মাশরুম-এর প্রকারভেদ ও বিবিধ উপকারিতা

বাংলায় আমরা ছাতা, ব্যাঙের ছাতা, ভূঁইছাতা, কোড়ক ছাতা, ছত্রাক, পলছত্রাক, ভূঁইছাতি, ছাতকুড় প্রভৃতি নামে চিনি; হিন্দীতে এটিকে ছাতা, ভূঁইছত্তা, ভূঁইফোড়ছত্তা, ছতোনা, সাপের ছাতা, খুমী, ধরতীফুল প্রভৃতি বলে।

Fungi বর্গের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ genus বা গণ হচ্ছে Agaricus; এই গণের এক হাজারেরও বেশি প্রজাতি বর্তমান। ভারতে কয়েক প্রকার ছত্রাক কোন প্রকার বাছবিচার না করে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইংরেজীতে সবগুলিরই একটি সাধারণ নাম Mushroom. কিছু ছত্রাক আছে, যা খাওয়া যায় আর এমন অনেক ছত্রাক আছে, যা বিষাক্ত, তন্মধ্যে কিছু খুবই মারাত্মক। সবগুলি ছত্রাককে আলাদা আলাদা ভাবে নামকরণ করা এবং সেগুলির গুণাগুণ বিচার করা সম্ভব হয়নি। এজন্য এগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কিছুটা বিচার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

১. Agaricus campestris Linn.(Family-Agaricaceae) এটি এক প্রকার। ভূঁইছাতা, সমগ্র ভারতেই জন্মে, তবে পাঞ্জাবে খুব বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে আপনা-আপনি মাটি ভেদ করে এই ছাতা জন্মে। এটি পাহাড়ী ও সমতলভূমিতে পচাপাতা, খড়, গোবর থেকেও বর্ষাকালে জন্মে। জলাশয়ের কাছাকাছি সেঁতসেঁতে ভূমিতেও হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে কোথাও কোথাও এটিকে দুর্গাছাতু বলে।

কেবল একটি সাদা রঙের কাণ্ড মাটি ভেদ করে ওঠে, কাণ্ডের মাথায় থাকে বর্তুলাকার ছাতা, এটি প্রথমাবস্থা পরে সেটি প্রস্ফুটিত হয়ে ছাতার আকার ধারণ করে। কন্দ থেকে যে কান্ডটি বেরোয় সেটি উপরের দিকে ক্রমশ সরু, ৬/৭ ইঞ্চি পর্যন্ত সাধারণলম্বা হয়; কাণ্ডটিকে ডাঁটাও বলা হয়ে থাকে। ডাঁটার মাথায় যে ছাতাটি থাকে, সেটির নীচের দিকে মাছের ঝিল্লীর মতো পাতলা পরদা থাকে এবং তাতে বীজাণুর অস্তিত্বও পাওয়া যায়। এই ছাতার নীচের দিকে ডাঁটাতে একটা পাতলা পদার্মত আবরণ থাকে, সেটি প্রথমাবস্থায় ডাঁটার সঙ্গে অনেকটা মিশে থাকে, ছাতাটি সম্পূর্ণ পরিস্ফুট হওয়ার সময় ঐ আবরণটি একটু ঝুলে পড়ে, দেখলে মনে হয়— মসৃণ কাণ্ডের উপরের দিকে যেন একটি আলগা ধরনের গাঁট। এটিকে Gill বলা হয়। এই ছাতাটি পঃ বঙ্গের মাটিতে খুব কম জন্মে, আমরা যেটি দেখতে ও খেতে অভ্যস্ত সেটিকে পল ছত্রাক বা খড়ছাতু বলা হয়।

আরো পড়ুন:  দূর্বা বাংলাদেশের পতিত জমিতে জন্মানো ভেষজ ঘাস

এই প্রজাতিটির চাষ করার উপযুক্ত সময় সমতলে আগষ্ট থেকে মার্চ মাস এবং পাহাড়ী জয়গায় মার্চ-অক্টোবর মাস। তাপনিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সারা বৎসর তৈরি করা কোন কষ্টকর ব্যাপার নয়। একবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে নিয়মিত সার দিয়ে গেলে তা থেকে ৭/৮ মাস ছত্রাক পাওয়া যায়। পলছত্রাক বা খড়ছাতু মাত্র ৪/৫ দিন ধরে তৈরী হয়। এই ছত্রাকটি তাজা ও শুকনো দুই ভাবেই খাওয়া যায়। খুবই সুস্বাদু ও উপাদেয় খাদ্য।

এই মাশরুমের ছাতা ও তার ডাঁটা ছোট ছোট করে কেটে জলে ধুয়ে নিংড়ে নিয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা যায়। ভারতের অধিবাসীগণ এই ছত্রাককে যেভাবে ব্যবহার করে থাকেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে ইউরোপ ও আমেরিকায়। সেসব দেশে এটির চাষ খুব যত্নসহকারে হয়ে থাকে।

২. Volvaria displasia Berk & Br. (Straw Mushroom) পচা খড় থেকে সাধারণ বর্ষা ও শরৎকালে এই ছত্রাকটি জন্মে। খড় (পল) থেকে এটি জন্মে বলেই এটিকে বাংলায় পলছত্রাক, খড়ছাতু, পোয়াল ছাতু (ছাতা) বলে। এই ছত্রাকটি পশ্চিমবঙ্গে ও মাদ্রাজে বেশি পাওয়া যায়। কন্দ হতে ২-৫ ইঞ্চি লম্বা সাদা রঙের কাণ্ড বা ডাঁটা বেরোয়, কাণ্ডটি উপরের দিকে ক্রমশঃ সরু এবং মসৃণ। কাণ্ড বা ডাঁটার উপর ছত্রাকটি থাকে, ছোট অবস্থায় বর্তুলাকার, অনেকটা ঘণ্টার মতো, পরে বেড়ে ছাতার মতো প্রসারিত হয়, কোন কোনটা অতটা হয় না। ছাতার উপরের দিকটা মসৃণ, ধূসর সাদা, উপরের কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি স্থানটা কালচে সাদা, কিনারা কাটা কাটা। ছাতার ভেতরের দিকটা ফিকে লাল রঙের হাল্কা পরদা ভাঁজ ভাঁজ হয়ে থাকে, তা অনাবৃত অর্থাৎ কোন আবরণ থাকে না। ডাঁটা ও ছাতা দুটিই খুব নরম, একটু নাড়াচাড়া করলেই ভেঙ্গে যায় ও দ্রুত শুকিয়ে যায়। বর্ষায় ভাল ভাবে এটির চাষ হয়।

পচা খড়ের গাদায় বা স্তুপে আর এক প্রকার ছত্রাক পাওয়া যায়, সেটির নাম Volvaria terastria Berk & Br., বাংলায় এটিকেও বলে পলছত্রাক বা খড় ছাতু। এ দুটি প্রজাতি দেখতে প্রায় একই রকম। একই ভাবে দুটি অযত্নসম্ভূত। বর্তমানে দু’টিকেই কৃত্রিমভাবে সারা বৎসর ধরে তৈরী করা হচ্ছে। বীজ ছড়ানোর ১৫-২০ দিনের মধ্যে ছত্রাক তৈরী আরম্ভ হয় এবং ৪/৫ দিন ধরে প্রচুর পরিমাণে হতে থাকে।

আরো পড়ুন:  পুদিনা পাতা-র নয়টি ঔষধি ব্যবহার ও প্রয়োগ

এ দুটি ছত্রাক কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা বিশেষভাবে জেনে রাখা দরকার। তাজা ছাতু বা ছাতা তুলে এনে প্রথমে কন্দমূলটা কেটে বাদ দিয়ে কাণ্ড বা ডাঁটাটা কুচি কুচি করে কেটে নিতে হবে। ছাতাটা ছোট ছোট করে টুকরা তৈরীর সময় ছাতার উপরের ধূসর রঙের পাতলা আবরণটিকে বাদ দিতে হবে। এর পর সমস্ত টুকরাগুলিকে ভালভাবে জলে চটকে ধুয়ে নিংড়ে সেই ছাতাতে প্রয়োজনমত লবণ ও হলুদ মিশিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর পুনরায় নিংড়ে জলটা ফেলে দিতে হবে। এরপর ঐ নিংড়ানো ছাতুকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে, যেমন তেলে ভেজে, একক বা একাধিক সবজির সঙ্গে মিশিয়ে তরকারি প্রস্তুত করে, সামান্য অল্প ও চিনি সহয়োগে চাটনী বানিয়ে খাওয়া যায়।

গ্রামাঞ্চলে অনেকেই এই ছাতু বা ছাতা খাওয়ার জন্য কিছু খড়কে তূপীকৃত করে রাখেন এবং বৃষ্টির জলে সেই খড় পচে গিয়ে ছত্রাকের সৃষ্টি হয়। এটিকে শুকিয়ে খাওয়া যায় না। পঃ বঙ্গের কোন কোন গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি একটি উপাদেয় খাদ্য বস্তু।

এছাড়া আরও কয়েকটি প্রজাতির ছত্রাক ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কমবেশি জন্মে এবং সেগুলি খাদ্যোপযোগী, তন্মধ্যে কয়েকটি প্রজাতির নাম— Cantharellus cibarius Fr., Morchella esculenta (Linn.) Pers., Tuber cibarium Sibth. প্রভৃতি এবং Hymenomycetes ও Gasteromycetes বর্গর্ভুক্ত কিছু প্রজাতি। মেদিনীপুরের কোন কোন দোআঁশ মাটির অঞ্চলে “উইছাতু” নামে একপ্রকার ছাতা বা ছাতু পাওয়া যায়, সেগুলি সাধারণতঃ স্যাঁৎসেঁতে মাটিতে, উই-এর ঢিপির উপরে জন্মে। খুব ছোট ছোট, একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে হতে দেখা যায়। সকালের দিকে ফোটে, বিকালের দিকে শুকিয়ে যায়। এটিও খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

Agaricus ostreatus Jacq.নামে একটি ছত্রাক পাওয়া যায়। কাঁঠাল গাছের পুরাতন গুড়িতে নস্যি রঙের ছাতা জন্মে। মোটা দণ্ডের বা কাণ্ডের উপর শক্ত সমতল বিশিষ্ট (চেটাল) ছাতা, অনেকটা ঝিনুকের খোলের মত শক্ত, ভেতরের দিকে কিছু পাতলা স্তর আছে। এজন্য এটিকে পনস ছত্রাক বলে, পনস অর্থে কাঁঠাল। এটি খাওয়া হয়।

আরো পড়ুন:  শাচী শাক-এর পাঁচটি ভেষজ গুণ ও ব্যবহারবিধি

Agaricus albus, Polyporus igniarius, P. officinalis — এগুলি এদেশে পাওয়া যায় না, তবে বাইরে থেকে এদেশে আসে এবং ইউনানি সম্প্রদায়ের চিকিৎসকগণ এটিকে গারীকুন বলেন। এগুলি বাহ্যিক রক্তরোধক, পুষ্টিকর, বিরেচক, প্রস্রাবকারক, কফ নিঃসারক, স্নায়ুর বলকারক প্রভৃতি গুণবিশিষ্ট।

কয়েক প্রকার বিষাক্ত ছত্রাক আছে, যেগুলি খেলে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। Amanita phalloides Secr. নামক ছত্রাকটি খুবই বিষাক্ত, তাই এর এক নাম Death Cap, আর একটি বিষাক্ত প্রজাতির নাম Amanita muscaria Pers.; এছাড়া আরও কিছু বিষাক্ত প্রজাতি আছে।

সেজন্য ছত্রাক ব্যবহারের সময় সাবধানে ব্যবহার করা উচিতই, তাছাড়া এ সম্বন্ধে উপযুক্ত জ্ঞান না থাকলে ছত্রাক খাওয়া উচিত নয়। এটা দিয়ে নানাপ্রকার ভিটামিন, ঔষধ, বাণিজ্যিক দ্রব্যও তৈরি হয়।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ১২২-১২৫।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Thomas Pruß

Leave a Comment

error: Content is protected !!