঢাকা, দিব্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা ৯৫। আইএসবিএন 984-483-108-3

৪. সিরাজুল করিম আধুনিক পদ্ধতিতে ফুলের চাষ প্রথম প্রকাশ ২০০১ ঢাকা, গতিধারা, পৃষ্ঠা ১১৮-১২০। আইএসবিএন 984-461-128-7

৫. Kumar, V. and Subramaniam,, B. 1986 Chromosome Atlas of Flowering Plants of the Indian Subcontinent. Vol.1. Dicotyledons Botanical Survey of India, Calcutta. 464 pp.

৬. van Valkenburg, J.L.C.H and Bunyapraphatsara, N. (eds.). 2002. Plant Resources of South-East Asia,  No. 12(2). Medicinal and Poisonous plants 2. Prosea Foundation, Bogor, Indonesia. 782 pp.

Leave a Comment

error: Content is protected !!